বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রধান বিদ্যুৎ পরিদর্শকের দপ্তর থেকে গত পাঁচ বছরে মোট ২ লাখ ৬৬ হাজার ৯২৮টি লাইসেন্স দিয়েছে। যার বড় অংশ হয়েছে দালাল চক্রের হাত ধরে। সরকারি নির্ধারিত ফি-র বাইরে প্রতিটি লাইসেন্সে ঘুষ আদায় হয়েছে ১০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত। লাইসেন্সের ধরন ও সংখ্যার ভিত্তিতে হিসাব করলে এই খাত থেকে পাঁচ বছরে ঘুষ আদায়ের পরিমাণ অন্তত ৫৭০ কোটি টাকা।
এই বিশাল দুর্নীতির জাল বিস্তারের নেপথ্য রয়েছেন মূলত দুজন সরকারি কর্মচারী—অফিস সহকারী সাখাওয়াত হোসেন বাবু ও কম্পিউটার অপারেটর উইলিয়াম হোসেন। দেশজুড়ে তাদের দালাল নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল লেনদেন আর কুরিয়ার সার্ভিসের আড়ালে চলছে লাইসেন্স বাণিজ্যের এই নীরব কারবার। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে লাইসেন্স করালে পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও আগেই সরবরাহ করা হয়। পরীক্ষায় পাস করলেও ঘুষ না দিয়ে ফেল দেখানো হয়।
বিকাশে টাকা, কুরিয়ারে কাগজ
প্রধান বিদ্যুৎ পরিদর্শকের দপ্তর থেকে লাইসেন্স নেওয়ার পদ্ধতি এখন অনেকটা অনলাইন শপিংয়ের মতো। ডকুমেন্ট পাঠাতে হয় কুরিয়ারে, ঘুষের টাকা দিতে হয় বিকাশে। ঘুষের টাকা পাঠালে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লাইসেন্স মেলে অনলাইনে। এই ব্যবস্থা চালু অফিস সহকারী সাখাওয়াত হোসেন বাবু ও কম্পিউটার অপারেটর উইলিয়াম হোসেন। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে এবং নথিপত্র ঘেঁটে এসব তথ্যের প্রমাণ মিলেছে। সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস ও স্টেডফাস্ট কুরিয়ারের মাধ্যমে নথি বিনিময়ের একাধিক চালান সিটও আমাদের মাতৃভূমির হাতে এসেছে।
যেভাবে ভাগ হয় কাজ
ইঞ্জিনিয়ার আল-আমিন হোসেন নামের এক ভুক্তভোগী জানান, ‘অফিস সহকারী বাবুর কাজ বিকাশে টাকা নেওয়া ও দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা। আর কম্পিউটার অপারেটর উইলিয়ামের দায়িত্ব টাকার বিনিময়ে যারা লাইসেন্স চান তাদের ডাটাবেজ তৈরি করা।’এছাড়াও লাইসেন্স পেতে যাঁদের পরীক্ষায় বসতে হবে, তাঁদের আগেই সরবরাহ করা হয় প্রশ্নপত্র ও সম্ভাব্য উত্তর। ভাইভা বোর্ডে কোন যন্ত্রপাতির নাম জিজ্ঞাসা করা হবে, সেগুলোর ছবি ও নাম আগেই পৌঁছে দেওয়া হয় প্রার্থীর কাছে।
শুধু টাকার বিনিময়ে লাইসেন্স দেওয়া নয়, যোগ্য প্রার্থীদের ফেল করিয়ে দেওয়াটাও এই চক্রের কৌশলের অংশ। ইঞ্জিনিয়ার আল-আমিন হোসেন বলেন, ‘সুপারভাইজার লাইসেন্সের জন্য পরীক্ষা দিতে গিয়ে ভাইভা বোর্ডের সব প্রশ্নের উত্তর দিলেও আমাকে ফেল করানো হয়। অথচ আমার পাশে থাকা নওসিন তাবাসুম নামের এক মেয়েকে কোনো প্রশ্ন ছাড়াই এবিসি ক্যাটাগরির লাইসেন্স অনুমোদন দেওয়া হয়।’ পরে ইঞ্জিনিয়ার আল-আমিন হোসেন ওই নারীর সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন তিনি দালালের মাধ্যমে এসেছিলেন।
আরেক ভুক্তভোগী ইঞ্জিনিয়ার মেহেদী হাসান বলেন, ‘চাহিদা অনুযায়ী এবিসি ক্যাটাগরির লাইসেন্স না দিয়ে শুধু সি বা বি ক্যাটাগরির লাইসেন্স দেওয়া হয়। ফলে বাধ্য হয়ে দালালের মাধ্যমে বা সরাসরি টাকা দিয়ে লাইসেন্স করতে হয়।’
সিন্ডিকেটের কথা বলতে গেলে প্রথমেই নাম আসে সাখাওয়াত হোসেন বাবু ও উইলিয়াম হোসেনের। তবে ভুক্তভোগীরা বলছেন, এই দুজনই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন, এমন নয়। ইঞ্জিনিয়ার মেহেদী হাসানের অভিযোগ, ‘বিদ্যুৎ বিভাগের এই অসাধু কর্মচারীরা সবকিছু করেন বিদ্যুৎ লাইসেন্সিং বোর্ডের সদস্য সচিব প্রকৌশলী মো. আতোয়ার রহমান মোল্লার যোগসাজসে। এই দুজন প্রকৌশলী আতোয়ারের ক্যাশিয়ার ও অর্থ সংগ্রাহকের কাজ করে থাকেন।’
হোয়াটসঅ্যাপে সিন্ডিকেট, ফেসবুকে প্রচারণা
সারা দেশে দালাল নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতে দুটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ব্যবহার করেন সাখাওয়াত ও উইলিয়াম। একটির নাম ‘এবিসি লাইসেন্স গ্রুপ’, অন্যটি ‘বিদ্যুৎ লাইসেন্স ও ইলেকট্রিক্যাল স্টাডি গ্রুপ’। ‘এবিসি লাইসেন্স গ্রুপ’-এর অ্যাডমিন ‘সুমন বই বিতান’ (**৭৪৪১০৯) ও ‘এক্সাম সেন্টার’ (*৮৩৯৭১৮) নামের দুই হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারী। ‘বিদ্যুৎ লাইসেন্স ও ইলেকট্রিক্যাল স্টাডি গ্রুপ’-এর অ্যাডমিন নয়জন। এর মধ্যে রয়েছেন সুমন বই বিতান (*৭৪৪১০৯), আল আমিন শিকদার (*০৩১৯২৩), জাহিদ (*৭৮৪০২৭), এসএমটিডিএনকেএস (*৭৫৮৯৯২), পাওয়ার মাইন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড অটোমেশন (*৪০৭২৫৭) ও সিরাজগঞ্জ ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলস (**৭৭১৫০৬) প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া ‘ইলেকট্রিশিয়ান ভাই’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমেও দালালরা লাইসেন্স দেওয়ার প্রচারণা চালায়।
মাঠ পর্যায়ের দালালদের মধ্যে যাদের নাম এসেছে, তারা হলেন শাকিল খান, জাহিদ হাসান, সাফায়েত হোসেন, তুষার হোসেন, ইকবাল হোসেন ও ইঞ্জিনিয়ার শিমুল। মেহেদী হাসান বলেন, ‘এই চক্রটি সারা দেশে গড়ে তুলেছে শক্তিশালী দালাল চক্র। লাইসেন্স প্রার্থীরা এই চক্রের মাধ্যমে না আসলে মাসের পর মাস ঘুরতে হয় বিদ্যুৎ অফিসে।’
পাঁচ বছরে কত লাইসেন্স, কত টাকা
বিভিন্ন নথিপত্র অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে বিদ্যুৎ লাইসেন্সিং বিভাগ বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্র চালুর অনুমোদন দিয়েছে ১৭ হাজার ১৫১টি। দালালের মাধ্যমে যারা এই লাইসেন্স পেয়েছেন, তাদের প্রতিটি ফাইলে অতিরিক্ত গুনতে হয়েছে ১ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকা। গড়ে ২ লাখ টাকা করে ধরলে শুধু এই ক্যাটাগরিতেই অতিরিক্ত আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৪৩ কোটি টাকার বেশি।
বৈদ্যুতিক ঠিকাদারি লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে ৫ হাজার ৪০৭টি। এখানে প্রতি লাইসেন্সে অতিরিক্ত আদায় ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। গড়ে ৬০ হাজার টাকা করে ধরলে এই খাতে আদায় হয়েছে ৩২ কোটি টাকার বেশি। বৈদ্যুতিক সুপারভাইজার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে ১১ হাজার ২৩৭টি। প্রতিটিতে অতিরিক্ত ১ লাখ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। গড়ে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা করে ধরলে এই খাতে আদায়ের পরিমাণ ১২৪ কোটির টাকার বেশি।
ইলেকট্রিশিয়ান লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে ৪৮ হাজার ১৫৩টি। প্রতিটিতে অতিরিক্ত ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছে। গড়ে ১৫ হাজার ধরলে এই খাতে আদায় হয়েছে ৭২ কোটি টাকার বেশি। সব মিলিয়ে পাঁচ বছরে এই চার ধরনের লাইসেন্সে অবৈধ আদায়ের পরিমাণ ৫৭১ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
কারা পেয়েছেন এই লাইসেন্স
দালাল চক্রের মাধ্যমে যারা লাইসেন্স পেয়েছেন তাদের তালিকায় রয়েছে ঢাকার মতিঝিলের ‘গণি পাওয়ার’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। ব্যক্তির নামে টাঙ্গাইলের মো. শহিদুল ইসলামও এভাবে লাইসেন্স পেয়েছেন। এ ছাড়া পেয়েছেন এমএস তালুকদার এন্টারপ্রাইজ, এমএস তাওহিদ এন্টারপ্রাইজ, এমএস এ আর অ্যান্ড কোং, সর্দার সিরাজুম মুনিরা, মো. তফিকুর রহমান, একে এম আখতার হোসেন, মো. খাইরুল ইসলাম, মো. আল মাসুদ, সুমন কুমার দাস, মো. আবদুর রশিদ ও মো. বাবুল মিয়া প্রমুখ।
মাসিক বেতন ১৭ হাজার, লেনদেন ৫ লাখ
সাখাওয়াত হোসেন বাবুর মাসিক বেতন মাত্র ১৭ হাজার ২৩৭ টাকা। আর উইলিয়াম হোসেনের বেতন ২২ হাজার ২৯৭ টাকা। কিন্তু তাদের আর্থিক লেনদেনের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
নথি অনুযায়ী, শুধু মোবাইল ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম বিকাশ ও নগদে গত এক বছরে সাখাওয়াত লেনদেন করেছেন ৬০ লাখ টাকা। অর্থাৎ মাসে গড়ে ৫ লাখ টাকা। এর বাইরেও তাঁর ইসলামী ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ব্যাংক ও সিটি ব্যাংকের হিসাবে ঘুষ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।
উইলিয়ামের ব্যক্তিগত বিকাশ নম্বর (**৮১৮৫০৪) ও লতা আক্তার নামের আরেকটি বিকাশ নম্বরে (**৬৬৮১০৪) গত বছর লেনদেন হয়েছে ৮০ লাখ টাকার বেশি। সোনালী ব্যাংকের একটি হিসাবে গত বছর লেনদেন হয়েছে আরও ২০ লাখ টাকার বেশি। সব মিলিয়ে উইলিয়াম প্রতি মাসে লেনদেন করেন ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা।
দুই কর্মচারির জমি, ফ্ল্যাট, বহুতল ভবন
নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, সাখাওয়াত সম্প্রতি বেশকিছু জমি কিনেছেন। গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ায় রামশীল কাফুলাবাড়ি মৌজায় নারায়ণ রায়ের কাছ থেকে প্রায় ৭৫ লাখ টাকায় কিনেছেন ১৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ জমি (দলিল নম্বর **২৪)। একই মৌজায় জিন্নাতুন নেসার কাছ থেকে কিনেছেন আরও ৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ জমি, আনুমানিক মূল্য ২০ লাখ টাকা (দলিল নম্বর **১৯)।
কোটালিপাড়ায় সাখাওয়াত ও তার ভাই ইয়াসিন কাজীর নামে রয়েছে আনুমানিক ১ কোটি ২০ লাখ টাকা মূল্যের ৩৯ দশমিক ৮২ শতাংশ জমি। একই এলাকায় দুই ভাইয়ের নামে রয়েছে আরও ৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ জমি, আনুমানিক মূল্য ৩০ লাখ টাকা। এ ছাড়া কোটালিপাড়ার বান্ধাবাড়ী মৌজায় সাখাওয়াতের নামে রয়েছে আনুমানিক ২ কোটি টাকা মূল্যের ৪২ শতাংশের একটি প্লট।
উইলিয়ামের গ্রামের বাড়ি যশোরের বাঘারপাড়া থানার তেলিধ্যান্যপুরে। সম্প্রতি বাজারে একটি জমি কিনে সেখানে চারতলা ফাউন্ডেশনের একটি ভবন নির্মাণ শুরু করেছেন তিনি।
নির্বাচন কমিশন থেকে বিদ্যুৎ বিভাগ
বিদ্যুৎ বিভাগে যোগ দেওয়ার আগে উইলিয়াম নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে ডাটা এন্ট্রি অপারেটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সেখানে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর চাকরি ছেড়ে দেন তিনি।
নথিপত্রে দেখা যায়, উইলিয়ামের নানা মো. জয়নাল মোল্লা একজন মুক্তিযোদ্ধা। ২০০৫ সালে বেসামরিক গেজেটভুক্ত হয়েছেন তিনি (গেজেট নম্বর ২১২৩, প্রকাশের তারিখ ১৪ মে ২০০৫)। নাতি হিসেবে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় বিদ্যুৎ বিভাগে চাকরি নেন উইলিয়াম। তবে নথিপত্রে কিছু অসামঞ্জস্যও দেখা গেছে। উইলিয়াম ও তাঁর ভাই-বোনদের জাতীয় পরিচয়পত্রে মায়ের নাম লেখা ‘রিনা খাতুন’। কিন্তু তাঁর বাবা মো. নাজিম উদ্দীনের একাধিক পাসপোর্টে স্ত্রীর নাম হিসেবে উল্লেখ রয়েছে রেহেনা বেগম।
অভিযুক্তদের বক্তব্য
এ বিষয়ে উইলিয়ামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। যা ইচ্ছা তাই লিখতে পারেন।’
অফিস সহকারী সাখাওয়াত হোসেন বাবু বলেন, ‘যে অভিযোগ করছেন এগুলোর সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা নেই।’ টাকা লেনদেনের নথির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই লেনদেনগুলো আমি করিনি।’
এছাড়াও ইঞ্জিনিয়ার মেহেদী হাসানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুই কর্মচারির এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন বিদ্যুৎ লাইসেন্সিং বোর্ডের একজন কর্মকর্তা। ওই কর্মকর্তা অন্তত একশ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ বানিয়েছেন। নিজের ছেলেকে ব্যবসায়ী সাজিয়ে এসব টাকা বৈধ করার চেষ্টা করছেন তিনি। এ বিষয়ে অনুসন্ধান চলমান।
মোঃ মামুন হোসেন 






















