বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় উঠে এসেছেন সংস্থাটির এক প্রভাবশালী কর্মকর্তা ফকির মো. মহিউদ্দিন। দীর্ঘ কর্মজীবনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করা এই কর্মকর্তাকে ঘিরে অভিযোগ উঠেছে যে, বিগত সরকারের আমলে রেলওয়ের বেশ কিছু বড় প্রকল্পে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন এবং সেসব প্রকল্পের অনেকগুলোতেই আর্থিক অনিয়ম, অপচয় এবং দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি, এবং সংশ্লিষ্ট অনেক বিষয়ই তদন্তাধীন বলে জানা গেছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সূত্রে প্রাথমিকভাবে যে তথ্য উঠে এসেছে, তাতে বলা হয়েছে যে বিগত সরকারের সময় রেলওয়ের বিভিন্ন খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থের অনিয়মের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। কিছু প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম বা পাচারের সম্ভাব্য তথ্য-উপাত্ত দুদকের হাতে এসেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। যদিও এই অঙ্কের বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশিত হয়নি, তবুও বিষয়টি ইতোমধ্যে জনমনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ফকির মো. মহিউদ্দিনকে ঘিরে বিভিন্ন অভিযোগ নতুন করে সামনে আসছে।
প্রায় ২৫ বছরের কর্মজীবনে তিনি যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই বিভাগের কিছু পদকে রেলওয়ের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও আর্থিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের আমলে প্রায় ১২ বছর তিনি এমন কিছু পদে দায়িত্ব পালন করেছেন, যেখানে বড় বাজেটের প্রকল্প, ক্রয়-বিক্রয় এবং সরবরাহ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ ছিল। এই সময়কালে বিভিন্ন প্রকল্পে তার সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং অভিযোগ রয়েছে যে তিনি যে প্রকল্পগুলোতে দায়িত্বে ছিলেন, সেগুলোর অনেকগুলোতেই অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফলাফল এখনো পুরোপুরি প্রকাশ পায়নি।
অভিযোগের মধ্যে বিশেষভাবে আলোচিত দুটি প্রকল্প হলো ২০টি লোকোমোটিভ সংগ্রহ এবং ১৫০টি মিটারগেজ যাত্রীবাহী কোচ সংগ্রহ প্রকল্প। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের সময় নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপে ক্রয় প্রক্রিয়া, দরপত্র মূল্যায়ন এবং সরবরাহের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে ডেমু ট্রেন ক্রয় প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এই প্রকল্পে যে ট্রেনগুলো কেনা হয়েছিল, সেগুলো দেশের বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি উপযোগী ছিল না এবং সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে পরবর্তীতে সমালোচনা দেখা দেয়। এতে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হয়েছে বলে দাবি করা হয়, যার পরিমাণ কয়েকশ কোটি টাকা বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন এখনো প্রকাশিত হয়নি।
ফকির মো. মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে যে তিনি ক্রয়-বাণিজ্যে অনিয়ম, বদলি সংক্রান্ত প্রভাব খাটানো, প্রকল্পে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ না করেই বিল পরিশোধের মতো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কিছু অভিযোগে বলা হয়েছে, ঠিকাদারি কাজেও তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ আদালতে উপস্থাপিত হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয় এবং বিষয়গুলো তদন্তাধীন বলেই সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টিও এই আলোচনায় উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের সময় রেলপথ মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, যার ফলে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ এবং দায়িত্ব লাভে সুবিধা পেয়েছেন। একই সঙ্গে সংসদীয় কমিটির কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে তার সুসম্পর্ক ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব সম্পর্কের কারণে তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকতে পেরেছেন বলে সমালোচকদের দাবি। তবে এই দাবিগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
সরকার পরিবর্তনের পর ফকির মো. মহিউদ্দিনের অবস্থান ও ভূমিকা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তিনি নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন এবং রেলওয়ের একটি বৈষম্যবিরোধী প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছেন। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তিনি নতুন প্রশাসনের কাছে নিজেকে ‘বৈষম্যের শিকার’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন বলে দাবি করা হয়। একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে, এই প্রেক্ষাপটে তিনি পদোন্নতি লাভ করেছেন এবং রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (প্রকল্প) পদে দায়িত্ব পেয়েছেন। তবে এই পদোন্নতি প্রক্রিয়াটি কতটা নিয়মতান্ত্রিক ছিল, সে বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে এবং বিষয়টি নিয়েও বিতর্ক দেখা দিয়েছে।
কিছু সূত্রে আরও দাবি করা হয়েছে যে, সরকার পরিবর্তনের পর রেলওয়ের অভ্যন্তরে কিছু কর্মসূচি আয়োজনের মাধ্যমে তিনি নিজের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করেন। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে বাইরের লোকজনকে সম্পৃক্ত করে শক্তি প্রদর্শনের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব বিষয় যাচাইযোগ্য স্বাধীন সূত্রে নিশ্চিত করা যায়নি এবং সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে এ বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর তদন্তে রেলপথ মন্ত্রণালয় একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেছে বলে জানা গেছে। এই কমিটি তার অধীনে বাস্তবায়িত বিভিন্ন প্রকল্পের কার্যক্রম, আর্থিক লেনদেন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো পর্যালোচনা করছে। তবে তদন্তের অগ্রগতি বা প্রাথমিক ফলাফল সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠেছে যে গুরুত্বপূর্ণ নথি বা ফাইল গায়েব হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে, যা তদন্ত প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। যদিও এসব অভিযোগও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, রেলওয়ের মতো একটি বৃহৎ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, বরং সেবার মান এবং জনসাধারণের আস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং একই সঙ্গে নির্দোষদের প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।
এদিকে, ফকির মো. মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার নিজস্ব বক্তব্য পাওয়া না যাওয়ায় বিষয়টি একপাক্ষিক হয়ে থাকার ঝুঁকি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ প্রকাশের ক্ষেত্রে তার বক্তব্য বা প্রতিক্রিয়া তুলে ধরা সাংবাদিকতার ন্যূনতম নীতির অংশ। তাই এই বিষয়ে তার অবস্থান জানা গেলে সামগ্রিক চিত্রটি আরও স্পষ্ট হতো।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এবং সেই প্রেক্ষাপটে একাধিক কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা এখনো চলমান। তদন্তের অগ্রগতি, প্রমাণের উপস্থাপন এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য—সবকিছু মিলিয়ে ভবিষ্যতে এ বিষয়ে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে। বর্তমানে যে তথ্যগুলো সামনে এসেছে, সেগুলো মূলত অভিযোগ ও প্রাথমিক অনুসন্ধানের ওপর ভিত্তি করে, যার চূড়ান্ত সত্যতা নির্ভর করছে চলমান তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার ওপর।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















