মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দফতরের উপপরিচালক (উপসচিব) উম্মে হাবিবার বিরুদ্ধে টেন্ডারে নানা অনিয়মের মাধ্যমে সরকারের লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে আর্থিক অনিয়মের কাজে বাধ্য করারও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে বস্ত্র অধিদফতরের পরিচালক পদে বদলি করা হয়। কিন্তু তিনি বর্তমান পদ ছেড়ে যেতে রাজি নন।
উপপরিচালক (উপসচিব) উম্মে হাবিবাকে গত ১৬ জুন বস্ত্র অধিদফতরের পরিচালক হিসেবে বদলি করা হয়। বদলির প্রজ্ঞাপনে তাকে ২২ জুনের মধ্যে দায়িত্ব হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়। এই সময়ের মধ্যে তিনি দায়িত্ব হস্তান্তর না করলে এদিন অপরাহ্ন থেকে তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত গণ্য হবেন বলে বদলির আদেশে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু স্ট্যান্ড রিলিজ বা তাৎক্ষণিক অবমুক্তির কোনো তোয়াক্কাই করছেন না এই সরকারি কর্মকর্তা। ৫ জুলাই এই রিপোর্ট তৈরি করা পর্যন্ত তিনি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ ত থ্য দফতরেই বহাল-তবিয়তে রয়েছেন। বরং এই বদলির আদেশ বাতিলের জন্য মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলে তদবির করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
উপসচিব উম্মে হাবিবা আওয়ামী দোসর কর্মকর্তা হিসেবে চিহ্নিত। এই দফতরে যোগদান করার আগে আওয়ামী লীগ আমলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ছিলেন তিনি। তৎকালীন স্বাস্থ্য সচিব জাহাঙ্গীর আলমের নানা দুষ্কর্মের দোসর হিসেবে তাকে আখ্যায়িত করা হতো। সচিব জাহাঙ্গীর আলম দীর্ঘদিন জেল-হাজতে থাকার পর সম্প্রতি জামিনে আছেন। উম্মে হাবিবার সেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে তখনকার মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা সোচ্চার হয়ে ওঠেছিল। তার বিরুদ্ধে আন্দোলনও করেছিল। কিন্তু তিনি যেহেতু প্রভাবশালী সচিব জাহাঙ্গীর আলমের দুর্নীতি-অনিয়মের সহযোগী তাই আওয়ামী লীগ আমলে তার বিরুদ্ধে কোনোই ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়।
কিন্তু পরবর্তীতে অনেকটা রহস্যজনকভাবে ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর এই কর্মকর্তাকে শাস্তির পরিবর্তে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দফতরের উপপরিচালক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
উপপরিচালক পদে থেকে তিনি এই দফতরের সকল টেন্ডার, কেনাকাটা ও প্রচার-প্রচারণার কাজ কোটেশন করে নানা রকমের কারসাজির মাধ্যমে নিজস্ব লোকদের মধ্যে বিলিবণ্টনের ব্যবস্থা করেন। এ ব্যাপারে একটা শক্তিশালী সিন্ডিকেটও গড়ে তুলেছেন। তাঁর এই সিন্ডিকেটের বাইরে অন্য কোনো ঠিকাদারের কাজ পাওয়ার সুযোগ নেই। এদের মাধ্যমে তিনি অনেক ক্ষেত্রেই কাজ না করে বিল করে টাকা তুলে ভাগবাটোয়ারা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রিন্টিং এবং এ সংক্রান্ত প্রচার-প্রচারণার কাজগুলো বেশিরভাগই দেওয়া হয় রায়আন প্রিন্টার্স নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে। টিভিসি বা ভিডিও বিজ্ঞাপনের কাজগুলো করেন জনৈক রবিন। টেন্ডার বা কোটেশনে নানা কারসাজির মাধ্যমে এদের কাজ দেওয়ার ব্যবস্থা করেন উপপরিচালক উম্মে হাবিবা। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, পিপিআর অনুযায়ী সব নিয়মকানুন অনুসরণ করে সর্বনিম্ন দরদাতা হওয়া সত্ত্বেও অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ না দিয়ে সিন্ডিকেটের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হচ্ছে। এমনকি বেশি মূল্যে কার্যাদেশ দেওয়া হচ্ছে। উপপরিচালকের এ রকমের স্বেচ্ছাচারী ও বেপরোয়া দুর্নীতির কারণে প্রতিটি কেনাকাটায় সরকারের অর্থ গচ্ছা যাচ্ছে।
পিপিআর অনুযায়ী প্রাক্কলিত দরের ২০% পর্যন্ত নিম্নে দরপত্র দাখিল করা যায়। সেই হিসেবে আইডি নং ১২৩৯৭৭৩ টেন্ডারে প্রথম সর্বনিম্ন দরদাতা তিথি প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং। এই প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাবিত দর ছিল ৯ লাখ ৫৬ হাজার ৫শ’ ৪৪ টাকা। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানটির পরিবর্তে ৫ম সর্বনিম্ন দরদাতা রায়আন ট্রেডার্সকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। রায়আন ট্রেডার্সের দর ছিল ১০ লাখ ৭৪ হাজার ৬শ’ ৬১ টাকা।
আইডি নং ১২৩৯৭৩৪ টেন্ডারে প্রথম সর্বনিম্ন দরদাতা একুশে মিডিয়া নামে একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানটির দর ছিল ৮ লাখ ৬৯ হাজার ৯শ’ ৯২ টাকা। কিন্তু কাজটি দেওয়া হয়েছে ৪র্থ সর্বনিম্ন দরদাতা রায়আন ট্রেডার্সকে। এই প্রতিষ্ঠানটির দর ছিল ৮ লাখ ৯৯ হাজার ১শ’ ২ টাকা।
আইডি নং ১১৮৮৩৫৯ টেন্ডারে প্রথম সর্বনিম্ন দরদাতা খন্দকার এন্টারপ্রাইজ। এই প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাবিত দর ছিল ৯ লাখ ৭৯ হাজার ৪শ’ টাকা। এখানেও প্রথম সর্বনিম্ন দরদাতার পরিবর্তে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা রায়আন ট্রেডার্সের অনুকূলে কার্যাদেশ দেওয়া হয়।
শুধু এ ধরনের অনিয়ম বা কারসাজিই নয়, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে যথাযথভাবে মালামাল সরবরাহ না নিয়ে বিল প্রদানেরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে উপপরিচালক উম্মে হাবিবার বিরুদ্ধে। মাঠপর্যায়ে কোনো কাজ না করেই জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া বিল প্রস্তুত করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করারও অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকার প্রধান কার্যালয়সহ দেশের চারটি আঞ্চলিক অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজের একক ইচ্ছা অনুযায়ী অবৈধ কাজ করতে বাধ্য করেন এই উপসচিব। কেউ তার এই অনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করলে তাকে চাকরিচ্যুত করার হুমকি, বেতন বন্ধের ভয় দেখানো এবং দুর্ব্যবহারের শিকার হতে হয়। ইতোমধ্যে তার এই অপকর্মের প্রতিবাদ করায় দু’জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়মবহির্ভূতভাবে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উম্মে হাবিবা নিজেকে অত্যন্ত প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে দাবি করেন এবং বিভিন্ন মহলে প্রভাবশালীদের নাম ভাঙিয়ে চলেন। এমনকি নিজের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে তিনি অর্থ লেনদেনের মতো অনৈতিক সুবিধা দেয়ার গল্পও ছড়িয়ে বেড়ান, যাতে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ভয়ে মুখ খুলতে না পারেন।
ভুক্তভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, বর্তমান সময়ে যেখানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতকে এগিয়ে নিতে একটি গতিশীল ও স্বচ্ছ প্রচার দফতর প্রয়োজন, সেখানে একজন বিতর্কিত কর্মকর্তার কারণে পুরো দফতরের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে। প্রজাতন্ত্রের এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে স্বৈরাচারের দোসর এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা বহাল থাকলে সংস্কার কার্যক্রম ব্যাহত হবে।
জানা গেছে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে সম্প্রতি জনপ্রশাসন সচিব বরাবর একটি অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। তাতে উপপরিচালক উম্মে হাবিবার নানা অনিয়ম-অপকর্মের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষে মো. রাকিবুল আলম খান স্বাক্ষরিত ওই অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দফতরে উপপরিচালক হিসেবে উম্মে হাবিবা যোগদানের পর থেকেই প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের সুনাম ক্ষুণ্ন ও স্বাভাবিক কাজকর্ম স্থবির হয়ে পড়েছে। তিনি কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে একক সিদ্ধান্তে দফতর পরিচালনা করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, উপপরিচালক উম্মে হাবিবা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে উপদেষ্টার দফতরের একজন কর্মকর্তাকে নিয়মিত মাসোহারা দিতেন। এভাবেই তিনি মন্ত্রণালয়কে ম্যানেজ রাখতেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















