ঢাকা ০৯:২৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
নীলফামারী জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশের অভিযানে ‘ভুয়া ডিবি ও ডলার প্রতারক’ চক্রের ০১ জন সক্রীয় সদস্য গ্রেফতার। মনোহরগঞ্জে সন্ত্রাসী কায়দায় গাছ কেটে নেয়ার অভিযোগ পিএসএলের বাকি অংশে খেলা হচ্ছে না নাহিদ-মুস্তাফিজের কোন নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে অনিয়মকেই নিয়মে পরিনত করছেন মাদারীপুর উপজেলা শিক্ষা অফিসার বেরোবিতে আন্তঃবিভাগ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট ২০২৬-এর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত আইইএলটিএস পরীক্ষা দিতে আসা তরুণীর লাশ মিলল হোটেলের বাথরুমে বড়লেখা উপজেলা পৌর ছাত্রদল ও বড়লেখা উপজেলা শাখার ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। তনু হত্যায় গ্রেপ্তার হাফিজুরের ডিএনএর নমুনা সংগ্রহ বিসিকের টেন্ডার সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রক সাবেক ছাত্রলীগ নেতা রাশেদ! ঘোড়াশালে চাঁদাবাজ মহিউদ্দিনের দাপট, স্বাস্থ্যকেন্দ্র দখলের অভিযোগ

কোটিপতি তৈরির কারখানা রাজউক: অফিস সহকারীর বিলাস-সম্পদের বিস্ময়কর সাম্রাজ্য

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ রাজউক— দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান। এই সংস্থাকে কেন্দ্র করে দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনা, নগর পরিকল্পনা, নকশা অনুমোদন ও প্লট বরাদ্দের মতো অতি সংবেদনশীল কাজ সম্পন্ন হয়। সরকারি এ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় অনিয়মুদুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির মাত্র ৪০ হাজার টাকা বেতন পাওয়া একজন অফিস সহকারী যে বহুমূল্য ৮ তলা অট্টালিকা, রাজধানীুচট্টগ্রামে বহুসংখ্যক প্লট এবং কোটি কোটি টাকার সম্পদের অধিকারী হয়ে উঠতে পারেন, তা নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। আর এ কারণেই বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
দৈনিক আমাদের মাতৃভূমির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, রাজউকের মহাখালী আঞ্চলিক জোনু৪ুএ কর্মরত অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. সাইফুল ইসলাম বছরের পর বছর ধরে এমন সব সম্পদ অর্জন করেছেন, যা তাঁর বৈধ আয়ের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের এবং রাজউকের বেশ কিছু কর্মকর্তাুকর্মচারীর। অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি এখন রাজউকের উচ্চপর্যায়ে আলোচনায় রয়েছে। রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানের অবস্থান এখন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’, তাই অভিযোগ যাচাইুবাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকার উত্তরা দক্ষিণখান এলাকায় সাইফুল ইসলামের রয়েছে ৩.৩১ কাঠা জমির ওপর নির্মিত আটতলা বিশাল অট্টালিকা। স্থানীয়দের দাবি, ভবনটির নির্মাণশৈলী, নির্মাণ ব্যয় ও জমির বর্তমান বাজারমূল্য বিবেচনা করলে এটি কমপক্ষে ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার কম নয়। সরকারি চাকরিজীবী, তাও নিম্নপদস্থ একজন কর্মচারীর পক্ষে এমন ভবন নির্মাণের সামর্থ্য অর্জন অনেকের কাছেই অসম্ভব বলে মনে হয়েছে। ফলে ভবন নির্মাণের অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে চারদিকে।
দলিল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ভবনটির জমির দলিল নম্বর ১২৪৭৭। সিএস দাগ, আরএস দাগ—সব মিলিয়ে জমিটি সম্পূর্ণ বৈধভাবে ক্রয় করা হলেও জমি কেনা ও ভবন নির্মাণের টাকার উৎস নির্দেশ করতে পারেননি সাইফুল ইসলামের সমালোচকেরা। একই এলাকায় তাঁর আরও একটি জমি রয়েছে, যা তিনি ২০১১ সালে ১৩৭২৯ নং দলিলে ক্রয় করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু ঢাকায় নয়, চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলায়ও সাইফুল ইসলামের রয়েছে ১২টিরও বেশি প্লট। এসব জমির দলিল, পরিমাণ, দাম—সবই অনুসন্ধানী প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে বলে জানা গেছে। এসব জমি বিভিন্ন সময়ে কম দামে ক্রয় করা হলেও বর্তমান বাজারমূল্যে এসব জমির মূল্য দাঁড়িয়েছে বিপুল অঙ্কে। প্রশ্ন উঠেছে—একজন সরকারি নিম্নপদস্থ কর্মচারী কীভাবে এক দশকের ব্যবধানে এতগুলো সম্পত্তির মালিক হলেন।
স্থানীয় সূত্র ও রাজউকের একাধিক কর্মচারীর দাবি, সাইফুল ইসলাম রাজউকের নকশা পাস করানো, প্লট বরাদ্দে তদ্বির, প্লট বিক্রিতে কমিশন আদায়, অনুমোদন সংক্রান্ত কাগজপত্র এগিয়ে দেওয়া—এ ধরনের সংবেদনশীল কর্মকাণ্ডে গভীরভাবে জড়িত। অভিযোগ রয়েছে, রাজউকের কিছু অসাধু কর্মকর্তাুকর্মচারীর সঙ্গে যোগসাজশে তিনি অবৈধ আর্থিক লেনদেনের একটি বড় ‘নেটওয়ার্ক’ গড়ে তুলেছিলেন, যার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে বিপুল অর্থ উপার্জন করেছেন।
২০১৫ সালে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদকুএ একটি অভিযোগ জমা পড়েছিল বলে জানা যায়। অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দাবি করেন, মামলা বা তদন্ত এগোতে না দেওয়ার জন্য তিনি দলীয় প্রভাব ব্যবহার করেছিলেন। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলা আওয়ামী লীগুসংলগ্ন বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখতেন। এমনকি তিনি নীতিনির্ধারণী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবহার করে নিজের চাকরি ও সুবিধা নিশ্চিত করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিয়মিত অফিসও করতেন না। কাজে উপস্থিতি কম হলেও তাঁর প্রভাবুপ্রতিপত্তি অফিসজুড়ে ছিল দৃশ্যমান। অভিযোগকারীদের দাবি, রাজউকে তাঁর কিছু ‘বিশেষ ভূমিকা’ ছিল, যা তাঁকে নিয়মিত থাকার প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দিয়েছিল। অনেকেই মনে করেন, বিভিন্ন ফাইল, নকশা বা অনুমোদন সংক্রান্ত কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা তাঁর মাধ্যমে যোগাযোগ করতেন। এসব কাজের মাধ্যমেই তিনি বিপুল অঙ্কের কমিশন সংগ্রহ করেছেন বলে অভিযোগ।
অপরাধ আরও চাঞ্চল্যকর হয়ে ওঠে যখন জানা যায়, তিনি প্রতি সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার ঢাকার অফিস থেকে বিমানে চট্টগ্রাম যাতায়াত করতেন। একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিম্নপর্যায়ের কর্মচারীর এমন ব্যয়বহুল জীবনযাপন নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। শুধু তাই নয়, তাঁর কাছে ছিল উচ্চমূল্যের আইফোন এবং কোটি টাকার টয়োটা হায়েস গাড়ি, যা তিনি গত ৫ আগস্টের পর দ্রুত বিক্রি করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ।
এখানেই শেষ নয়। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার পরে তিনি তাঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে থাকা প্রায় ৫০ কোটি টাকা তাঁর বাবার অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করেছেন। এসব টাকা কোথা থেকে এসেছে—এমন প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি। তাঁর দাবি—রাজউকের প্লট বিক্রির কমিশন থেকেই তিনি এসব অর্থ উপার্জন করেছেন। তবে রাজউকের বর্তমান কর্তৃপক্ষ মনে করছে, কমিশন ভিত্তিক কোনোরূপ লেনদেনই সরকারি নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এসব অভিযোগ কঠোর তদন্তের দাবি রাখে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, তাঁর বিরুদ্ধে মিরসরাই থানায় একটি হত্যা মামলাও চলমান রয়েছে। এই মামলার বিষয়টি অধিকাংশ রাজউক কর্মকর্তাই জানতেন না। অভিযোগকারীরা দাবি করেন, সাইফুল ইসলাম তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব এবং নানা সংযোগের কারণে দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে বাঁচিয়ে আসছিলেন।
রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম স্পষ্ট করে বলেছেন, “যেুই অপরাধী হোক, অভিযোগের সত্যতা অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” রাজউক এখন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে আছে, তাই এসব অভিযোগ উপেক্ষা করা হবে না।
সাইফুল ইসলাম অবশ্য সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, তিনি অবৈধ কোনো উপায়ে সম্পদ অর্জন করেননি। বরং রাজউকের বিভিন্ন প্লট বিক্রি থেকে যে কমিশন পান, সেই অর্থ দিয়েই তিনি বাড়িুজমি কিনেছেন। তাঁর ভাষায়, “আমার সব সম্পদ বৈধ। আমি কারও সঙ্গে কোনো অনিয়ম করিনি।”
তবে এসব দাবি কতটা বাস্তবসম্মত—তা এখন তদন্তের বিষয়। কারণ সরকারি চাকরির বেতন গড় হিসাবে বিবেচনা করলে দেখা যায়, একজন ৪০ হাজার টাকা বেতনভোগী কর্মচারীর পক্ষে এত বিপুল সম্পদের অধিকারী হওয়া স্বাভাবিক হিসাবের সঙ্গে যায় না।
আর সে কারণেই প্রশ্ন উঠছে- রাজউকে কি সত্যিই কোটিপতি তৈরির এক অদৃশ্য কারখানা কাজ করছে? যেখানে মাত্র অফিস সহকারী পদেও কেউ কেউ কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে উঠতে পারেন?
বর্তমানে রাজউকের যে অবস্থান—অনিয়মুদুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর, জিরো টলারেন্স—তাতে আশা করা যায়, সাইফুল ইসলামের সম্পদ, আয়ুব্যয়ের হিসাব এবং তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সকল অভিযোগ যাচাইুবাছাই করে স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে সত্যুমিথ্যা উদঘাটন করা হবে। কারণ এই তদন্ত কেবল একজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে নয়; বরং এটি রাজউকের সামগ্রিক সুনাম, স্বচ্ছতা এবং জনবিশ্বাসের সঙ্গেও জড়িত।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নীলফামারী জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশের অভিযানে ‘ভুয়া ডিবি ও ডলার প্রতারক’ চক্রের ০১ জন সক্রীয় সদস্য গ্রেফতার।

কোটিপতি তৈরির কারখানা রাজউক: অফিস সহকারীর বিলাস-সম্পদের বিস্ময়কর সাম্রাজ্য

আপডেট সময় ১২:২১:২০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর ২০২৫

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ রাজউক— দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান। এই সংস্থাকে কেন্দ্র করে দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনা, নগর পরিকল্পনা, নকশা অনুমোদন ও প্লট বরাদ্দের মতো অতি সংবেদনশীল কাজ সম্পন্ন হয়। সরকারি এ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় অনিয়মুদুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির মাত্র ৪০ হাজার টাকা বেতন পাওয়া একজন অফিস সহকারী যে বহুমূল্য ৮ তলা অট্টালিকা, রাজধানীুচট্টগ্রামে বহুসংখ্যক প্লট এবং কোটি কোটি টাকার সম্পদের অধিকারী হয়ে উঠতে পারেন, তা নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। আর এ কারণেই বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
দৈনিক আমাদের মাতৃভূমির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, রাজউকের মহাখালী আঞ্চলিক জোনু৪ুএ কর্মরত অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মো. সাইফুল ইসলাম বছরের পর বছর ধরে এমন সব সম্পদ অর্জন করেছেন, যা তাঁর বৈধ আয়ের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের এবং রাজউকের বেশ কিছু কর্মকর্তাুকর্মচারীর। অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি এখন রাজউকের উচ্চপর্যায়ে আলোচনায় রয়েছে। রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানের অবস্থান এখন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’, তাই অভিযোগ যাচাইুবাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকার উত্তরা দক্ষিণখান এলাকায় সাইফুল ইসলামের রয়েছে ৩.৩১ কাঠা জমির ওপর নির্মিত আটতলা বিশাল অট্টালিকা। স্থানীয়দের দাবি, ভবনটির নির্মাণশৈলী, নির্মাণ ব্যয় ও জমির বর্তমান বাজারমূল্য বিবেচনা করলে এটি কমপক্ষে ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার কম নয়। সরকারি চাকরিজীবী, তাও নিম্নপদস্থ একজন কর্মচারীর পক্ষে এমন ভবন নির্মাণের সামর্থ্য অর্জন অনেকের কাছেই অসম্ভব বলে মনে হয়েছে। ফলে ভবন নির্মাণের অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে চারদিকে।
দলিল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ভবনটির জমির দলিল নম্বর ১২৪৭৭। সিএস দাগ, আরএস দাগ—সব মিলিয়ে জমিটি সম্পূর্ণ বৈধভাবে ক্রয় করা হলেও জমি কেনা ও ভবন নির্মাণের টাকার উৎস নির্দেশ করতে পারেননি সাইফুল ইসলামের সমালোচকেরা। একই এলাকায় তাঁর আরও একটি জমি রয়েছে, যা তিনি ২০১১ সালে ১৩৭২৯ নং দলিলে ক্রয় করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু ঢাকায় নয়, চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলায়ও সাইফুল ইসলামের রয়েছে ১২টিরও বেশি প্লট। এসব জমির দলিল, পরিমাণ, দাম—সবই অনুসন্ধানী প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে বলে জানা গেছে। এসব জমি বিভিন্ন সময়ে কম দামে ক্রয় করা হলেও বর্তমান বাজারমূল্যে এসব জমির মূল্য দাঁড়িয়েছে বিপুল অঙ্কে। প্রশ্ন উঠেছে—একজন সরকারি নিম্নপদস্থ কর্মচারী কীভাবে এক দশকের ব্যবধানে এতগুলো সম্পত্তির মালিক হলেন।
স্থানীয় সূত্র ও রাজউকের একাধিক কর্মচারীর দাবি, সাইফুল ইসলাম রাজউকের নকশা পাস করানো, প্লট বরাদ্দে তদ্বির, প্লট বিক্রিতে কমিশন আদায়, অনুমোদন সংক্রান্ত কাগজপত্র এগিয়ে দেওয়া—এ ধরনের সংবেদনশীল কর্মকাণ্ডে গভীরভাবে জড়িত। অভিযোগ রয়েছে, রাজউকের কিছু অসাধু কর্মকর্তাুকর্মচারীর সঙ্গে যোগসাজশে তিনি অবৈধ আর্থিক লেনদেনের একটি বড় ‘নেটওয়ার্ক’ গড়ে তুলেছিলেন, যার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে বিপুল অর্থ উপার্জন করেছেন।
২০১৫ সালে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদকুএ একটি অভিযোগ জমা পড়েছিল বলে জানা যায়। অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দাবি করেন, মামলা বা তদন্ত এগোতে না দেওয়ার জন্য তিনি দলীয় প্রভাব ব্যবহার করেছিলেন। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলা আওয়ামী লীগুসংলগ্ন বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখতেন। এমনকি তিনি নীতিনির্ধারণী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবহার করে নিজের চাকরি ও সুবিধা নিশ্চিত করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিয়মিত অফিসও করতেন না। কাজে উপস্থিতি কম হলেও তাঁর প্রভাবুপ্রতিপত্তি অফিসজুড়ে ছিল দৃশ্যমান। অভিযোগকারীদের দাবি, রাজউকে তাঁর কিছু ‘বিশেষ ভূমিকা’ ছিল, যা তাঁকে নিয়মিত থাকার প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দিয়েছিল। অনেকেই মনে করেন, বিভিন্ন ফাইল, নকশা বা অনুমোদন সংক্রান্ত কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা তাঁর মাধ্যমে যোগাযোগ করতেন। এসব কাজের মাধ্যমেই তিনি বিপুল অঙ্কের কমিশন সংগ্রহ করেছেন বলে অভিযোগ।
অপরাধ আরও চাঞ্চল্যকর হয়ে ওঠে যখন জানা যায়, তিনি প্রতি সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার ঢাকার অফিস থেকে বিমানে চট্টগ্রাম যাতায়াত করতেন। একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিম্নপর্যায়ের কর্মচারীর এমন ব্যয়বহুল জীবনযাপন নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। শুধু তাই নয়, তাঁর কাছে ছিল উচ্চমূল্যের আইফোন এবং কোটি টাকার টয়োটা হায়েস গাড়ি, যা তিনি গত ৫ আগস্টের পর দ্রুত বিক্রি করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ।
এখানেই শেষ নয়। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার পরে তিনি তাঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে থাকা প্রায় ৫০ কোটি টাকা তাঁর বাবার অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করেছেন। এসব টাকা কোথা থেকে এসেছে—এমন প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি। তাঁর দাবি—রাজউকের প্লট বিক্রির কমিশন থেকেই তিনি এসব অর্থ উপার্জন করেছেন। তবে রাজউকের বর্তমান কর্তৃপক্ষ মনে করছে, কমিশন ভিত্তিক কোনোরূপ লেনদেনই সরকারি নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এসব অভিযোগ কঠোর তদন্তের দাবি রাখে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, তাঁর বিরুদ্ধে মিরসরাই থানায় একটি হত্যা মামলাও চলমান রয়েছে। এই মামলার বিষয়টি অধিকাংশ রাজউক কর্মকর্তাই জানতেন না। অভিযোগকারীরা দাবি করেন, সাইফুল ইসলাম তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব এবং নানা সংযোগের কারণে দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে বাঁচিয়ে আসছিলেন।
রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম স্পষ্ট করে বলেছেন, “যেুই অপরাধী হোক, অভিযোগের সত্যতা অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” রাজউক এখন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে আছে, তাই এসব অভিযোগ উপেক্ষা করা হবে না।
সাইফুল ইসলাম অবশ্য সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, তিনি অবৈধ কোনো উপায়ে সম্পদ অর্জন করেননি। বরং রাজউকের বিভিন্ন প্লট বিক্রি থেকে যে কমিশন পান, সেই অর্থ দিয়েই তিনি বাড়িুজমি কিনেছেন। তাঁর ভাষায়, “আমার সব সম্পদ বৈধ। আমি কারও সঙ্গে কোনো অনিয়ম করিনি।”
তবে এসব দাবি কতটা বাস্তবসম্মত—তা এখন তদন্তের বিষয়। কারণ সরকারি চাকরির বেতন গড় হিসাবে বিবেচনা করলে দেখা যায়, একজন ৪০ হাজার টাকা বেতনভোগী কর্মচারীর পক্ষে এত বিপুল সম্পদের অধিকারী হওয়া স্বাভাবিক হিসাবের সঙ্গে যায় না।
আর সে কারণেই প্রশ্ন উঠছে- রাজউকে কি সত্যিই কোটিপতি তৈরির এক অদৃশ্য কারখানা কাজ করছে? যেখানে মাত্র অফিস সহকারী পদেও কেউ কেউ কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে উঠতে পারেন?
বর্তমানে রাজউকের যে অবস্থান—অনিয়মুদুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর, জিরো টলারেন্স—তাতে আশা করা যায়, সাইফুল ইসলামের সম্পদ, আয়ুব্যয়ের হিসাব এবং তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সকল অভিযোগ যাচাইুবাছাই করে স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে সত্যুমিথ্যা উদঘাটন করা হবে। কারণ এই তদন্ত কেবল একজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে নয়; বরং এটি রাজউকের সামগ্রিক সুনাম, স্বচ্ছতা এবং জনবিশ্বাসের সঙ্গেও জড়িত।