ঢাকা ০৯:২২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
নীলফামারী জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশের অভিযানে ‘ভুয়া ডিবি ও ডলার প্রতারক’ চক্রের ০১ জন সক্রীয় সদস্য গ্রেফতার। মনোহরগঞ্জে সন্ত্রাসী কায়দায় গাছ কেটে নেয়ার অভিযোগ পিএসএলের বাকি অংশে খেলা হচ্ছে না নাহিদ-মুস্তাফিজের কোন নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে অনিয়মকেই নিয়মে পরিনত করছেন মাদারীপুর উপজেলা শিক্ষা অফিসার বেরোবিতে আন্তঃবিভাগ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট ২০২৬-এর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত আইইএলটিএস পরীক্ষা দিতে আসা তরুণীর লাশ মিলল হোটেলের বাথরুমে বড়লেখা উপজেলা পৌর ছাত্রদল ও বড়লেখা উপজেলা শাখার ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। তনু হত্যায় গ্রেপ্তার হাফিজুরের ডিএনএর নমুনা সংগ্রহ বিসিকের টেন্ডার সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রক সাবেক ছাত্রলীগ নেতা রাশেদ! ঘোড়াশালে চাঁদাবাজ মহিউদ্দিনের দাপট, স্বাস্থ্যকেন্দ্র দখলের অভিযোগ
শ্রম মন্ত্রণালয়ের

প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহীনুর ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহীনুর ইসলাম দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগের মুখে রয়েছেন। ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা শাহীনুর ইসলাম ১৯৯৯ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। এরপর তিনি সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে অফিস সহকারী হিসেবে যোগদান করেন। তবে সরকারি চাকরিতে যোগদানের পরও তিনি ছাত্ররাজনীতির পরিচয় ব্যবহার করে মন্ত্রণালয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন, যা দীর্ঘদিন ধরে মন্ত্রণালয়ের ভেতরে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কার্যক্রম পরিচালনা করে।

শাহীনুর ইসলামের এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ানের পরিবারের সদস্যরা। এই সিন্ডিকেটের মধ্যে সাবেক প্রতিমন্ত্রীর ভাই এপিএস সাহাবুদ্দিন, ভাতিজি শামীমা সুলতানা হৃদয় এবং ভাগিনা ইয়াছিন আরাফাত পৃথিবী অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কেনাকাটা, ভাউচার এবং সরকারি অর্থের ব্যবহারকে কৌশলে নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবিত করা হতো।

একটি চরম উদাহরণ হিসেবে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে মন্ত্রণালয়ের ‘অগ্রগামী ট্রেডার্স’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান থেকে পাঁচটি বৈদ্যুতিক পণ্য কেনার ঘটনা উল্লেখযোগ্য। এতে মোট খরচ হয়েছিল ১ লাখ ৪০ হাজার ৫০০ টাকা। পরদিন অর্থাৎ ১৪ ফেব্রুয়ারি বিল জমা দেওয়া হয় এবং টাকা উত্তোলন করা হয়। তবে পরে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ‘অগ্রগামী ট্রেডার্স’ নামে কোনো প্রতিষ্ঠানই বাস্তবে নেই। যে ঠিকানায় প্রতিষ্ঠানটির অবস্থিতি দাবি করা হয়েছিল, সেখানে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। পাশাপাশি একই ঠিকানা ব্যবহার করে বিভিন্ন সময় প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম পরিবর্তন করে পণ্য কেনার ভুয়া বিল তৈরি করার প্রমাণও পাওয়া গেছে।

শাহীনুর ইসলাম এই ধরনের অনিয়মের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকেননি বলে দাবী করেছেন। তিনি বলেন, “আমি শ্রম মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি, তবে কোনো কেনাকাটার শাখায় আমি কখনোই যুক্ত ছিলাম না। কেনাকাটার প্রক্রিয়ায় আমার কোনো ভূমিকা ছিল না। আমাদের মন্ত্রণালয়ে একটি সিন্ডিকেট রয়েছে, তারা ষড়যন্ত্র করে আমার নাম জড়িয়েছে। এই বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছিল, কিন্তু তদন্তে আমার বিরুদ্ধে কোনো অনিয়ম বা সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই আমার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আমি এসবের কোনো কিছুর সঙ্গেই যুক্ত নই।”

তবে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত শাহীনুর ইসলাম শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে কার্যক্রম চালিয়ে এসেছেন। এই সময়কালে তিনি বিভিন্ন কাজে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সিন্ডিকেটের শক্তি বৃদ্ধি করেছেন। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন ভুয়া প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য কেনা, কম দামে পণ্য ক্রয় করে বেশি দামে ভাউচার তৈরি করা, এবং সরকারি তহবিল আত্মসাৎ করার মতো কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে।

শাহীনুর ইসলামের সিন্ডিকেটে অন্তর্ভুক্ত কর্মকর্তা ও ব্যক্তিদের মধ্যে সাবেক সহকারী সচিব মো. ফয়জুল্লাহ বিশ্বাস, প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান মোড়ল, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম, প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহীনুর ইসলাম এবং উপসচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা রয়েছেন। এই পাঁচ কর্মকর্তা মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে নিয়মিত সমালোচনার মুখে পড়েছেন।

বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনিয়মের পরিমাণ কোটি টাকারও বেশি। ২০২২-২৩ অর্থবছরের নিরীক্ষা অনুযায়ী অন্তত ৩ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। এছাড়া বিগত সরকারের সময় তাদের বিরুদ্ধে একাধিকবার দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। তবে সরকারের ঘনিষ্ঠজনের সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তারা বারবার এ ধরনের অভিযোগ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছেন।

শাহীনুর ইসলামের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেট মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেছে। বিশেষ করে, সরকারি তহবিলের ব্যবহারে ভুয়া প্রতিষ্ঠান ও ভুয়া বিলের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। একাধিক নথি এবং প্রমাণ কালবেলার হাতে এসেছে, যা দেখাচ্ছে যে, এই সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন শাখার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে দুর্নীতি পরিচালনা করেছে।

একটি উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০২৩ সালে শোক দিবসের জন্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য কালো ব্যাজ তৈরির নামে মোট ৩ লাখ ৪৩ হাজার টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। বিলে ব্যাজের সংখ্যা দেখানো হয়েছিল ৩,৫০০টি, যেখানে মন্ত্রণালয়ের মোট কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৫০ জন। এছাড়া, ব্যাজের মূল্য হিসেবে ১০০ টাকা ধরা হলেও বাস্তব দাম অনেক কম। এই ধরনের কৌশলে ভুয়া বিল তৈরি করে উপসচিবের একক ক্ষমতায় তা অনুমোদন করা হয়েছে, যা প্রমাণ করছে, সিন্ডিকেটটি মন্ত্রণালয়ের কেনাকাটা প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করতো।

শাহীনুর ইসলাম মন্ত্রণালয়ে যোগদানের পরও ছাত্ররাজনীতির পরিচয় ব্যবহার করে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করেছেন। এই প্রভাবের মাধ্যমে সিন্ডিকেটটি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের নিয়োগ বাণিজ্য, সনদ জালিয়াতি, পণ্য না কিনে বিল উত্তোলন এবং অন্যান্য অনিয়মমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা মো. আব্দুল হাকিম ২০২৪ সালের ৯ জানুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশনে একটি লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দুদক সচিব ২০২৪ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রণালয়ে চিঠি প্রেরণ করেন। এর পর মন্ত্রণালয় দুটি সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু কমিটি মূলত মো. ফয়জুল্লাহ বিশ্বাসের কেনাকাটা ও বিল-ভাউচার পরীক্ষা-নিরীক্ষা কেন্দ্র করে প্রতিবেদন জমা দেয়। শাহীনুর ইসলামের সম্পৃক্ততার বিষয়ে কমিটি কোনো সুস্পষ্ট অনুসন্ধান বা প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি।

এই ঘটনায় দেখা যায় যে, শাহীনুর ইসলাম এবং তার সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধে যথাযথ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ কারণে বিভিন্ন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে যে, সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে দুর্নীতি দমন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার যে প্রক্রিয়া রয়েছে, তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে কি না। মন্ত্রণালয়ের ভেতরের সিন্ডিকেটের প্রভাব ও রাজনৈতিক প্রভাব দুর্নীতি দমন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে বলে মত প্রকাশ করেছেন বেশ কিছু বিশ্লেষক।

শাহীনুর ইসলামের কর্মকাণ্ড শুধু মন্ত্রণালয় পর্যায়ে সীমিত ছিল না, বরং তিনি বিভিন্ন স্থানে প্রভাব বিস্তার করে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও অংশগ্রহণ করেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি মন্ত্রণালয়ে এমনভাবে কার্যক্রম চালিয়েছেন, যা প্রমাণ করছে যে, সরকারি তহবিল ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় অবৈধ স্বার্থ লোপাট করার জন্য কৌশলগতভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন এই বিষয়ে বলেছেন, “যারা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত তাদের কারও স্বপদে থাকার সুযোগ নেই। যদি কেউ অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকে তাহলে অবশ্যই তাদের শাস্তির আওতায় আনা হবে।” তবে তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন যে, এই অনিয়মের ঘটনা তার দায়িত্ব নেওয়ার আগে ঘটেছে। তাই এখনো এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

শাহীনুর ইসলামের কর্মকাণ্ড মন্ত্রণালয়ের ভেতরে দুর্নীতি ও অনিয়মকে চর্চিত করেছে এবং দীর্ঘদিন ধরে এটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশে পরিণত হয়েছে। এর ফলে সরকারি তহবিলের অপচয় ও জনগণের করের অর্থের অনিয়মিত ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া, সিন্ডিকেটের কার্যক্রম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নৈতিকতার অবনতি ঘটিয়েছে।

এই দীর্ঘ সময় ধরে পরিচালিত দুর্নীতি ও অনিয়মের ঘটনা দেখাচ্ছে যে, শাহীনুর ইসলাম শুধু এককভাবে নয়, বরং সিন্ডিকেটের অংশ হিসেবে মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক ও আর্থিক কর্মকাণ্ডকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন। বিভিন্ন ধরনের ভুয়া প্রতিষ্ঠান, ভুয়া বিল, নিয়োগ বাণিজ্য, সনদ জালিয়াতি এবং সরকারি তহবিলের অপব্যবহার এই সিন্ডিকেটের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড ছিল।

উপসংহারে বলা যায়, মোহাম্মদ শাহীনুর ইসলাম শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছেন। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে মন্ত্রণালয়ে সিন্ডিকেট তৈরি, ভুয়া প্রতিষ্ঠান ও বিলের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ, নিয়োগ ও সনদ জালিয়াতি—এই সব কর্মকাণ্ডের প্রমাণ থাকলেও যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে, মন্ত্রণালয়ের ভেতরের স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের উপর প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে। সরকারি অর্থের অপব্যবহার রোধ করতে হলে শুধু তদন্ত নয়, কার্যকর প্রশাসনিক ও আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নীলফামারী জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশের অভিযানে ‘ভুয়া ডিবি ও ডলার প্রতারক’ চক্রের ০১ জন সক্রীয় সদস্য গ্রেফতার।

শ্রম মন্ত্রণালয়ের

প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহীনুর ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ

আপডেট সময় ০১:২৪:৪০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর ২০২৫

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহীনুর ইসলাম দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগের মুখে রয়েছেন। ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা শাহীনুর ইসলাম ১৯৯৯ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। এরপর তিনি সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে অফিস সহকারী হিসেবে যোগদান করেন। তবে সরকারি চাকরিতে যোগদানের পরও তিনি ছাত্ররাজনীতির পরিচয় ব্যবহার করে মন্ত্রণালয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন, যা দীর্ঘদিন ধরে মন্ত্রণালয়ের ভেতরে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কার্যক্রম পরিচালনা করে।

শাহীনুর ইসলামের এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ানের পরিবারের সদস্যরা। এই সিন্ডিকেটের মধ্যে সাবেক প্রতিমন্ত্রীর ভাই এপিএস সাহাবুদ্দিন, ভাতিজি শামীমা সুলতানা হৃদয় এবং ভাগিনা ইয়াছিন আরাফাত পৃথিবী অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কেনাকাটা, ভাউচার এবং সরকারি অর্থের ব্যবহারকে কৌশলে নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবিত করা হতো।

একটি চরম উদাহরণ হিসেবে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে মন্ত্রণালয়ের ‘অগ্রগামী ট্রেডার্স’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান থেকে পাঁচটি বৈদ্যুতিক পণ্য কেনার ঘটনা উল্লেখযোগ্য। এতে মোট খরচ হয়েছিল ১ লাখ ৪০ হাজার ৫০০ টাকা। পরদিন অর্থাৎ ১৪ ফেব্রুয়ারি বিল জমা দেওয়া হয় এবং টাকা উত্তোলন করা হয়। তবে পরে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ‘অগ্রগামী ট্রেডার্স’ নামে কোনো প্রতিষ্ঠানই বাস্তবে নেই। যে ঠিকানায় প্রতিষ্ঠানটির অবস্থিতি দাবি করা হয়েছিল, সেখানে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। পাশাপাশি একই ঠিকানা ব্যবহার করে বিভিন্ন সময় প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম পরিবর্তন করে পণ্য কেনার ভুয়া বিল তৈরি করার প্রমাণও পাওয়া গেছে।

শাহীনুর ইসলাম এই ধরনের অনিয়মের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকেননি বলে দাবী করেছেন। তিনি বলেন, “আমি শ্রম মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি, তবে কোনো কেনাকাটার শাখায় আমি কখনোই যুক্ত ছিলাম না। কেনাকাটার প্রক্রিয়ায় আমার কোনো ভূমিকা ছিল না। আমাদের মন্ত্রণালয়ে একটি সিন্ডিকেট রয়েছে, তারা ষড়যন্ত্র করে আমার নাম জড়িয়েছে। এই বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছিল, কিন্তু তদন্তে আমার বিরুদ্ধে কোনো অনিয়ম বা সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই আমার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আমি এসবের কোনো কিছুর সঙ্গেই যুক্ত নই।”

তবে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত শাহীনুর ইসলাম শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে কার্যক্রম চালিয়ে এসেছেন। এই সময়কালে তিনি বিভিন্ন কাজে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সিন্ডিকেটের শক্তি বৃদ্ধি করেছেন। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন ভুয়া প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য কেনা, কম দামে পণ্য ক্রয় করে বেশি দামে ভাউচার তৈরি করা, এবং সরকারি তহবিল আত্মসাৎ করার মতো কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে।

শাহীনুর ইসলামের সিন্ডিকেটে অন্তর্ভুক্ত কর্মকর্তা ও ব্যক্তিদের মধ্যে সাবেক সহকারী সচিব মো. ফয়জুল্লাহ বিশ্বাস, প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান মোড়ল, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম, প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহীনুর ইসলাম এবং উপসচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা রয়েছেন। এই পাঁচ কর্মকর্তা মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে নিয়মিত সমালোচনার মুখে পড়েছেন।

বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনিয়মের পরিমাণ কোটি টাকারও বেশি। ২০২২-২৩ অর্থবছরের নিরীক্ষা অনুযায়ী অন্তত ৩ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। এছাড়া বিগত সরকারের সময় তাদের বিরুদ্ধে একাধিকবার দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। তবে সরকারের ঘনিষ্ঠজনের সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তারা বারবার এ ধরনের অভিযোগ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছেন।

শাহীনুর ইসলামের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেট মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেছে। বিশেষ করে, সরকারি তহবিলের ব্যবহারে ভুয়া প্রতিষ্ঠান ও ভুয়া বিলের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। একাধিক নথি এবং প্রমাণ কালবেলার হাতে এসেছে, যা দেখাচ্ছে যে, এই সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন শাখার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে দুর্নীতি পরিচালনা করেছে।

একটি উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০২৩ সালে শোক দিবসের জন্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য কালো ব্যাজ তৈরির নামে মোট ৩ লাখ ৪৩ হাজার টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। বিলে ব্যাজের সংখ্যা দেখানো হয়েছিল ৩,৫০০টি, যেখানে মন্ত্রণালয়ের মোট কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৫০ জন। এছাড়া, ব্যাজের মূল্য হিসেবে ১০০ টাকা ধরা হলেও বাস্তব দাম অনেক কম। এই ধরনের কৌশলে ভুয়া বিল তৈরি করে উপসচিবের একক ক্ষমতায় তা অনুমোদন করা হয়েছে, যা প্রমাণ করছে, সিন্ডিকেটটি মন্ত্রণালয়ের কেনাকাটা প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করতো।

শাহীনুর ইসলাম মন্ত্রণালয়ে যোগদানের পরও ছাত্ররাজনীতির পরিচয় ব্যবহার করে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করেছেন। এই প্রভাবের মাধ্যমে সিন্ডিকেটটি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের নিয়োগ বাণিজ্য, সনদ জালিয়াতি, পণ্য না কিনে বিল উত্তোলন এবং অন্যান্য অনিয়মমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা মো. আব্দুল হাকিম ২০২৪ সালের ৯ জানুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশনে একটি লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দুদক সচিব ২০২৪ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রণালয়ে চিঠি প্রেরণ করেন। এর পর মন্ত্রণালয় দুটি সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু কমিটি মূলত মো. ফয়জুল্লাহ বিশ্বাসের কেনাকাটা ও বিল-ভাউচার পরীক্ষা-নিরীক্ষা কেন্দ্র করে প্রতিবেদন জমা দেয়। শাহীনুর ইসলামের সম্পৃক্ততার বিষয়ে কমিটি কোনো সুস্পষ্ট অনুসন্ধান বা প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি।

এই ঘটনায় দেখা যায় যে, শাহীনুর ইসলাম এবং তার সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধে যথাযথ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ কারণে বিভিন্ন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে যে, সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে দুর্নীতি দমন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার যে প্রক্রিয়া রয়েছে, তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে কি না। মন্ত্রণালয়ের ভেতরের সিন্ডিকেটের প্রভাব ও রাজনৈতিক প্রভাব দুর্নীতি দমন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে বলে মত প্রকাশ করেছেন বেশ কিছু বিশ্লেষক।

শাহীনুর ইসলামের কর্মকাণ্ড শুধু মন্ত্রণালয় পর্যায়ে সীমিত ছিল না, বরং তিনি বিভিন্ন স্থানে প্রভাব বিস্তার করে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও অংশগ্রহণ করেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি মন্ত্রণালয়ে এমনভাবে কার্যক্রম চালিয়েছেন, যা প্রমাণ করছে যে, সরকারি তহবিল ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় অবৈধ স্বার্থ লোপাট করার জন্য কৌশলগতভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন এই বিষয়ে বলেছেন, “যারা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত তাদের কারও স্বপদে থাকার সুযোগ নেই। যদি কেউ অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকে তাহলে অবশ্যই তাদের শাস্তির আওতায় আনা হবে।” তবে তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন যে, এই অনিয়মের ঘটনা তার দায়িত্ব নেওয়ার আগে ঘটেছে। তাই এখনো এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

শাহীনুর ইসলামের কর্মকাণ্ড মন্ত্রণালয়ের ভেতরে দুর্নীতি ও অনিয়মকে চর্চিত করেছে এবং দীর্ঘদিন ধরে এটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশে পরিণত হয়েছে। এর ফলে সরকারি তহবিলের অপচয় ও জনগণের করের অর্থের অনিয়মিত ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া, সিন্ডিকেটের কার্যক্রম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নৈতিকতার অবনতি ঘটিয়েছে।

এই দীর্ঘ সময় ধরে পরিচালিত দুর্নীতি ও অনিয়মের ঘটনা দেখাচ্ছে যে, শাহীনুর ইসলাম শুধু এককভাবে নয়, বরং সিন্ডিকেটের অংশ হিসেবে মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক ও আর্থিক কর্মকাণ্ডকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন। বিভিন্ন ধরনের ভুয়া প্রতিষ্ঠান, ভুয়া বিল, নিয়োগ বাণিজ্য, সনদ জালিয়াতি এবং সরকারি তহবিলের অপব্যবহার এই সিন্ডিকেটের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড ছিল।

উপসংহারে বলা যায়, মোহাম্মদ শাহীনুর ইসলাম শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছেন। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে মন্ত্রণালয়ে সিন্ডিকেট তৈরি, ভুয়া প্রতিষ্ঠান ও বিলের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ, নিয়োগ ও সনদ জালিয়াতি—এই সব কর্মকাণ্ডের প্রমাণ থাকলেও যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে, মন্ত্রণালয়ের ভেতরের স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের উপর প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে। সরকারি অর্থের অপব্যবহার রোধ করতে হলে শুধু তদন্ত নয়, কার্যকর প্রশাসনিক ও আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য।