রিযিক মানবজীবনের একটি মৌলিক প্রয়োজন। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, সম্পদ, সুস্থতা, জ্ঞান; সবই রিযিকের অন্তর্ভুক্ত। ইসলাম রিযিককে কেবল অর্থনৈতিক বিষয় হিসেবে দেখেনি; বরং এটিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত এক বিশেষ নিয়ামত হিসেবে বিবেচনা করেছে। আল্লাহ তাআলা যার জন্য ইচ্ছা প্রশস্ত করেন, যার জন্য ইচ্ছা সংকুচিত করেন।
কিন্তু একই সঙ্গে তিনি কিছু আমল ও গুণাবলিকে রিযিক বৃদ্ধির মাধ্যম হিসেবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
অনেক সময় মানুষ হালাল চেষ্টা করেও রিজিকে বরকত পায় না, আবার কেউ সীমিত উপার্জনেও প্রশান্তিতে জীবন যাপন করে। এর মূল রহস্য লুকিয়ে আছে আল্লাহর বিধান ও সুন্নাহভিত্তিক আমলের মধ্যে। নিচে কোরআন ও হাদিসের আলোকে রিযিক বৃদ্ধির ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ উপায় আলোচনা করা হলো।
১. তাকওয়া (আল্লাহভীতি)
তাকওয়া হলো রিজিক বৃদ্ধির সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে এবং তার সীমা রক্ষা করে চলে, আল্লাহ তার জন্য অচিন্তনীয় উৎস থেকে রিযিকের ব্যবস্থা করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—‘যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য নিস্কৃতির পথ করে দেবেন। এবং তাকে তার ধারণাতীত জায়গা থেকে রিযিক দেবেন।
’ (সূরা তালাক, আয়াত : ২-৩)
তাকওয়া মানুষকে হারাম থেকে বাঁচায়, আর হারাম বর্জন রিজিকের বরকত বৃদ্ধির অন্যতম শর্ত।
২. তাওয়াক্কুল (আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা)
তাওয়াক্কুল মানে চেষ্টা বর্জন নয়; বরং সর্বোচ্চ চেষ্টা করে ফলাফলের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া। যে ব্যক্তি প্রকৃত অর্থে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান।
আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ তাঁর কাজ পূর্ণ করেন।
[সূরা তালাক : ৩]
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন,
“ لَوْ أَنَّكُمْ كُنْتُمْ تَوَكَّلُونَ عَلَى اللَّهِ حَقَّ تَوَكُّلِهِ لَرُزِقْتُمْ كَمَا تُرْزَقُ الطَّيْرُ تَغْدُو خِمَاصًا وَتَرُوحُ بِطَانًا ”
‘যদি তোমরা আল্লাহর ওপর যথার্থভাবে ভরসা করতে, তবে তিনি পাখিদের মতো তোমাদের রিজিক দিতেন—তারা সকালে খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে।’ তিরমিজি, হাদিস ২৩৪৪)
৩. দান-সদকা
দান বাহ্যিকভাবে সম্পদ কমালেও প্রকৃতপক্ষে তা রিজিক বৃদ্ধি করে। কারণ দান আল্লাহর সঙ্গে এক লাভজনক লেনদেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কে আছে, যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে? ফলে তিনি তার জন্য বহু গুণে বাড়িয়ে দেবেন।’ (সূরা বাক্বারাহ, আয়াত : ২৪৫
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘সদকা সম্পদ কমায় না।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৮)
৪. কৃতজ্ঞতা (শুকরিয়া আদায়)
নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করলে আল্লাহ তা বাড়িয়ে দেন। শুকরিয়া শুধু মুখে নয়, অন্তরে স্বীকৃতি ও আমলের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় কর, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের বাড়িয়ে দেবো।’ (সূরা ইবরাহিম, আয়াত : ৭)
শুকরিয়া রিযিকের ধারাবাহিকতা ও বরকতের গ্যারান্টি।
৫. ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা)
গুনাহ রিযিক আটকে দেয়, আর ইস্তিগফার রিযিক খুলে দেয়। নবী নূহ (আ.) তার কওমকে ইস্তিগফারের মাধ্যমে রিযিক বৃদ্ধির সুসংবাদ দিয়েছিলেন।
আল্লাহ বলেন— ‘তোমরা তোমাদের পালনকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো… তিনি তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বাড়িয়ে দেবেন।”
(সূরা নূহ, আয়াত : ১০–১২)
রাসূলুল্লাহ (সা.) এ ব্যাপারে অসংখ্য হাদিসে তাকিদ দিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি বেশি বেশি ইস্তিগফার করবে, আল্লাহ তার প্রতিটি দুশ্চিন্তা দূর করবেন এবং অপ্রত্যাশিত উৎস থেকে তাকে রিযিক দেবেন।
৬. পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করা (সিলাতুর রহমান)
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা রিযিক বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— যে কামনা করে যে তার রিযিক বৃদ্ধি পাক এবং জীবন দীর্ঘায়িত হোক, সে যেন আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করে।’ (বুখারি)
আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা রিযিকের বরকত নষ্ট করে।
সূরা ওয়াকিয়াহ পাঠ
অনেক সাহাবি ও সালাফে সালেহিন সূরা ওয়াকিয়াহ নিয়মিত পাঠ করতেন রিযিকের প্রশস্ততার জন্য। মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ে নিয়মিত সূরা ওয়াকিয়াহ পাঠ করা একটি বরকতময় আমল হিসেবে পরিচিত।
রিযিক বৃদ্ধির প্রকৃত চাবিকাঠি ব্যাংক-ব্যালেন্স বা কৌশলে নয়, বরং আল্লাহর আনুগত্যে। তাকওয়া, তাওয়াক্কুল, দান, শুকরিয়া, ইস্তিগফার ও আত্মীয়তার সম্পর্ক; এই ছয়টি গুণ একত্রে মানুষের রিযিককে শুধু বৃদ্ধি করে না, বরং তাতে বরকত ও প্রশান্তি এনে দেয়।
রিযিক আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত, তবে তা লাভের পথও তিনিই শিখিয়ে দিয়েছেন। প্রয়োজন শুধু আন্তরিক আমল ও দৃঢ় বিশ্বাস।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল রিযিক, প্রশস্ত রিযিক এবং তাতে বরকত দান করুন। আমীন।
অনলাইন ডেস্ক 
























