নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলায় দায়িত্ব পালনকালে সেচ প্রকল্পের নামে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রায়হানুল হকের বিরুদ্ধে যে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে, তা স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সরকারি সুবিধাভোগী একটি সোলার সেচপাম্প বরাদ্দের প্রক্রিয়ায় কৃষকের কাছ থেকে অর্থ দাবি এবং পরে তার একটি অংশ গ্রহণের অভিযোগ ওঠার ফলে বিষয়টি ইতোমধ্যেই জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দুই কৃষকের করা লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
ঘটনার শুরু ফেচিয়া গ্রামের দুই কৃষক—হাসান আলী এবং তার ফুফাতো ভাই আলাল মিয়ার মাধ্যমে। দু’জনই তাদের চাহিদা অনুযায়ী একটি সোলার সেচপাম্প পাওয়ার লক্ষ্যে স্থানীয় কৃষি অফিসে আবেদন করেছিলেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর বরাদ্দ প্রদানের খবরে তারা উপজেলা কৃষি অফিসে গিয়ে যোগাযোগ করেন। সেখানে তাদের মুখোমুখি হতে হয় দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা মো. রায়হানুল হকের। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই সময় রায়হানুল হক তাদের জানান যে পাম্প বরাদ্দের ক্ষেত্রে কিছু “খরচ” রয়েছে এবং তা পরিশোধ করতে হবে। তারা বলেন, প্রথমে ১ লাখ টাকা দাবি করা হয়, যার মধ্যে হাতেহাতে ৩০ হাজার টাকা নেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে আরও ২০ হাজার টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য হন।
হাসান আলীর বিবরণ অনুযায়ী, তাঁরা শুরুতে বিষয়টি স্বাভাবিক খরচ হিসেবেই মনে করেছিলেন। কিন্তু পরে অন্যান্য কৃষকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জানতে পারেন, সরকারি সোলার সেচপাম্প বরাদ্দের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অর্থ নেওয়া বা দেওয়ার বিধান নেই। সরকারি বরাদ্দ পেতে কোনো খরচ হয় না—এ তথ্য জানার পর তাদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি হয়। এরপরই ১ লাখ টাকার দাবির মধ্যে ইতোমধ্যে ৫০ হাজার টাকা প্রদান করা হয়েছে বুঝতে পেরে তারা পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আলাল মিয়া বলেন, তাঁরা দুইজনই আর্থিকভাবে খুব স্বচ্ছল নন, জমি চাষ করেই সংসার চালান। সরকারি সহায়তার নামে কোনো কর্মকর্তা তাদের কাছ থেকে টাকা চাইলে তা তাঁদের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তাই অন্য কৃষকদের কাছ থেকে প্রকৃত তথ্য জেনে তারা অভিযোগ দায়ের করতে মনস্থ করেন।
১৮ নভেম্বর তারা লিখিত অভিযোগ দেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কাছে। অভিযোগে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে মো. রায়হানুল হক সরকারি প্রকল্পের সুবিধাভোগী হতে চাইলে তাদের কাছ থেকে অযৌক্তিকভাবে বড় অঙ্কের টাকা দাবি করেছেন এবং ইতোমধ্যে তা গ্রহণও করেছেন। তারা আরও উল্লেখ করেন যে অতিরিক্ত টাকা চাইতে থাকায় এবং সরকারি নিয়মনীতি সম্পর্কে জানতে পারার পর তাঁরা এই বিষয়টি উচ্চ কর্তৃপক্ষকে জানাতে বাধ্য হন।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বললে জানা যায়, সোলার সেচ প্রকল্পটি এলাকার কৃষিকাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত বর্ষার পর শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজের জন্য সেচের প্রয়োজন পড়ে, এবং ডিজেলচালিত পাম্পের খরচ বেশী হওয়ায় সোলার সেচপাম্প কৃষকদের আর্থিকভাবে বড় সহায়তা দেয়। তাই এই প্রকল্পের বরাদ্দ পাওয়া অনেক কৃষকের স্বপ্নের মতো। কিন্তু বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় ঘুষের দাবি উঠে এলে তা কৃষকদের হতাশ করে। এলাকার নানা জনের মত, সরকারি বরাদ্দে কোনো অর্থ লাগার কথা নয়। তাই কেউ যদি সুযোগ নিয়ে সাধারণ কৃষকের কাছ থেকে টাকা দাবি করেন, তা বড় ধরনের অনিয়ম এবং দুর্নীতির শামিল।
অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে উপজেলা কৃষি অফিসে গেলে জানা যায়, রায়হানুল হক সেদিন অফিসে উপস্থিত ছিলেন না; অফিস সূত্র জানায় তিনি ছুটিতে আছেন। ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট। আপনারা জানেন, আমি কেমন অফিসার।” তাঁর দাবি, তাঁকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপমান ও হেয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, সোলার সেচ প্রকল্পের বরাদ্দে কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ভূমিকা নেই এবং সবকিছু সরকারি নীতিমালা অনুযায়ীই সম্পন্ন হয়। তাই ঘুষ নেওয়ার প্রশ্নই আসে না।
তবে ভুক্তভোগী কৃষকরা বলছেন, তারা নিজেদের ক্ষতির কথা ভেবে ভয় পেয়েছিলেন, কিন্তু পরে সত্য জানার পর আর চুপ থাকা ঠিক মনে করেননি। তাদের অভিযোগে বলা হয়েছে যে প্রথমদিকে পাম্প বরাদ্দের খবর পেয়ে খুশি ছিলেন তাঁরা। কিন্তু রায়হানুল হকের কাছে গিয়ে খরচের কথা শোনার পর তাঁরা উদ্বিগ্ন হন। তাদের দাবি, খরচ বলতে প্রথমে ১ লাখ টাকার কথা বলা হয়। পরে চাপের মুখে তাঁরা হাতেহাতে ৩০ হাজার টাকা দেন এবং রায়হানুল হকের দেওয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আরও ২০ হাজার টাকা জমা দেন।
স্থানীয়দের মতে, কৃষি অফিসে অনেক সময় যোগাযোগ করতে গেলে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়। কেউ কেউ বলেন, কোন কাজে কীভাবে আবেদন করতে হবে বা কী কাগজ লাগবে—এসব বিষয় বুঝে ওঠা কঠিন। ফলে অনেক সময় তথ্যের অভাবকে কাজে লাগিয়ে কেউ কেউ সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে অর্থ দাবির সুযোগ নেয়। এ ধরনের ঘটনা ঘটলে সাধারণ কৃষক ভুক্তভোগী হয় এবং সরকারি সেবা পাওয়ার পথ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।
অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। উপপরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম জানান, তাঁরা অভিযোগ পাওয়ার পরই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। তিনি বলেন, “লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। কমিটি ঘটনাটি খতিয়ে দেখবে এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাই করবে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তাঁর ভাষ্য, সরকারি কাজে অনিয়মের অভিযোগ এলে তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখতেই হয় এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
এদিকে এলাকায় কৃষকদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন যে অভিযোগ সত্য হলে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তাঁদের যুক্তি, সাধারণ কৃষকের টাকা-পয়সা নিয়ে কেউ দুর্নীতি করলে তা শুধু অন্যায় নয়, বরং কৃষি খাতের উন্নয়নেও বাধা সৃষ্টি করে। আবার কেউ কেউ বলছেন, অভিযোগের সত্যতা প্রমাণের আগ পর্যন্ত কাউকে দোষী বলা ঠিক নয়। তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষায় থাকা উচিত।
এলাকার আরেক কৃষক আবুল কালাম বলেন, “আমরা সরকারি প্রকল্পের ওপর ভরসা রাখি। যদি সরকারি কর্মকর্তারাই আমাদের কাছ থেকে টাকা চান, তাহলে আমরা কোথায় যাব? কৃষি অফিসের ওপর আস্থাই কমে যাবে।” তাঁর মতে, সোলার পাম্প প্রকল্পটি অত্যন্ত দরকারি। এটি কৃষকের সেচ ব্যয় কমায়, উৎপাদন বাড়ায় এবং পরিবেশবান্ধবও। তাই এই প্রকল্পের বরাদ্দ নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা খুবই হতাশাজনক।
একই গ্রামের বাসিন্দা রমেশ চন্দ্র শর্মা বলেন, “এই অভিযোগ সত্য হলে এটা বড় অপরাধ। কিন্তু তদন্ত হোক আগে। প্রতিটি অভিযোগই সত্য নয়। অনেক সময় ভুল বোঝাবুঝিতে বড় ঘটনা হয়ে যায়।” তিনি মনে করেন যে সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলে তার পুরো ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তাই অভিযোগ প্রমাণ ছাড়া কারও বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় অবস্থান নেওয়া উচিত নয়।
অন্যদিকে অভিযোগকারী হাসান আলী বলেছেন, তাঁরা শুধু তাঁদের প্রাপ্য সুবিধা চান। তাঁর ভাষায়, “আমরা সরকারি সেবা নিতে গেলে আমাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হবে—এটি মানতে পারিনি। তাই অভিযোগ করেছি। আমরা শুধু চাই ঘটনা তদন্ত হোক এবং সত্য বের হয়ে আসুক।”
এলাকার আরেক বাসিন্দা বলেন, কৃষি অফিসে অনেক সময় সঠিক নির্দেশনা পাওয়া কঠিন। যদি কেউ নতুন প্রকল্প বা বরাদ্দের ব্যাপারে জানতে চান, তাকে এ ব্যক্তি থেকে ওই ব্যক্তির কাছে যেতে হয়। ফলে দুর্বল কৃষকরা অনিশ্চয়তায় ভোগেন। তাই সুষ্ঠু প্রশাসন, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং সহনশীল আচরণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা হয়।
এদিকে রায়হানুল হকের নামে যখন অভিযোগ ওঠে, তখন তার অতিরিক্ত দায়িত্বের মেয়াদ প্রায় শেষের দিকে। জানা গেছে, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিপা বিশ্বাস ছুটিতে গেলে ওই অতিরিক্ত দায়িত্ব তিনি পান। সেই সময়ই অভিযোগটি তৈরি হয়। ফলে কেউ কেউ মনে করছেন যে দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় কোনো ক্ষমতা–সংশ্লিষ্ট দ্বন্দ্ব বা ভুল বোঝাবুঝি থেকেও পরিস্থিতি জটিল হতে পারে। তবে এসবই অনুমান; তদন্ত ছাড়া কিছু নিশ্চিত নয়।
সার্বিক পরিস্থিতি দেখে বোঝা যায়, অভিযোগটি শুধু দুই কৃষকের ক্ষোভ ও অভিজ্ঞতার প্রতিফলন নয়; বরং এটি সরকারি সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রয়োজনীয়তার কথাও নতুন করে সামনে আনে। সরকারি সেবা জনগণের অধিকার, এবং সেসব সেবা যেন কোনো দুর্নীতির ছায়া ছাড়া জনগণ সহজে পায়—এটি সংশ্লিষ্ট সকলের দায়িত্ব। তাই এমন অভিযোগ উঠলে তা গভীরভাবে তদন্ত হওয়া জরুরি।
আপাতত তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে। সত্যতা প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হবে। তবে যাই হোক, এই ঘটনার মধ্য দিয়ে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে সরকারি সেবা ব্যবস্থার প্রতি যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তা সমাধান করতে আরও কার্যকর যোগাযোগ, স্বচ্ছতা ও সঠিক তথ্যের প্রয়োজন —এমন মতামতই পাওয়া যাচ্ছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















