ঢাকা ১১:০৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
দেশ-বিদেশে সম্পদ, প্রকল্পে অনিয়ম আইয়ুব আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় ‘মেয়ের সমালোচনা আমার কনফিডেন্স শেষ করে দিয়েছে’ পাম্পে সিরিয়ালে মোটরসাইকেল এগিয়ে দিয়ে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ, আটক ৩ সন্ত্রাসীদের হুমকিতে সাংবাদিক রাসেলের পরিবার, বাড়ি দখলের চেষ্টা ও হামলার অভিযোগ। বোরহানউদ্দিনে মাদকমুক্ত ও নিরাপদ সমাজ গঠনে প্রশাসনের সচেতনতামূলক সভা ও র‍্যালি শেয়ারবাজারে অনলাইনে প্রতারণার ফাঁদ, বিএসইসির সতর্কবার্তা অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রি, দুই প্রতিষ্ঠানকে লাখ টাকা জরিমানা বৈভবের সঙ্গে ছবি তুলতে গুনতে হবে ১০০ রুপি! ‘জুলাই সনদ’র আলোচনাকে কেন্দ্র করে সংসদে হট্টগোল ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তামাক খাতে ৮৫০০ কোটি টাকার রাজস্ব হারিয়েছে’
৫ম পর্বের ১ম পর্ব

দেশ-বিদেশে সম্পদ, প্রকল্পে অনিয়ম আইয়ুব আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়

প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা প্রকৌশলী আইয়ুব আলীকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, টেন্ডার বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার, সম্পদ অর্জন এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ ঘুরে বেড়াচ্ছে সংশ্লিষ্ট মহলে। সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারী, ঠিকাদার, প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং বিভিন্ন সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি রাজনৈতিক প্রভাবকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বিআইডব্লিউটিএ’র গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প, ড্রেজিং কার্যক্রম, ড্রেজার ক্রয়, যন্ত্রাংশ কেনাকাটা, বিল অনুমোদন এবং টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিতে পরিণত হন। সরকার পরিবর্তনের পরও তার প্রভাব কমেনি—এমন অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) সাইফুজ্জামান শিখরের আত্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে আইয়ুব আলী দীর্ঘদিন সংস্থাটির ভেতরে একচ্ছত্র দাপট দেখিয়েছেন। যদিও বিভিন্ন সূত্র বলছে, তিনি সরাসরি নয়, পারিবারিক সূত্রে শিখরের বড় ভাইয়ের আত্মীয়; তবু প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে তিনি বরাবর শিখরের নাম ব্যবহার করতেন। বিআইডব্লিউটিএ’র অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ধারণা ছিল, তার বিরুদ্ধে কথা বললে বদলি, হয়রানি বা পদোন্নতি আটকে যেতে পারে। এ কারণে বহু অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও দীর্ঘ সময় তা কার্যকর তদন্তের মুখ দেখেনি।

ড্রেজিং প্রকল্পগুলোকে কেন্দ্র করেই সবচেয়ে বেশি অভিযোগ জমা হয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ’র চলমান বিভিন্ন সংরক্ষণ ড্রেজিং কাজে সাধারণত যে ব্যয় কাঠামো অনুসরণ করা হয়, অভিযোগ অনুযায়ী আইয়ুব আলীর নিয়ন্ত্রণাধীন কিছু প্রকল্পে তার চেয়ে অনেক বেশি দর নির্ধারণ করা হয়। প্রতি ঘনমিটার ড্রেজিং ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার মাধ্যমে সরকারি অর্থ লোপাট করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১৪০ লাখ ঘনমিটার মাটি অপসারণের বিল বাবদ প্রায় ৭০০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে এবং এর বড় অংশ অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে দেখানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। অভিযোগকারীরা বলছেন, এই অতিরিক্ত অর্থ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী মহলের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা হয়েছে।

বঙ্গ ড্রেজার্স লিমিটেড ও কর্ণফুলী ড্রেজিং লিমিটেড নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আইয়ুব আলীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, টেন্ডার প্রক্রিয়াকে প্রতিযোগিতামূলক না রেখে নানা কারসাজির মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হতো। কখনও দরপত্রের শর্ত এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান সুবিধা পায়, আবার কখনও প্রকল্পের দর অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কাজের বিনিময়ে মোটা অঙ্কের কমিশন নেওয়া হতো এবং সেই অর্থের একটি অংশ দেশ-বিদেশে বিনিয়োগ করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত নৌপথের নাব্যতা উন্নয়ন প্রকল্প, বরিশাল অঞ্চলের নদী খনন, বিভিন্ন আঞ্চলিক রুটে ড্রেজিং, শ্মশানঘাট টার্মিনাল, কার্গো টার্মিনাল নির্মাণসহ একাধিক প্রকল্পে আইয়ুব আলীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের বাস্তব প্রয়োজনীয়তা যাচাই না করেই নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, কোথাও অতিরিক্ত ব্যয় ধরা হয়েছে, কোথাও নিম্নমানের কাজের বিল পরিশোধ করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে কাজের অগ্রগতি ধীর হলেও বিল দ্রুত ছাড় হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

শ্মশানঘাট টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা রয়েছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, যেখানে বিদ্যমান টার্মিনালগুলো পর্যাপ্তভাবে ব্যবহারই হচ্ছিল না, সেখানে নতুন টার্মিনাল নির্মাণে কোটি কোটি টাকা ব্যয় যৌক্তিক ছিল না। প্রতিটি পল্টুনের দাম বাজারমূল্যের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি দেখানো হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, প্রকল্পটি জনস্বার্থের চেয়ে কমিশনভিত্তিক সিদ্ধান্তের উদাহরণ।

ড্রেজার ও আনুষঙ্গিক জলযান ক্রয় প্রকল্পেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের আওতায় ড্রেজার, টাগ বোট, হাউজ বোট, সার্ভে ভেসেল, পাইপলাইনসহ নানা সরঞ্জাম কেনা হলেও এর একটি অংশ নিম্নমানের, অকার্যকর বা প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। কিছু ড্রেজার অল্প সময়ের মধ্যেই বিকল হয়ে পড়ে, কিছু ভেসেল দীর্ঘদিন ব্যবহার ছাড়াই পড়ে থাকে, আবার কাগজে-কলমে দেখানো পাইপলাইনের বাস্তব অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এসব ক্রয়ে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে বিল অনুমোদন করা হয়েছে বলে অভিযোগ।

যান্ত্রিক শাখায় চাকরিজীবনের শুরু থেকেই কেনাকাটা, মেরামত ও যন্ত্রাংশ সরবরাহে আইয়ুব আলীর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ছিল বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। সরকারি জাহাজ ও জলযান মেরামতের কাজ সিন্ডিকেটভিত্তিক ঠিকাদারদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজস্ব বাজেটের আওতায় ছোট-বড় অসংখ্য মেরামত কাজের বিল ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত কাজের তুলনায় বিল বেশি দেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও কাজ না করেই কাগজে সমাপ্ত দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএ’র অভ্যন্তরে নিয়োগ, বদলি ও পদায়নেও তার প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। নিজের অনুগত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো, অপ্রিয়দের সরিয়ে দেওয়া, নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপের কথা বলেছেন অনেকেই। অভিযোগকারীদের দাবি, সংস্থাটির একটি অংশকে তিনি ব্যক্তিগত নেটওয়ার্কের মতো ব্যবহার করতেন, যেখানে যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্য বেশি মূল্য পেত।

আইয়ুব আলীর বিরুদ্ধে ঘুষ ছাড়া ফাইল সই না করার অভিযোগও এসেছে। ঠিকাদারদের ভাষ্য অনুযায়ী, কাজের বিল, ওয়ার্ক অর্ডার, অনুমোদন কিংবা টেন্ডার-সংক্রান্ত নথি এগোতে হলে অনৈতিক আর্থিক লেনদেন ছিল প্রায় বাধ্যতামূলক। কেউ টাকা না দিলে ফাইল আটকে রাখা, দেরি করা বা অজুহাত দেখিয়ে ফেরত দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটত বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সৎ ঠিকাদার ও প্রকৃত প্রতিযোগীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

কিছু ঘটনায় ঠিকাদারদের সঙ্গে তার বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নেয় বলেও জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, একই কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে একাধিক পক্ষের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার পর শেষ পর্যন্ত পছন্দের একজনকে কাজ দেওয়া হতো। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে কয়েকজন ঠিকাদার তার দপ্তরে গিয়ে টাকা ফেরত দাবি করেন এবং এক পর্যায়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এমনকি তাকে মারধরের ঘটনাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।

দুর্নীতির অর্থ দিয়ে বিপুল সম্পদ গড়ার অভিযোগও বিস্তর। পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের নামে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট, জমি, খামার, মাছের ঘের, বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট, কৃষিজমি ও বাণিজ্যিক বিনিয়োগের তথ্য বিভিন্ন অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, বারিধারা ডিওএইচএস, ধানমণ্ডি, জিগাতলা, হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুর, আশুলিয়া, পূর্বাচল, আফতাবনগর, মিরপুর, কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, সাভারসহ নানা এলাকায় তার বা পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পদের কথা বলা হচ্ছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, বসুন্ধরায় তিন কাঠার প্লটে বহুতল ভবন নির্মাণ চলছে। ধানমণ্ডি ও বারিধারায় একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে। হাজারীবাগে কয়েকটি বড় আকারের ফ্ল্যাট, মোহাম্মদপুর হাউজিংয়ে ফ্ল্যাট, আশুলিয়ায় একাধিক প্লট, পূর্বাচলে প্লট, আফতাবনগরে জমি—এসব সম্পদের বেশিরভাগই স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, ভাই, বোন বা শ্যালকের নামে কেনা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। অনুসন্ধানসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকৃত মালিকানা আড়াল করতেই এসব কৌশল নেওয়া হয়েছে।

শুধু শহুরে সম্পদ নয়, গ্রামাঞ্চলেও খামার ও জমির বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। সাভারের আকরানে গরুর খামার, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে বড় মুরগির খামার, বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট, মাছের ঘের, যশোর অঞ্চলে কৃষিজমি ও গবাদিপশুর খামার, মাগুরা ও অন্যান্য জেলায় জমি কেনার তথ্য বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে। একটি বায়োগ্যাস প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগের কথাও বলা হচ্ছে।

বিদেশে সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগ আরও গুরুতর। বিভিন্ন সূত্র দাবি করছে, ২০২১ সালে লন্ডনে এবং ২০২৩ সালে নিউইয়র্কে বাড়ি কেনা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় ছেলেদের নামে বাড়ি ও অন্যান্য সম্পদ রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সেখানকার ব্যাংক হিসাবে অর্থ স্থানান্তর, কমিশনের টাকা বিদেশে পাঠানো এবং ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়িক অংশীদারদের মাধ্যমে অর্থ পাচারের বিষয়ও অভিযোগপত্রে উঠে এসেছে। যদিও এসব তথ্যের স্বাধীন যাচাই এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

আইয়ুব আলীর দুই ছেলে অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা বা বসবাস করছেন এবং পরিবারসহ তিনি নিয়মিত বিদেশ ভ্রমণ করেন—এমন তথ্যও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। সমালোচকদের প্রশ্ন, সরকারি চাকরির বেতন-ভাতা দিয়ে এত বিপুল দেশি-বিদেশি সম্পদ, একাধিক গাড়ি, ঘনঘন বিদেশ সফর এবং বিলাসী জীবনযাপন কীভাবে সম্ভব হলো।

সংস্থাটির ভেতরের অনেকে বলছেন, দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও তিনি বারবার পার পেয়ে গেছেন রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ার কারণে। কখনও মন্ত্রী, কখনও প্রতিমন্ত্রী, কখনও ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনিক পরিবর্তনের পরও তিনি টিকে গেছেন, এমনকি পদোন্নতিও পেয়েছেন বলে ক্ষোভ রয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের মধ্যে।

অভিযোগ রয়েছে, সরকার পরিবর্তনের পর কিছুদিন আড়ালে থাকলেও পরে আবার সক্রিয় হয়ে ওঠেন আইয়ুব আলী। নতুন ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গেও সম্পর্ক তৈরি করে তিনি নিজের অবস্থান শক্ত করেন বলে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা। ফলে বিগত আমলের অভিযোগগুলো চাপা পড়ে যায় এবং চলমান প্রকল্পগুলোতেও তার প্রভাব অব্যাহত থাকে।

দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করেছে। তবে এসব অভিযোগের কতগুলো অনুসন্ধানে গেছে, কতগুলো প্রাথমিক যাচাইয়ে আছে, আর কতগুলো মামলায় রূপ নিয়েছে—তা স্পষ্ট নয়। দুদকের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের একটি অংশ অনানুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছেন, রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে অতীতে অনেক অভিযোগে অগ্রগতি হয়নি।

আইয়ুব আলী অবশ্য অতীতে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে। তিনি নিজেকে সৎ, দক্ষ ও পরিশ্রমী কর্মকর্তা হিসেবে দাবি করেছেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে পাঠানো প্রতিবাদলিপিতে তিনি অভিযোগগুলোকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও উল্লেখ করেছেন। তবে সমালোচকদের বক্তব্য, শুধু অস্বীকার করলেই হবে না—সম্পদের উৎস, প্রকল্প ব্যয়, টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং বিদেশে অর্থ লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দিতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিআইডব্লিউটিএ’র মতো কৌশলগত প্রতিষ্ঠানে যদি দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের অভিযোগ চলতে থাকে, তবে এর প্রভাব পড়ে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি, নদীপথ ব্যবস্থাপনা, বন্দর উন্নয়ন এবং জনসেবার ওপর। ড্রেজিংয়ের নামে অতিরিক্ত ব্যয় মানে জনগণের করের টাকা অপচয়; নিম্নমানের সরঞ্জাম মানে দীর্ঘমেয়াদি লোকসান; আর টেন্ডার কারসাজি মানে প্রতিযোগিতা ধ্বংস ও দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, আইয়ুব আলীর বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হওয়া জরুরি। তার নামে-বেনামে থাকা সম্পদ, পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের নামে কেনা সম্পত্তি, দেশ-বিদেশের ব্যাংক হিসাব, প্রকল্প ব্যয়ের অসঙ্গতি, টেন্ডার অনুমোদনের নথি, ড্রেজিং বিল, ড্রেজার ক্রয়, মেরামত ব্যয় এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত—সবকিছু খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে যেসব কর্মকর্তা, ঠিকাদার বা রাজনৈতিক ব্যক্তি এসব অভিযোগে জড়িত থাকতে পারেন, তাদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।

বিআইডব্লিউটিএ’র সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানটিকে বাঁচাতে হলে ব্যক্তি নয়, সিস্টেমকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, সিন্ডিকেট সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন গড়ে তুলতে না পারলে শুধু একজনকে সরিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। তবে আইয়ুব আলীকে ঘিরে ওঠা বিস্তর অভিযোগ এখন সেই বৃহত্তর সংকটেরই প্রতীক হয়ে উঠেছে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

দেশ-বিদেশে সম্পদ, প্রকল্পে অনিয়ম আইয়ুব আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়

৫ম পর্বের ১ম পর্ব

দেশ-বিদেশে সম্পদ, প্রকল্পে অনিয়ম আইয়ুব আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়

আপডেট সময় ১১:০৫:৪০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬

প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা প্রকৌশলী আইয়ুব আলীকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, টেন্ডার বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার, সম্পদ অর্জন এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ ঘুরে বেড়াচ্ছে সংশ্লিষ্ট মহলে। সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারী, ঠিকাদার, প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং বিভিন্ন সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি রাজনৈতিক প্রভাবকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বিআইডব্লিউটিএ’র গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প, ড্রেজিং কার্যক্রম, ড্রেজার ক্রয়, যন্ত্রাংশ কেনাকাটা, বিল অনুমোদন এবং টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিতে পরিণত হন। সরকার পরিবর্তনের পরও তার প্রভাব কমেনি—এমন অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) সাইফুজ্জামান শিখরের আত্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে আইয়ুব আলী দীর্ঘদিন সংস্থাটির ভেতরে একচ্ছত্র দাপট দেখিয়েছেন। যদিও বিভিন্ন সূত্র বলছে, তিনি সরাসরি নয়, পারিবারিক সূত্রে শিখরের বড় ভাইয়ের আত্মীয়; তবু প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে তিনি বরাবর শিখরের নাম ব্যবহার করতেন। বিআইডব্লিউটিএ’র অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ধারণা ছিল, তার বিরুদ্ধে কথা বললে বদলি, হয়রানি বা পদোন্নতি আটকে যেতে পারে। এ কারণে বহু অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও দীর্ঘ সময় তা কার্যকর তদন্তের মুখ দেখেনি।

ড্রেজিং প্রকল্পগুলোকে কেন্দ্র করেই সবচেয়ে বেশি অভিযোগ জমা হয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ’র চলমান বিভিন্ন সংরক্ষণ ড্রেজিং কাজে সাধারণত যে ব্যয় কাঠামো অনুসরণ করা হয়, অভিযোগ অনুযায়ী আইয়ুব আলীর নিয়ন্ত্রণাধীন কিছু প্রকল্পে তার চেয়ে অনেক বেশি দর নির্ধারণ করা হয়। প্রতি ঘনমিটার ড্রেজিং ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার মাধ্যমে সরকারি অর্থ লোপাট করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১৪০ লাখ ঘনমিটার মাটি অপসারণের বিল বাবদ প্রায় ৭০০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে এবং এর বড় অংশ অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে দেখানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। অভিযোগকারীরা বলছেন, এই অতিরিক্ত অর্থ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী মহলের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা হয়েছে।

বঙ্গ ড্রেজার্স লিমিটেড ও কর্ণফুলী ড্রেজিং লিমিটেড নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আইয়ুব আলীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, টেন্ডার প্রক্রিয়াকে প্রতিযোগিতামূলক না রেখে নানা কারসাজির মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হতো। কখনও দরপত্রের শর্ত এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান সুবিধা পায়, আবার কখনও প্রকল্পের দর অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কাজের বিনিময়ে মোটা অঙ্কের কমিশন নেওয়া হতো এবং সেই অর্থের একটি অংশ দেশ-বিদেশে বিনিয়োগ করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত নৌপথের নাব্যতা উন্নয়ন প্রকল্প, বরিশাল অঞ্চলের নদী খনন, বিভিন্ন আঞ্চলিক রুটে ড্রেজিং, শ্মশানঘাট টার্মিনাল, কার্গো টার্মিনাল নির্মাণসহ একাধিক প্রকল্পে আইয়ুব আলীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের বাস্তব প্রয়োজনীয়তা যাচাই না করেই নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, কোথাও অতিরিক্ত ব্যয় ধরা হয়েছে, কোথাও নিম্নমানের কাজের বিল পরিশোধ করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে কাজের অগ্রগতি ধীর হলেও বিল দ্রুত ছাড় হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

শ্মশানঘাট টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা রয়েছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, যেখানে বিদ্যমান টার্মিনালগুলো পর্যাপ্তভাবে ব্যবহারই হচ্ছিল না, সেখানে নতুন টার্মিনাল নির্মাণে কোটি কোটি টাকা ব্যয় যৌক্তিক ছিল না। প্রতিটি পল্টুনের দাম বাজারমূল্যের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি দেখানো হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, প্রকল্পটি জনস্বার্থের চেয়ে কমিশনভিত্তিক সিদ্ধান্তের উদাহরণ।

ড্রেজার ও আনুষঙ্গিক জলযান ক্রয় প্রকল্পেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের আওতায় ড্রেজার, টাগ বোট, হাউজ বোট, সার্ভে ভেসেল, পাইপলাইনসহ নানা সরঞ্জাম কেনা হলেও এর একটি অংশ নিম্নমানের, অকার্যকর বা প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। কিছু ড্রেজার অল্প সময়ের মধ্যেই বিকল হয়ে পড়ে, কিছু ভেসেল দীর্ঘদিন ব্যবহার ছাড়াই পড়ে থাকে, আবার কাগজে-কলমে দেখানো পাইপলাইনের বাস্তব অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এসব ক্রয়ে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে বিল অনুমোদন করা হয়েছে বলে অভিযোগ।

যান্ত্রিক শাখায় চাকরিজীবনের শুরু থেকেই কেনাকাটা, মেরামত ও যন্ত্রাংশ সরবরাহে আইয়ুব আলীর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ছিল বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। সরকারি জাহাজ ও জলযান মেরামতের কাজ সিন্ডিকেটভিত্তিক ঠিকাদারদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজস্ব বাজেটের আওতায় ছোট-বড় অসংখ্য মেরামত কাজের বিল ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত কাজের তুলনায় বিল বেশি দেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও কাজ না করেই কাগজে সমাপ্ত দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএ’র অভ্যন্তরে নিয়োগ, বদলি ও পদায়নেও তার প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। নিজের অনুগত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো, অপ্রিয়দের সরিয়ে দেওয়া, নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপের কথা বলেছেন অনেকেই। অভিযোগকারীদের দাবি, সংস্থাটির একটি অংশকে তিনি ব্যক্তিগত নেটওয়ার্কের মতো ব্যবহার করতেন, যেখানে যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্য বেশি মূল্য পেত।

আইয়ুব আলীর বিরুদ্ধে ঘুষ ছাড়া ফাইল সই না করার অভিযোগও এসেছে। ঠিকাদারদের ভাষ্য অনুযায়ী, কাজের বিল, ওয়ার্ক অর্ডার, অনুমোদন কিংবা টেন্ডার-সংক্রান্ত নথি এগোতে হলে অনৈতিক আর্থিক লেনদেন ছিল প্রায় বাধ্যতামূলক। কেউ টাকা না দিলে ফাইল আটকে রাখা, দেরি করা বা অজুহাত দেখিয়ে ফেরত দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটত বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সৎ ঠিকাদার ও প্রকৃত প্রতিযোগীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

কিছু ঘটনায় ঠিকাদারদের সঙ্গে তার বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নেয় বলেও জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, একই কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে একাধিক পক্ষের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার পর শেষ পর্যন্ত পছন্দের একজনকে কাজ দেওয়া হতো। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে কয়েকজন ঠিকাদার তার দপ্তরে গিয়ে টাকা ফেরত দাবি করেন এবং এক পর্যায়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এমনকি তাকে মারধরের ঘটনাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।

দুর্নীতির অর্থ দিয়ে বিপুল সম্পদ গড়ার অভিযোগও বিস্তর। পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের নামে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট, জমি, খামার, মাছের ঘের, বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট, কৃষিজমি ও বাণিজ্যিক বিনিয়োগের তথ্য বিভিন্ন অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, বারিধারা ডিওএইচএস, ধানমণ্ডি, জিগাতলা, হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুর, আশুলিয়া, পূর্বাচল, আফতাবনগর, মিরপুর, কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, সাভারসহ নানা এলাকায় তার বা পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পদের কথা বলা হচ্ছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, বসুন্ধরায় তিন কাঠার প্লটে বহুতল ভবন নির্মাণ চলছে। ধানমণ্ডি ও বারিধারায় একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে। হাজারীবাগে কয়েকটি বড় আকারের ফ্ল্যাট, মোহাম্মদপুর হাউজিংয়ে ফ্ল্যাট, আশুলিয়ায় একাধিক প্লট, পূর্বাচলে প্লট, আফতাবনগরে জমি—এসব সম্পদের বেশিরভাগই স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, ভাই, বোন বা শ্যালকের নামে কেনা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। অনুসন্ধানসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকৃত মালিকানা আড়াল করতেই এসব কৌশল নেওয়া হয়েছে।

শুধু শহুরে সম্পদ নয়, গ্রামাঞ্চলেও খামার ও জমির বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। সাভারের আকরানে গরুর খামার, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে বড় মুরগির খামার, বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট, মাছের ঘের, যশোর অঞ্চলে কৃষিজমি ও গবাদিপশুর খামার, মাগুরা ও অন্যান্য জেলায় জমি কেনার তথ্য বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে। একটি বায়োগ্যাস প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগের কথাও বলা হচ্ছে।

বিদেশে সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগ আরও গুরুতর। বিভিন্ন সূত্র দাবি করছে, ২০২১ সালে লন্ডনে এবং ২০২৩ সালে নিউইয়র্কে বাড়ি কেনা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় ছেলেদের নামে বাড়ি ও অন্যান্য সম্পদ রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সেখানকার ব্যাংক হিসাবে অর্থ স্থানান্তর, কমিশনের টাকা বিদেশে পাঠানো এবং ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়িক অংশীদারদের মাধ্যমে অর্থ পাচারের বিষয়ও অভিযোগপত্রে উঠে এসেছে। যদিও এসব তথ্যের স্বাধীন যাচাই এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

আইয়ুব আলীর দুই ছেলে অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা বা বসবাস করছেন এবং পরিবারসহ তিনি নিয়মিত বিদেশ ভ্রমণ করেন—এমন তথ্যও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। সমালোচকদের প্রশ্ন, সরকারি চাকরির বেতন-ভাতা দিয়ে এত বিপুল দেশি-বিদেশি সম্পদ, একাধিক গাড়ি, ঘনঘন বিদেশ সফর এবং বিলাসী জীবনযাপন কীভাবে সম্ভব হলো।

সংস্থাটির ভেতরের অনেকে বলছেন, দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও তিনি বারবার পার পেয়ে গেছেন রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ার কারণে। কখনও মন্ত্রী, কখনও প্রতিমন্ত্রী, কখনও ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনিক পরিবর্তনের পরও তিনি টিকে গেছেন, এমনকি পদোন্নতিও পেয়েছেন বলে ক্ষোভ রয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের মধ্যে।

অভিযোগ রয়েছে, সরকার পরিবর্তনের পর কিছুদিন আড়ালে থাকলেও পরে আবার সক্রিয় হয়ে ওঠেন আইয়ুব আলী। নতুন ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গেও সম্পর্ক তৈরি করে তিনি নিজের অবস্থান শক্ত করেন বলে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা। ফলে বিগত আমলের অভিযোগগুলো চাপা পড়ে যায় এবং চলমান প্রকল্পগুলোতেও তার প্রভাব অব্যাহত থাকে।

দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করেছে। তবে এসব অভিযোগের কতগুলো অনুসন্ধানে গেছে, কতগুলো প্রাথমিক যাচাইয়ে আছে, আর কতগুলো মামলায় রূপ নিয়েছে—তা স্পষ্ট নয়। দুদকের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের একটি অংশ অনানুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছেন, রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে অতীতে অনেক অভিযোগে অগ্রগতি হয়নি।

আইয়ুব আলী অবশ্য অতীতে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে। তিনি নিজেকে সৎ, দক্ষ ও পরিশ্রমী কর্মকর্তা হিসেবে দাবি করেছেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে পাঠানো প্রতিবাদলিপিতে তিনি অভিযোগগুলোকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও উল্লেখ করেছেন। তবে সমালোচকদের বক্তব্য, শুধু অস্বীকার করলেই হবে না—সম্পদের উৎস, প্রকল্প ব্যয়, টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং বিদেশে অর্থ লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দিতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিআইডব্লিউটিএ’র মতো কৌশলগত প্রতিষ্ঠানে যদি দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের অভিযোগ চলতে থাকে, তবে এর প্রভাব পড়ে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি, নদীপথ ব্যবস্থাপনা, বন্দর উন্নয়ন এবং জনসেবার ওপর। ড্রেজিংয়ের নামে অতিরিক্ত ব্যয় মানে জনগণের করের টাকা অপচয়; নিম্নমানের সরঞ্জাম মানে দীর্ঘমেয়াদি লোকসান; আর টেন্ডার কারসাজি মানে প্রতিযোগিতা ধ্বংস ও দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, আইয়ুব আলীর বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হওয়া জরুরি। তার নামে-বেনামে থাকা সম্পদ, পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের নামে কেনা সম্পত্তি, দেশ-বিদেশের ব্যাংক হিসাব, প্রকল্প ব্যয়ের অসঙ্গতি, টেন্ডার অনুমোদনের নথি, ড্রেজিং বিল, ড্রেজার ক্রয়, মেরামত ব্যয় এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত—সবকিছু খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে যেসব কর্মকর্তা, ঠিকাদার বা রাজনৈতিক ব্যক্তি এসব অভিযোগে জড়িত থাকতে পারেন, তাদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।

বিআইডব্লিউটিএ’র সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানটিকে বাঁচাতে হলে ব্যক্তি নয়, সিস্টেমকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, সিন্ডিকেট সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন গড়ে তুলতে না পারলে শুধু একজনকে সরিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। তবে আইয়ুব আলীকে ঘিরে ওঠা বিস্তর অভিযোগ এখন সেই বৃহত্তর সংকটেরই প্রতীক হয়ে উঠেছে।