রাজধানীর শ্যামলী এলাকার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সরকারি টিবি (যক্ষ্মা) হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে চলা হুমকির ঘটনাটি এখন সমাজের নজরে এসেছে। হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ভয়ে কাজ করতে পারছেন না। অভিযোগ উঠেছে, হাসপাতালের সাবেক উপপরিচালক এবং স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি মো. আবু রায়হান নিয়মিতভাবে হাসপাতালের কক্ষে প্রবেশ করে হুমকি দিচ্ছেন। একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তিনি একা বা দল বেঁধে এসে ডাক্তার, নার্স, ওয়ার্ড মাস্টার, সহকারী পরিচালকসহ বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর ওপর ভয়ভীতি তৈরি করছেন।
শহরের শেরেবাংলা থানায় গত ২৬ নভেম্বর হাসপাতালের এক নারী কর্মকর্তা জিডি করেছেন। জিডিতে বলা হয়েছে, ২০ নভেম্বর আবু রায়হান হাসপাতালে এসে বিভিন্ন কক্ষে প্রবেশ করেন এবং ভয়ভীতি দেখান। এছাড়া রাতে ভিডিও কলের মাধ্যমে বিরক্ত করেন এবং বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত দাবি করে হুমকি দেন। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, হঠাৎ করে তিনি চলে আসেন এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। ভয়ে ভয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে।
মো. আবু রায়হান ২০২৪ সালের জুন মাসে সরকারি চাকরি থেকে অবসরগ্রহণ করেন। তবে এর পরও তিনি হাসপাতালের কর্মকাণ্ডে সরাসরি হস্তক্ষেপ করছেন। হাসপাতালের উপপরিচালকসহ তিনজন চিকিৎসক এবং দুজন কর্মকর্তা জানান, আবু রায়হানের নামে বেশ কিছু আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ আছে। তার উপপরিচালক থাকার সময়ে ২০২১-২২ অর্থবছরে আন্তর্জাতিক দরপত্র ছাড়াই দেড় কোটি টাকার ইনসিনারেটর (দাহন চুল্লি) কেনা হয়েছিল। এছাড়া এক লাখ টাকা দরে বেশ কয়েকটি আলমারি কেনা হয়, যার আসল বাজারমূল্য মাত্র ৩০ হাজার টাকা। সরকারি বাসায় থেকেও তিনি অবৈধভাবে বিদ্যুৎ বিল নেন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও অডিট শাখা এসব কেনাকাটার ব্যাপারে অডিট আপত্তি জানায়। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আবু রায়হানের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করেছে। অভিযোগ রয়েছে, এই মামলাগুলোর ক্ষেত্রে অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি করতে এবং দুদকের মামলায় জাল কাগজপত্র সরবরাহের জন্য আবু রায়হান নিয়মিতভাবে হাসপাতালে এসে কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন।
হাসপাতালের একজন কর্মকর্তা বলেন, “তিনি হঠাৎ করে চলে আসেন। অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। আমরা ভয়ে ভয়ে থাকি। কাজ করার পরিবেশে এখন শঙ্কা আর আতঙ্ক।”
জেবুন নেসা জব্বার নামে স্টেনোটাইপিস্ট একজন নারী কর্মকর্তা শেরেবাংলা থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, আবু রায়হান প্রায় প্রতিদিনই হাসপাতালে হাজির হন। কখন, কোথায় কী করবেন তা কেউ জানে না। তার হুমকি এবং চাপের কারণে হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মানসিকভাবে অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
উপপরিচালক আয়শা আক্তার বলেন, “থানায় জিডি করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকেও বিষয়টি জানানো হয়েছে। আমরা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব। তবে এই পরিস্থিতিতে কর্মকর্তারা ভয়ে কাজ করতে পারছে না।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) এ বি এম আবু হানিফ জানিয়েছেন, “উপপরিচালক আয়শা আক্তার আমাকে বিষয়গুলো জানিয়েছেন। আমরা সব আইনানুগ ব্যবস্থা নেব। এই ধরনের হুমকি এবং চাপের ঘটনা আমাদের সহ্য করা উচিত নয়।”
উল্লেখযোগ্য, আবু রায়হানের এই আচরণ শুধুমাত্র হুমকি বা ভয়ভীতি প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতি, সরকারি তহবিলের অপব্যবহার এবং জাল কাগজপত্র সরবরাহের অভিযোগও রয়েছে। হাসপাতালের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, আবু রায়হান তার রাজনৈতিক সংযোগ এবং স্বাচিপের কেন্দ্রীয় পদ ব্যবহার করে হাসপাতালের ক্রয়-বিক্রয় এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে হস্তক্ষেপ করেন।
হাসপাতালে কর্মরত এক চিকিৎসক বলেন, “আমরা জানি, আমাদের বিরুদ্ধে তার অনেক মামলা রয়েছে। কিন্তু আদালতের বাইরে নিজের প্রভাব খাটিয়ে তিনি নিয়মিত হুমকি দিচ্ছেন। এ ধরনের আচরণ হাসপাতালের সাধারণ চিকিৎসা কার্যক্রমকেও প্রভাবিত করছে।”
অন্য একজন কর্মকর্তা যোগ করেন, “এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে চলছে। কিন্তু উপায় নেই। আমরা পুলিশের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হয়েছি। জিডিতে সব ঘটনার বর্ণনা দেয়া হয়েছে। আশা করি আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা হবে।”
অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, আবু রায়হান দেড় কোটি টাকার ইনসিনারেটর কেনার সময় নিয়ম নৈতিকতার শিকড়কে উপেক্ষা করেছেন। তার ক্রয়ের পদ্ধতি আন্তর্জাতিক দরপত্র ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছিল, যা সরকারি নীতিমালার পরিপন্থী। এছাড়া তিনি সরকারি বাসায় বিদ্যুৎ বিল নেয়ার মাধ্যমে ব্যক্তিগত সুবিধা নিয়েছেন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও দুদক থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আবু রায়হানকে কেন্দ্র করে হাসপাতালের কর্মকর্তারা ভয়, উৎকণ্ঠা এবং মানসিক চাপের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তার হুমকি, ভয়ভীতি, অডিট আপত্তি নিষ্পত্তিতে চাপ এবং জাল কাগজপত্র সরবরাহের দাবি একত্রে কর্মকর্তাদের উপর গভীর প্রভাব ফেলেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, “আমরা জানি, এই ধরনের আচরণ অবৈধ। কিন্তু তার রাজনৈতিক প্রভাব এবং কেন্দ্রীয় পদ আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। আমরা ভয়ে আমাদের কাজ করতে পারি না।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, “আমরা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখছি। প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হাসপাতালের কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার।”
উপসংহারে, মো. আবু রায়হানের কার্যক্রম এবং আচরণ টিবি হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং কর্মকর্তাদের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যক্তিগত স্বার্থান্বেষণে হস্তক্ষেপ এই ধরনের ঘটনা যে কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে, তার এক নজির এই হাসপাতালের ঘটনা।
হাসপাতালের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, যদি মো. আবু রায়হানের এমন আচরণের অবসান না ঘটে, তবে হাসপাতালের কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। তাদের মতে, প্রশাসনিক পদে থাকা ব্যক্তিদের উচিত নয়, যে ধরনের হুমকি ও ভয়ভীতি তিনি চালাচ্ছেন। আইন অনুযায়ী অবশ্যই তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এই ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত হুমকি নয়, বরং সরকারি হাসপাতালের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, আর্থিক দায়িত্ব এবং সাধারণ মানুষকে সেবা প্রদানের সক্ষমতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও দুদককে একযোগে কাজ করে এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















