বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের ডিএফএ-স্টোরস অ্যান্ড প্রকিউরমেন্ট শাখার হিসাব কর্মকর্তা (সংগ্রহ) কাজী সাঈদা বেগম নিপার বিরুদ্ধে কমিশন বাণিজ্য, অনিয়ম, ভুয়া বিলের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্নসাৎ এবং নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ অর্জনের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এ লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা।
গত ১৩ জুন লিখিত এই অভিযোগ চট্টগ্রাম দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের পরিচালক বরাবরে দায়ের করা হয় ২২ জুন। লিখিত অভিযোগে জানা যায়, ডিএফএ-স্টোরস অ্যান্ড প্রকিউরমেন্ট শাখায় বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে ঠিকাদারদের কাছ থেকে ২ থেকে ৩ শতাংশ কমিশন ছাড়া কোনো বিলের ফাইল ছাড়েন না কাজী সাঈদা বেগম নিপা। কমিশন দিতে অস্বীকৃতি জানালে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের হয়রানি ও দুর্ব্যবহারের শিকার হতে হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট শাখায় প্রতি অর্থবছরে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার বিল পরিশোধ হয়। এর বিপরীতে কমিশনের নামে বছরে প্রায় সাড়ে ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা অবৈধ কমিশন আদায় করা হয়। পাশাপাশি ভুয়া বিলের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্নসাতের ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন একই শাখায় দায়িত্ব পালন করার সুযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তা দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, চট্টগ্রামের হালিশহরে তার স্বামীর নামে প্রায় ১০ কোটি টাকা মূল্যের জমিতে বহুতল ভবন নির্মাণাধীন রয়েছে।
এছাড়া নগরীর একে খান, সিটি গেট এবং মিরসরাই উপজেলার শ্বশুপুরবাড়ি এলাকায় জমি ও বাড়ি রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। জন্মস্থান বরিশালেও বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণের তথ্য অভিযোগপত্রে তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব সম্পদের একটি বড় অংশ নিজের নামে না রেখে স্বামী ও স্বজনদের নামে ক্রয় করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, দুর্নীতির অর্থের একটি অংশ রেলওয়ে দপ্তরের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দেওয়ার কথা বলে কমিশন আদায় করা হলেও অধিকাংশ অর্থ নিজেই আত্নসাৎ করেন। এছাড়া নগরীর বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংকে স্বজনদের নামে একাধিক হিসাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ গচ্ছিত রয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঠিকাদারদের অভিযোগ, অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কার্যকর তদারকির অভাবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়েছে দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে রেলওয়ে জার্নালিষ্ট এসোসিয়েশন নামে কথিত একটি সংগঠনের কয়েকজন নেতাকে নিয়মিত মাসোহারা দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে অভিযোগে স্বাক্ষরকারী ঠিকাদারদের পক্ষ থেকে দ্রুত দুদকের অনুসন্ধান, অভিযুক্ত কর্মকর্তার স¤পদের উৎস যাচাই এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থের অপচয় ও ঠিকাদারদের হয়রানি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য দুদকের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে।
অভিযোগকারী ঠিকাদাররা অভিযোগপত্রের অনুলিপি দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অর্থ), রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের জেনারেল ম্যানেজার এবং প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের বরাবরেও প্রেরণ করেছেন।
তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে কাজী সাঈদা বেগম নিপার মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলে সংযোগ বন্ধ পাওয়া যায়। এ কারণে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।
প্রতিবাদ ও উকিল নোটিশ প্রেরণ
গত ১৪ জুন `কাজী সাঈদার দূর্নীতিতে কাঁপছে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের হিসাব শাখা’ শীর্ষক প্রতিবেদন ও সাপ্তাহিক পূর্বধারা পত্রিকায় এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলে বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের কোন অনুমোদন ছাড়াই কথিত আইনজীবীর মাধ্যমে প্রতিবাদ ও উকিল নোটিশ প্রদান করা হয়। যেখানে প্রকাশিত তথ্য সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আখ্যা দিয়ে অভিযুক্তের বক্তব্য ছাড়াই একতরফাভাবে প্রকাশ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
অথচ প্রতিবেদন প্রকাশের আগে সরাসরি সাক্ষাতে নেওয়া বক্তব্য যথাযথভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। যার অডিও রেকর্ড সংরক্ষিত রয়েছে। একই অডিও রেকর্ড অভিযুক্ত সাঈদা বেগম নীপার কাছেও সংরক্ষিত থাকার কথা উকিল নোটিশে বলা হয়েছে। যা পুরোপুরি স্ববিরোধী এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার উপর নগ্ন হস্তক্ষেপ। উক্ত প্রতিবেদন সুনির্দিষ্ট তথ্য ও অভিযোগের ভিত্তিতে করা হয়েছে। অভিযোগের স্বপক্ষে একাধিক ভুক্তভোগী ঠিকাদারের কাছ থেকে কমিশন নেওয়ার স্বীকারোক্তিমূলক রেকর্ডও সংরক্ষিত রয়েছে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. সুবক্তগীন বলেন, দুদকে অভিযোগের বিষয়ে এই মুহুর্তে আমি ঠিক বলতে পারছি না। অভিযোগের কপি পেলে সংশ্লিষ্ট সেকশনে পাঠিয়ে দিব। আর প্রতিবাদ বা উকিল নোটিশের ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না। বিষয়টির খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















