আইন মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধন অধিদপ্তরের অধীন ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের অস্থায়ী নকলনবিশদের পদোন্নতিকে ঘিরে চলছে তুঘলকি কাণ্ড। গত দুই বছরে নকলনবিশদের পদোন্নতির জন্য একাধিক তালিকা করেও বারবার সংশোধন করা হচ্ছে। অদ্যাবধি তালিকা চূড়ান্ত করা হয়নি। কয়েক দফা তালিকা সংশোধনের পর সম্প্রতি আবারও তালিকা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, পদোন্নতি পেতে ইচ্ছুক নকলনবিশদের কাছ থেকে দফায় দফায় ঘুষ দাবি করা হচ্ছে। টাকা দিলেই তালিকার ওপরের দিকে নাম উঠে আসে, আবার টাকা না দিলে তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হয়। গত দুই বছরে কয়েকটি খসড়া তালিকা করা হলেও দাপ্তরিকভাবে তৈরি করা হয়েছে দুটি তালিকা, যা দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি’র হাতে এসেছে।
এ ব্যাপারে ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার মুনশী মোকলেছুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ঘুষ লেনদেনের বিষয় অস্বীকার করে তিনি দৈনিক আমাদের মাতৃভূমিকে বলেন, ‘পদোন্নতি নীতিমালার আলোকে নকলনবিশদের ১০ বছরের ধারাবাহিক কাজের বিবরণ প্রয়োজন হয়। কিন্তু তালিকায় যাদের নাম পাওয়া গেছে তাদের ধারাবাহিক কাজের বিবরণ সন্তোষজনক নয়।’
তারা কি কাজ করেন না? এমন প্রশ্নের উত্তরে জেলা রেজিস্ট্রার বলেন, নকলনবিশদের কাজই হলো ‘বালামে দলিল লিপিবদ্ধ করা, দলিলের অবিকল নকল (সার্টিফায়েট কপি) করা।’ কিন্তু সাব-রেজিস্ট্রার অফিসগুলোতে লোকবল কম থাকায় তাদের দিয়ে অন্য কাজও করা হয়। ফলে তাদের মূল কাজের ধারাবাহিকতা বিঘ্নিত হয়। এখন মোহরার-টিসি মোহরারসহ অন্তত ১২টি পদ শূন্য রয়েছে। নীতিমালা অনুসারে প্রকৃত যোগ্যদের নিয়োগ দেওয়ার জন্য নতুন তালিকা তৈরির কাজ চলছে।
শূন্যপদ থাকা সাপেক্ষে অস্থায়ী নকলনবিশরা রাজস্ব খাতে স্থায়ী নকলনবিশ হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে থাকেন। এ জন্য প্রতিটি জেলায় জেলা রেজিস্ট্রারের নেতৃত্বে নিয়োগ পদোন্নতি ও বাছাই কমিটি রয়েছে। ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার মুনশী মোকলেছুর রহমানের সভাপতিত্বে ওই কমিটির বৈঠকে গত দুই বছরে পদোন্নতির যোগ্যদের কয়েকটি খসড়া তালিকা করা হলেও গত বছরের ১৬ মার্চ দাপ্তরিকভাবে প্রথম তালিকা প্রকাশ করা হয়। প্রস্তাবিত পদোন্নতির ওই তালিকায় ১০ জন অস্থায়ী নকলনবিশের নাম আনা হয়।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নকলনবিশদের ১০ বছরের কাজের বিবরণ ও বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরবরাহ করতে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রারদের নির্দেশ দেন জেলা রেজিস্ট্রার মুনশী মোকলেছুর রহমান। কাগজপত্র সরবরাহের জন্য তিন দিন সময় বেঁধে দেওয়া হয়। ওই তালিকায় নকলনবিশ মো. শামীম, মোসা. পারভীন আক্তার, মো. আতাউর রহমান, মোসা. কামরুন নাহার, মো. রফিকুল ইসলাম, মো. শফিকুর রহমান, মোসা. আনোয়ারা আক্তার, মো. আবু সাঈদ মিয়া, মোসা. মাসুদা আক্তার ও মো. মারুফ আহম্মদের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু কোনো কারণ উল্লেখ ছাড়াই কয়েক মাস পদোন্নতির বিষয়টি ঝুলিয়ে রেখে আরও কয়েকটি খসড়া তালিকা করা হয়। তবে দাপ্তরিকভাবে ওই তালিগুলো প্রকাশ করা হয়নি।
নকলনবিশদের একাধিক সূত্র দৈনিক আমাদের মাতৃভূমিকে জানান, খসড়া তালিকা দেখিয়ে দফায় দফায় ঘুষ দাবি করেছে তৎকালীন আইন মন্ত্রণালয়ের এবং ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের সমন্বয়ের একটি সিন্ডিকেট।
পরে একই বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর দাপ্তরিকভাবে আরেকটি তালিকা প্রকাশ করা হয়। এবারও নকলনবিশদের প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়ে পাঁচ দিন সময় বেঁধে সাব-রেজিস্ট্রারদের চিঠি দেন জেলা রেজিস্ট্রার মুনশী মোকলেছুর রহমান। এই তালিকায় ১১ জন নকলনবিশের নাম উল্লেখ করা হলেও আগের তালিকা থেকে মো. শামীম ও আতাউর রহমানের নাম বাদ দেওয়া হয়। তালিকায় নতুন যুক্ত হন বেলাল হোসেন, মনির হোসেন ও পারুল আক্তার। এই তালিকা আবারও সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছেন জেলা রেজিস্ট্রার।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন নকলনবিশ দৈনিক আমাদের মাতৃভূমিকে জানান, সাব-রেজিস্ট্রার ও জেলা রেজিস্ট্রাররা মূলত অস্থায়ী নকলনবিশদের দিয়েই তাদের সব অনৈতিক কাজ করিয়ে নেন। যে কারণে নকলনবিশরা তাদের আসল কাজটি করেন না। আর্থিকভাবে বেশি লাভবান হওয়ার লোভে নকলনবিশরাও তাদের মূল কাজে মনযোগ দেন না।
এদিকে নকলনবিশদের পদোন্নতি বাণিজ্যের বিষয়ে ভুক্তভোগীরা প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাদের কয়েকজন দৈনিক আমাদের মাতৃভূমিকে জানান, ভবিষ্যতেও এই জেলা রেজিস্ট্রারের (মুনশী মোকলেছুর রহমান) অধীনেই নকলনবিশদের কাজ করতে হবে। নিবন্ধন অধিদপ্তরের পরিদর্শক পদে পদোন্নতির সর্বশেষ তালিকায় জেলা রেজিস্ট্রার মুনশী মোকলেছুর রহমানের নাম রয়েছে। এ মাসেই পদোন্নতির আদেশ হতে পারে।
জানা গেছে, ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্টদের কাছে তথ্য পাঠানো হয়েছে, কেউ কোনো বাড়াবাড়ি করলে সবার পদোন্নতি আটকে দেওয়া হবে। তাই ভবিষ্যতে বিপদে পড়ার ভয়ে কেউই প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বদলির প্রাপ্যতা ছাড়াও জনস্বার্থ এবং বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে ব্যাপকসংখ্যক জেলা রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রারের অনুপযুক্ত (আন ডিউ) বদলি হয়েছে।
তবে নির্ধারিত মেয়াদ শেষে বদলির প্রাপ্যতা থাকা (ওভার ডিউ) সত্ত্বেও আইন মন্ত্রণালয়ের সেই সিন্ডিকেটকে ম্যানেজ করে ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার পদে বহাল আছেন মুনশী মোকলেছুর রহমান।
সংবাদ শিরোনাম ::
ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার অফিসে পদোন্নতি বাণিজ্যের অভিযোগ: টাকা দিলেই তালিকার শীর্ষে
-
মোঃ মামুন হোসেন - আপডেট সময় ০৮:২৪:৪৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৬
- ৫০৯ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ



















