সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদে আওয়ামী লীগের শাসন আমলের শেষ সাত বছরে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুল (পিপিআর) অমান্য করে নানা প্রকল্পের বাস্তবায়ন দেখানো হয়েছে। এ রকম কিছু প্রকল্প হয়েছে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধেও। জেলার চারটি উপজেলার হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধে বাঁশ-বস্তা ফেলা হয়েছে দেখিয়ে এই প্রতিষ্ঠানে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৫৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা লুটপাট হয়েছে। জেলা পরিষদের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় উঠে এসেছে এমন তথ্য।
এসব অনিয়মের সঙ্গে পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান নূরুল হুদা মুকুট ও কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী যুক্ত বলে তাতে উল্লেখ করা হয়েছে। সম্প্রতি জেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত প্রশাসকের পক্ষ থেকে অনিয়ম-দুনীতি ও লুটপাটের কিছু তথ্য চিঠি দিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদককে) জানানো হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সাবেক চেয়ারম্যান ও সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নূরুল হুদা মুকুট আত্মগোপনে আছেন।
পরিষদের প্রকল্প বাস্তবায়নের নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, বাগান সংস্কারের নামে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২০ লাখ টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। পরের বছর একই বাগান সংস্কারে আরও তিন প্রকল্পে ১৭ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়। তদন্তে বলা হয়, এসব প্রকল্প ছিল ভুয়া। ২০১৯-২০ অর্থবছরে আবার এখানে নান্দনিক বাগান নির্মাণের নামে আরও ১০ লাখ টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। কিছু ফুলের চারা ও কিছু সার কিনে পুরো প্রকল্পের টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে।
এখানে আবার আলোকসজ্জা ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের নামে আরও পাঁচ লাখ টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে বলে পরিষদের ২০১৯ সালের ১৪ আগস্টের সভার কার্যবিবরণীতে উল্লেখ রয়েছে। পরিষদ ভবনের সামনে আগেই ফটক ছিল। এখানে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দৃষ্টিনন্দন গেট নির্মাণের জন্য ২৫ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়। এ বিষয়ে পরিষদের অভ্যন্তরীণ তদন্তের মন্তব্যে বলা হয়েছে, এই প্রকল্পে মাত্র পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় করে বাকি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
সুনামগঞ্জ পৌর শহরের স্টেডিয়ামের পাশে পরিষদের একটি রেস্টহাউস আছে। এ ছাড়া জেলার সাতটি উপজেলায় পরিষদের আরও সাতটি রেস্টহাউসে সাত বছরে ৪১টি প্রকল্প নেওয়া হয়। এতে ব্যয় হয়েছে দুই কোটি ৪৬ লাখ টাকার বেশি। জেলা শহরের রেস্টহাউসে ১৪টি প্রকল্প নেওয়া হয়। এতে ব্যয় হয়েছে ৮৭ লাখ টাকা। কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, একই নামে বারবার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
জেলা পরিষদ আইন ২০০০ অনুযায়ী এবং পিপিআর অনুযায়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন প্রকল্পের কাজ এবং মাটির কাজ জেলা পরিষদ বাস্তবায়ন করতে পারে না। তবুও পাহাড়ি ঢল এবং সুরমা নদীর পানি বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে জামালগঞ্জ উপজেলার চারটি হাওরে কাগজে-কলমে বাঁশ, মাটি, বালুর বস্তা ইত্যাদি সরবরাহ দেখিয়ে পাঁচ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। একই অর্থবছরে জগন্নাথপুর উপজেলায় হাওর উন্নয়ন প্রকল্পরের নামে কাজ না করেই আট লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। একই প্রক্রিয়ায় একই উপজেলায় আরও একটি প্রকল্পের নামে সাড়ে ছয় লাখ, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় আট লাখ, দোয়ারাবাজার উপজেলায় পাঁচ লাখ, ধর্মপাশা উপজেলায় পাঁচ লাখ, আরও একটি প্রকল্পে ধর্মপাশা উপজেলায় সাত লাখ ও শাল্লা উপজেলা হাওর উন্নয়নের কাজ দেখিয়ে ৯ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। এক বছরেই হাওর উন্নয়ন নামে গায়েবি এসব প্রকল্পে লুটপাট করা হয় প্রায় ৫৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
জেলা পরিষদের তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল ওয়াহাব রাশেদ বর্তমানে নরসিংদী জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে। তিনি বলেন, নূরুল হুদা মুকুট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। প্রভাবশালী এই রাজনীতিক চেয়ারম্যান হওয়ার পর লুটপাট সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। অনেক গায়েবি প্রকল্পের প্রতিবাদ করায় আমাকে বদলি করা হয়।
নূরুল হুদা মুকুটের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি কোনো দুই নম্বরি করিনি। যে কোনো তদন্ত মোকাবিলা করার জন্য আমার প্রস্তুতি রয়েছে। আমার বিরুদ্ধে যেসব তথ্য গণমাধ্যমকে দেওয়া হচ্ছে, এগুলো ভুয়া।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, হাওরের কোনো বাঁধে জেলা পরিষদের বরাদ্দ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। হাওর রক্ষা বাঁধে জেলা পরিষদের অর্থে কোনো কাজ হয়েছে বলেও জানা নেই।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও জেলা পরিষদের বর্তমান প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, বিগত সময়ের অনেক দুর্নীতির সঠিক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। যাদের নামে ভুয়া প্রকল্প হয়েছে, তারা হয়তো জানেই না। কিছু প্রকল্পের কাগজপত্র পাওয়া গেছে। যেগুলোর সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে, সেগুলো সম্প্রতি দুদকের কাছে পাঠানো হয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















