সংবাদ শিরোনাম ::
ওসমান হাদিকে নিয়ে পাগলা মসজিদের দানবাক্সে চিঠি গিলাতলা-কালীগঞ্জ সড়ক সংস্কার কাজ পরিদর্শনে কর্তৃপক্ষ, কাজের মান সন্তোষজনক নোরা ফাতেহির সঙ্গে নতুন গানে আবারও সঞ্জয় রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের পথ সামনে খুলবে : পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া-চীন সফর পররাষ্ট্রনীতির মানদণ্ড নিশ্চিত করেছে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে হোন্ডার ম্যাংগো ফেস্ট, উচ্চস্বরে মাইক বাজিয়ে পরিবেশ দূষণ আত্রাইয়ে জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন-অবহিতকরণ ও পরিকল্পনা সভা অনুষ্ঠিত আত্রাইয়ে নদী থেকে মানসিক প্রতিবন্ধী বৃদ্ধের লাশ উদ্ধার ইতালির রাজধানী রোমে একই পরিবারের ৩ বাংলাদেশি খুন, গুরুতর আহত ১ সংসদ সদস্যের সময় চাওয়ায় স্পিকার বললেন বাকি চাহিয়া লজ্জা দেবেন না’

চট্টগ্রাম বন্দরে সীমাহীন দুর্নীতির অভিযোগ এনামুলের বিরুদ্ধে

চট্টগ্রাম বন্দরের পরিবহন বিভাগের প্রধান হিসেবে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা এনামুল করিমকে ঘিরে নতুন করে তীব্র আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে সাম্প্রতিক একটি ফৌজদারি মামলার পর। রামপুরা আমলী আদালতে দায়ের হওয়া সি.আর. মামলা নং ৪৯৯/২০২৫-এ তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ১৪৩, ১৪৭, ১৪৮, ৩২৬, ৩০৭, ১১৪ ও ১০৯ ধারাসহ বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের ৩ ও ৩এ ধারায় গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলাটি দায়ের করেছেন আবদুর রহমান নামের ২৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তি, যিনি তাঁর অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন যে এনামুল করিম তাঁর বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধভাবে হামলা, গুরুতর জখম করার চেষ্টা, অস্ত্রসহ দাঙ্গা এবং বিস্ফোরক ব্যবহারের মতো অপরাধে সম্পৃক্ত ছিলেন। মামলার অভিযোগগুলো এখনও প্রমাণিত নয়, তবে এই নতুন মামলা ইতোমধ্যেই তাঁর অতীতের নানা অভিযোগকে আবার সামনে এনে দিয়েছে।

এনামুল করিমকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম বন্দরের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে অনিয়ম, ঘুষ ও ক্ষমতার অপব্যবহার সংক্রান্ত অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই শোনা যাচ্ছে। বন্দরের পরিবহন বিভাগ মূলত জেটি, শেড, ইয়ার্ড, মুরিং, অ্যাংকরেজ এবং বিভিন্ন টার্মিনালের সার্বিক ব্যবস্থাপনা তদারকি করে থাকে। আমদানি-রপ্তানি পণ্যবাহী জাহাজ থেকে মাল খালাস করা, জাহাজে আবার নতুন মাল বোঝাই করার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ, কনটেইনারের সঠিক সঞ্চালন ও সংরক্ষণ, বন্দরভিত্তিক ট্রাক ও লরির চলাচল ব্যবস্থাপনা, বন্দর ট্রাফিক নীতিমালা বাস্তবায়ন থেকে শুরু করে শুল্ক ছাড়পত্রের তথ্য ব্যবস্থাপনাও এই বিভাগের আওতায় পড়ে। এত বিপুল দায়িত্বের প্রভাব যে একজন কর্মকর্তাকে বন্দর কার্যক্রিয়ায় অত্যন্ত প্রভাবশালী করে তোলে, সে কথাই বলছেন অনেক বন্দর ব্যবহারকারী। তাঁদের দাবি অনুযায়ী, এই প্রভাবই বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন অনিয়মের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরে কোনো জাহাজ বার্থিংয়ের পর থেকেই অতিরিক্ত অর্থ লেনদেনের চক্র শুরু হয়—এমন অভিযোগ এসেছে ব্যবসায়ী ও বন্দর ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে। তাঁদের ভাষ্যে, পণ্য খালাসের প্রতিটি ধাপে একাধিক খাতে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয় এবং এর বেশিরভাগই দালাল ও কিছু কর্মকর্তা মিলে আদায় করেন। ব্যবসায়ীরা বলেন, পোর্ট ক্লিয়ারেন্স, অন বোর্ড বুকিং, স্টোর লিস্ট প্রস্তুত, বন্ড সিলসহ বিভিন্ন কাজের সময় নির্দিষ্ট ফি-এর বাইরে আলাদা করে ন্যূনতম কয়েক হাজার টাকা থেকে শুরু করে বিদেশি সিগারেট বা অ্যালকোহলের বোতল পর্যন্ত দিতে হয়। তাঁদের মতে, জাহাজের ড্রাফট সীমার বাইরে গেলে প্রতি ইঞ্চিতে পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়, যা তাঁরা বাধ্য হয়েই মেটান। এসব অর্থের একটি অংশ পরিবহন বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তার কাছে যায়—এমন অভিযোগ তাঁরা বহুদিন ধরে করে আসছেন। যদিও এসব অভিযোগ এখনো কোনো স্বাধীন তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।

ব্যবসায়ীদের আরেকটি অভিযোগ হলো, কনটেইনার খালাস, হ্যান্ডলিং বা স্ক্যানিং দ্রুত করতে চাইলে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া যেন নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। তাঁরা জানান, কোনো কনটেইনার পছন্দমতো স্থানে রাখতে চাইলে বা নথিপত্র দ্রুত যাচাই করাতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দেন যে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হবে। অন্যথায় নথিতে ত্রুটি দেখিয়ে কাজ আটকে দেওয়া হয়। ব্যবসায়ীদের দাবি অনুযায়ী, একটি কনটেইনার বন্দর থেকে ছাড় করতে তাঁদের দালিলিক প্রমাণ ছাড়া অতিরিক্ত দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। তাঁরা বলেন, এসব খরচ না দিলে কনটেইনার দিনের পর দিন বন্দরে পড়ে থাকে, ফলে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বড় ধরনের ক্ষতি হয়। অভিযোগকারীদের দাবি—এসব ‘অতিরিক্ত লেনদেনের’ উৎস এবং নিয়ন্ত্রণ মূলত পরিবহন বিভাগের শীর্ষকর্তার দপ্তর থেকেই তৈরি হয়, যদিও কোনোটিই আদালতে অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

এনামুল করিমকে ঘিরে আরেকটি বড় অভিযোগ—বন্দরের যন্ত্রপাতি কেনাকাটা এবং স্ক্র্যাপ বিক্রি সংক্রান্ত অনিয়ম। বন্দর সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, সেন্ট্রাল ওয়ার্কশপে সামান্য ত্রুটিযুক্ত যন্ত্রাংশকে স্ক্র্যাপ হিসেবে দেখিয়ে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করা হয়। এরপর সেই স্ক্র্যাপকৃত যন্ত্রাংশই আবার নতুন হিসেবে ব্যবহার করা হয়, ফলে বন্দর আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং নির্দিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তির মধ্যে অবৈধ লেনদেন চলে। কর্মকর্তাদের অভিযোগ অনুযায়ী, কালমারের সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত চাকাগুলো প্রতিটি ১৫ লাখ টাকায় এবং বার্থওভারের স্পাইডারগুলো ৩৫-৪০ লাখ টাকায় স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি হয়েছে। তাঁদের ভাষ্যে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতি মাসে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ হাতবদল হয়। এসব কাজে সেন্ট্রাল ওয়ার্কশপের কয়েকজন ব্যক্তি তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করেন বলেও অভিযোগ করা হয়, যদিও এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন।

চট্টগ্রাম বন্দরের ভেতরের দালালচক্রের সদস্যরাও অভিযোগ করেন, বন্দর ব্যবহারের বিভিন্ন স্তরে যে অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেন হয়, তার বেশিরভাগই পরিবহন বিভাগের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। তাঁরা দাবি করেন, আমদানিকারকদের কোনো কারণে সমস্যা হলে তা সমাধানে বিভাগীয় কর্মকর্তাদের অনুমোদন প্রয়োজন হয়, আর সেই সুযোগেই অনেকে বাড়তি সুবিধা আদায় করে। তাঁদের কথায়, “একটা কনটেইনার নড়াতে বা জাহাজের নির্দিষ্ট সময়সূচি ঠিক করতে চাইলে উপরের নির্দেশ লাগে। ওই নির্দেশই সবচেয়ে দামি।”

এমন অভিযোগের পটভূমিতে দুদক কিছুদিন আগে এনামুল করিমের বিরুদ্ধে কয়েক কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে বলে জানা গেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের চিঠিতে উল্লেখ রয়েছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তিনি ডেপুটি ট্রাফিক ম্যানেজার (অপারেশন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় মেসার্স ইউনিবেঙ্গল কনটেইনার ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড নামের একটি শিপিং এজেন্টকে নিয়ম লঙ্ঘন করে ছাড়পত্র দেন। তাঁদের রিভলভিং অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকা সত্ত্বেও বন্দরের নিয়ম অমান্য করে দেওয়া এই অনুমোদনের ফলে বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটির কাছে ১০ কোটি ৩২ লাখ টাকা পাওনা আদায়ে সংকটে পড়ে। দুদকের মতে, শিপিং এজেন্ট ও কর্মকর্তা মিলেই এই অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে—এমন সন্দেহের ভিত্তিতেই তদন্ত শুরু হয়েছে।

বন্দরের কর্মচারী নিয়োগ সংক্রান্ত অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে। কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, বন্দর কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন অস্থায়ী বা স্থায়ী পদে নিয়োগ দিতে গেলে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত ‘অফিসিয়াল নয় এমন লেনদেন’ প্রচলিত আছে। যদিও কেউ প্রকাশ্যে এসব বলতে সাহস পান না, কারণ অভিযোগ করলে তাঁরাই নানাভাবে হয়রানির শিকার হন বলে দাবি করেন পরিচয় গোপন রাখা বন্দর সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি।

চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে সম্পর্কিত বহু ব্যবসায়ী ও কর্মকর্তা মনে করেন, দীর্ঘ সময় ধরে একই বিভাগে দায়িত্ব পালন করায় এনামুল করিম বিশাল এক ক্ষমতাকাঠামোর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছেন। তাঁদের মতে, বন্দর কার্যক্রম দেশের বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় কেউই ঝুঁকি নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ করেন না। অনেক আমদানিকারক জানান, তাঁরা যদি অভিযোগ করেন, তাঁদের পণ্য আটকে রাখা হতে পারে বা নথিপত্রে সমস্যা দেখানো হতে পারে—এমন ভয় থেকেই তাঁরা চুপ থাকেন। একজন আমদানিকারক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “তাঁর বিরুদ্ধে কথা বললে আমাদের পণ্যই দিনের পর দিন আটকে যায়। আমরা লোকসান সামলাতে পারি না। তাই মুখ খুলতে পারি না।”

নতুন করে দায়ের হওয়া সি.আর. মামলা নং ৪৯৯/২০২৫-এ বাদী আবদুর রহমান যেসব ধারায় অভিযোগ এনেছেন, তার মধ্যে রয়েছে অবৈধ সমাবেশ, দাঙ্গা, অস্ত্রসহ দাঙ্গা, গুরুতর জখম সাধন, হত্যা চেষ্টা, প্ররোচনা এবং সহযোগিতা। এসব অভিযোগের পাশাপাশি বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের ৩ ও ৩এ ধারার অন্তর্ভুক্তি মামলাটিকে আরও জটিল করেছে। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, এনামুল করিম একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দিয়ে বাদীর ওপর হামলা সংগঠিত করেছেন এবং হামলার সময় প্রাণনাশক অস্ত্র ও বিস্ফোরক সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। এই অভিযোগগুলোর কোনোটিই আদালতে প্রমাণিত হয়নি, এবং মামলাটি বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে।

সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে এনামুল করিমের বক্তব্য নেওয়ার একাধিক চেষ্টা করা হয়েছে। তাঁর অফিস নম্বরে বারবার ফোন করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া গেছে। চট্টগ্রাম বন্দরের ওয়েবসাইটে দেওয়া যোগাযোগ নম্বরেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর ব্যক্তিগত মন্তব্য পাওয়া না যাওয়ায় তাঁর অবস্থান সংবাদে প্রতিফলিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তিনি কী বলেন—তা অজানা রয়ে গেছে।

চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র। দেশের আমদানি-রপ্তানির ৯০ শতাংশেরও বেশি পণ্য এই বন্দর দিয়ে আসেুযায়। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যদি দুর্নীতি বা অনিয়ম থাকে, তাহলে সেটি দেশের বাণিজ্য, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থার ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন বন্দর বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, বন্দর সংশ্লিষ্ট যেকোনো অভিযোগ তদন্ত করে সত্যুমিথ্যা নির্ধারণ করা জরুরি, কারণ ভরসার জায়গায় অনিয়ম থাকলে সেটি দেশের সামগ্রিক কার্যক্রমের জন্য বিপজ্জনক।

সাম্প্রতিক মামলার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে আগের অভিযোগগুলো যেমন নতুন করে আলোচনায় এসেছে, তেমনি বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নজরও এখন তাঁর কার্যক্রমের দিকে আরও নিবিড় হয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। মামলাটি প্রক্রিয়াধীন, দুদকের তদন্তও চলমান। এসব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত অভিযোগ প্রমাণিত হয় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ওসমান হাদিকে নিয়ে পাগলা মসজিদের দানবাক্সে চিঠি

চট্টগ্রাম বন্দরে সীমাহীন দুর্নীতির অভিযোগ এনামুলের বিরুদ্ধে

আপডেট সময় ১১:০৬:০২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২৫

চট্টগ্রাম বন্দরের পরিবহন বিভাগের প্রধান হিসেবে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা এনামুল করিমকে ঘিরে নতুন করে তীব্র আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে সাম্প্রতিক একটি ফৌজদারি মামলার পর। রামপুরা আমলী আদালতে দায়ের হওয়া সি.আর. মামলা নং ৪৯৯/২০২৫-এ তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ১৪৩, ১৪৭, ১৪৮, ৩২৬, ৩০৭, ১১৪ ও ১০৯ ধারাসহ বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের ৩ ও ৩এ ধারায় গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলাটি দায়ের করেছেন আবদুর রহমান নামের ২৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তি, যিনি তাঁর অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন যে এনামুল করিম তাঁর বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধভাবে হামলা, গুরুতর জখম করার চেষ্টা, অস্ত্রসহ দাঙ্গা এবং বিস্ফোরক ব্যবহারের মতো অপরাধে সম্পৃক্ত ছিলেন। মামলার অভিযোগগুলো এখনও প্রমাণিত নয়, তবে এই নতুন মামলা ইতোমধ্যেই তাঁর অতীতের নানা অভিযোগকে আবার সামনে এনে দিয়েছে।

এনামুল করিমকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম বন্দরের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে অনিয়ম, ঘুষ ও ক্ষমতার অপব্যবহার সংক্রান্ত অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই শোনা যাচ্ছে। বন্দরের পরিবহন বিভাগ মূলত জেটি, শেড, ইয়ার্ড, মুরিং, অ্যাংকরেজ এবং বিভিন্ন টার্মিনালের সার্বিক ব্যবস্থাপনা তদারকি করে থাকে। আমদানি-রপ্তানি পণ্যবাহী জাহাজ থেকে মাল খালাস করা, জাহাজে আবার নতুন মাল বোঝাই করার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ, কনটেইনারের সঠিক সঞ্চালন ও সংরক্ষণ, বন্দরভিত্তিক ট্রাক ও লরির চলাচল ব্যবস্থাপনা, বন্দর ট্রাফিক নীতিমালা বাস্তবায়ন থেকে শুরু করে শুল্ক ছাড়পত্রের তথ্য ব্যবস্থাপনাও এই বিভাগের আওতায় পড়ে। এত বিপুল দায়িত্বের প্রভাব যে একজন কর্মকর্তাকে বন্দর কার্যক্রিয়ায় অত্যন্ত প্রভাবশালী করে তোলে, সে কথাই বলছেন অনেক বন্দর ব্যবহারকারী। তাঁদের দাবি অনুযায়ী, এই প্রভাবই বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন অনিয়মের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরে কোনো জাহাজ বার্থিংয়ের পর থেকেই অতিরিক্ত অর্থ লেনদেনের চক্র শুরু হয়—এমন অভিযোগ এসেছে ব্যবসায়ী ও বন্দর ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে। তাঁদের ভাষ্যে, পণ্য খালাসের প্রতিটি ধাপে একাধিক খাতে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয় এবং এর বেশিরভাগই দালাল ও কিছু কর্মকর্তা মিলে আদায় করেন। ব্যবসায়ীরা বলেন, পোর্ট ক্লিয়ারেন্স, অন বোর্ড বুকিং, স্টোর লিস্ট প্রস্তুত, বন্ড সিলসহ বিভিন্ন কাজের সময় নির্দিষ্ট ফি-এর বাইরে আলাদা করে ন্যূনতম কয়েক হাজার টাকা থেকে শুরু করে বিদেশি সিগারেট বা অ্যালকোহলের বোতল পর্যন্ত দিতে হয়। তাঁদের মতে, জাহাজের ড্রাফট সীমার বাইরে গেলে প্রতি ইঞ্চিতে পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়, যা তাঁরা বাধ্য হয়েই মেটান। এসব অর্থের একটি অংশ পরিবহন বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তার কাছে যায়—এমন অভিযোগ তাঁরা বহুদিন ধরে করে আসছেন। যদিও এসব অভিযোগ এখনো কোনো স্বাধীন তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।

ব্যবসায়ীদের আরেকটি অভিযোগ হলো, কনটেইনার খালাস, হ্যান্ডলিং বা স্ক্যানিং দ্রুত করতে চাইলে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া যেন নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। তাঁরা জানান, কোনো কনটেইনার পছন্দমতো স্থানে রাখতে চাইলে বা নথিপত্র দ্রুত যাচাই করাতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দেন যে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হবে। অন্যথায় নথিতে ত্রুটি দেখিয়ে কাজ আটকে দেওয়া হয়। ব্যবসায়ীদের দাবি অনুযায়ী, একটি কনটেইনার বন্দর থেকে ছাড় করতে তাঁদের দালিলিক প্রমাণ ছাড়া অতিরিক্ত দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। তাঁরা বলেন, এসব খরচ না দিলে কনটেইনার দিনের পর দিন বন্দরে পড়ে থাকে, ফলে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বড় ধরনের ক্ষতি হয়। অভিযোগকারীদের দাবি—এসব ‘অতিরিক্ত লেনদেনের’ উৎস এবং নিয়ন্ত্রণ মূলত পরিবহন বিভাগের শীর্ষকর্তার দপ্তর থেকেই তৈরি হয়, যদিও কোনোটিই আদালতে অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

এনামুল করিমকে ঘিরে আরেকটি বড় অভিযোগ—বন্দরের যন্ত্রপাতি কেনাকাটা এবং স্ক্র্যাপ বিক্রি সংক্রান্ত অনিয়ম। বন্দর সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, সেন্ট্রাল ওয়ার্কশপে সামান্য ত্রুটিযুক্ত যন্ত্রাংশকে স্ক্র্যাপ হিসেবে দেখিয়ে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করা হয়। এরপর সেই স্ক্র্যাপকৃত যন্ত্রাংশই আবার নতুন হিসেবে ব্যবহার করা হয়, ফলে বন্দর আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং নির্দিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তির মধ্যে অবৈধ লেনদেন চলে। কর্মকর্তাদের অভিযোগ অনুযায়ী, কালমারের সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত চাকাগুলো প্রতিটি ১৫ লাখ টাকায় এবং বার্থওভারের স্পাইডারগুলো ৩৫-৪০ লাখ টাকায় স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি হয়েছে। তাঁদের ভাষ্যে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতি মাসে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ হাতবদল হয়। এসব কাজে সেন্ট্রাল ওয়ার্কশপের কয়েকজন ব্যক্তি তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করেন বলেও অভিযোগ করা হয়, যদিও এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন।

চট্টগ্রাম বন্দরের ভেতরের দালালচক্রের সদস্যরাও অভিযোগ করেন, বন্দর ব্যবহারের বিভিন্ন স্তরে যে অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেন হয়, তার বেশিরভাগই পরিবহন বিভাগের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। তাঁরা দাবি করেন, আমদানিকারকদের কোনো কারণে সমস্যা হলে তা সমাধানে বিভাগীয় কর্মকর্তাদের অনুমোদন প্রয়োজন হয়, আর সেই সুযোগেই অনেকে বাড়তি সুবিধা আদায় করে। তাঁদের কথায়, “একটা কনটেইনার নড়াতে বা জাহাজের নির্দিষ্ট সময়সূচি ঠিক করতে চাইলে উপরের নির্দেশ লাগে। ওই নির্দেশই সবচেয়ে দামি।”

এমন অভিযোগের পটভূমিতে দুদক কিছুদিন আগে এনামুল করিমের বিরুদ্ধে কয়েক কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে বলে জানা গেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের চিঠিতে উল্লেখ রয়েছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তিনি ডেপুটি ট্রাফিক ম্যানেজার (অপারেশন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় মেসার্স ইউনিবেঙ্গল কনটেইনার ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড নামের একটি শিপিং এজেন্টকে নিয়ম লঙ্ঘন করে ছাড়পত্র দেন। তাঁদের রিভলভিং অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকা সত্ত্বেও বন্দরের নিয়ম অমান্য করে দেওয়া এই অনুমোদনের ফলে বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটির কাছে ১০ কোটি ৩২ লাখ টাকা পাওনা আদায়ে সংকটে পড়ে। দুদকের মতে, শিপিং এজেন্ট ও কর্মকর্তা মিলেই এই অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে—এমন সন্দেহের ভিত্তিতেই তদন্ত শুরু হয়েছে।

বন্দরের কর্মচারী নিয়োগ সংক্রান্ত অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে। কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, বন্দর কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন অস্থায়ী বা স্থায়ী পদে নিয়োগ দিতে গেলে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত ‘অফিসিয়াল নয় এমন লেনদেন’ প্রচলিত আছে। যদিও কেউ প্রকাশ্যে এসব বলতে সাহস পান না, কারণ অভিযোগ করলে তাঁরাই নানাভাবে হয়রানির শিকার হন বলে দাবি করেন পরিচয় গোপন রাখা বন্দর সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি।

চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে সম্পর্কিত বহু ব্যবসায়ী ও কর্মকর্তা মনে করেন, দীর্ঘ সময় ধরে একই বিভাগে দায়িত্ব পালন করায় এনামুল করিম বিশাল এক ক্ষমতাকাঠামোর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছেন। তাঁদের মতে, বন্দর কার্যক্রম দেশের বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় কেউই ঝুঁকি নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ করেন না। অনেক আমদানিকারক জানান, তাঁরা যদি অভিযোগ করেন, তাঁদের পণ্য আটকে রাখা হতে পারে বা নথিপত্রে সমস্যা দেখানো হতে পারে—এমন ভয় থেকেই তাঁরা চুপ থাকেন। একজন আমদানিকারক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “তাঁর বিরুদ্ধে কথা বললে আমাদের পণ্যই দিনের পর দিন আটকে যায়। আমরা লোকসান সামলাতে পারি না। তাই মুখ খুলতে পারি না।”

নতুন করে দায়ের হওয়া সি.আর. মামলা নং ৪৯৯/২০২৫-এ বাদী আবদুর রহমান যেসব ধারায় অভিযোগ এনেছেন, তার মধ্যে রয়েছে অবৈধ সমাবেশ, দাঙ্গা, অস্ত্রসহ দাঙ্গা, গুরুতর জখম সাধন, হত্যা চেষ্টা, প্ররোচনা এবং সহযোগিতা। এসব অভিযোগের পাশাপাশি বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের ৩ ও ৩এ ধারার অন্তর্ভুক্তি মামলাটিকে আরও জটিল করেছে। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, এনামুল করিম একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দিয়ে বাদীর ওপর হামলা সংগঠিত করেছেন এবং হামলার সময় প্রাণনাশক অস্ত্র ও বিস্ফোরক সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। এই অভিযোগগুলোর কোনোটিই আদালতে প্রমাণিত হয়নি, এবং মামলাটি বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে।

সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে এনামুল করিমের বক্তব্য নেওয়ার একাধিক চেষ্টা করা হয়েছে। তাঁর অফিস নম্বরে বারবার ফোন করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া গেছে। চট্টগ্রাম বন্দরের ওয়েবসাইটে দেওয়া যোগাযোগ নম্বরেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর ব্যক্তিগত মন্তব্য পাওয়া না যাওয়ায় তাঁর অবস্থান সংবাদে প্রতিফলিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তিনি কী বলেন—তা অজানা রয়ে গেছে।

চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র। দেশের আমদানি-রপ্তানির ৯০ শতাংশেরও বেশি পণ্য এই বন্দর দিয়ে আসেুযায়। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যদি দুর্নীতি বা অনিয়ম থাকে, তাহলে সেটি দেশের বাণিজ্য, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থার ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন বন্দর বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, বন্দর সংশ্লিষ্ট যেকোনো অভিযোগ তদন্ত করে সত্যুমিথ্যা নির্ধারণ করা জরুরি, কারণ ভরসার জায়গায় অনিয়ম থাকলে সেটি দেশের সামগ্রিক কার্যক্রমের জন্য বিপজ্জনক।

সাম্প্রতিক মামলার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে আগের অভিযোগগুলো যেমন নতুন করে আলোচনায় এসেছে, তেমনি বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নজরও এখন তাঁর কার্যক্রমের দিকে আরও নিবিড় হয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। মামলাটি প্রক্রিয়াধীন, দুদকের তদন্তও চলমান। এসব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত অভিযোগ প্রমাণিত হয় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।