ঢাকা ০৫:৩০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
নীলফামারী জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশের অভিযানে ‘ভুয়া ডিবি ও ডলার প্রতারক’ চক্রের ০১ জন সক্রীয় সদস্য গ্রেফতার। মনোহরগঞ্জে সন্ত্রাসী কায়দায় গাছ কেটে নেয়ার অভিযোগ পিএসএলের বাকি অংশে খেলা হচ্ছে না নাহিদ-মুস্তাফিজের কোন নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে অনিয়মকেই নিয়মে পরিনত করছেন মাদারীপুর উপজেলা শিক্ষা অফিসার বেরোবিতে আন্তঃবিভাগ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট ২০২৬-এর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত আইইএলটিএস পরীক্ষা দিতে আসা তরুণীর লাশ মিলল হোটেলের বাথরুমে বড়লেখা উপজেলা পৌর ছাত্রদল ও বড়লেখা উপজেলা শাখার ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। তনু হত্যায় গ্রেপ্তার হাফিজুরের ডিএনএর নমুনা সংগ্রহ বিসিকের টেন্ডার সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রক সাবেক ছাত্রলীগ নেতা রাশেদ! ঘোড়াশালে চাঁদাবাজ মহিউদ্দিনের দাপট, স্বাস্থ্যকেন্দ্র দখলের অভিযোগ

শাহ আলম শিকদারের একক নিয়ন্ত্রণে ৩০ কোটি টাকার অনিয়ম দুর্নীতি

দেশের উচ্চশিক্ষায় বিজ্ঞানভিত্তিক অবকাঠামো গড়ে তোলার কথা ছিল সরকারি কলেজসমূহে বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ প্রকল্পের মাধ্যমে। প্রকল্পটি শিক্ষার মান উন্নয়নের পাশাপাশি বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা পুরোপুরি ভিন্ন। এক বছরের মধ্যে প্রকল্পের কেনাকাটার মাধ্যমে প্রায় ৩০ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে। এই অনিয়ম ও দুর্নীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে প্রকল্পের হিসাবরক্ষক মোঃ শাহ আলম শিকদারকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

২০১৮ সালের জুলাইয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়। প্রথম প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয় ২ হাজার ৫১১ কোটি ৫১ লাখ ৩২ হাজার টাকা। পরে ২০২৩ সালে ডিপিপি সংশোধন করে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয় এবং ব্যয় বাড়িয়ে ২ হাজার ৫৫০ কোটি ১৮ লাখ ৬২ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে মেয়াদ আরও বাড়ানোর প্রস্তাব নাকচ হয়ে যায়।

প্রকল্পের আওতায় দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১৭৬টি একাডেমিক ভবন ও ৩৫টি হোস্টেল নির্মাণ এবং কয়েকটি ভবন সংস্কারের কাজ চলছে। এছাড়া ২০০টি কলেজে অফিস সরঞ্জাম, কম্পিউটার সামগ্রী, বিজ্ঞানের যন্ত্রপাতি ও আসবাব সরবরাহ এবং ১ হাজার ৯১৪টি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করার কথা। পাশাপাশি বাজার চাহিদার আলোকে ১০টি নতুন বিষয় চালু এবং ৮ হাজার ৬২৫টি বিজ্ঞান শিক্ষক ও হোস্টেলের কর্মচারীর ৪৫৫টি পদ সৃজনও প্রকল্পভুক্ত।

তবে প্রকল্পের শুরু থেকেই অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে কেনাকাটার ক্ষেত্রে অনিয়ম সবচেয়ে বেশি। চলতি অর্থবছরের কার্যক্রমে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চার কলেজ ও একটি হোস্টেলের জন্য ২ কোটি ৩৫ লাখ ২ হাজার ৪০২ টাকার আসবাব কেনাকাটার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল ২০২৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর। দরপত্র শর্ত অনুযায়ী ৬৫৬টি সিঙ্গেল খাট সরবরাহ করার কথা থাকলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সরবরাহ করে মাত্র ৪১৭টি। অর্থাৎ ২৩৯টি খাট সরবরাহ না করলেও ৫৬ লাখ ৬৩ হাজার ৬২০ টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়। একইভাবে আরও একটি দরপত্রে মালামাল সরবরাহ না করেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ৪৮ লাখ ৫১ হাজার ৭০০ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম সর্বনিম্ন দরদাতার সঙ্গে চুক্তি না করে তৃতীয় ও চতুর্থ সর্বনিম্ন দরদাতার সঙ্গে চুক্তি করার কারণে সরকারের আরও কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এক দরপত্রে ৮৬ লাখ ৬৩ হাজার ৯৯২ টাকা আরেকটিতে ৩৭ লাখ ৪৬ হাজার ৯০০ টাকা ক্ষতি হয়েছে। একই সঙ্গে আসবাবপত্র কেনাকাটার একটি কাজকে একাধিক প্যাকেজে ভাগ করে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১৯ কোটি ১৭ লাখ ৭৪ হাজার ৩৩০ টাকা। এছাড়া অর্থবছরের শেষ সময়ে কেনাকাটা করায় আর ৯ কোটি ১৪ লাখ ১৩ হাজার ২২৭ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

প্রকল্পের আইসিটি, কম্পিউটার ও ল্যাপটপ সামগ্রী উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে ক্রয় করতে হবে বলে ডিপিপিতে উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে কোটেশন পদ্ধতিতে ক্রয় করা হয়েছে। এতে ৯ লাখ ৭১ হাজার ৯৬৫ টাকা অনিয়মিতভাবে পরিশোধ হয়েছে। এছাড়া সাধারণ বিমা করপোরেশন থেকে ইন্স্যুরেন্স কাভারেজ না নেওয়ায় ৪ লাখ ৩ হাজার ৩৩ টাকা, প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও সম্মানি দেওয়ায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

প্রকল্পের শুরু থেকেই অনিয়মের অভিযোগে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি। বরং তদন্ত কর্মকর্তাদের প্রকল্পের ক্রয় কমিটিতে যুক্ত করা হয়েছে। আগে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন অধ্যাপক নুরুল হুদা এবং ড. খন্দকার মুজাহিদুল ইসলাম। অনিয়মের অভিযোগে তারা সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর ড. খন্দকার মুজাহিদুল হককে সরিয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয় অধ্যাপক ড. মো. মাহমুদ হোসেনকে। কিন্তু দায়িত্ব বদল সত্ত্বেও অনিয়মের মাত্রা কমেনি; বরং বেড়েছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করছেন, প্রকল্পের সব নথি, ক্রয় সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং হিসাবরক্ষণে একক নিয়ন্ত্রণ থাকার কারণে অনিয়মের সুযোগ সবচেয়ে বেশি হয়েছে হিসাবরক্ষক মোঃ শাহ আলম শিকদারের। তার তত্ত্বাবধানে কাজ করার কারণে প্রকল্পের অর্থ ও ক্রয় শাখার কর্মকর্তারা দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। কেউ তার নির্দেশ অমান্য করলে বদলি করা হয়েছে। গত ছয় বছরে ছয় গবেষণা কর্মকর্তা বদলি হতে বাধ্য হয়েছেন।

অধিকন্তু, প্রকল্পের অনিয়ম ঢাকতে কিছু কেনাকাটার নথিপত্র গায়েব করা হয়েছে। এই কাজে প্রকল্প পরিচালকের নির্দেশে মুখ্য ভূমিকা রেখেছেন মোঃ শাহ আলম শিকদার। একাধিক সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পের বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে অযথা অর্থ প্রদান, বিল নথি মেলানো না হওয়া এবং সরবরাহ না হওয়া মালামালের জন্যও দায়ী এই হিসাবরক্ষক।

প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক রওশন আরা বেগমকে বাধা দেওয়ার অভিযোগে বদলিও করা হয়েছে। প্রকল্পে দায়িত্ব পালনরত কর্মকর্তারা বলছেন, অনিয়ম ও দুর্নীতি এখন প্রকল্পের সংস্কৃতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

ফোসেপ প্রকল্প কার্যালয়ে প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. মাহমুদ হোসেন কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মজিবর রহমান বলেছেন, বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

টিআইবি বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, “প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতি দিন দিন সংস্কৃতিতে পরিণত হচ্ছে। যারা এর সঙ্গে জড়িত, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড না হয়।”

প্রকল্পের শুরু থেকে একাধিক ঘটনা প্রমাণ করছে, হিসাবরক্ষক মোঃ শাহ আলম শিকদারের একক নিয়ন্ত্রণে কেনাকাটার নথিপত্র ও অর্থ ব্যবস্থাপনাকে কেন্দ্র করে প্রকল্পের বাজেটের বিশাল অংশ অর্থহীনভাবে ব্যয় হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিল পরিশোধ, সরবরাহহীন মালামালের টাকা প্রদান এবং নথি গায়েব করার মতো কার্যক্রমের কারণে প্রকল্পের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

একাধিক কলেজ ও হোস্টেলকে সরবরাহকৃত আসবাবপত্রের নিরীক্ষা করলে দেখা যায়, সরবরাহের তুলনায় অতিরিক্ত অর্থ প্রদান, বিলের অনিয়ম এবং ঠিকাদারদের বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের বাজেটের সর্বনিম্ন ক্ষতি হিসাবরক্ষক শাহ আলম শিকদারের নির্দেশে সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পের নথি ও হিসাবপত্র তার তত্ত্বাবধানে থাকায় এটি বাস্তবায়িত হয়েছে।

এ ছাড়াও, একাধিক দরপত্রে প্রথম সর্বনিম্ন দরদাতার সঙ্গে চুক্তি না করে তৃতীয় ও চতুর্থ সর্বনিম্ন দরদাতার সঙ্গে চুক্তি করার মাধ্যমে প্রকল্পের অর্থনৈতিক ক্ষতি কোটি টাকায় হয়েছে। এছাড়া কেনাকাটার জন্য দরপত্রকে একাধিক প্যাকেজে ভাগ করার মাধ্যমে ১৯ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। অর্থবছরের শেষ সময়ে দ্রুত কেনাকাটার কারণে ৯ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

প্রকল্পের আইসিটি, কম্পিউটার ও ল্যাপটপ ক্রয়ও কোটেশন পদ্ধতিতে করা হয়েছে, ডিপিপির নির্দেশনা অমান্য করে। এতে ৯ লাখ ৭১ হাজার ৯৬৫ টাকা অনিয়মিতভাবে পরিশোধ হয়েছে। এছাড়া সাধারণ বিমা না নেওয়া ও প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও সম্মানি প্রদানের ফলে আরও অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালকের নির্দেশে হিসাবরক্ষক শাহ আলম শিকদারের একক নিয়ন্ত্রণ, নথি গায়েব, দপ্তরী কর্মকর্তাদের বদলি এবং দরপত্রে অগোছালো কার্যক্রমের কারণে এই প্রকল্পের বাজেটের বিশাল অংশ অনিয়ম ও দুর্নীতিতে ব্যয় হয়েছে।

অতিরিক্ত সচিব মো. মজিবর রহমান বলেন, “বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।” অন্যদিকে, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “যারা এই অনিয়মে জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।”

পরিশেষে বলা যায়, সরকারি কলেজে বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ প্রকল্পের এক বছরের কেনাকাটায় অনিয়মের মূল হোতা হিসাবরক্ষক মোঃ শাহ আলম শিকদার। তার একক নিয়ন্ত্রণে হওয়ায় প্রকল্পের সব নথি, অর্থ এবং ক্রয় কার্যক্রমে অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। প্রকল্পের অর্থের অপচয়, অসংগতি, বিল পরিশোধ এবং নথি গায়েবের ঘটনায় সরকারের কোটি কোটি টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই অনিয়ম ও দুর্নীতির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না হলে, ভবিষ্যতে সরকারি প্রকল্পগুলোতেও অনিয়ম ও দুর্নীতি চলবে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নীলফামারী জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশের অভিযানে ‘ভুয়া ডিবি ও ডলার প্রতারক’ চক্রের ০১ জন সক্রীয় সদস্য গ্রেফতার।

শাহ আলম শিকদারের একক নিয়ন্ত্রণে ৩০ কোটি টাকার অনিয়ম দুর্নীতি

আপডেট সময় ১২:১৪:০৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২৫

দেশের উচ্চশিক্ষায় বিজ্ঞানভিত্তিক অবকাঠামো গড়ে তোলার কথা ছিল সরকারি কলেজসমূহে বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ প্রকল্পের মাধ্যমে। প্রকল্পটি শিক্ষার মান উন্নয়নের পাশাপাশি বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা পুরোপুরি ভিন্ন। এক বছরের মধ্যে প্রকল্পের কেনাকাটার মাধ্যমে প্রায় ৩০ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে। এই অনিয়ম ও দুর্নীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে প্রকল্পের হিসাবরক্ষক মোঃ শাহ আলম শিকদারকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

২০১৮ সালের জুলাইয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়। প্রথম প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয় ২ হাজার ৫১১ কোটি ৫১ লাখ ৩২ হাজার টাকা। পরে ২০২৩ সালে ডিপিপি সংশোধন করে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয় এবং ব্যয় বাড়িয়ে ২ হাজার ৫৫০ কোটি ১৮ লাখ ৬২ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে মেয়াদ আরও বাড়ানোর প্রস্তাব নাকচ হয়ে যায়।

প্রকল্পের আওতায় দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১৭৬টি একাডেমিক ভবন ও ৩৫টি হোস্টেল নির্মাণ এবং কয়েকটি ভবন সংস্কারের কাজ চলছে। এছাড়া ২০০টি কলেজে অফিস সরঞ্জাম, কম্পিউটার সামগ্রী, বিজ্ঞানের যন্ত্রপাতি ও আসবাব সরবরাহ এবং ১ হাজার ৯১৪টি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করার কথা। পাশাপাশি বাজার চাহিদার আলোকে ১০টি নতুন বিষয় চালু এবং ৮ হাজার ৬২৫টি বিজ্ঞান শিক্ষক ও হোস্টেলের কর্মচারীর ৪৫৫টি পদ সৃজনও প্রকল্পভুক্ত।

তবে প্রকল্পের শুরু থেকেই অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে কেনাকাটার ক্ষেত্রে অনিয়ম সবচেয়ে বেশি। চলতি অর্থবছরের কার্যক্রমে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চার কলেজ ও একটি হোস্টেলের জন্য ২ কোটি ৩৫ লাখ ২ হাজার ৪০২ টাকার আসবাব কেনাকাটার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল ২০২৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর। দরপত্র শর্ত অনুযায়ী ৬৫৬টি সিঙ্গেল খাট সরবরাহ করার কথা থাকলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সরবরাহ করে মাত্র ৪১৭টি। অর্থাৎ ২৩৯টি খাট সরবরাহ না করলেও ৫৬ লাখ ৬৩ হাজার ৬২০ টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়। একইভাবে আরও একটি দরপত্রে মালামাল সরবরাহ না করেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ৪৮ লাখ ৫১ হাজার ৭০০ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম সর্বনিম্ন দরদাতার সঙ্গে চুক্তি না করে তৃতীয় ও চতুর্থ সর্বনিম্ন দরদাতার সঙ্গে চুক্তি করার কারণে সরকারের আরও কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এক দরপত্রে ৮৬ লাখ ৬৩ হাজার ৯৯২ টাকা আরেকটিতে ৩৭ লাখ ৪৬ হাজার ৯০০ টাকা ক্ষতি হয়েছে। একই সঙ্গে আসবাবপত্র কেনাকাটার একটি কাজকে একাধিক প্যাকেজে ভাগ করে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১৯ কোটি ১৭ লাখ ৭৪ হাজার ৩৩০ টাকা। এছাড়া অর্থবছরের শেষ সময়ে কেনাকাটা করায় আর ৯ কোটি ১৪ লাখ ১৩ হাজার ২২৭ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

প্রকল্পের আইসিটি, কম্পিউটার ও ল্যাপটপ সামগ্রী উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে ক্রয় করতে হবে বলে ডিপিপিতে উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে কোটেশন পদ্ধতিতে ক্রয় করা হয়েছে। এতে ৯ লাখ ৭১ হাজার ৯৬৫ টাকা অনিয়মিতভাবে পরিশোধ হয়েছে। এছাড়া সাধারণ বিমা করপোরেশন থেকে ইন্স্যুরেন্স কাভারেজ না নেওয়ায় ৪ লাখ ৩ হাজার ৩৩ টাকা, প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও সম্মানি দেওয়ায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

প্রকল্পের শুরু থেকেই অনিয়মের অভিযোগে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি। বরং তদন্ত কর্মকর্তাদের প্রকল্পের ক্রয় কমিটিতে যুক্ত করা হয়েছে। আগে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন অধ্যাপক নুরুল হুদা এবং ড. খন্দকার মুজাহিদুল ইসলাম। অনিয়মের অভিযোগে তারা সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর ড. খন্দকার মুজাহিদুল হককে সরিয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয় অধ্যাপক ড. মো. মাহমুদ হোসেনকে। কিন্তু দায়িত্ব বদল সত্ত্বেও অনিয়মের মাত্রা কমেনি; বরং বেড়েছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করছেন, প্রকল্পের সব নথি, ক্রয় সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং হিসাবরক্ষণে একক নিয়ন্ত্রণ থাকার কারণে অনিয়মের সুযোগ সবচেয়ে বেশি হয়েছে হিসাবরক্ষক মোঃ শাহ আলম শিকদারের। তার তত্ত্বাবধানে কাজ করার কারণে প্রকল্পের অর্থ ও ক্রয় শাখার কর্মকর্তারা দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। কেউ তার নির্দেশ অমান্য করলে বদলি করা হয়েছে। গত ছয় বছরে ছয় গবেষণা কর্মকর্তা বদলি হতে বাধ্য হয়েছেন।

অধিকন্তু, প্রকল্পের অনিয়ম ঢাকতে কিছু কেনাকাটার নথিপত্র গায়েব করা হয়েছে। এই কাজে প্রকল্প পরিচালকের নির্দেশে মুখ্য ভূমিকা রেখেছেন মোঃ শাহ আলম শিকদার। একাধিক সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পের বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে অযথা অর্থ প্রদান, বিল নথি মেলানো না হওয়া এবং সরবরাহ না হওয়া মালামালের জন্যও দায়ী এই হিসাবরক্ষক।

প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক রওশন আরা বেগমকে বাধা দেওয়ার অভিযোগে বদলিও করা হয়েছে। প্রকল্পে দায়িত্ব পালনরত কর্মকর্তারা বলছেন, অনিয়ম ও দুর্নীতি এখন প্রকল্পের সংস্কৃতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

ফোসেপ প্রকল্প কার্যালয়ে প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. মাহমুদ হোসেন কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মজিবর রহমান বলেছেন, বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

টিআইবি বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, “প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতি দিন দিন সংস্কৃতিতে পরিণত হচ্ছে। যারা এর সঙ্গে জড়িত, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড না হয়।”

প্রকল্পের শুরু থেকে একাধিক ঘটনা প্রমাণ করছে, হিসাবরক্ষক মোঃ শাহ আলম শিকদারের একক নিয়ন্ত্রণে কেনাকাটার নথিপত্র ও অর্থ ব্যবস্থাপনাকে কেন্দ্র করে প্রকল্পের বাজেটের বিশাল অংশ অর্থহীনভাবে ব্যয় হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিল পরিশোধ, সরবরাহহীন মালামালের টাকা প্রদান এবং নথি গায়েব করার মতো কার্যক্রমের কারণে প্রকল্পের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

একাধিক কলেজ ও হোস্টেলকে সরবরাহকৃত আসবাবপত্রের নিরীক্ষা করলে দেখা যায়, সরবরাহের তুলনায় অতিরিক্ত অর্থ প্রদান, বিলের অনিয়ম এবং ঠিকাদারদের বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের বাজেটের সর্বনিম্ন ক্ষতি হিসাবরক্ষক শাহ আলম শিকদারের নির্দেশে সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পের নথি ও হিসাবপত্র তার তত্ত্বাবধানে থাকায় এটি বাস্তবায়িত হয়েছে।

এ ছাড়াও, একাধিক দরপত্রে প্রথম সর্বনিম্ন দরদাতার সঙ্গে চুক্তি না করে তৃতীয় ও চতুর্থ সর্বনিম্ন দরদাতার সঙ্গে চুক্তি করার মাধ্যমে প্রকল্পের অর্থনৈতিক ক্ষতি কোটি টাকায় হয়েছে। এছাড়া কেনাকাটার জন্য দরপত্রকে একাধিক প্যাকেজে ভাগ করার মাধ্যমে ১৯ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। অর্থবছরের শেষ সময়ে দ্রুত কেনাকাটার কারণে ৯ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

প্রকল্পের আইসিটি, কম্পিউটার ও ল্যাপটপ ক্রয়ও কোটেশন পদ্ধতিতে করা হয়েছে, ডিপিপির নির্দেশনা অমান্য করে। এতে ৯ লাখ ৭১ হাজার ৯৬৫ টাকা অনিয়মিতভাবে পরিশোধ হয়েছে। এছাড়া সাধারণ বিমা না নেওয়া ও প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও সম্মানি প্রদানের ফলে আরও অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালকের নির্দেশে হিসাবরক্ষক শাহ আলম শিকদারের একক নিয়ন্ত্রণ, নথি গায়েব, দপ্তরী কর্মকর্তাদের বদলি এবং দরপত্রে অগোছালো কার্যক্রমের কারণে এই প্রকল্পের বাজেটের বিশাল অংশ অনিয়ম ও দুর্নীতিতে ব্যয় হয়েছে।

অতিরিক্ত সচিব মো. মজিবর রহমান বলেন, “বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।” অন্যদিকে, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “যারা এই অনিয়মে জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।”

পরিশেষে বলা যায়, সরকারি কলেজে বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ প্রকল্পের এক বছরের কেনাকাটায় অনিয়মের মূল হোতা হিসাবরক্ষক মোঃ শাহ আলম শিকদার। তার একক নিয়ন্ত্রণে হওয়ায় প্রকল্পের সব নথি, অর্থ এবং ক্রয় কার্যক্রমে অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। প্রকল্পের অর্থের অপচয়, অসংগতি, বিল পরিশোধ এবং নথি গায়েবের ঘটনায় সরকারের কোটি কোটি টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই অনিয়ম ও দুর্নীতির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না হলে, ভবিষ্যতে সরকারি প্রকল্পগুলোতেও অনিয়ম ও দুর্নীতি চলবে।