হরমুজ প্রণালি ও ওমান উপসাগর পেরিয়ে আসা ১৫টি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে ১২টি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করেছে। আরও তিনটি জাহাজ চলতি সপ্তাহেই বন্দরে নোঙর করার কথা রয়েছে। এসব জাহাজের মধ্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসসহ ৭ লাখ টন পণ্য রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এদিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার জেরে হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণার কারণে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে ভয়াবহ উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জাহাজ চলাচলে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায় অনেক শিপিং লাইন পণ্য বা কনটেইনার বুকিং নিচ্ছে না। আবার আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শিপিং কোম্পানি কনটেইনার পরিবহণে নতুন করে সারচার্জ আরোপ করেছে। এ কারণে রপ্তানি বাণিজ্যেও তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিরাপদ না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সিকম গ্রুপের কর্ণধার ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আমিরুল হক বলেছেন, ‘অগামী দু’এক সপ্তাহের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে বাংলাদেশে ভয়াবহ দুর্যোগ নেমে আসবে। বিশেষ করে পণ্য পরিবহণসহ সব খাতে সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়বে। ইতোমধ্যে সব ধরনের পণ্যের দাম ২০ শতাংশ বেড়ে গেছে। ৬০ ডলারের ক্রুড অয়েল ৯০ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। তবে ইরানি প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, তারা আক্রান্ত না হলে মধ্যপ্রাচ্যে তারা হামলা করবে না। তার এই আশ্বাসে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। শিগগিরই যুদ্ধ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছি।’ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলা এবং তেহরানের পালটা প্রতিক্রিয়া হিসাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করার কারণে পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে ইরাক, ইরান, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব-এই সাত দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয়। পারস্য উপসাগর থেকে এই প্রণালি পেরিয়ে ওমান উপসাগর, আরব সাগর, ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর হয়ে বাংলাদেশে জাহাজ আসে। এসব দেশ থেকে জ্বালানি পণ্যই বেশি আসে।
চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানিয়েছে, কাতার থেকে ১ লাখ ২৬ হাজার টন এলএনজি নিয়ে ‘আল জোর’ ও ‘আল জাসাসিয়া’ নামে দুটি জাহাজ ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে। এলপিজি নিয়ে ‘সেভান’ নামে একটি জাহাজ আজ রোববার পৌঁছানোর কথা রয়েছে। আগামী বুধবার ‘আল গালায়েল’ এবং সোমবার ‘লুসাইল’ নামে আরও দুটি জাহাজ বন্দরের জলসীমায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সব মিলিয়ে চার জাহাজে এলএনজি রয়েছে প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার টন। কাতারের রাস লাফান বন্দর থেকে সংঘাত শুরুর দুই থেকে সাত দিন আগে হরমুজ প্রণালি পার হয়ে যায় এসব জাহাজ। চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানো এবং পথে থাকা এসব জাহাজের মধ্যে ৪টিতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), ২টিতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) এবং ৯টিতে সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামাল ক্লিংকার রয়েছে। ১৫টি জাহাজে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টন পণ্য রয়েছে। তবে লিব্রেথা নামে আরেকটি এলএনজিবাহী জাহাজ এখনো হরমুজ প্রণালির ভেতরে রয়েছে। জাহাজটিতে এলএনজি বোঝাই করা হয়েছে এবং এটি প্রণালি অতিক্রমের অপেক্ষায় আছে বলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ার কারণে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহণে ঝুঁকি নিচ্ছে না অনেক শিপিং লাইন। আবার কোনো কোনো শিপিং লাইন ঝুঁকির অজুহাতে বাড়িয়ে দিয়েছে ভাড়া। কনটেইনার বুকিংয়ে আরোপ করেছে সারচার্জ। এতে করে রপ্তানি পণ্যের পরিবহণ খরচও বাড়ছে।
শিপিং লাইন সূত্র জানায়, ১৪ টন ধারণক্ষমতার একটি কনটেইনারে ৮০০ থেকে ২ হাজার ডলার পর্যন্ত সার চার্জ আরোপ করা হয়েছে। হিমায়িত পণ্য পরিবহণের জন্য ব্যবহৃত রেফার কনটেইনারে ১ হাজার ৬০০ ডলার থেকে ৪ হাজার ডলার পর্যন্ত সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি মায়ের্স্ক লাইন, এমএসসি, মেডিটেরিয়ান, হেপাক লয়েডসহ বিভিন্ন কোম্পানি উপসাগরীয় অঞ্চলমুখী বাড়তি সারচার্জ কার্যকর করেছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, ‘যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, অতিরিক্ত ইনস্যুরেন্স কাভারেজ, নাবিকদের নিরাপত্তা, জাহাজকে ঝুঁকি এড়িয়ে বিকল্প পথে চালানোসহ নানা কারণে শিপিং লাইনের খরচ বেড়েছে। বাড়তি এই ব্যয় মেটাতেই সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে।’
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, ‘দেশে জ্বালানি তেলের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ আমদানিনির্ভর। তাও উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। জ্বালানি সংকট তৈরি হলে শিল্পোৎপাদন ব্যাহত হবে। এতে রপ্তানি খাতেও বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে। বিশেষ করে বস্ত্র খাতে সংকট তৈরি হবে।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে যেসব পণ্য রপ্তানি হয় এর ৮৩ শতাংশই হচ্ছে পোশাক। পোশাক উৎপাদনে আমরা গত বছরের তুলনায় ১৮ শতাংশ পিছিয়ে আছি। এখন জ্বালানি সংকট সৃষ্টি হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে।’
বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোট অ্যাসোসিয়েশন-বিকডার সচিব রুহুল আমিন শিকদার বিপ্লব বলেন, ‘আমাদের ডিপো থেকে ২ শতাংশ কনটেইনার সরবরাহ কমেছে। শিপিং লাইনগুলো বুকিং কমিয়ে দিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত পোশাক রফতানি খাতে এর তেমন প্রভাব পড়েনি।’
জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় বেশ কয়েক দিন থেকেই চট্টগ্রামে পেট্রোলপাম্পগুলোতে যানবাহনের ভিড় বেড়েছে। চাহিদার অতিরিক্ত জ্বালানি কিনতে গিয়ে হচ্ছে সমস্যা। অনেক পেট্রোলপাম্প জ্বালানি তেল বিক্রি বন্ধ করে রেখেছে।
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি 



















