ঢাকা ০২:৫৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উপেক্ষা করে সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদোন্নতি ভিকারুননিসায় নানা অজুহাতে অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগে ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা ‘গবেষণা’র নামে নিয়মিত কাজ, সম্মানী নেওয়ার অভিযোগ বিটিআরসির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিশ্বকাপ ফাইনালকে ঘিরে মেক্সিকোতে গণবিয়ে, অংশ নিয়েছে ৭৫০ দম্পতি দুর্যোগ থেকে উপকূলীয় এলাকাকে রক্ষা করতে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করবে সরকার : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দফতরের উপপরিচালকের বিরুদ্ধে টেন্ডারে অনিয়মের অভিযোগ মহাখালীতে সওজের ২০০ কোটি টাকার সরকারি জমি ইস্টার্ন হাউজিংয়ের দখলে! পঞ্চগড়ে ইউএনওর বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ শিক্ষামন্ত্রীর কাছে যে দাবি জানালেন নওগাঁর এমপি বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের সময় ৩ বছর বাড়ানোর আহ্বান বাণিজ্যমন্ত্রীর

‘গবেষণা’র নামে নিয়মিত কাজ, সম্মানী নেওয়ার অভিযোগ বিটিআরসির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে

জাতীয় টেলিযোগাযোগসংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়নে সরকারকে পরামর্শ ও প্রস্তাব দেওয়া বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) নিয়মিত কাজ। অথচ অভিযোগ উঠেছে যে এ কাজকেই ‘গবেষণা’ দেখিয়ে আলাদাভাবে সম্মানী নিচ্ছেন কমিশনের কর্মকর্তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ‘টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক ও লাইসেন্সিং পলিসি’ তৈরির কাজকে ‘গবেষণা’ হিসেবে দেখিয়ে এ কাজে যুক্ত কর্মকর্তাদের সম্মানী ধরা হয়েছে ১৬ লাখ ২৮ হাজার টাকা। বিটিআরসির সবশেষ কমিশন সভায় এ অর্থ ছাড়ও করা হয়েছে।

অন্যদিকে ‘পলিসি বাস্তবায়নে গাইডলাইন’ প্রণয়ন কাজে যুক্ত ব্যক্তিদের সম্মানী ধরা হয়েছে ১২ লাখ ২৫ হাজার টাকা। বর্তমানে এ অর্থ ছাড় করার জন্য যাচাই–বাছাইয়ের কাজ চলছে।

সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সভা ও সেমিনারের নামে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার ঘটনা নতুন নয়। এবার বিটিআরসিতেও একই চিত্র দেখা গেল।
কমিশনের নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর কমিশনের সিদ্ধান্তে দেশের টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক ও লাইসেন্সিংয়ের ব্যবস্থা নতুনভাবে সাজানোর জন্য ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের দুই প্রতিনিধি বাদে অন্য সবাই ছিলেন কমিশনের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা।

বিটিআরসির নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর কমিশনের সিদ্ধান্তে দেশের টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক ও লাইসেন্সিংয়ের ব্যবস্থা নতুনভাবে সাজানোর জন্য ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের দুই প্রতিনিধি বাদে অন্য সবাই ছিলেন কমিশনের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা।
নথিতে দেখা গেছে, কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল নতুন নীতির ধারণাপত্র তৈরি ও সরকারের জন্য একটি পথনকশা সুপারিশ করা। প্রাথমিক কাজ শেষে একে গবেষণা হিসেবে দেখিয়ে একটি গবেষণা প্রস্তাব কমিশনে দেয় ওই কমিটি। ‘সুষ্ঠুভাবে গবেষণা সম্পন্ন’ করতে ২৯ লাখ টাকার বাজেট নির্ধারণ করা হয়।

বিটিআরসির চাকরি প্রবিধানমালায় বিশেষ ধরনের গবেষণা ও উন্নয়নমূলক কাজের জন্য সম্মানী দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক ও লাইসেন্সিং নীতিমালা তৈরি বিশেষ গবেষণা কাজের মধ্যে পড়ে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

তিনটি ধাপে এ ‘গবেষণা’কাজে যুক্ত কর্মকর্তাদের সম্মানী নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথমটি, পলিসি প্রস্তুত করার প্রক্রিয়ায় গবেষণাকাজের জন্য কমিটির সদস্যদের সম্মানী। এর মধ্যে রয়েছে গবেষক দলের সদস্য হিসেবে মূল সম্মানী, সভার সম্মানী, কর্মশালার সম্মানী ও বিশেষ দায়িত্বের সম্মানী।

আটটি অধিবেশনে আলাদা সম্মানী
নথিপত্র অনুযায়ী, এ কাজের জন্য দুটি কর্মশালা করা হয়েছে। সেই দুটি কর্মশালাকে মোট আটটি অধিবেশনে ভাগ করে প্রতিটির জন্য আলাদা সম্মানী ধরা হয়েছে।

‘গবেষণা’ কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে বিটিআরসি কমিশনার ইকবাল আহমেদের সম্মানী ভাতা ধরা হয়েছে ২ লাখ ১৭ হাজার টাকা। গবেষক দলের সদস্য হিসেবে তাঁর মূল সম্মানী ৫০ হাজার টাকা। এ ছাড়া ১৩টি সভার জন্য সম্মানী ৬৫ হাজার টাকা। আর দুটি কর্মশালার আটটি অধিবেশনের জন্য সম্মানী ৩২ হাজার টাকা। এর বাইরেও ‘বিশেষ দায়িত্বের সম্মানী’ আরও ৭০ হাজার টাকা ধরা হয়েছে।

পলিসি তৈরির জন্য বিভিন্ন সভায় বাইরের ১৩ বিশেষজ্ঞকেও আনা হয়। তিনটি সভায় তাঁদের প্রত্যেকের সম্মানী ধরা হয়েছে ১৫ হাজার টাকা।

নীতিমালাটি প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত এক স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এটাকে ঠিক গবেষণা বলা যায় কি না, জানি না। সভায় বিটিআরসি আগে থেকে ঠিক করে রাখা কিছু বিষয় উপস্থাপন করেছে। বিশেষজ্ঞরা সমালোচনা করেছেন, পরামর্শ দিয়েছেন। যদিও কমিটির সুপারিশ ও আজকের নীতিমালার মধ্যে মিল নেই।’
এর বাইরে পলিসি বাস্তবায়নে পথনকশা প্রণয়নে গঠিত কমিটির সদস্যদের গবেষক হিসেবে সম্মানী দেওয়ার বিষয়টি বিটিআরসি যাচাই–বাছাই করছে। কমিটিতে বিটিআরসির ২৮ কর্মকর্তা রয়েছেন।

নতুন এ পলিসি গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর অনুমোদন দেয় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার। আর রহিত করা হয় আন্তর্জাতিক দূরপাল্লার টেলিযোগাযোগ সেবা (আইএলডিটিএস) নীতিমালা। আইএলডিটিএস নীতিমালা মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটির মাধ্যমে করা হয়েছিল। এতে কাজ করেছিলেন বিটিআরসির কর্মকর্তা ও স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞরা।

সেই সময়ে কী পরিমাণ সম্মানী দেওয়া হয়েছিল—এ বিষয়ে জানতে বিটিআরসির তখনকার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি জানান, নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবেই পথনকশা প্রণয়নের কাজ করা হয়েছিল। সম্মানী বাবদ অতিরিক্ত কোনো অর্থ কর্মকর্তাদের দেওয়া হয়নি।

তাহলে এখন কেন নীতি প্রণয়নে সম্মানীর প্রসঙ্গটি এসেছে, এমন প্রশ্নের জবাবে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী বলেন, ‘এটি কমিশনের রুটিন কাজ নয়। এটি একটি কৌশলগত কাজ।’

এমদাদ উল বারী আরও বলেন, ‘এ কাজ শুধু বিটিআরসির কর্মকর্তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিল্প, একাডেমিয়া ও অন্যান্য অংশীজনকে যুক্ত করে গবেষণার মাধ্যমে করা হয়েছে। যে সম্মানী দেওয়া হয়েছে, তা সরকারের বিধি মেনেই দেওয়া হয়েছে।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যা বলছেন
নীতিমালাটি প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত স্বতন্ত্র ১৩ বিশেষজ্ঞের মধ্যে দুজনের সঙ্গে পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়। তাঁদের একজন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। অন্যজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এটাকে আসলে গবেষণা বলা যায় কি না, আমি জানি না। সভায় বিটিআরসি আগে থেকে ঠিক করে রাখা কিছু বিষয় উপস্থাপন করেছে।’

ওই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘বিশেষজ্ঞরা সমালোচনা করেছেন ও পরামর্শ দিয়েছেন। যদিও কমিটির সুপারিশ ও আজকের নীতিমালার মধ্যে মিল নেই।’

সরকারের উচিত নীতিমালা করে সভা ও সেমিনারের নামে এভাবে অযৌক্তিকভাবে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ করার সুযোগ চিরতরে বন্ধ করা।
ইফতেখারুজ্জামান, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক
‘অনৈতিক ও ক্ষমতার অপব্যবহার’
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘মিটিং করে, মিটিংয়ের অধিবেশন অনুযায়ী ভাতা নেওয়া—এ চর্চা কোনো সভ্য দেশে নেই।’

ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, ‘একজন সরকারি কর্মকর্তা হঠাৎ গবেষক হয়ে যাওয়া, গবেষক হিসেবে ভাতা নেওয়া, সেই গবেষণার মিটিং করার জন্য আরও বেশি টাকা নেওয়া—এগুলো সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, অনৈতিক ও ক্ষমতার অপব্যবহার। বাস্তবে এসব জনগণের অর্থ আত্মসাতের সুযোগ করে দেয়।’

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারের উচিত নীতিমালা করে সভা ও সেমিনারের নামে এভাবে অযৌক্তিকভাবে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ করার সুযোগ চিরতরে বন্ধ করা।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উপেক্ষা করে সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদোন্নতি

‘গবেষণা’র নামে নিয়মিত কাজ, সম্মানী নেওয়ার অভিযোগ বিটিআরসির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে

আপডেট সময় ০২:০২:২১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

জাতীয় টেলিযোগাযোগসংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়নে সরকারকে পরামর্শ ও প্রস্তাব দেওয়া বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) নিয়মিত কাজ। অথচ অভিযোগ উঠেছে যে এ কাজকেই ‘গবেষণা’ দেখিয়ে আলাদাভাবে সম্মানী নিচ্ছেন কমিশনের কর্মকর্তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ‘টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক ও লাইসেন্সিং পলিসি’ তৈরির কাজকে ‘গবেষণা’ হিসেবে দেখিয়ে এ কাজে যুক্ত কর্মকর্তাদের সম্মানী ধরা হয়েছে ১৬ লাখ ২৮ হাজার টাকা। বিটিআরসির সবশেষ কমিশন সভায় এ অর্থ ছাড়ও করা হয়েছে।

অন্যদিকে ‘পলিসি বাস্তবায়নে গাইডলাইন’ প্রণয়ন কাজে যুক্ত ব্যক্তিদের সম্মানী ধরা হয়েছে ১২ লাখ ২৫ হাজার টাকা। বর্তমানে এ অর্থ ছাড় করার জন্য যাচাই–বাছাইয়ের কাজ চলছে।

সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সভা ও সেমিনারের নামে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার ঘটনা নতুন নয়। এবার বিটিআরসিতেও একই চিত্র দেখা গেল।
কমিশনের নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর কমিশনের সিদ্ধান্তে দেশের টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক ও লাইসেন্সিংয়ের ব্যবস্থা নতুনভাবে সাজানোর জন্য ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের দুই প্রতিনিধি বাদে অন্য সবাই ছিলেন কমিশনের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা।

বিটিআরসির নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর কমিশনের সিদ্ধান্তে দেশের টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক ও লাইসেন্সিংয়ের ব্যবস্থা নতুনভাবে সাজানোর জন্য ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের দুই প্রতিনিধি বাদে অন্য সবাই ছিলেন কমিশনের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা।
নথিতে দেখা গেছে, কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল নতুন নীতির ধারণাপত্র তৈরি ও সরকারের জন্য একটি পথনকশা সুপারিশ করা। প্রাথমিক কাজ শেষে একে গবেষণা হিসেবে দেখিয়ে একটি গবেষণা প্রস্তাব কমিশনে দেয় ওই কমিটি। ‘সুষ্ঠুভাবে গবেষণা সম্পন্ন’ করতে ২৯ লাখ টাকার বাজেট নির্ধারণ করা হয়।

বিটিআরসির চাকরি প্রবিধানমালায় বিশেষ ধরনের গবেষণা ও উন্নয়নমূলক কাজের জন্য সম্মানী দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক ও লাইসেন্সিং নীতিমালা তৈরি বিশেষ গবেষণা কাজের মধ্যে পড়ে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

তিনটি ধাপে এ ‘গবেষণা’কাজে যুক্ত কর্মকর্তাদের সম্মানী নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথমটি, পলিসি প্রস্তুত করার প্রক্রিয়ায় গবেষণাকাজের জন্য কমিটির সদস্যদের সম্মানী। এর মধ্যে রয়েছে গবেষক দলের সদস্য হিসেবে মূল সম্মানী, সভার সম্মানী, কর্মশালার সম্মানী ও বিশেষ দায়িত্বের সম্মানী।

আটটি অধিবেশনে আলাদা সম্মানী
নথিপত্র অনুযায়ী, এ কাজের জন্য দুটি কর্মশালা করা হয়েছে। সেই দুটি কর্মশালাকে মোট আটটি অধিবেশনে ভাগ করে প্রতিটির জন্য আলাদা সম্মানী ধরা হয়েছে।

‘গবেষণা’ কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে বিটিআরসি কমিশনার ইকবাল আহমেদের সম্মানী ভাতা ধরা হয়েছে ২ লাখ ১৭ হাজার টাকা। গবেষক দলের সদস্য হিসেবে তাঁর মূল সম্মানী ৫০ হাজার টাকা। এ ছাড়া ১৩টি সভার জন্য সম্মানী ৬৫ হাজার টাকা। আর দুটি কর্মশালার আটটি অধিবেশনের জন্য সম্মানী ৩২ হাজার টাকা। এর বাইরেও ‘বিশেষ দায়িত্বের সম্মানী’ আরও ৭০ হাজার টাকা ধরা হয়েছে।

পলিসি তৈরির জন্য বিভিন্ন সভায় বাইরের ১৩ বিশেষজ্ঞকেও আনা হয়। তিনটি সভায় তাঁদের প্রত্যেকের সম্মানী ধরা হয়েছে ১৫ হাজার টাকা।

নীতিমালাটি প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত এক স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এটাকে ঠিক গবেষণা বলা যায় কি না, জানি না। সভায় বিটিআরসি আগে থেকে ঠিক করে রাখা কিছু বিষয় উপস্থাপন করেছে। বিশেষজ্ঞরা সমালোচনা করেছেন, পরামর্শ দিয়েছেন। যদিও কমিটির সুপারিশ ও আজকের নীতিমালার মধ্যে মিল নেই।’
এর বাইরে পলিসি বাস্তবায়নে পথনকশা প্রণয়নে গঠিত কমিটির সদস্যদের গবেষক হিসেবে সম্মানী দেওয়ার বিষয়টি বিটিআরসি যাচাই–বাছাই করছে। কমিটিতে বিটিআরসির ২৮ কর্মকর্তা রয়েছেন।

নতুন এ পলিসি গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর অনুমোদন দেয় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার। আর রহিত করা হয় আন্তর্জাতিক দূরপাল্লার টেলিযোগাযোগ সেবা (আইএলডিটিএস) নীতিমালা। আইএলডিটিএস নীতিমালা মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটির মাধ্যমে করা হয়েছিল। এতে কাজ করেছিলেন বিটিআরসির কর্মকর্তা ও স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞরা।

সেই সময়ে কী পরিমাণ সম্মানী দেওয়া হয়েছিল—এ বিষয়ে জানতে বিটিআরসির তখনকার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি জানান, নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবেই পথনকশা প্রণয়নের কাজ করা হয়েছিল। সম্মানী বাবদ অতিরিক্ত কোনো অর্থ কর্মকর্তাদের দেওয়া হয়নি।

তাহলে এখন কেন নীতি প্রণয়নে সম্মানীর প্রসঙ্গটি এসেছে, এমন প্রশ্নের জবাবে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী বলেন, ‘এটি কমিশনের রুটিন কাজ নয়। এটি একটি কৌশলগত কাজ।’

এমদাদ উল বারী আরও বলেন, ‘এ কাজ শুধু বিটিআরসির কর্মকর্তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিল্প, একাডেমিয়া ও অন্যান্য অংশীজনকে যুক্ত করে গবেষণার মাধ্যমে করা হয়েছে। যে সম্মানী দেওয়া হয়েছে, তা সরকারের বিধি মেনেই দেওয়া হয়েছে।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যা বলছেন
নীতিমালাটি প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত স্বতন্ত্র ১৩ বিশেষজ্ঞের মধ্যে দুজনের সঙ্গে পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়। তাঁদের একজন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। অন্যজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এটাকে আসলে গবেষণা বলা যায় কি না, আমি জানি না। সভায় বিটিআরসি আগে থেকে ঠিক করে রাখা কিছু বিষয় উপস্থাপন করেছে।’

ওই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘বিশেষজ্ঞরা সমালোচনা করেছেন ও পরামর্শ দিয়েছেন। যদিও কমিটির সুপারিশ ও আজকের নীতিমালার মধ্যে মিল নেই।’

সরকারের উচিত নীতিমালা করে সভা ও সেমিনারের নামে এভাবে অযৌক্তিকভাবে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ করার সুযোগ চিরতরে বন্ধ করা।
ইফতেখারুজ্জামান, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক
‘অনৈতিক ও ক্ষমতার অপব্যবহার’
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘মিটিং করে, মিটিংয়ের অধিবেশন অনুযায়ী ভাতা নেওয়া—এ চর্চা কোনো সভ্য দেশে নেই।’

ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, ‘একজন সরকারি কর্মকর্তা হঠাৎ গবেষক হয়ে যাওয়া, গবেষক হিসেবে ভাতা নেওয়া, সেই গবেষণার মিটিং করার জন্য আরও বেশি টাকা নেওয়া—এগুলো সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, অনৈতিক ও ক্ষমতার অপব্যবহার। বাস্তবে এসব জনগণের অর্থ আত্মসাতের সুযোগ করে দেয়।’

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারের উচিত নীতিমালা করে সভা ও সেমিনারের নামে এভাবে অযৌক্তিকভাবে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ করার সুযোগ চিরতরে বন্ধ করা।