ঢাকা ১০:০১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬, ৪ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
টিকিটের অগ্নিমূল্যে যাত্রীদের নাভিশ্বাস ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় পোর্টেবল সিগন্যাল লাইট ব্যবহার শুরু পুলিশের ঈদযাত্রায় ‘তেলের টেনশনে’ শিডিউল বিপর্যয়ের শঙ্কা সালমান আগার রান আউট বিতর্কে যা বলছে এমসিসি ঈদযাত্রা নিরাপদ রাখতে নোয়াখালীতে র‍্যাবের কঠোর অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ঈদযাত্রায় সাভারে সড়কে মানুষের ঢল, বেড়েছে গণপরিবহনের চাপ কক্সবাজার সৈকতে বারুণী স্নান ও গঙ্গাপূজায় পুণ্যার্থীর ঢল মতিঝিলে চোর-পুলিশ খেলা, গুলিস্তানে পুলিশের সামনে নতুন নোট বিক্রি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, দুই পরিবহনকে জরিমানা

ফের রং বদলাতে চান তারেক রহমানের মামলার বাদী আমিন আহমেদ

বিএনপি জোট সরকারের সময়ে দলটির নেতাদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে ঠিকাদারি ব্যবসার মাধ্যমে বৈধ-অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জন করেন আল-আমিন কনস্ট্রাকশনের চেয়ারম্যান আমিন আহমেদ ভূঁইয়া। ১/১১’র তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে তাদের সাথে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ২০০৭ সালে তিনিই আবার বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং তার একান্ত সহকারী মিয়া নূরউদ্দিন অপুকে আসামি করে ১ কোটি টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা করেন গুলশানের আলোচিত উদয় টাওয়ারের মালিক আমিন আহমেদ ভূঁইয়া। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসলে দ্রুতই সেই দলের ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে মিশে যান তিনি। বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির বাচ্চুর সাথে মিলে ফাঁকি দিয়েছেন সাড়ে আট কোটি টাকার রাজস্ব। সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, পদ্মা ব্যাংকের চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফাত ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান শিবলী রুবায়াত উল ইসলামের সহযোগিতায় পুঁজিবাজার থেকে শত শত কোটি টাকা তুলে নিয়েছে আমিন আহমেদ ভূঁইয়া, শেখ হাসিনার চাচা শেখ কবির হোসেন, শেখ ফজলে নূর তাপসের ঘনিষ্ট শেখ মামুন খালেদের প্রতিষ্ঠান বেস্ট হোল্ডিংস। দুদকের করা মামলায় ‘লা মেরিডিয়ান হোটেল’র মালিক আমিন আহমেদকে গত ১০ জুলাই কারাগারে পাঠায় আদালত। এরই মধ্যে গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের পতন পর বিগত দিনের মতো ফের রং পাল্টে বিএনপির আনুকূল্য পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন তিনি। জামিন নিতেও বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের নিয়োগ দিতে যোগাযোগ করছে তার ঘনিষ্টব্যক্তিরা। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর শুরু হয়েছে ব্যাপক সমালোচনাও। অনেকেই বলছেন, যে ব্যক্তি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে প্রথম চাঁদাবাজীর মিথ্যা মামলা দিয়েছিলেন তার হয়ে বিএনপির কোন আইনজীবী লড়তে পারেন না। সেটি করলে প্রতিহতের ঘোষণাও দিয়েছেন কেউ কেউ।

সাড়ে ৮ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি: দুদকের মামলা সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট বাজারের ৩০ দশমিক ২৫ কাঠা জমি ক্রয় দেখিয়ে আত্মসাতের প্রায় ৯৫ কোটি টাকা গোপন করার চেষ্টা ও সাড়ে ৮ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে আমিন আহমেদের বিরুদ্ধে। এই মামলায় গত ৫ জুন আমিন আহমেদসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন দুদকের সহকারি পরিচালক নেয়ামুল হাসান গাজী। চার্জশিটভুক্ত অন্য আসামিরা হলেন- বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আব্দুল হাই বাচ্চু, তার স্ত্রী শিরিন আক্তার, তার ভাই শেখ শাহরিয়ার পান্না, বাচ্চুর ছেলে শেখ রাফা হাই ও শেখ ছাবিদ হাই অনিক।

জানা যায়, ২০১২ সালের ৮ আগস্ট বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল হাই বাচ্চু বেস্ট হোল্ডিংস গ্রুপের চেয়ারম্যান আমিন আহমেদের সঙ্গে গুলশান সাবরেজিস্ট্রি অফিসের অধীন ক্যান্টনমেন্ট বাজার এলাকার লালসরাইস্থিত মৌজার ৬ নং প্লটের ৩০ দশমিক ২৫ কাঠা ভূমি ক্রয়ের জন্য সমঝোতা চুক্তিপত্র সম্পাদন করেন। চুক্তি অনুযায়ী মূল্য ধরা হয় ১১০ কোটি টাকা। পরে চুক্তিপত্র অনুযায়ী ২০১২ সালের ১৬ অক্টোবর দুটি দলিল মোতাবেক ভূমির দলিল রেজিস্ট্রি করা হয়। যার মধ্যে ৮০৮৮৫ নং দলিলে ১৮ কাঠা জমি রেজিস্ট্রি হয়। যার মূল্য ধরা হয় ৯ কোটি টাকা। এই দলিলের গ্রহীতারা হলেন- শেখ আব্দুল হাই বাচ্চু, তার ভাই শেখ শাহরিয়ার পান্না ও স্ত্রী মিসেস শিরিন আক্তার। অপরদিকে ৮০৮৮৬ নং দলিলে ১২ দশমিক ২৫ কাঠা জমি রেজিস্ট্রি করা হয়। যার মূল্য ধরা হয় ৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এই দলিলের গ্রহীতা আব্দুল হাই বাচ্চুর দুই ছেলে শেখ ছাবিদ হাই অনিক ও শেখ রাফা হাই। তাই দুটি দলিলে জমির মোট রেজিস্ট্রেশন মূল্য দাঁড়ায় ১৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
অথচ জমি ক্রয় বাবদ আসামি শেখ আব্দুল হাই বাচ্চু ১৩৪টি পে-অর্ডারের মাধ্যমে সর্বমোট ৭৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং নগদে ৩১ কোটি ৫০ লাখ, অর্থাৎ মোট ১১০ কোটি টাকা আসামি আমিন আহমেদ-এর স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে পরিশোধ করেন। যা আসামি আমিন আহমেদ বুঝে পেয়েছেন মর্মে স্বীকার করেন।

এর মাধ্যমে আসামি শেখ আব্দুল হাই বাচ্চু তার স্ত্রী, ভাই ও সন্তানদের নামে ৯৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা হস্তান্তর, স্থানান্তর, রূপান্তর, ছদ্মাবরণের মাধ্যমে অপরাধলব্ধ অর্থ গোপন করেছেন। আর ১১০ কোটি টাকায় ক্রয় করা সত্ত্বেও ১৫ কোটি ২৫ লাখ টাকায় দলিল করে আসামি শেখ আব্দুল হাই বাচ্চু সরকারের ৮ কোটি ৫২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন। আসামি আমিন আহমেদ আসামি শেখ আব্দুল হাই বাচ্চুর অবৈধ অর্থ বৈধতা প্রদানে সরাসরি সহায়তা করেছেন। এর মাধ্যমে আসামিরা মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।

বেস্ট হোল্ডিংসের মানি লন্ডারিং মামলা: বেস্ট হোল্ডিংস লিমিটেড কোম্পানির ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাত/মানিলন্ডারিং এর মাধ্যমে বিদেশে পাচারের অভিযোগটির পুনরায় অনুসন্ধান করতে দুর্নীতি দমন কমিশনের সভা নং ০৮/২০২২ তারিখ ২৩/২/২০২২ এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। যা এখনও তদন্তাধীন অবস্থায় আছে।
পুঁজিবাজার থেকে বেস্ট হোল্ডিংসের অর্থ উত্তোলন: পাবলিক ইস্যু রুলসের ৩ এর ২ এর (পি) অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি শেয়ারবাজার থেকে টাকা উত্তোলনের জন্য আবেদন করার পূর্বের ২ বছরের মধ্যে বোনাস শেয়ার ছাড়া পরিশোধিত মূলধন বাড়াতে পারবে না। এই বিধান থাকার পরেও বেস্ট হোল্ডিংসের শত শত কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন বাড়ানো হয়েছে আইপিওতে আবেদন করার ২ বছরের মধ্যে। কিন্তু বিএসইসি গতবছরের ২৭ জুলাই বেস্ট হোল্ডিংসকে এই বিধান থেকে অব্যাহতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। ১০ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটিকে আইপিও অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। কোম্পানিটির কর্তৃপক্ষ আইপিওর আবেদনে উল্লেখ করে লো মেরিডিয়ান হোটেলটির প্রতি স্কয়ার ফিট কাঠামো নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১৮ হাজার ৫০১ টাকা। হোটেল ভবনটির প্রতি স্কয়ার ফিটের বাজার দাম দেখানো হয় ৪০ হাজার ১০ টাকা। সংশ্লিষ্টরা জানান, এক্ষেত্রে সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, পদ্মা ব্যাংকের চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফাত ও বিএসইসি চেয়ারম্যান শিবলি রুবায়াত উল ইসলামের আনুকূল্য পেয়েছে বেস্ট হোল্ডিংস। এর পরপরই আমিন আহমেদ ভূঁইয়ার প্রতিষ্ঠান বেস্ট হোল্ডিংস লিমিটেডের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাত ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ অনুসন্ধানের মধ্যেই গতবছর ২০ নভেম্বর থেকে ২৩ নভেম্বর পর্যন্ত নিলামের মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে ৩৫০ কোটি টাকা উত্তোলন করে।

অতিরিক্ত শেয়ার মূল্য: বেস্ট হোল্ডিংসের শেয়ার ইস্যু দর নিয়ে ব্যতিক্রম ঘটনা ঘটে। এই কোম্পানিটি থেকে ৫৫ টাকা প্রিমিয়ামসহ প্রতিটি ৬৫ টাকা করে ইস্যুর পরে শুধুমাত্র অভিহিত মূল্যেও বা ১০ টাকায় শেয়ার ইস্যু করা হয়। স্বাভাবিকভাবেই কোম্পানির যোগ্যতার ওপর শেয়ার ইস্যু দাম নির্ভর করে। সে হিসাবে ৬৫ টাকা দামে ইস্যুর পরে কোম্পানি যখন শুধু ১০ টাকায় নেমে আসে, তখন বোঝায় যায় কোম্পানির অবস্থা খারাপ হয়েছে।
রেড হেরিং প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, বেস্ট হোল্ডিংসের পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ৯২৫ দশমিক ৫৮ কোটি টাকা। এরমধ্যে ২০১৯ সালের ১ অক্টোবর পর্যন্ত ১০ টাকা করে ৫৬৬ দশমিক ১৫ কোটি টাকার শেয়ার ইস্যু করা হয়। এরপরে ২০১৯ সালের ১৮ নভেম্বর থেকে ২০২০ সালের ৩ মার্চ পর্যন্ত সময়ে ২৪৮ দশমিক ৩৪ কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন বাড়ানো হয় প্রতিটি শেয়ার ৬৫ টাকা করে ইস্যুর মাধ্যমে। এরপরে ২০২০ সালের ১০ ও ৩০ সেপ্টেম্বর ৬২ দশমিক ৫০ কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন বাড়ানো হয় শুধুমাত্র ১০ টাকা করে ইস্যুর মাধ্যমে।
এরপরে ২০২০ সালের ২০ অক্টোবর প্রতিটি ৬৫ টাকা করে ১৫ দশমিক ৩৮ কোটি টাকার, একই বছরের ১০ ডিসেম্বর ১০ টাকা করে ১৩ দশমিক ৯৭ কোটি টাকার এবং সর্বশেষ ২০২২ সালের ৩০ জুন ৬৫ টাকা করে ১৯ দশমিক ২৩ কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন বাড়ানো হয়েছে।

 

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

টিকিটের অগ্নিমূল্যে যাত্রীদের নাভিশ্বাস

ফের রং বদলাতে চান তারেক রহমানের মামলার বাদী আমিন আহমেদ

আপডেট সময় ০২:৫৪:৫৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬

বিএনপি জোট সরকারের সময়ে দলটির নেতাদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে ঠিকাদারি ব্যবসার মাধ্যমে বৈধ-অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জন করেন আল-আমিন কনস্ট্রাকশনের চেয়ারম্যান আমিন আহমেদ ভূঁইয়া। ১/১১’র তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে তাদের সাথে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ২০০৭ সালে তিনিই আবার বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং তার একান্ত সহকারী মিয়া নূরউদ্দিন অপুকে আসামি করে ১ কোটি টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা করেন গুলশানের আলোচিত উদয় টাওয়ারের মালিক আমিন আহমেদ ভূঁইয়া। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসলে দ্রুতই সেই দলের ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে মিশে যান তিনি। বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির বাচ্চুর সাথে মিলে ফাঁকি দিয়েছেন সাড়ে আট কোটি টাকার রাজস্ব। সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, পদ্মা ব্যাংকের চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফাত ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান শিবলী রুবায়াত উল ইসলামের সহযোগিতায় পুঁজিবাজার থেকে শত শত কোটি টাকা তুলে নিয়েছে আমিন আহমেদ ভূঁইয়া, শেখ হাসিনার চাচা শেখ কবির হোসেন, শেখ ফজলে নূর তাপসের ঘনিষ্ট শেখ মামুন খালেদের প্রতিষ্ঠান বেস্ট হোল্ডিংস। দুদকের করা মামলায় ‘লা মেরিডিয়ান হোটেল’র মালিক আমিন আহমেদকে গত ১০ জুলাই কারাগারে পাঠায় আদালত। এরই মধ্যে গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের পতন পর বিগত দিনের মতো ফের রং পাল্টে বিএনপির আনুকূল্য পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন তিনি। জামিন নিতেও বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের নিয়োগ দিতে যোগাযোগ করছে তার ঘনিষ্টব্যক্তিরা। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর শুরু হয়েছে ব্যাপক সমালোচনাও। অনেকেই বলছেন, যে ব্যক্তি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে প্রথম চাঁদাবাজীর মিথ্যা মামলা দিয়েছিলেন তার হয়ে বিএনপির কোন আইনজীবী লড়তে পারেন না। সেটি করলে প্রতিহতের ঘোষণাও দিয়েছেন কেউ কেউ।

সাড়ে ৮ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি: দুদকের মামলা সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট বাজারের ৩০ দশমিক ২৫ কাঠা জমি ক্রয় দেখিয়ে আত্মসাতের প্রায় ৯৫ কোটি টাকা গোপন করার চেষ্টা ও সাড়ে ৮ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে আমিন আহমেদের বিরুদ্ধে। এই মামলায় গত ৫ জুন আমিন আহমেদসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন দুদকের সহকারি পরিচালক নেয়ামুল হাসান গাজী। চার্জশিটভুক্ত অন্য আসামিরা হলেন- বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আব্দুল হাই বাচ্চু, তার স্ত্রী শিরিন আক্তার, তার ভাই শেখ শাহরিয়ার পান্না, বাচ্চুর ছেলে শেখ রাফা হাই ও শেখ ছাবিদ হাই অনিক।

জানা যায়, ২০১২ সালের ৮ আগস্ট বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল হাই বাচ্চু বেস্ট হোল্ডিংস গ্রুপের চেয়ারম্যান আমিন আহমেদের সঙ্গে গুলশান সাবরেজিস্ট্রি অফিসের অধীন ক্যান্টনমেন্ট বাজার এলাকার লালসরাইস্থিত মৌজার ৬ নং প্লটের ৩০ দশমিক ২৫ কাঠা ভূমি ক্রয়ের জন্য সমঝোতা চুক্তিপত্র সম্পাদন করেন। চুক্তি অনুযায়ী মূল্য ধরা হয় ১১০ কোটি টাকা। পরে চুক্তিপত্র অনুযায়ী ২০১২ সালের ১৬ অক্টোবর দুটি দলিল মোতাবেক ভূমির দলিল রেজিস্ট্রি করা হয়। যার মধ্যে ৮০৮৮৫ নং দলিলে ১৮ কাঠা জমি রেজিস্ট্রি হয়। যার মূল্য ধরা হয় ৯ কোটি টাকা। এই দলিলের গ্রহীতারা হলেন- শেখ আব্দুল হাই বাচ্চু, তার ভাই শেখ শাহরিয়ার পান্না ও স্ত্রী মিসেস শিরিন আক্তার। অপরদিকে ৮০৮৮৬ নং দলিলে ১২ দশমিক ২৫ কাঠা জমি রেজিস্ট্রি করা হয়। যার মূল্য ধরা হয় ৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এই দলিলের গ্রহীতা আব্দুল হাই বাচ্চুর দুই ছেলে শেখ ছাবিদ হাই অনিক ও শেখ রাফা হাই। তাই দুটি দলিলে জমির মোট রেজিস্ট্রেশন মূল্য দাঁড়ায় ১৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
অথচ জমি ক্রয় বাবদ আসামি শেখ আব্দুল হাই বাচ্চু ১৩৪টি পে-অর্ডারের মাধ্যমে সর্বমোট ৭৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং নগদে ৩১ কোটি ৫০ লাখ, অর্থাৎ মোট ১১০ কোটি টাকা আসামি আমিন আহমেদ-এর স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে পরিশোধ করেন। যা আসামি আমিন আহমেদ বুঝে পেয়েছেন মর্মে স্বীকার করেন।

এর মাধ্যমে আসামি শেখ আব্দুল হাই বাচ্চু তার স্ত্রী, ভাই ও সন্তানদের নামে ৯৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা হস্তান্তর, স্থানান্তর, রূপান্তর, ছদ্মাবরণের মাধ্যমে অপরাধলব্ধ অর্থ গোপন করেছেন। আর ১১০ কোটি টাকায় ক্রয় করা সত্ত্বেও ১৫ কোটি ২৫ লাখ টাকায় দলিল করে আসামি শেখ আব্দুল হাই বাচ্চু সরকারের ৮ কোটি ৫২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন। আসামি আমিন আহমেদ আসামি শেখ আব্দুল হাই বাচ্চুর অবৈধ অর্থ বৈধতা প্রদানে সরাসরি সহায়তা করেছেন। এর মাধ্যমে আসামিরা মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।

বেস্ট হোল্ডিংসের মানি লন্ডারিং মামলা: বেস্ট হোল্ডিংস লিমিটেড কোম্পানির ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাত/মানিলন্ডারিং এর মাধ্যমে বিদেশে পাচারের অভিযোগটির পুনরায় অনুসন্ধান করতে দুর্নীতি দমন কমিশনের সভা নং ০৮/২০২২ তারিখ ২৩/২/২০২২ এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। যা এখনও তদন্তাধীন অবস্থায় আছে।
পুঁজিবাজার থেকে বেস্ট হোল্ডিংসের অর্থ উত্তোলন: পাবলিক ইস্যু রুলসের ৩ এর ২ এর (পি) অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি শেয়ারবাজার থেকে টাকা উত্তোলনের জন্য আবেদন করার পূর্বের ২ বছরের মধ্যে বোনাস শেয়ার ছাড়া পরিশোধিত মূলধন বাড়াতে পারবে না। এই বিধান থাকার পরেও বেস্ট হোল্ডিংসের শত শত কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন বাড়ানো হয়েছে আইপিওতে আবেদন করার ২ বছরের মধ্যে। কিন্তু বিএসইসি গতবছরের ২৭ জুলাই বেস্ট হোল্ডিংসকে এই বিধান থেকে অব্যাহতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। ১০ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটিকে আইপিও অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। কোম্পানিটির কর্তৃপক্ষ আইপিওর আবেদনে উল্লেখ করে লো মেরিডিয়ান হোটেলটির প্রতি স্কয়ার ফিট কাঠামো নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১৮ হাজার ৫০১ টাকা। হোটেল ভবনটির প্রতি স্কয়ার ফিটের বাজার দাম দেখানো হয় ৪০ হাজার ১০ টাকা। সংশ্লিষ্টরা জানান, এক্ষেত্রে সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, পদ্মা ব্যাংকের চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফাত ও বিএসইসি চেয়ারম্যান শিবলি রুবায়াত উল ইসলামের আনুকূল্য পেয়েছে বেস্ট হোল্ডিংস। এর পরপরই আমিন আহমেদ ভূঁইয়ার প্রতিষ্ঠান বেস্ট হোল্ডিংস লিমিটেডের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাত ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ অনুসন্ধানের মধ্যেই গতবছর ২০ নভেম্বর থেকে ২৩ নভেম্বর পর্যন্ত নিলামের মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে ৩৫০ কোটি টাকা উত্তোলন করে।

অতিরিক্ত শেয়ার মূল্য: বেস্ট হোল্ডিংসের শেয়ার ইস্যু দর নিয়ে ব্যতিক্রম ঘটনা ঘটে। এই কোম্পানিটি থেকে ৫৫ টাকা প্রিমিয়ামসহ প্রতিটি ৬৫ টাকা করে ইস্যুর পরে শুধুমাত্র অভিহিত মূল্যেও বা ১০ টাকায় শেয়ার ইস্যু করা হয়। স্বাভাবিকভাবেই কোম্পানির যোগ্যতার ওপর শেয়ার ইস্যু দাম নির্ভর করে। সে হিসাবে ৬৫ টাকা দামে ইস্যুর পরে কোম্পানি যখন শুধু ১০ টাকায় নেমে আসে, তখন বোঝায় যায় কোম্পানির অবস্থা খারাপ হয়েছে।
রেড হেরিং প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, বেস্ট হোল্ডিংসের পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ৯২৫ দশমিক ৫৮ কোটি টাকা। এরমধ্যে ২০১৯ সালের ১ অক্টোবর পর্যন্ত ১০ টাকা করে ৫৬৬ দশমিক ১৫ কোটি টাকার শেয়ার ইস্যু করা হয়। এরপরে ২০১৯ সালের ১৮ নভেম্বর থেকে ২০২০ সালের ৩ মার্চ পর্যন্ত সময়ে ২৪৮ দশমিক ৩৪ কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন বাড়ানো হয় প্রতিটি শেয়ার ৬৫ টাকা করে ইস্যুর মাধ্যমে। এরপরে ২০২০ সালের ১০ ও ৩০ সেপ্টেম্বর ৬২ দশমিক ৫০ কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন বাড়ানো হয় শুধুমাত্র ১০ টাকা করে ইস্যুর মাধ্যমে।
এরপরে ২০২০ সালের ২০ অক্টোবর প্রতিটি ৬৫ টাকা করে ১৫ দশমিক ৩৮ কোটি টাকার, একই বছরের ১০ ডিসেম্বর ১০ টাকা করে ১৩ দশমিক ৯৭ কোটি টাকার এবং সর্বশেষ ২০২২ সালের ৩০ জুন ৬৫ টাকা করে ১৯ দশমিক ২৩ কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন বাড়ানো হয়েছে।