ছাগলনাইয়া উপজেলার দারোগারহাট কমিউনিটি ক্লিনিককে কেন্দ্র করে এক কর্মচারীর বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রভাব বিস্তারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র, এলাকাবাসী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগে উঠে এসেছে, পিএইচসিপি ট্রাস্টের আওতাভুক্ত চাকরিজীবী ইউসুফ আপন নামের ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি সেবা ব্যবস্থাকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার, ওষুধ অনিয়মিতভাবে বিক্রি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, এনআইডি সেবা নিয়ে দালালি এবং মামলা বাণিজ্যের মতো কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দারোগারহাট কমিউনিটি ক্লিনিক এলাকার সাধারণ মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষ এখানে এসে চিকিৎসা পরামর্শ, মাতৃসেবা, শিশুস্বাস্থ্যসেবা এবং বিনামূল্যে বিতরণযোগ্য ওষুধ গ্রহণ করে থাকেন। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, ক্লিনিকে সরকারি বরাদ্দের কিছু ওষুধ নিয়মিত রোগীদের মাঝে বিতরণ না করে সেগুলো বাইরে বিক্রি করা হয়। এলাকাবাসীর একাংশের দাবি, প্রয়োজনীয় ওষুধ না পেয়ে অনেক রোগীকে বাইরে থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এতে দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, ওষুধ সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা না থাকায় রোগীরা বুঝতেই পারেন না কোন ওষুধ এসেছে, কতটুকু এসেছে এবং কী পরিমাণ বিতরণ হয়েছে। ফলে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে নিয়মিত অডিট, স্টক যাচাই এবং ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণ না থাকলে এ ধরনের অভিযোগ বারবার উঠতেই থাকবে। তারা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের জরুরি নজরদারি দাবি করেছেন।
অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রসঙ্গ। স্থানীয় সূত্রের দাবি, ২০২৩ সালে প্রায় ৩০ লাখ টাকার জমি ক্রয় করা হয়েছে, যার অর্থের উৎস নিয়ে এলাকায় নানা প্রশ্ন রয়েছে। এবং ৬ লক্ষ টাকা দিয়ে মেসার্স এ এ এন্টারপ্রাইজ নামে একটি দোকান নেয়।
একজন ফটোকপি দোকানদার বলেন ১৪তম গ্রেডভুক্ত চাকরিজীবীর বেতন কাঠামো অনুযায়ী এমন সম্পদ অর্জন স্বাভাবিক আয় দিয়ে সম্ভব কি না, তা তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। যদিও সম্পদ ক্রয়ের অভিযোগের পক্ষে কোনো সরকারি নথি এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি, তবুও বিষয়টি নিয়ে এলাকায় আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
এলাকার কয়েকজন ব্যবসায়ী ও বাসিন্দার অভিযোগ, ইউসুফ আপন “মেসার্স এ এ এন্টারপ্রাইজ” নামে একটি কম্পিউটার ও ফটোকপি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং ওই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন, নতুন আবেদন, তথ্য হালনাগাদসহ বিভিন্ন সেবা পাইয়ে দেওয়ার নামে দালালি করা হয়। অভিযোগকারীরা বলেন, সাধারণ মানুষ অনেক সময় সরকারি প্রক্রিয়া সম্পর্কে না জানায় তারা মধ্যস্থতাকারীর কাছে যায় এবং অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে বাধ্য হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি দাবি করেন, এনআইডি সংক্রান্ত কাজে প্রভাব খাটানোর কথাও এলাকায় প্রচার করা হয়। তার ভাষ্য, কিছু মানুষকে বলা হয় যে চাইলে যে কাউকে বদলি বা ট্রান্সফার করানো সম্ভব। যদিও এ দাবির কোনো প্রামাণ্য দলিল পাওয়া যায়নি, তবুও এ ধরনের কথাবার্তা জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউসুফ আপন বলেন, এগুলো আমি লোন নিয়ে করেছি, দোকান না দিলে আমি কি করে খাবো। অথছ সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ অনুযায়ী, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো সরকারি কর্মচারী—সেটি নিয়মিত হোক বা মাস্টাররোল—চাকরির পাশাপাশি ব্যবসা, কোম্পানি গঠন বা অন্য কোনো লাভজনক পেশায় জড়িত হতে পারেন না
আরও বলেন আমি নির্বাচন কমিশন অফিসে একটা কাজে গেছিলাম এবং ওই অফিসের সজীব, কাদির এবং ইয়াসিন নামক ব্যাক্তিদ্বয়ের সাথে আমার একটু ঝামেলাও হয়োছিলো। তারাই হয়ত এখন আমার নামে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
অভিযোগের তালিকায় সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো মামলা বাণিজ্যের অভিযোগ। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, বিভিন্ন বিরোধ বা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে মামলা করার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয়।
বিশেষ করে এনসিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান নুরুন নেওয়াজ সেলিমকে মিথ্যা মামলা দিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ দাবি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে এ বিষয়ে আদালতের কোনো নথি, মামলার কপি বা আনুষ্ঠানিক রেকর্ড এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। এবং ইউসুফ আপনের কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন আমার বাবার হত্যা মামলায় আমি বাদী হয়ে এনআরবিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান নুরুন নেওয়াজ সেলিম ও আরও ছয়জনের নামে একটি মামলা দায়ের করেছি তবে টাকা পয়সা কিছু চাইনি।
স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, একটি কমিউনিটি ক্লিনিক শুধু চিকিৎসা কেন্দ্র নয়, এটি সরকারের গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার মুখ। সেখানে কর্মরত কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতি, দালালি বা প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠলে পুরো ব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তারা মনে করেন, দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত হলে সত্য-মিথ্যা পরিষ্কার হবে এবং নির্দোষ কেউ হয়রানির শিকার হলে তিনিও ন্যায়বিচার পাবেন। অপরদিকে অভিযোগ সত্য হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের কাজে জড়াতে সাহস না পায়।
এলাকাবাসীর অনেকে অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়মের কথা লোকমুখে শোনা গেলেও দৃশ্যমান কোনো তদন্ত হয়নি। তাদের ভাষ্য, অনেক সময় সাধারণ মানুষ ভয়, প্রভাব বা ঝামেলার আশঙ্কায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করতে চান না। ফলে অভিযোগগুলো স্থানীয় আড্ডা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ব্যক্তিগত আলাপেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক অভিযোগ না থাকলে প্রশাসনের পক্ষেও ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই সামাজিকভাবে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা উচিত নয়। একইভাবে অভিযোগকে হালকাভাবে উড়িয়ে দেওয়াও ঠিক নয়। গণতান্ত্রিক ও আইনের শাসনভিত্তিক সমাজে সঠিক পথ হলো—অভিযোগ গ্রহণ, তথ্য যাচাই, অভিযুক্তের বক্তব্য গ্রহণ এবং নিরপেক্ষ তদন্ত শেষে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো।
এই ঘটনায় স্থানীয়দের প্রধান দাবি হলো, দারোগারহাট কমিউনিটি ক্লিনিক ও সংশ্লিষ্ট অভিযোগসমূহ দ্রুত তদন্তে একটি নিরপেক্ষ কমিটি গঠন করা হোক। একই সঙ্গে সরকারি ওষুধের স্টক, সম্পদ অর্জনের উৎস, এনআইডি সেবা নিয়ে দালালচক্রের সংশ্লিষ্টতা এবং মামলা বাণিজ্যের অভিযোগ খতিয়ে দেখার আহ্বান জানানো হয়েছে। তারা বলছেন, সত্য উদঘাটন হলে শুধু একটি ব্যক্তির বিষয় নয়, পুরো এলাকার সরকারি সেবাব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরবে।
সংবাদ শিরোনাম ::
৫ম পর্বের প্রথম পর্ব
দারোগারহাট কমিউনিটি ক্লিনিক কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় ০৪:১৩:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
- ৫৩৫ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ
























