সীমান্তঘেঁষা নিস্তব্ধ জনপদ হঠাৎ যেন রূপ নিয়েছে এক অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্রে। চারদিকে আতঙ্ক, কান্না আর ভয়ের ঘন কালো ছায়া। ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার ভদ্রেশ্বরী কলোনী, ১নং ধর্মগড় এলাকায় মোঃ আবুল হোসেন’র বসতঘর ২৯ মার্চ ২০২৬ সকাল ১০টায় জমি দখলকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ তাণ্ডব চালিয়েছে কথিত ভূমিদস্যুরা। সশস্ত্র হামলা, মারধর, আগুন লাগানো, সম্পত্তি ভাঙচুর, শ্লীলতাহানির চেষ্টা ও হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণের ঘটনায় পুরো গ্রামজুড়ে বিরাজ করছে শ্মশানের নীরবতা—পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে বহু বাড়ি।
স্থানীয়দের অভিযোগ অনুসারে, প্রায় ১৬ জনের সংঘবদ্ধ লাঠিয়াল বাহিনী ধারালো অস্ত্র, লোহা ও কাঠের রড নিয়ে হঠাৎ ঝড়ের মতো গ্রামে ঢুকে কৃষকের বসতঘরে হামলা চালায়। অভিযোগকারী মোঃ আবুল হোসেন ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের উপর হত্যার উদ্দেশ্যে আঘাত করে গুরুতর জখম করে। অভিযোগকারীর শাশুড়ী মোছাঃ লাইলী বেগমকে বোরকা ছিঁড়ে নগ্ন করার চেষ্টা করা হয় এবং শ্লীলতাহানি ও শ্বাসরোধের চেষ্টা চালানো হয়। ঘরবাড়ি ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দিয়ে ভয়ভীতি সৃষ্টি করা হয়। এতে অভিযোগকারীর ঘর-বাড়ির আনুমানিক আড়াই লক্ষ টাকার ক্ষতি হয় ভাঙচুরে এবং আগুনে আনুমানিক ২ লক্ষ ৮০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে।
প্রতিবেশী সহকারী শিক্ষক মো. মারুফ জানান, “ভূমিদস্যুরা যেভাবে তাণ্ডব চালিয়েছে, তা ছিল চোখে দেখার মতো নয়—একেবারে বিভীষিকাময়। আমি ঘটনাটি ভিডিও করতে গেলে তারা লাঠিসোটা নিয়ে আমার দিকে তেড়ে আসে। আমি প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসি।” তিনি আরও জানান, পরবর্তীতে হামলাকারীরা তার বাড়িতে ঢুকে তার পিতাকে তাড়া করে এবং চার ভাইকে বেদম পিটিয়ে গুরুতর আহত করে।
ভুক্তভোগী কৃষক পরিবারের সদস্য লালচান বাদশা বলেন, “আমি বাজার থেকে ফিরে দেখি আমার ভাইয়ের বাড়িতে আগুন, ভাঙচুর আর তাণ্ডব। আমি তাদের (হামলাকারীদের) বলি—আপনাদের যদি কোনো দাবি থাকে, আমরা গ্রাম্যভাবে বসে সমাধান করি। কিন্তু তারা কোনো কথা শোনেনি।”
এদিকে স্থানীয় ফারুক আহমেদ সরকার এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিলে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। তিনি জানান, রাণীশংকৈল উপজেলার ধর্মঘট চেকপোস্ট কলোনিতে আবুল হোসেনের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও পরিবারের সদস্যদের মারধর করা হয়েছে। এমনকি ভুক্তভোগী পরিবারটি চিকিৎসার জন্য হাসপাতালেও যেতে পারছে না—তাদের ঘেরাও করে রাখা হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, ঠাকুরগাঁও জেলার রাণীশংকৈল উপজেলার মৌজা ভদ্রেশ্বরী, খতিয়ান নং ১১১, দাগ নং ৩১-এর অন্তর্ভুক্ত ১ একর ৩৫ শতক ডাঙ্গা শ্রেণির জমি সরকার কর্তৃক ২০০০ সালে বন্দোবস্ত পান তুলাচাষী মোঃ আব্দুস সাত্তার । কবুলিয়ৎপত্র নং- ৬৬২৫/২০০০ অনুযায়ী তিনি জমির বৈধ মালিক হন। তার মৃত্যুর পর ওয়ারিশ মিয়াজান আলী ও আবুল হোসেন গং দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখলে রয়েছেন।
কিন্তু হঠাৎ করেই সীমান্ত এলাকার প্রভাবশালী একটি লাঠিয়াল চক্র—যাদের মধ্যে প্রধান আসামি মোঃ দুরুল হুদা (৫০), মোঃ মনিরুল ইসলাম (৪৮), মোঃ খায়রুল ইসলাম কাজল (৫০), মোঃ জেনারেল জেনু (৪০), মোঃ জাহেরুল ইসলাম (৪০), মোঃ জালাল (৫৫), মোঃ আনিসুর রহমান (৫৫), মোঃ দুলাল (৫০) সহ প্রায় ১৬ জন তালিকাভুক্ত আসামি— অজ্ঞাত ভাড়াটে ৭/৮জন সন্ত্রাসী নিয়ে নিজেদের জমির মালিক দাবি করে সংঘবদ্ধভাবে হামলা চালায়।
ঘটনায় অভিযোগকারী মোঃ আবুল হোসেন, তাঁর বড় ভাই মোঃ বাবুল হোসেন, ছোট ভাই মোঃ সাইফুল ইসলাম এবং শাশুড়ী মোছাঃ লাইলী বেগম গুরুতর জখমজনিত কারণে রাণীশংকৈল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি ও চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্থানীয়দের দাবি, হামলার পরপরই উল্টো ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে, যাতে করে তারা আইনি জটিলতায় পড়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়। এতে করে প্রকৃত ভোগদখলকারীরা এখন আতঙ্কে ঘরছাড়া। এ ঘটনায় দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছেন অভিযোগকারী।
মোঃ দুরুল হুদা গং-এর মোঃ দুরুল হুদাকে এ বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে ১৪ মিনিট ৪৯ সেকেন্ড কথা হয়েছে। আপনি কি দুরুল সাহেব? – হ্যাঁ আমি মোঃ দুরুল হুদা।; জমি সংক্রান্ত বিষয়ে হামলার ঘটনার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে দেখলাম। এ বিষয়ে আপনার সাথে কিছু কথা আছে। – হ্যাঁ বলেন।; হামলার নেপথ্যের ঘটনা কি? – আমার জমি আমি দখলে নিয়েছি। ; বিরোধী পক্ষের ২০০০ সালে একটি কবুলিয়ৎ দলিল রয়েছে, আপনার আইনি ভিত্তি কি? – আমি ১৯৯১ সালে এক সেনাবাহিনীর থেকে দলিল নিয়েছি। ; উভয় পক্ষের দাবী থাকলে দু’জন নিয়ে স্থানীয়ভাবে মিমাংসা করা যেত, তাহলে হামলার ঘটনা কেন হলো? – আমরা হামলা করিনি, আমাদের জমি দখল করেছি। ; আপনি কি করেন? – আমি বিএনপি করি। ; কোন পদ আছে? – না কোন পদ নেই। ; তাহলেতো সমর্থক বলা যায়? – হ্যাঁ সমর্থন করি। ; আসলে আপনি কি কাজ করেন? – আমি শিক্ষকতা করি, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক। ; হামলার শিকার পক্ষ সহকারী শিক্ষক মো. মারুফও শিক্ষক? – না আমার জানা নাই। ; হামলার ঘটনা কি? – এটা হামলা না, আমার জমি আমি দখল করেছি। ; তাহলে জমি দখল ছাড়া হলো কিভাবে? – আমরা বিএনপি করি তাই ২০০৯ সালে বিরোধীরা আমাদের জমি দখল করেছে। তা এখন উদ্ধার করছি। ; এজন্য আইনীভাবে দখল উচিৎ ছিলোনা? – আমার জমি আমি দখল করেছি আইনী বিষয়না এটা। ; কেন? আপনার দল এখন ক্ষমতায় আসছে এমন ভাবছেন? ; না আমি শিক্ষক বিএনপি সমর্থন করি। – স্থানীয়ভাবে বা আইনীভাবে কাজটা করলে ভাল হতো না? – না আমার জমি আমি দখল করেছি। ; দখল চলে যাবার কারণ কি বিএনপি করেছেন এমন কিছু? – আমার জমি আর এখন আমার দখলে নেয়ার সময়। ; তাহলেতো দল ক্ষমতায় এজন্য আইন কোন বিষয় না এমন হয়ে যায়না? – না সেরকম কিছু না। ; তাহলে হামলার ঘটনা কেন হলো? – আমার জমি দখল করেছি। ; এজন্য হামলার করাই একমাত্র পথ? – তারাও আমাদের হামলা করছ। আমাদের ৪ জন আহত করছে। ; আপনার বাড়িতে বা অন্যকোথাও এ ঘটনা করছে? – না আমার জমিতে, দখল করতে গেলে। ; সেটা কি সহকারী শিক্ষক মো. মারুফদের বাড়িতে? – বাড়ি হবে কেন? আমার জমি। ; হ্যাঁ আমি সেটাই বলছি। আপনার বাড়িতে গিয়ে তো হামলা করেনি। ওদের বাড়িতে এ ঘটনা তাইতো, যেটা বিরোধীয় জমি? – হ্যাঁ আমার জমি। ; মোঃ দুরুল হুদার সাথে আরও অনেক কথা হয়। শেষ বাক্যে তিনি বলেন, “ভিডিওটি বিরোধীদের বানানো ও সকল অভিযোগ মিথ্যা।”
এলাকাজুড়ে এখন এক অদ্ভুত আতঙ্ক—দিনে নীরবতা, রাতে অজানা ভয়ের ছায়া। প্রতিটি বাড়ি যেন একেকটি অবরুদ্ধ দুর্গ, যেখানে মানুষ বেঁচে আছে শুধু ভয়ের সঙ্গে লড়াই করে।
স্থানীয় সচেতন মহল দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন, নতুবা যে কোনো সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















