ক্ষমতার পরিবর্তনের দেড় বছর পরও সমাজসেবা অধিদপ্তরের বাস্তব চিত্র যে কতটা জটিল, তা এখন আরও স্পষ্টভাবে সামনে আসছে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুরনো রাজনৈতিক প্রভাবমণ্ডল ভাঙার যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, তার কোনো বাস্তব রূপ এখনো দেখা যায়নি। বরং অভিযোগ উঠছে—দপ্তরের অভ্যন্তরে এখনো আগের শাসনামলের “অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ” সক্রিয় রয়েছে।
এই নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন অতিরিক্ত পরিচালক মো. সাজ্জাদুল ইসলাম—এমনটাই দাবি করছেন অধিদপ্তরের বহু কর্মকর্তা। দ্বিতীয় পর্বের এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তার বিরুদ্ধে নতুন সব অভিযোগ, অসন্তোষ ও আশঙ্কা।
অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ বলছেন, সাজ্জাদুল ইসলাম এখনো এমন প্রভাব ধরে রেখেছেন যা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা দুটোই প্রশ্নবিদ্ধ করে। তারা অভিযোগ করেন, তিনি কে কোন ইউনিটে কাজ করবেন, কোন প্রকল্পে কার দায়িত্ব যাবে—এসব বিষয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে মতামত দেন এবং অনেক ক্ষেত্রে সেই মতামতই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে রূপ নেয়। কর্মকর্তাদের ভাষায়, “যেখানে তার কোনো আনুষ্ঠানিক এখতিয়ার নেই, সেখানে এমন হস্তক্ষেপ দপ্তরের জন্য বিপর্যয় সৃষ্টি করছে।”
সূত্রগুলো দাবি করেন, সন্ধ্যার পর তার কক্ষে নিয়মিত উপপরিচালকদের আনাগোনা এখন অধিদপ্তরের একটি অঘোষিত সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, “নীতিনির্ধারণী আলোচনার নামে যে ধরনের গোপন সমন্বয় চলছে, তা কোনো সুস্থ প্রশাসনের অংশ হতে পারে না।”
এমন মন্তব্যই দেখায়, দপ্তরের ভেতরে কতটা চাপা অসন্তোষ জমে আছে।
অভিযোগকারীরা আরও বলেন, সাজ্জাদুল ইসলাম আগের সরকারের সময় রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা ব্যবহার করে দ্রুত পদোন্নতি ও সুবিধা নিয়েছিলেন। তাদের দাবি, সেই ‘ক্ষমতার স্মৃতি’ এখনো তিনি ছাড়তে চান না। এক সিনিয়র কর্মকর্তা কড়া বক্তব্য দিয়ে বলেন, “পুরনো শাসনযুগের সুবিধাভোগীরা যদি এখনো সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করে, তবে পরিবর্তনের পুরো দাবি-দাওয়াই অসার। এটা শুধু অনৈতিকই না—দরিদ্র জনগণের সাথে প্রতারণা।”
জুলাই ঐক্যের নেতারাও বলছেন, সমাজসেবা অধিদপ্তরের মতো সংবেদনশীল দপ্তরে কোনোভাবেই প্রভাবশালী ব্যক্তির একচ্ছত্র আধিপত্য গ্রহণযোগ্য নয়। একজন সংগঠক বলেন, “সাধারণ মানুষ যাদের ওপর ভরসা করে, সেই জায়গায় যদি পুরনো স্বার্থগোষ্ঠী দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে পরিবর্তন শুধু কাগজে-কলমেই থাকবে।”
কর্মকর্তাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হলো—দপ্তরে পদায়ন প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার। তাদের বক্তব্য, যোগ্যতার ভিত্তিতে নয়, বরং অঘোষিত অভ্যন্তরীণ সম্পর্কের ভিত্তিতে অনেক কর্মকর্তা পদায়ন পান। এর ফলে প্রকল্পের গতি কমে যায়, মাঠপর্যায়ে কাজের মান কমে এবং জনগণ প্রত্যাশিত সেবা পায় না।
একজন কর্মকর্তা সরাসরি বলেন, “এই দপ্তরটাকে যদি আবারও একই হাতের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়, তাহলে অভ্যুত্থানের মূল্য কী?”
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দপ্তরে যতদিন অঘোষিত প্রভাব থাকবে, ততদিন প্রশাসনিক শুদ্ধি অভিযান কার্যকর হবে না। তাদের মতে, রাজনৈতিক সংযোগ থাকা মানেই কেউ দোষী—এটা নয়। কিন্তু সেই সংযোগ ব্যবহার করে যদি প্রশাসনে অস্বচ্ছ প্রভাব সৃষ্টি হয়, তবে সেটা জনগণের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য—“সামাজিক নিরাপত্তা খাত সবচেয়ে দুর্বল জনগোষ্ঠীকে সার্ভিস দেয়। এখানে ভুল সিদ্ধান্ত মানেই মানবিক ক্ষতি।”
অন্যদিকে সাজ্জাদুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করে সাংবাদিকদের বলেন, “আমার বিরুদ্ধে যে তথ্য দেওয়া হচ্ছে তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।”
কিন্তু কর্মকর্তাদের মতে, এমন বক্তব্য তার বিরুদ্ধে ওঠা সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তারা দাবি করছেন, তিনি বিষয়টি ব্যাখ্যা করার পরিবর্তে অভিযোগকারীদের উদ্দেশ্য প্রশ্নবিদ্ধ করছেন, যা আলোচনাটিকে আরও ঘনীভূত করছে।
কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ বলছেন, অধিদপ্তরের বর্তমান পরিস্থিতি সরাসরি মাঠপর্যায়ের কাজে ধাক্কা দিচ্ছে। প্রকল্প থেকে বরাদ্দ, ইউনিটভিত্তিক কর্মী বণ্টন, তদারকি—সব ক্ষেত্রেই অস্থিরতা স্পষ্ট। তাদের মতে, “যে দপ্তরের ওপর দেশব্যাপী কোটি মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা নির্ভর করে, সেই দপ্তরে যদি প্রভাব-অধিপত্য চলে, তাহলে জনগণের জীবনই সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
এই দ্বিতীয় পর্বের তদন্ত প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে যে, অনেক কর্মকর্তা সরাসরি মন্তব্য করেছেন—“এটি কেবল একজন ব্যক্তির আচরণের সমস্যা নয়; এটি পুরো প্রশাসনিক সংস্কার ব্যর্থতার প্রতীক।” তাদের দাবি, পুরনো নেটওয়ার্ক ভাঙা না গেলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের ভবিষ্যৎ উপকারভোগী জনগণের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ, কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং চলমান বিতর্ক মিলিয়ে বলা যায়—সমাজসেবা অধিদপ্তরে মো. সাজ্জাদুল ইসলামকে ঘিরে যে অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে, তা কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতা নয় বরং রাজনৈতিক ছায়া এখনো কতটা শক্তিশালী অবস্থানে আছে তারই প্রতিচ্ছবি।
যদি এখনো এই বিতর্কের সমাধান না হয়, তাহলে সামাজিক নিরাপত্তা খাত দীর্ঘমেয়াদে সংকটে পড়বে—এমনটাই সতর্ক করছেন প্রশাসনিক বিশ্লেষকেরা।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















