পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বিভিন্ন ব্যয়বহুল প্রকল্পে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী গাজী আলতাফুজ্জামানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ১০ বছরের অনুসন্ধান শেষ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনুসন্ধানে ঢাকায় বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পদ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কোটি টাকার সঞ্চয়পত্রের তথ্য পাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের সুপারিশ করা হয়েছে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সাল থেকে আলতাফুজ্জামানের বিরুদ্ধে একাধিক প্রকল্পে দুর্নীতি, সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু হয়। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই অনুসন্ধানকালে চারবার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অভিযুক্ত এই প্রকৌশলীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বারবার অনুসন্ধান কর্মকর্তা বদল করা হয় এবং তদন্তে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়েছে।
সর্বশেষ অনুসন্ধান কর্মকর্তা হিসেবে দুদকের চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়–২ এর সহকারী পরিচালক মোসাব্বির তদন্ত শেষ করে কমিশনে মামলা দায়েরের সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দেন। তবে তার প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আগেই নতুন করে আবারও অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়ায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
দুদকের মহাপরিচালক মোতাহার হোসেন জানান, আলতাফুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ কমিশনে জমা হয়েছে। তবে মামলার অনুমোদনের আগেই কমিশন পদত্যাগ করায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়নি। নতুন কমিশন দায়িত্ব নিলে বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত হবে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুর্নীতি ও ঘুষের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বিদেশে পাচার করে ২০১৭ সালে কানাডায় একটি বাড়ি কেনেন আলতাফুজ্জামান। এছাড়া ঢাকার অভিজাত এলাকায় তার বিপুল সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। আয়কর নথিতে তিনি রাজধানীর লালমাটিয়ায় ১ হাজার ৭০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাটের মূল্য রেজিস্ট্রি খরচসহ মাত্র ১৪ লাখ টাকা দেখালেও বাস্তবে এর বাজারমূল্য কোটি টাকার বেশি বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একটি প্লট, জামালপুরে ভাইদের সঙ্গে যৌথ মালিকানায় বড় বাড়ি এবং রাজউকের বাড্ডা পুনর্বাসন প্রকল্পে একটি প্লট রয়েছে। ওই প্লটে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে বহুতল ভবন নির্মাণের চুক্তি করা হয়েছে, যেখানে তিনি ছয়টি ফ্ল্যাটের মালিক। পাশাপাশি একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তার নামে প্রায় দেড় কোটি টাকার এফডিআরও রয়েছে।
দুদকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দীর্ঘ অনুসন্ধানে আলতাফুজ্জামানের অধিকাংশ অবৈধ সম্পদের সন্ধান ঢাকাতেই পাওয়া গেছে। তবে কানাডায় বাড়ি কেনার বিষয়ে এখনও পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করা যায়নি। মামলা হলে তদন্তে আরও তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
একই সঙ্গে আলতাফুজ্জামানের স্ত্রী ও পরিবারের অন্য সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের বিষয়েও পৃথক অনুসন্ধান চলছে, যা প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
তদন্তে আরও অভিযোগ উঠে এসেছে, পাউবোর ক্যাপিটাল (পাইলট) ড্রেজিং অব রিভার সিস্টেম ইন বাংলাদেশ (সিডিআরএসবি) প্রকল্প এবং সিরাজগঞ্জের গড়াই নদী পুনঃখনন প্রকল্পে অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। একটি কার্যকর পাম্পকে অকেজো দেখিয়ে প্রায় ১১ কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং একটি প্রতিষ্ঠানের নামে প্রায় ৫০ কোটি টাকা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন প্রকল্প থেকে জিপ গাড়ি আত্মসাৎ করার ঘটনাও তদন্তে উঠে এসেছে।
২০১৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ‘গঙ্গা ব্যারাজ সমীক্ষা প্রকল্প’-এর দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রকল্প পরিচালক হিসেবে আন্তর্জাতিক ঠিকাদার চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির আওতায় সাতটি জিপ গাড়ি গ্রহণ করেন আলতাফুজ্জামান। প্রকল্প শেষ হওয়ার পরও ওই গাড়িগুলো সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এছাড়া ব্যক্তিগতভাবে দুটি টয়োটা প্রাডো জিপ গাড়ি কেনার তথ্যও পাওয়া গেছে। ২০১৮ সালে চট্টগ্রামের কে আর অটো কারসের মাধ্যমে প্রায় ৩৬ লাখ টাকায় একটি পুরোনো প্রাডো জিপ কেনেন তিনি। পরে ২০২১ সালে জাপান থেকে ৭২ লাখ টাকায় আরও একটি প্রাডো জিপ আমদানি করেন।
দুদকের অনুসন্ধান চলাকালে আলতাফুজ্জামান নিজেকে ছাত্রলীগের সাবেক নেতা এবং আওয়ামী ঘরানার রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে দাবি করে তদন্ত কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তিনি তার সম্পদ বিবরণীর জবাবে উল্লেখ করেন, তার পরিবার বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত এবং গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের প্রয়াত সভাপতি অ্যাডভোকেট রহমত আলী ও সাবেক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হোসেনের সঙ্গে রাজনীতি করেছেন।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে গাজী আলতাফুজ্জামান খুদেবার্তায় জানান, তার বয়স এখন ৬৫ বছর এবং তিনি ছয় বছর আগে চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। তবুও তার নামে বিভিন্ন জায়গায় “আজব আজব দরখাস্ত” করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে এসব দরখাস্ত কারা করছে, সে বিষয়ে তিনি কিছু উল্লেখ করেননি।
স্টাফ রিপোর্টার: 
























