রমজান সংযম ও আত্মশুদ্ধির মাস হলেও কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় নিম্নআয়ের মানুষের কাছে এ মাস এখন বাড়তি দুশ্চিন্তার নাম। রোজা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও ইফতার সামগ্রীর দামে হঠাৎ ঊর্ধ্বগতি দেখা দেওয়ায় সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। আয় অপরিবর্তিত থাকলেও খাদ্য ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সঞ্চয় তো দূরের কথা, অনেককে ধারদেনা করেই রোজার খরচ মেটাতে হচ্ছে।
শোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সদর বাজার কাঁচাবাজার, চান্দলা বাজার ও নাগাইশ বাজার ঘুরে দেখা যায়, ছোলা, বুট, ডাল, তেল ও পেঁয়াজসহ নিত্যপণ্যের পাশাপাশি বেগুনি, পিঁয়াজু, আলুর চপ ও হালিমের চাহিদা বেড়েছে। বাড়তি এই চাহিদার সুযোগে প্রায় সব পণ্যের দামই ঊর্ধ্বমুখী।
রমজানে ইফতারের টেবিলে লেবুর শরবত অনেকের কাছেই অপরিহার্য। কিন্তু চলতি মৌসুমে লেবুর দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। বাজারে ভালো মানের এক হালি লেবু বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৩০ টাকায়। কিছু দোকানে বড় আকারের লেবু হালি ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে একটি লেবুর দামই পড়ছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা।
অথচ মাত্র দুই সপ্তাহ আগেও মাঝারি আকারের এক হালি লেবু পাওয়া যেত ২০ থেকে ৪০ টাকায়। গত বছর রোজার শুরুতে এই দাম ছিল ৪০ থেকে ৫০ টাকার মধ্যে।
ব্রাহ্মণপাড়া বাজারে লেবুর দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে হিসাব কষছিলেন মোঃ মানিক ভুইয়া । তিনি বলেন, দুই দিন আগেও ৪০-৫০ টাকায় হালি লেবু পাওয়া গেছে। এখন ১৩০-১৪০ টাকা, বড় হলে ১৬০ টাকা পর্যন্ত চাইছে। একটি লেবুর দামই যদি ৩০-৪০ টাকা হয়, তাহলে প্রতিদিন শরবত বানানো সম্ভব নয়।
বিক্রেতারা বলছেন, মৌসুম শেষ হওয়ায় লেবুর সরবরাহ কমেছে। পাশাপাশি রমজানকে কেন্দ্র করে হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দামও বেড়েছে।
বাজারের সবজি বিক্রেতা সোহেল মিয়া বলেন, আড়তে দাম বেড়ে যাওয়ায় খুচরা বাজারেও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। পাইকারি দামের ওপর ১০-২০ টাকা লাভ রেখেই বিক্রি করছি।
শুধু লেবু নয়, ইফতার তৈরির অন্যান্য উপকরণের দামও বেড়েছে। বেগুন ও শসার দাম কেজিতে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বর্তমানে বেগুন বিক্রি হচ্ছে কেজিতে ৮০ থেকে ১২০ টাকায়, শসা ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। টমেটো ও গাজরের দামও কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এসব সবজির দাম ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও স্বস্তি নেই। পেঁয়াজের দাম কেজিতে ১০-১৫ টাকা বেড়ে ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় উঠেছে। কাঁচা মরিচের দাম বেড়ে কেজিতে ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা হয়েছে।
আমিষের বাজারেও একই চিত্র। দুই সপ্তাহ আগে ব্রয়লার মুরগির দাম ছিল কেজিতে ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা, যা এখন বেড়ে ১৮০ থেকে ২০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। সোনালি মুরগির দামও কেজিতে ৩০-৪০ টাকা বেড়ে ৩৩০ থেকে ৩৫০ টাকায় উঠেছে।
মাছের বাজারেও দাম ঊর্ধ্বমুখী। তেলাপিয়া বিক্রি হচ্ছে কেজিতে ২২০ থেকে ২৫০ টাকায়। মাঝারি আকারের রুই বা কাতলা ৪০০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না।
রমজানে সবচেয়ে বেশি চাহিদাসম্পন্ন ফল মাল্টা ও আপেলের দামও বেড়েছে। মাল্টা বিক্রি হচ্ছে কেজিতে ৩১০ থেকে ৩৪০ টাকা এবং আপেল ৩৩০ থেকে ৪০০ টাকায়। দেশীয় ফলের মধ্যেও কলার দাম ডজনে ৩০ থেকে ৬০ টাকা বেড়েছে।
সবকিছুর ভিড়ে ফার্মের ডিমের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। এক ডজন বাদামি ডিম বিক্রি হচ্ছে ১০৫ থেকে ১১০ টাকায়। ফলে এখন এক হালি লেবুর দামে এক ডজন ডিম কেনা যাচ্ছে যা বাজার পরিস্থিতির অস্বাভাবিকতার স্পষ্ট চিত্র বলে মনে করছেন ক্রেতারা।
ব্রাহ্মণপাড়ার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম সুজন বলেন, রমজানে নিত্যপণ্যের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দামও ঊর্ধ্বমুখী। চাহিদা বৃদ্ধির সুযোগে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা ও কার্যকর তদারকি না থাকলে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়, এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন নিম্নআয়ের মানুষ।
খুচরা বিক্রেতারা জানান, কয়েক দিন ধরে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ সংকট রয়েছে। যদিও ছোলা, ডাল ও চিনির দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল, তবে মিনিকেট চালের দাম কেজিতে ৩-৪ টাকা বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রমজানকে কেন্দ্র করে চাহিদা বৃদ্ধির সুযোগে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা ও কার্যকর তদারকি না থাকলে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন নিম্নআয়ের মানুষ।
বাজারের চাপে অনেক পরিবার এখন বিকল্প পথে হাঁটছে। কেউ লেবুর বদলে কাঁচা আম বা শুধু পানি দিয়ে ইফতার করছেন, কেউ মাছ-মুরগির পরিবর্তে ডিম বা ডালেই ভরসা রাখছেন। এতে পুষ্টির ঘাটতির আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।
সংযমের মাসে যেখানে স্বস্তির প্রত্যাশা থাকে, সেখানে বাজারের এই লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সংযম নয়, বরং বাধ্যতামূলক সংকোচনের বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। তাদের প্রত্যাশা সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং প্রশাসনের কঠোর নজরদারিতে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি রোধ করা।
পারভেজ আলম, কুমিল্লা 





















