বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডে সাড়ে আট বছরের সময়ে এক ভয়াবহ আর্থিক অনিয়ম ও জালিয়াতির চিত্র সামনে এসেছে। শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে এই দুর্নীতি শিক্ষক সমাজ এবং জনগণের আস্থা একধরনের শূন্যে ফেলে দিয়েছে। অবসরে যাওয়া শিক্ষক ও কর্মচারীদের নামে ভুয়া ইনডেক্স এবং জাল আবেদনপত্র ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা উত্তোলনের অভিযোগে সরাসরি নাম উঠে এসেছে বোর্ডের সাবেক সচিব অধ্যক্ষ শরীফ আহমদ, প্রোগ্রামার জামাল হোসেন, এবং সফটওয়্যার কোম্পানি ‘গ্রিন বি’-এর মালিক মোফাজ্জল মওদুদ এলাহী ও গোলাম সারোয়ার-এর।
অধ্যক্ষ শরীফ আহমদ দীর্ঘ সাড়ে আট বছর বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডের সচিব পদে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে তিনি তার ভাতিজা মোফাজ্জল মওদুদ এলাহীর মালিকানাধীন সফটওয়্যার কোম্পানি ‘গ্রিন বি’-কে বোর্ডের কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে দেন। অভিযোগ রয়েছে, এই যোগসাজশের মাধ্যমে বোর্ডের সম্পূর্ণ আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়। প্রোগ্রামার জামাল হোসেন নিয়মবহির্ভূতভাবে ভুয়া আবেদনপত্র যাচাই এবং দ্রুত অর্থ পরিশোধের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করে টাকা সরাসরি ভুয়া অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করতেন। এই চারজনের মধ্যে অধ্যক্ষ শরীফ আহমদ ছিলেন মূল নায়ক, যিনি বোর্ডের তহবিল থেকে শত কোটি টাকা লোপাটের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন।
শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের তদন্তে দেখা গেছে, বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী সরকারি ব্যাংকে রাখা উচিত ছিল শিক্ষক ও কর্মচারীদের অবসরের টাকা। তবে দোষীদের পরিকল্পনায় সরকারি ব্যাংকের পরিবর্তে অর্থ বেসরকারি ব্যাংকে রাখা হয়। এরপর এই অর্থের মুনাফা নিজেদের খুশিমতো ব্যবহার করা হয়। শিক্ষকরা অবসরে গেলেও তাদের প্রাপ্য সুবিধা পাওয়ার জন্য তিন থেকে চার বছর অপেক্ষা করতে হয়। কেউ কেউ জীবিত থাকতে পেরে টাকা পাননি, আর কেউ মারা গেছেন।
জালিয়াতির প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম। শিক্ষক বা কর্মচারীর ভুয়া ইনডেক্স ব্যবহার করে জাল আবেদনপত্র তৈরি করা হতো। প্রোগ্রামার জামাল হোসেন এই আবেদনপত্র দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য ব্যাংকের কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করতেন। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে অর্থ স্থানান্তর করা হতো। এছাড়া, বোর্ডের সাবেক সচিব অধ্যক্ষ শরীফ আহমদ ও সফটওয়্যার কোম্পানির মালিক মোফাজ্জল মওদুদ এলাহী ও গোলাম সারোয়ার এই প্রক্রিয়ায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তাদের পরিকল্পিত যোগসাজশের কারণে বোর্ডের স্থায়ী তহবিল থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ আত্মসাৎ করা সম্ভব হয়েছে।
শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের ২০২৩ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত পরিচালিত দুই অর্থবছরের অডিটে বোর্ডের বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য প্রকাশ পায়। অধ্যাপক এসএম সাউদুজ্জামান সোহাগ, উপপরিচালক, শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর জানান, ‘আমরা অডিট পরিচালনা করে রিপোর্ট জমা দিয়েছি। এই প্রতিবেদন কয়েক দিনের মধ্যে বোর্ডে পাঠানো হবে। সেখানে কোনো আপত্তি থাকলে বা তথ্যগত সমস্যা থাকলে সেটি সমাধান করা হবে।’
অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা আইন, ২০০২-এর ধারা ৯(৪) এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা প্রবিধানমালা, ২০০৫-এর ধারা ৬ লঙ্ঘন করে বোর্ড তহবিলের অর্থ সরকারি ব্যাংকে না রেখে বেসরকারি ব্যাংকে রাখা হয়েছে। এভাবে বোর্ডের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে মোট ৬৩৯ কোটি ৬০ লাখ ৬১ হাজার ৭২৫ টাকা। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সিটিজেনস ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক বরাবর মুনাফাসহ বোর্ডের অনুকূলে জমাকৃত অর্থ দ্রুত ফেরত দেওয়ার অনুরোধ করা হলেও তারা অর্থ ফেরত দেয়নি।
এছাড়া, নীতিমালা ছাড়া এন্ডাউমেন্ট ফান্ডে বিনিয়োগ এবং যথাযথ হিসাবভুক্ত না করার কারণে বোর্ডের স্থায়ী তহবিলের ঘাটতি হয়েছে ২৯ কোটি ২০ লাখ ৬৯ হাজার ১৫৭ টাকা। বোর্ডের পরিচালক অধ্যাপক মো. জাফর আহম্মদ জানান, ‘তদন্ত কার্যক্রমে আমরা সহযোগিতা করেছি। তবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টস গায়েব হয়ে গেছে, যা পাওয়া যায়নি। দ্রুত তদন্ত না হলে বোর্ড আরও শতকোটি টাকা ক্ষতির সম্মুখীন হতো।’
প্রকৃত ঘটনা প্রকাশিত হওয়ার পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত শুরু করেছে। বোর্ডের অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়েরিও করা হয়েছে। প্রোগ্রামার জামাল হোসেনকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জামাল হোসেন ভুয়া ইনডেক্স এবং জাল আবেদনকারীদের দ্রুত টাকা পরিশোধ করতে নির্দেশ দিতেন। তিনি ব্যাংকের প্রভাব খাটিয়ে জাল আবেদনপত্রের অর্থ প্রদানের ব্যবস্থা করতেন।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কর্মচারীরা এই অনিয়মের শিকার হয়ে বহু বছর টাকা না পেয়ে দুর্ভোগের মধ্যে জীবন কাটাতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকেই অবসরে গিয়ে স্বাভাবিকভাবে প্রাপ্য সুবিধা পাননি। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ বলেন, ‘শিক্ষকরা অবসরে গেলে স্বাভাবিকভাবে তাদের প্রাপ্য সুবিধা পাওয়ার কথা। কিন্তু এখানে তারা তিন-চার বছর হয়রানির শিকার হয়েছেন। এই ধরনের অনিয়ম অমার্জনীয়। দোষীদের খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।’
শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ভুয়া ইনডেক্স এবং জাল আবেদনপত্র ব্যবহার করে শিক্ষক ও কর্মচারীদের অর্থ চুরি করা হয়েছে। ইনডেক্স না থাকা সত্ত্বেও ভুয়া ইনডেক্স ব্যবহার করে ১ কোটি ৪২ লাখ ৭৮ হাজার ৫৬৭ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। প্রাপ্যতাবহির্ভূতভাবে অর্থ পরিশোধের কারণে বোর্ডের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১ কোটি ৩৭ লাখ ৯৬ হাজার ৪৯৭ টাকা। একই ইনডেক্সে একাধিকবার অবসর সুবিধা পরিশোধের ফলে আরও ৭৯ লাখ ৬৭ হাজার ৩৩৬ টাকা ক্ষতি হয়েছে।
২০২৩-২৪ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মিথ্যা তথ্য দিয়ে জাল আবেদনপত্রের মাধ্যমে বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। এতে বোর্ডের ৫৮ লাখ ৭৬ হাজার ৩৮ টাকা ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া ভুয়া ইনডেক্স নম্বর ব্যবহার করে সফটওয়্যার ভেন্ডরের মাধ্যমে বোর্ড তহবিল থেকে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে ৩১ লাখ ৯০ হাজার ৭৭৫ টাকা।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক বিএম আব্দুল হান্নান বলেন, ‘বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী অবসর বোর্ডে বিগত সময়ে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে। শিক্ষকরা যেখানে স্বাভাবিকভাবে অবসরের টাকা পাওয়ার কথা, সেখানে তা আত্মসাৎ করা হয়েছে।’
অধ্যক্ষ শরীফ আহমদ, মোফাজ্জল মওদুদ এলাহী, জামাল হোসেন এবং গোলাম সারোয়ারের এই অভূতপূর্ব যোগসাজশ কেবল অবসর বোর্ডের নয়, পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা নষ্ট করেছে। শিক্ষকেরা তাদের জীবনের শেষ পর্যায়ে প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। শতকোটি টাকা লোপাটের ঘটনা প্রকাশ হওয়ায় বোর্ডে নতুন তদন্ত শুরু হয়েছে। তবে এই ধরনের দূর্নীতি নিয়ন্ত্রণ না করলে ভবিষ্যতে আরও বড় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।
শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের তদন্ত ও সরকারের উদ্যোগ এই দুর্নীতির প্রকৃত চিত্র উন্মোচন করেছে। তবে দোষীদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে শতকোটি টাকা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে না। শিক্ষক ও কর্মচারীরা ক্ষতিপূরণের দাবিতে সংগঠিত হয়েছেন। তারা দাবী করছেন, যারা এই লুটপাটের মূল চক্র, বিশেষ করে অধ্যক্ষ শরীফ আহমদ ও তার সহযোগীরা, তাদের আইনত শাস্তি দেওয়া হোক।
এই দুর্নীতির ঘটনা প্রমাণ করে যে, সরকারের তদারকি ছাড়া এবং কর্মকর্তাদের যোগসাজশে, বেসরকারি শিক্ষা ক্ষেত্রেও কোটি কোটি টাকা লোপাট করা সম্ভব। অধ্যক্ষ শরীফ আহমদ এবং তার সহযোগীরা স্বচ্ছতার পরিবর্তে স্বার্থচালিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছেন। ফলে সাধারণ শিক্ষকরা তাদের স্বাভাবিক প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশন এই ঘটনার তদন্ত করছে। বোর্ডের অন্যান্য কর্মকর্তাদেরও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষক ও কর্মচারীদের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ ফেরত না দিলে এই ধরনের অনিয়ম পুনরায় ঘটতে পারে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ নিলে শতকোটি টাকা পুনরুদ্ধার সম্ভব।
অনুসন্ধান দেখিয়েছে, অবসর বোর্ডে জালিয়াতি ও আর্থিক লুটপাটের ঘটনায় শিক্ষক সমাজের ক্ষতিই সবচেয়ে বড়। বহু শিক্ষক এবং তাদের পরিবার দীর্ঘ সময় অর্থের অভাবে সমস্যা ভোগ করছে। এই পরিস্থিতিতে বোর্ডের দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে শিক্ষাব্যবস্থা এবং অবসর সুবিধা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা চিরতরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আমাদের মার্তৃভূমি ডেস্ক : 





















