নথিতে একের পর এক জালিয়াতি। তারপরও ৪১ বছর আগের তামাদি ফাইল জীবন্ত হয়ে উঠেছে রাজউকে। যার জেরে শেষ পর্যন্ত ১২ কোটি টাকার একটি প্লট হস্তান্তরও করে দিয়েছে সংস্থাটি। অবিশ্বাস্য এই জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) নিকুঞ্জ-২ আবাসিক এলাকা প্রকল্পের ২ নম্বর রোডের ১৪ নম্বর প্লট ঘিরে।
লিখিত অভিযোগ
ব্যাংক রসিদ টেম্পারিং, মৃত মানুষের স্বাক্ষর, ভুয়া অ্যাওয়ার্ড সনদ। একের পর এক সরকারি নির্দেশনা লঙ্ঘন করে দুই কাঠা ৮ ছটাক আয়তনের এই প্লটটির শুধু নামজারিই করা হয়নি, বিক্রির চূড়ান্ত অনুমতিও দেওয়া হয়েছে। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী, প্লটটির দাম অন্তত ১২ থেকে ১৫ কোটি টাকা।
এই কাণ্ডের নেপথ্যে নাম এসেছে রাজউক চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম, সংস্থাটির এস্টেট ও ভূমি সদস্য মতিয়ার রহমান এবং সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাসের ছেলে ও সংস্থার উপপরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-২) মো. আসাদুজ্জামান বিশ্বাসের।
জালিয়াতিতে এই তিনজনসহ একটি সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট তথ্য মিলেছে। সম্প্রতি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে জমা পড়া একটি লিখিত অভিযোগের সূত্র ধরে অনুসন্ধান চালায়। সেই অনুসন্ধানেই উঠে আসে প্লটের নথিপত্রে জালিয়াতির ভয়াবহ চিত্র।
শর্ত ভাঙলেও বাতিল হয়নি বরাদ্দ
জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে এক সময় স্থানীয়দের কাছ থেকে ওই এলাকার জমি অধিগ্রহণ করে রাজউক। এরপর ১৯৮৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি নিকুঞ্জ-২ প্রকল্পের ১৪ নম্বর প্লটটি ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ কোটায় চূড়ান্ত বরাদ্দ পান আব্দুস সাত্তার নামের এক ব্যক্তি। চুক্তি অনুযায়ী, চার কিস্তিতে তার এই প্লটের সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধের বাধ্যবাধকতা ছিল।
রাজউকের নথি অনুযায়ী, ১৯৮৫ সালের ৩১ মার্চ সুদবিহীন প্রথম কিস্তির ৬ হাজার ৬৬৭ টাকা যথাসময়ে পরিশোধ করেন আব্দুস সাত্তার। এরপর ১৯৮৬ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে দ্বিতীয় কিস্তির ১৬ হাজার ৪৪৪ টাকা পরিশোধের কথা ছিল। কিন্তু তা আর পরিশোধ করা হয়নি। ১৯৮৭ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে তৃতীয় কিস্তির ১৪ হাজার ৬৬৭ টাকা পরিশোধের কথা থাকলেও তা-ও দেওয়া হয়নি।
চতুর্থ কিস্তির ১২ হাজার ৮৮৯ টাকা পরিশোধের সময়সীমা ছিল ১৯৮৮ সালের ৩১ মার্চ। কিন্তু তা গ্রহণ করা হয় দীর্ঘ ৩৪ বছর পর ২০২২ সালের ১৮ মে, যা সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূত। নানা দাপ্তরিক প্রক্রিয়া শেষে সর্বশেষ গত ৮ জানুয়ারি প্লটটি মমতাজ বেগম নামে পরিচয় দেওয়া এক নারীর অনুকূলে বরাদ্দ চূড়ান্তভাবে বহাল করে রাজউক।
রাজউকের ‘প্লট বরাদ্দ বিধি-২০২৪’ ও পূর্ববর্তী আইন অনুযায়ী, বরাদ্দপত্র পাওয়ার পর সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত অতিরিক্ত সুদসহ বকেয়া কিস্তি পরিশোধের সুযোগ থাকে। ৩৪ বছর পর কিস্তি পরিশোধের কোনো বিধান সংস্থাটির আইনে নেই।
শর্ত অনুযায়ী, কিস্তি পরিশোধ না করায় আইনত এই বরাদ্দ বহু আগেই বাতিল হয়ে জায়গাটি রাষ্ট্রের খাস জমিতে পরিণত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কোনো এক ইশারায় সেই বরাদ্দ বাতিল হয়নি। বরং পরবর্তীতে যা ঘটেছে তা আব্দুস সাত্তারের ওয়ারিশদের প্রাপ্য জমি বুঝিয়ে দেওয়া নয়, বরং সরকারের কোটি টাকার খাস জমি জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তর করা।
৪১ বছর ধরে বকেয়া থাকা প্লটের ফাইল কীভাবে সচল হলো? রাজউকের সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) শেখ মতিয়ার রহমানের কাছে এ বিষয়ে জানতে চায়। আলাপকালে এত দিন পরে টাকা জমা দেওয়ার বিষয়টি বিধিসম্মত হয়নি বলে স্বীকার করেন তিনি।
শেখ মতিয়ার রহমান বলেন, ‘দ্বিতীয় ও তৃতীয় কিস্তির জমাকৃত রসিদে অনেক ঘষামাজা ছিল। সেটি যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এসব রসিদ ১৯৮৭-৮৮ সালের হওয়ায় ব্যাংকেও নথি পাওয়া যায় না। এখন আমাদের কাছে বিস্তারিত জালিয়াতির বিষয়টি নজরে এসেছে। দ্রুত এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেব।’
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১৭ সালের ৭ ডিসেম্বর আব্দুস সাত্তারের স্ত্রী পরিচয় দিয়ে মমতাজ বেগম নামের এক নারী রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে সংশোধনী বরাদ্দপত্র ইস্যুর আবেদন করেন। জানান, স্বামী দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকায় পরবর্তী কিস্তিগুলো যথাসময়ে পরিশোধ করা যায়নি।
মমতাজ বেগমের দাবি, ২০১৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি এই বরাদ্দের কথা জানতে পারেন। যদিও একই সময়ে নিকুঞ্জ-২ (উত্তর) ১৮ নম্বর সড়কের ৩১ নম্বর প্লটটি আব্দুস সাত্তারের স্ত্রী পরিচয়ে একই ক্যাটাগরিতে ইতিমধ্যে বরাদ্দ পেয়েছিলেন।
বিধবা ও বৈধ ওয়ারিশ হিসেবে নামজারির আবেদন জানালে তৎকালীন চেয়ারম্যান বিষয়টি বিবেচনার নির্দেশ দেন ভূমি ও এস্টেট বিভাগকে। কিন্তু আবেদনের এক বছরেও ফাইলটি আলোর মুখ দেখেনি।
২০১৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি মমতাজ বেগম দ্বিতীয়বার আবেদন করেন। এবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সিনিয়র সচিব ড. মো. মোজাম্মেল হক খান সুপারিশ করেন। তার ভিজিটিং কার্ড এখনও নথিতে সংযুক্ত আছে। রাজউকের তৎকালীন চেয়ারম্যান বিষয়টিকে ‘অতীব জরুরি’ উল্লেখ করে তিন দশকের পুরোনো ফাইলটি উত্থাপনের নির্দেশ দেন। এখান থেকেই শুরু হয় ফাইলের জাদুকরি রূপান্তর।
মনজুরুল হকের রসিদ হয়ে গেল আব্দুস সাত্তারের
মমতাজ বেগমের আবেদনের পর ফাইলটি রাজউকের টেবিল থেকে টেবিলে ঘুরতে থাকে। এর সমান্তরালে ফাইলের ভেতরের তথ্য ও ব্যাংক স্টেটমেন্টও রহস্যজনকভাবে বদলে যেতে থাকে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় কিস্তির টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না পড়লেও নথিতে তা ‘পরিশোধিত’ দেখাতে অভিনব কৌশল নেওয়া হয়।
২০১৯ সালের ১৫ মার্চ এস্টেট ও ভূমি-২ উপবিভাগের নথিতে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল, প্লটটির কেবল প্রথম কিস্তি পরিশোধ করা হয়েছে। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে ২০২১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারির নথিতে উল্লেখ করা হয়, মৃত আব্দুস সাত্তার সমুদয় কিস্তি পরিশোধ করে গেছেন।
নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্লটের নথির ১৬ নম্বর পাতায় ১৯৮৭ সালের ১৭ মে সোনালী ব্যাংকের ডিআইটি শাখায় জমাকৃত ১২৭৬ নম্বর রসিদে ১৬ হাজার ৪৪৪ টাকা এবং ১৯৮৮ সালের ২ জানুয়ারির ১৬৮ নম্বর রসিদে ১৪ হাজার ৬৬৭ টাকা জমার দুটি ব্যাংক রসিদ সংযুক্ত রয়েছে। তবে নথিতে কোনো মূল রসিদ নেই। আছে দুটি ঘষামাজা করা ফটোকপি।
মূল নথিপত্র যাচাই করতে গিয়ে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসে। হাতে আসা নথিতে দেখা গেছে, সোনালী ব্যাংকের ১২৭৬ ও ১৬৮ নম্বর সিরিয়ালের মূল রসিদ দুটি আসলে নিকুঞ্জ-২ এলাকার ‘কবি ফারুক সরণি’ রোডের ৩ নম্বর প্লটের বিপরীতে জমা দেওয়া হয়েছিল। ওই প্লটের মূল বরাদ্দগ্রহীতা ছিলেন মনজুরুল হক। তিনি ১৯৮৭ ও ১৯৮৮ সালে নিজের প্লটের বিপরীতে ওই অর্থ জমা দিয়েছিলেন।
চক্রটি মনজুরুল হকের নথির আসল ব্যাংক রসিদ দুটি ফটোকপি করে। তারপর অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মূল বরাদ্দগ্রহীতার নাম ও প্লট নম্বর টেম্পারিং করে সেখানে বসিয়ে দেয় ১৪ নম্বর প্লটের গ্রহীতা আব্দুস সাত্তারের নাম। এই ভুয়া রসিদ দুটিই ১৪ নম্বর প্লটের নথির ১৬ ও ২০ নম্বর পৃষ্ঠায় যুক্ত করে ফাইলকে ‘পরিশোধিত’ সিল দেওয়া হয়।
ভূমি ও এস্টেট-১-এর তৎকালীন পরিচালক এ বি এম এহছানুল মামুন চেয়ারম্যানের কাছে নোটে ব্যাংকে সরেজমিনে লেজারবুক যাচাইয়ের সুপারিশ করেন। তবে কর্তৃপক্ষ পরে আর সেটি যাচাই করেনি।
এই জালিয়াতির অন্যতম কারিগর হিসেবে উঠে আসে রাজউকের উপপরিচালক মো. আসাদুজ্জামান বিশ্বাসের নাম। নথি পর্যালোচনা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কিস্তি অপরিশোধিত থাকায় আইন অনুযায়ী প্লটটি রাজউকের খাস জমিতে পরিণত হয়েছিল। বকেয়া কিস্তির জাল রসিদ দেখিয়ে জমিটি ব্যক্তিমালিকানায় দেখানোর মাধ্যমে সরকারের বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। বিগত প্রায় ৪০ বছরের চক্রবৃদ্ধি সুদ ও জরিমানা ফাঁকি দেওয়ায় সরকার আরও কয়েক কোটি টাকার প্রত্যক্ষ রাজস্ব হারিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে একাধিকবার রাজউকের উপপরিচালক আসাদুজ্জামান বিশ্বাসের দপ্তরে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে একাধিকবার মোবাইলে যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপে পরিচয়ে প্রশ্ন পাঠিয়েও জবাব মেলেনি।
সোনালী ব্যাংক পিএলসির ডিআইটি (বর্তমানে রাজউক ভবন) শাখার অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার (শাখা প্রধান) এরশাদুল হক বলেন, ‘ব্যাংক কখনও মৌখিকভাবে রসিদ যাচাই করে না। কোনো সংস্থা যদি ব্যাংক রসিদ যাচাই করতে চায় যে সেটির টাকা জমা হয়েছে কি না বা কার নামে জমা হয়েছে তখন তারা চিঠি দিয়ে সেটি জানতে চাইবে। আমরাও তাদেরকে চিঠি দিয়ে জানাবো। রাজউকেরও এ ধরনের নথি মৌখিকভাবে জানানোর সুযোগ নেই। আমি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় এই সময়ে কোনো মৌখিক তথ্য দিইনি।’
মৃত মানুষের স্বাক্ষর ও ভুয়া নথির পাহাড়
এই ফাইলে জালিয়াতির এখানেই শেষ নয়। অভিযুক্ত প্লটের নথির ১৮৩ নম্বর পৃষ্ঠায় সংরক্ষিত ২০২২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারির ‘ওয়ারিশদের হাজিরা শিটে মোহাম্মদ আলাউদ্দিন নামের এক ওয়ারিশের স্বাক্ষর রয়েছে। কিন্তু রাজউকের নিজস্ব রেকর্ড বলছে, এই হাজিরা দেওয়ার কয়েক বছর আগেই তিনি মারা গেছেন। তার মৃত্যুর প্রমাণপত্র নিকুঞ্জ-২ প্রকল্পের ১২ নম্বর প্লটের ফাইলে সংরক্ষিত আছে।
মৃত ব্যক্তি কীভাবে কবর থেকে উঠে এসে রাজউক কার্যালয়ে সই দিয়ে গেলেন? এমন প্রশ্ন উঠে খোদ রাজউকের কর্মকর্তাদের মধ্যেই। নথিতে আলাউদ্দিনের ছবি পরে সংযুক্ত করা হয়েছে বলে পরিচালক চেয়ারম্যানের কাছে দাপ্তরিক নোটে উল্লেখ করেছেন। ছবির ওপরে যে সীলমোহর থাকার কথা, তার অর্ধেক ছবিতে ও বাকি অর্ধেক স্ট্যাম্পে থাকার নিয়ম। কিন্তু ছবির ওপর কোনো সিলমোহর নেই।
মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, প্লটের ৩০ থেকে ৩৭ নম্বর পৃষ্ঠায় সংযুক্ত ওয়ারিশান সনদ এবং ৯/ক পৃষ্ঠার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ‘অ্যাওয়ার্ড সনদ’ দুটিই সম্পূর্ণ ভুয়া। এমনকি নথির ২৫-৩০ নম্বর নোট অনুচ্ছেদে এমআইএস শাখার যে মতামত রয়েছে, তা-ও জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে বলে ভূমি ও এস্টেট বিভাগের কর্মকর্তারা লিখিতভাবে জানিয়েছেন।
হাতে আসা নথির ১১১ থেকে ১১৩ পৃষ্ঠায় রক্ষিত ব্যাংক স্টেটমেন্টগুলোও অস্বাভাবিক। জামানতের ঘরে ১০ হাজার টাকা এবং প্রথম কিস্তির ঘরে ৬ হাজার ৬৭০ টাকা লেখা হলেও মোটের ঘরে লেখা হয়েছে মাত্র ১ হাজার টাকা।
১৬৫ নম্বর পৃষ্ঠায় রক্ষিত আমমোক্তারনামার ৬ নম্বর অনুচ্ছেদের ৫ নম্বর প্যারায় লেখা হয়েছে, প্রথম কিস্তির অর্থ ৩০ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে। কিন্তু চূড়ান্ত বরাদ্দপত্রের ৪ নম্বর শর্ত অনুযায়ী, কিস্তির অর্থ কেবল সোনালী ব্যাংকের ডিআইটি শাখার ‘ডি অ্যাকাউন্ট-২০ -এ জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল।
১৯৮৫ সালে ইসলামী ব্যাংকে কীভাবে সরকারি প্লটের কিস্তির টাকা জমা নেওয়া হলো এবং কিস্তির পরিমাণ ৬ হাজার ৬৬৭ টাকার জায়গায় কীভাবে ৩০ হাজার টাকা জমা হলো, তার কোনো ব্যাখ্যা নথিতে নেই।
একাধিক প্লটের তথ্য গোপন
অভিযুক্ত প্লটের নথির ৩ নম্বর পৃষ্ঠার ‘নোট অনুচ্ছেদ-৭’-এ একজন কর্মকর্তার মন্তব্য ছিল, এই বরাদ্দগ্রহীতার নিকুঞ্জ ছাড়াও গুলশান, বনানী বা বারিধারা এলাকায় একাধিক প্লট বরাদ্দ রয়েছে। তাই বিষয়টি চূড়ান্ত করার আগে মন্ত্রণালয়ের মতামত নেওয়া আবশ্যক ছিল।
নথিপত্র যাচাইয়ে দেখা যায়, মূল আবেদনকারী আব্দুস সাত্তার নিজেই এক আবেদনে স্বীকার করেছিলেন, তিনি বারিধারায় একটি প্লট বরাদ্দ পেয়েছেন এবং জোয়ার সাহারা পুনর্বাসন এলাকায় প্রাপ্ত এই প্লটটি প্রত্যর্পণের আবেদন করেছেন। রাজউকের বিধি অনুযায়ী, একই ব্যক্তি বা পরিবার একাধিক প্লট বহাল রাখতে পারেন না। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাইল থেকে ধামাচাপা দেওয়া হয়।
মমতাজ বেগমের পরিচয় নিয়ে সংশয়
৩৩ বছর পর হঠাৎ মমতাজ বেগম নামের এক নারী নিজেকে আব্দুস সাত্তারের স্ত্রী দাবি করে আবেদন করেন। তার পরিচয় নিয়ে রাজউকের নথিতে গুরুতর সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে।
রাজউকের তৎকালীন পরিচালক (এস্টেট) এ বি এম এহছানুল মামুন নথিতে উল্লেখ করেন, আবেদনকারীর নথির ১১৭ পৃষ্ঠায় সংযুক্ত জন্মসনদটি স্পষ্টতই জাল। মমতাজ বেগমের জন্ম ১৯৪৫ সালের ১২ জুলাই। জন্মসনদের ১৭ ডিজিটের নিয়ম অনুযায়ী প্রথম ৪ ডিজিট জন্মসাল (১৯৪৫) হওয়ার কথা। কিন্তু তার সনদ শুরু হয়েছে ‘২০০৮’দিয়ে, সনদ নম্বর ২০০৮***৭৮।
জন্মসনদ অনুযায়ী মমতাজ বেগমের স্থায়ী ঠিকানা নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রাম। অথচ নথিতে দাখিলকৃত অ্যাওয়ার্ড ও হলফনামায় তার স্থায়ী ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার সুকুন্দি গ্রাম। একই ব্যক্তির দুই জেলায় স্থায়ী ঠিকানা ও ভুয়া জন্মসনদ থাকার পরও কীভাবে তাকে কোটি টাকার প্লট হস্তান্তর করা হলো, তা এখনও রহস্য।
মৌখিক তথ্যে চূড়ান্ত অনুমোদন
এই বিশাল জালিয়াতি প্রথম ধরা পড়ে রাজউকের তৎকালীন পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-১) এ বি এম এহছানুল মামুনের কাছে। ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর তিনি ফাইলের ১৫১ থেকে ১৬১ নম্বর অনুচ্ছেদে থাকা সব ত্রুটি নথিভুক্ত করেন। একই সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে চেয়ারম্যানের কাছে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেন।
এ ঘটনায় রাজউকের উচ্চপর্যায়ে হইচই পড়ে যায়। কয়েক দিনের মাথায় পরিচালক এহছানুল মামুনকে এস্টেট বিভাগ থেকে প্রশাসন বিভাগে বদলি করা হয়। তার জায়গায় বসানো হয় বিসিএস ২৫ ব্যাচের কর্মকর্তা মিজানুর রহমানকে। চেয়ারম্যানের নির্দেশনায় এস্টেট ও ভূমি সদস্য শেখ মতিয়ার রহমান ২১ ডিসেম্বর নতুন পরিচালককে পূর্ববর্তী নোটের ‘যৌক্তিকতা পুনরায় যাচাইয়ের দায়িত্ব দেন।
রাজউকের তৎকালীন পরিচালক এ বি এম এহছানুল মামুন বলেন, ‘আমি প্লটের পুরোনো নথিপত্রের আলোকে সুপারিশ করেছি। আমার সুপারিশে যা অনিয়ম মনে হয়েছে তার সব প্রমাণ নথিপত্রে আছে। এরপরই আমাকে এস্টেট বিভাগ থেকে বদলি করে প্রশাসন বিভাগে সংযুক্ত করা হয়। তবে আমি মনি করি না যে, এই কারণে আমাকে বদল করা হয়েছে। বদলিও চাকরির অংশ, এ অংশ হিসাবে বদলি হয়েছে।’
এদিকে রাজউকের ২৫/২০২৪তম সাধারণ বোর্ড সভায় এই প্লটের জালিয়াতি তদন্তে তৎকালীন উপপরিচালক তাহমিনা বেগমকে প্রধান করে ৪ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই কমিটি আজও কোনো প্রতিবেদন দেয়নি। এ বিষয়ে কোনো তথ্যই নেই নথিতে। এমনকি ১৩৬-১৫০ নম্বর অনুচ্ছেদে এসব তথ্য গোপন করে প্লটের বরাদ্দ বহাল রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
তৎকালীন উপপরিচালক, বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা তাহমিনা বেগম বলেন, ‘এ ধরনের তদন্ত কমিটিতে সদস্য সচিব থাকেন সংশ্লিষ্ট বিভাগের পরিচালক। তিনিই মিটিং ডাকেন, কাগজপত্র উপস্থাপন করেন। এখানে এসব কিছুই হয়নি। গত বছরের সেপ্টেম্বরে আমার বদলি হওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী রাজউকের তদন্ত কমিটি পুনর্গঠন হওয়ার কথা। সেই কমিটি প্রতিবেদন দেওয়ার পর বোর্ড সভায় প্লটটি নিয়ে সিদ্ধান্ত দিতো। তদন্ত প্রতিবেদনকে পাশ কাটিয়ে প্লটের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা নিয়ম অনুযায়ী হয়নি।’
এদিকে, নতুন পরিচালক মিজানুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মাথায়, গত ২৯ ডিসেম্বর পূর্ববর্তী পরিচালকের সব লিখিত আপত্তি খারিজ করে দাপ্তরিক নোটে লেখেন, ‘সব ঠিক আছে, সদয় অনুমোদন দেওয়া যায়।’
নথিপত্র ও কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা যায়, মিজানুর রহমান নোটে জেলা প্রশাসনের অ্যাওয়ার্ড যাচাই করা হয়েছে বলে উল্লেখ করলেও পূর্ববর্তী পরিচালকের সুপারিশ করা অ্যাওয়ার্ড বই বাস্তবে যাচাই করা হয়নি। মমতাজ বেগমের ভুয়া জন্মসনদের ঠিকানা ও বয়স জালিয়াতির প্রশ্ন এড়িয়ে যান তিনি। সংশ্লিষ্টদের স্বাক্ষরও যাচাই করা হয়নি।
ব্যাংক রসিদের ঘষামাজা পরীক্ষা না করে এবং বারিধারার অন্য প্লটের বিষয়ে কোনো তদন্ত না করেই সবকিছু ঠিক আছে বলে উল্লেখ করা হয়। বরাদ্দগ্রহীতার স্বীকারোক্তি থাকার পরও মিজানুর রহমান জানান, বরাদ্দগ্রহীতার নামে বারিধারায় কোনো প্লট নেই। বকেয়া কিস্তির জাল রসিদের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে নোটে লেখেন, ‘ব্যাংক মৌখিকভাবে জানিয়েছে কিস্তি পরিশোধ সঠিক আছে।’
ব্যাংকের লিখিত কোনো স্টেটমেন্ট বা প্রমাণ ছাড়াই ৩৮ ও ৩৯ বছর আগে জমাকৃত কিস্তির লেনদেন কীভাবে ‘মৌখিকভাবে’ নিশ্চিত হলো, এই প্রশ্ন তোলা হয়নি। প্লট বরাদ্দ বহালের প্রস্তাবটি অনুমোদনপত্রে স্বাক্ষরের সময় উপপরিচালক আসাদুজ্জামান বিশ্বাস, ভূমি ও এস্টেট সদস্য শেখ মতিয়ার রহমান এবং চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম কেউই প্রশ্ন তোলেননি। বরং মিজানুর রহমানের উত্থাপিত ১৬৩-১৬৪ নোট অনুচ্ছেদে বাকি তিনজনই অবলোকন করে সই করেন।
এ ছাড়া বোর্ড সভায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন নিয়ে নথিতে কোনো প্রশ্ন বা আলোচনাও হয়নি। সর্বশেষ চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি প্লটটির বহাল অনুমোদন করে দ্রুত দখল হস্তান্তরের নির্দেশ দেয় রাজউক। এ ছাড়া নামজারি, জমি রেজিস্ট্রি, এমনকি মমতাজ বেগমের আম মোক্তার আল আমিনকে বিক্রির অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে।
সরেজমিনে প্লটে গিয়ে দেখা যায়, টিনশেড একতলা ভবনটি গোডাউন হিসেবে ব্যবহার করছিলেন স্থানীয় শাহজাহান মিয়া। এর আগে লাভলু নামের আরেকজন এই জমির মালিকানার পরিচয় দিয়েছিলেন। ভবনের ফলের দোকানদার কবির মিয়া বলেন, ‘আগে জায়গাটির মালিক ছিল শাহজাহান নামে এক ব্যবসায়ী। সম্প্রতি তিনি আরেকজনকে এসে নতুন মালিক (আল আমিনের লোক) হিসাবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। তার ম্যানেজার এসে ভাড়ার টাকা নিয়ে যায়। তাদের নাম ও মোবাইল নাম্বার আমার কাছে নেই।’
পূর্ববর্তী পরিচালকের তোলা জালিয়াতি নিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে কীভাবে ‘সব ঠিক আছে উল্লেখ করে সুপারিশ করলেন? এমন প্রশ্নে রাজউকের সদ্য সাবেক পরিচালক এবং বীমা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের উপসচিব মিজানুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইলে যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
সংস্থাটির এস্টেট ও ভূমি বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, সাড়ে তিন যুগ আগের প্লটটির বরাদ্দ বাতিল হয়ে সরকারি জমিতে রুপান্তরিত হওয়ার কথা। অথচ রাজউকের বর্তমান একজন উপপরিচালক আওয়ামী লীগ আমলে তার বাবার প্রভাব খাটিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে ব্যবহার করে মৃত ফাইলটি পুনরুজ্জীবিত করেন। বর্তমান চেয়ারম্যান কর্মকর্তাদের নথিতে ইতিবাচক মতামত দিতে বাধ্য করেছেন। এই প্লটের কাগজপত্র, ব্যাংক রসিদ জালিয়াতি ধরে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের সুপারিশ করলে ভূমি ও এস্টেট-১ পরিচালককে অন্য দপ্তরে বদলি করা হয়। সম্প্রতি সরকার সংস্থার ভূমি ও এস্টেট সদস্য হিসেবে আরেকজনকে দায়িত্ব দিলেও শুধু সিন্ডিকেট অক্ষুণ্ন রাখতে ভূমি ও এস্টেট সদস্যকে এই পদে বহাল রাখা হয়।’
রাজউকের সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) শেখ মতিয়ার রহমান বলেন, ‘আগের পরিচালক দীর্ঘদিন ফাইল আটকে রেখেছিলেন। তিনি বদলি হওয়ার ঠিক আগে এই নোট দিয়ে যান। নতুন পরিচালক নিজের মতো করে তদন্ত করেছেন। তার বদলির সঙ্গে এই ফাইলের কোনো সংযোগ নেই। মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে তাকে বদলি করা হয়।’
রাজউক চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। সে সময় আগের তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি নথি থেকে গায়েব করা হয়েছিল। ফলে তখন ত্রুটিগুলো নজরে আসেনি। এখন এই জালিয়াতিতে কারা কারা জড়িত এটি খুঁজে বের করতে তদন্ত কমিটি গঠনের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে নির্দেশনা দিয়েছি।’
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘দীর্ঘ ৪১ বছর পর কোনো প্লটের মালিকানা দাবি করা এবং নিয়ম অনুযায়ী সময়মতো কিস্তি পরিশোধ না করার পরও রাজউকের কিছু কর্মকর্তার পুনরায় বরাদ্দ দেওয়ার অতি-উৎসাহ সন্দেহজনক। আইনিভাবে এই প্লটের বরাদ্দ অনেক আগেই বাতিল হয়ে এটি রাষ্ট্রের সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। বর্তমান বর্ধিত বাজারমূল্যের এই সম্পত্তি কোনো ব্যক্তিকে অবৈধভাবে ফিরিয়ে দিলে রাষ্ট্র বিশাল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। এ ছাড়া যার একাধিক প্লটের ইতিহাস রয়েছে তিনি কোনোভাবেই এই প্লট পাওয়ার কথা নয়।’
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জমান বলেন, ‘রাজউক আজ সুশাসনহীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির এক চরম দৃষ্টান্তে পরিণত হয়েছে। এখানকার শক্তিশালী সিন্ডিকেট ৪১ বছর আগের একটি প্লটের কিস্তি সময়মতো পরিশোধ না করার পরও তা বাতিল না করে, উল্টো মৃত ব্যক্তির স্বাক্ষর ও ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে টেম্পারিং করে প্লটের অনুমোদন দিয়েছে। কোনো জালিয়াতি বা প্রতারণার মাধ্যমে এটি বৈধতা পেতে পারে না। এখানে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, যে কর্মকর্তা এই জালিয়াতি ধরে তদন্তের সুপারিশ করেছিলেন, তাকে পুরস্কৃত করার বদলে শাস্তিস্বরূপ বদলি করা হয়েছে। এরপর চেয়ারম্যানের পছন্দের কর্মকর্তাকে বসিয়ে ফাইলে ‘ক্লিন শিট’ দিয়ে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এটি উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ মদদের প্রমাণ। তাই জড়িত কর্মকর্তা ও সুবিধাভোগীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। মন্ত্রণালয়ের উচিত কঠোর বিভাগীয় পদক্ষেপ নিয়ে বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছে হস্তান্তর করা এবং তদন্ত প্রক্রিয়া যেন কোনো প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপে বাধাগ্রস্ত না হয় তা তদারকি করা।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















