ঢাকা ০৯:২৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
অর্পিত সম্পত্তিতে পাকা ভবন তুলে ভাড়া আদায়

 নুরুল আমীন খোকার অবৈধ কর্মকাণ্ডে স্থানীয় সমালোচনা

  • খুলনা প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় ১২:৪২:৪৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ৫২৯ বার পড়া হয়েছে

খুলনার কয়রায় প্রগতি শিশুশিক্ষা নিকেতনের নামে ইজারা নেওয়া সরকারি অর্পিত (ভিপি) জমিতে পাকা ভবন নির্মাণ, দোকান বরাদ্দ এবং বিপুল পরিমাণ ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে উপজেলার কলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক এবং বর্তমানে প্রগতি শিশুশিক্ষা নিকেতনের পরিচালনা কমিটির সভাপতি নুরুল আমীন খোকার বিরুদ্ধে। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে তিনি মদিনাবাদের ওই জমিতে নির্মিত ১৮টি দোকান থেকে বছরে প্রায় পাঁচ লাখ ৭৬ হাজার টাকা ভাড়া আদায় করেছেন। এছাড়া দোকানের অবস্থান বা ‘পজিশন’ বাবদ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে প্রায় ৫৮ লাখ টাকা।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, নুরুল আমীন খোকা শিক্ষকতার অবস্থায় সরকারি সম্পত্তি ব্যবহার করে ব্যক্তিগত আর্থিক সুবিধা নেন এবং সরকারি নিয়ম ভেঙে জমির ওপর পাকা স্থাপনা নির্মাণ করেন। এমনকি প্রতিষ্ঠান পরিচালনার নামে ভাড়া আদায় করলেও প্রকৃতপক্ষে প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়ন তেমন হয়নি।

উপজেলা ভূমি অফিস সূত্র জানায়, সদর ইউনিয়নের মদিনাবাদ মৌজার এসএ খতিয়ান নং ৩৫৬ ও ৩৫৭—এই জমির মালিক ছিলেন বিষ্ণুপদ স্বর্ণকার, দুর্গাপদ স্বর্ণকার, বিজয়কৃষ্ণ স্বর্ণকার ও সুপদ স্বর্ণকার। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর তারা ভারতে চলে গেলে জমিটি সরকারের দখলে আসে। ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে প্রগতি শিশুশিক্ষা নিকেতন কর্তৃপক্ষের আবেদনের পর ৩৩ শতাংশ জমি একসনা ইজারা দেওয়া হয়। ইজারা শর্ত অনুযায়ী এই জমি কেবল শিক্ষামূলক কার্যক্রমের জন্য ব্যবহার করা যাবে; সেখানে পাকা ভবন নির্মাণ বা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল।

প্রথমে প্রতি শতাংশ ২০ টাকা হারে প্রতিবছরে ৬৬০ টাকা ইজারা নেওয়া হলেও পরে তা বাড়িয়ে প্রতি শতাংশ ৮০ টাকা হারে ২ হাজার ৬৪০ টাকা করা হয়। আজও একই হার বজায় আছে। কিন্তু এই ইজারা সত্ত্বেও নুরুল আমীন খোকা সরকারি অনুমতি ছাড়া পাকা ভবন নির্মাণ করেছেন।

স্থানীয়রা জানায়, শুরুতে এখানে শিশুদের জন্য টিনের চালা ও কাঠের বেড়ার ঘর নির্মাণ করা হয়েছিল। পরে সেই অস্থায়ী স্থাপনা ভেঙে ২০১৮ সালে দুইতলা ভবন তৈরি করা হয়। একই সময়ে সড়কের পাশে সারিবদ্ধভাবে ১৮টি দোকান নির্মাণ করা হয় এবং সেগুলো থেকে ভাড়া নেওয়া শুরু হয়। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তিপত্র করা হয়। ভাড়াটিয়ারাও জানিয়েছেন, তারা জানতেন না দোকানগুলো সরকারি জমিতে নির্মিত কিনা।

গোলাম রসুল নামে একজন ভাড়াটিয়া জানান, “দুই বছর আগে ৬ লাখ টাকা অগ্রিম দিয়ে দুটি দোকান ভাড়া নিয়েছি। প্রতি মাসে ৬ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়। ভাড়ার টাকা দিতে হয় নুরুল আমীনের স্ত্রী ফাতেমা সুলতানাকে।” অন্যান্য ভাড়াটিয়াও একই তথ্য দিয়েছেন। প্রতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে সবাই ভাড়া প্রদানের জন্য ফাতেমা সুলতানার কাছে টাকা জমা দেন।

নুরুল আমীন খোকা এবং তাঁর স্ত্রী ফাতেমা সুলতানা—যিনি বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক—দোকান ভাড়া নেওয়ার দায়িত্ব সামলেছেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠান পরিচালনার খরচ ও মেরামতের কথা বলে এই ভাড়া নেওয়া হলেও প্রকৃতপক্ষে এর কোনো সঠিক হিসাব বা স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

গত পাঁচ বছরে প্রগতি শিশুশিক্ষা নিকেতনের উন্নয়নের জন্য সরকারি তহবিল এবং অন্যান্য প্রকল্প থেকে প্রায় ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, দোকানভাড়ার আয়ের ব্যবহার এবং প্রকল্পের বরাদ্দের মধ্যে স্বচ্ছতা নেই। এতে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে কত টাকা ব্যবহার হয়েছে এবং কত টাকা ব্যক্তিগতভাবে নিয়েছে নুরুল আমীন।

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, অর্পিত সম্পত্তির শ্রেণি পরিবর্তন করে পাকা ভবন নির্মাণ করা যায় না। শুধুমাত্র সরকার দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত দিলে এবং সেই বন্দোবস্তে অনুমতি থাকলে পাকা ভবন বৈধভাবে নির্মাণ করা যায়। কিন্তু নুরুল আমীন খোকা সরকারি অনুমতি ছাড়াই জমিতে ভবন নির্মাণ করেছেন এবং সেই ভবন থেকে দোকান ভাড়া আদায় করেছেন। উপজেলা ভূমি অফিসের সহকারী সায়রাত বিশ্বাস বলেন, “অর্পিত সম্পত্তি নিয়ে কেউ তা অন্য কারও কাছে ভাড়া দিতে পারেন না। পাকা ভবনও নির্মাণ করা যাবে না। নিয়ম লঙ্ঘন হলে ইজারা বাতিলসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

অভিযোগের বিষয়ে ফাতেমা সুলতানা কোনো মন্তব্য করতে চাননি। নুরুল আমীন খোকা জানিয়েছেন, “একটি প্রতিষ্ঠান চালাতে অনেক খরচ হয়। সেই খরচ মেটাতেই দোকান ভাড়া ব্যবহার করা হয়।” কিন্তু তিনি পাকা ভবন নির্মাণের অনুমতি না নেওয়া, সরকারি জমি বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার এবং দোকানভাড়ার প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল বাকী জানান, “এ ধরনের অভিযোগ আগে জানা ছিল না। তবে সত্যতা প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

স্থানীয়দের মধ্যে নুরুল আমীন খোকাকে নিয়ে সমালোচনা বিরাট। একজন সরকারি শিক্ষক হয়েও তিনি সরকারি জমি ব্যবহার করে নিজস্ব আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেছেন। একাধিক ব্যবসায়ী ও ভাড়াটিয়ার অভিযোগের ভিত্তিতে বলা যায়, নুরুল আমীন খোকা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থে সরকারি সম্পত্তি ব্যবহার করছেন।

দোকানগুলো থেকে আদায়কৃত ভাড়া এবং অগ্রিম টাকা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে ন্যায্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। আইন অনুযায়ী, সরকারি অর্পিত সম্পত্তি ব্যবহার করে পাকা ভবন নির্মাণ এবং বাণিজ্যিক ভাড়া নেওয়া সম্পূর্ণ অবৈধ। ভূমি অফিস ও উপজেলা প্রশাসনের দৃষ্টিতে এটি গুরুতর লঙ্ঘন।

প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে থাকা একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এমন কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকা স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এলাকার লোকজন বলছেন, একজন শিক্ষকের পেশাগত নৈতিকতা এবং সরকারি সম্পত্তি ব্যবহারের নিয়মকানুন তিনি লঙ্ঘন করেছেন।

অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নুরুল আমীন খোকা পাকা ভবন নির্মাণ, দোকান বরাদ্দ, অগ্রিম নেওয়া এবং নিয়মিত ভাড়া আদায়—সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেছেন। এই কর্মকাণ্ডের কারণে প্রতিষ্ঠানটির স্বচ্ছতা, সরকারি তহবিলের ব্যবহার এবং স্থানীয়দের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় ভাড়া থেকে নেওয়া অর্থের ব্যবহার এবং ভবন নির্মাণে অনুমতি না নেওয়ার বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসলে, ইজারা বাতিলসহ গুরুতর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নুরুল আমীন খোকা নিজেকে শিক্ষক এবং সভাপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়ে সরকারি সম্পত্তিকে ব্যক্তিগত আর্থিক সুবিধার জন্য ব্যবহার করেছেন।

এই ঘটনার ফলে সরকারি সম্পত্তি ব্যবহারের স্বচ্ছতা এবং স্থানীয় প্রশাসনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নও উঠেছে। যদি প্রশাসন যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে, এটি অন্যদের জন্যও অনৈতিক precedent তৈরি করতে পারে।

নুরুল আমীন খোকার কর্মকাণ্ডের প্রভাব স্কুলের বর্তমান শিক্ষার মান, প্রতিষ্ঠানের সুনাম এবং স্থানীয় জনমতেও পড়েছে। শিক্ষকতার স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও, সরকারি সম্পত্তি ব্যবহারে তার এমন দৃষ্টান্ত স্থানীয়দের মধ্যে সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রূপ নিয়েছে।

ভবিষ্যতে প্রশাসন ও ভূমি অফিস এই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করতে আরও কঠোর নজরদারি আর নিয়মিত অডিট করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, নুরুল আমীন খোকার কর্মকাণ্ডের সঠিক তদন্ত এবং আইনগত ব্যবস্থা না নিলে, সরকারি সম্পত্তি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ঝুঁকির মুখে পড়বে।

অর্পিত সম্পত্তিতে অবৈধভাবে পাকা ভবন নির্মাণ এবং বাণিজ্যিক দোকান থেকে বিপুল অর্থ আদায়—এটি শুধু আইন লঙ্ঘন নয়, এটি শিক্ষাক্ষেত্রে দৃষ্টান্তহীন অনৈতিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্থানীয়রা প্রশাসনের হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে এমন অবৈধ কর্মকাণ্ড পুনরায় না ঘটে।

প্রতিষ্ঠানের বর্তমান প্রধান শিক্ষক ফাতেমা সুলতানা অভিযোগের বিষয়ে চুপ থাকলেও, প্রশাসনের তদন্তে প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ পেলে নুরুল আমীন খোকার দায় ও অনিয়ম স্পষ্ট হবে। স্থানীয়দের মতে, একজন শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে তার দায় দায়িত্বপূর্ণ হওয়া উচিত, কিন্তু তিনি সরকারি সম্পত্তি ব্যবহার করে নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করেছেন।

এ ঘটনা শুধু স্থানীয় নয়, সমগ্র খুলনার শিক্ষাক্ষেত্র এবং সরকারি সম্পত্তির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সতর্কবার্তা বহন করছে। প্রশাসনের নজরদারি, ভূমি অফিসের কার্যক্রম এবং স্থানীয় জনমতের চাপ যদি যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হয়, তবে ভবিষ্যতে এমন অনিয়ম প্রতিরোধ সম্ভব।

অতএব, নুরুল আমীন খোকার কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে কয়রার প্রগতি শিশুশিক্ষা নিকেতন এবং সরকারি জমির ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলা বিতর্ক, প্রশাসন ও স্থানীয়দের নজরে এসেছে। এই ঘটনা সরকারের নিয়ম-কানুন, শিক্ষাক্ষেত্রে নৈতিকতা এবং স্থানীয় প্রশাসনের কার্যক্রমের উপর প্রশ্ন তোলে, যা সমাধান না হলে সরকারি সম্পত্তি ও শিক্ষার মান উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

স্থানীয় সরকারে আদিলুর, তথ্যে রিজওয়ানা, ক্রীড়া মন্ত্রণালয় পেলেন আসিফ নজরুল

অর্পিত সম্পত্তিতে পাকা ভবন তুলে ভাড়া আদায়

 নুরুল আমীন খোকার অবৈধ কর্মকাণ্ডে স্থানীয় সমালোচনা

আপডেট সময় ১২:৪২:৪৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২ ডিসেম্বর ২০২৫

খুলনার কয়রায় প্রগতি শিশুশিক্ষা নিকেতনের নামে ইজারা নেওয়া সরকারি অর্পিত (ভিপি) জমিতে পাকা ভবন নির্মাণ, দোকান বরাদ্দ এবং বিপুল পরিমাণ ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে উপজেলার কলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক এবং বর্তমানে প্রগতি শিশুশিক্ষা নিকেতনের পরিচালনা কমিটির সভাপতি নুরুল আমীন খোকার বিরুদ্ধে। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে তিনি মদিনাবাদের ওই জমিতে নির্মিত ১৮টি দোকান থেকে বছরে প্রায় পাঁচ লাখ ৭৬ হাজার টাকা ভাড়া আদায় করেছেন। এছাড়া দোকানের অবস্থান বা ‘পজিশন’ বাবদ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে প্রায় ৫৮ লাখ টাকা।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, নুরুল আমীন খোকা শিক্ষকতার অবস্থায় সরকারি সম্পত্তি ব্যবহার করে ব্যক্তিগত আর্থিক সুবিধা নেন এবং সরকারি নিয়ম ভেঙে জমির ওপর পাকা স্থাপনা নির্মাণ করেন। এমনকি প্রতিষ্ঠান পরিচালনার নামে ভাড়া আদায় করলেও প্রকৃতপক্ষে প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়ন তেমন হয়নি।

উপজেলা ভূমি অফিস সূত্র জানায়, সদর ইউনিয়নের মদিনাবাদ মৌজার এসএ খতিয়ান নং ৩৫৬ ও ৩৫৭—এই জমির মালিক ছিলেন বিষ্ণুপদ স্বর্ণকার, দুর্গাপদ স্বর্ণকার, বিজয়কৃষ্ণ স্বর্ণকার ও সুপদ স্বর্ণকার। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর তারা ভারতে চলে গেলে জমিটি সরকারের দখলে আসে। ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে প্রগতি শিশুশিক্ষা নিকেতন কর্তৃপক্ষের আবেদনের পর ৩৩ শতাংশ জমি একসনা ইজারা দেওয়া হয়। ইজারা শর্ত অনুযায়ী এই জমি কেবল শিক্ষামূলক কার্যক্রমের জন্য ব্যবহার করা যাবে; সেখানে পাকা ভবন নির্মাণ বা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল।

প্রথমে প্রতি শতাংশ ২০ টাকা হারে প্রতিবছরে ৬৬০ টাকা ইজারা নেওয়া হলেও পরে তা বাড়িয়ে প্রতি শতাংশ ৮০ টাকা হারে ২ হাজার ৬৪০ টাকা করা হয়। আজও একই হার বজায় আছে। কিন্তু এই ইজারা সত্ত্বেও নুরুল আমীন খোকা সরকারি অনুমতি ছাড়া পাকা ভবন নির্মাণ করেছেন।

স্থানীয়রা জানায়, শুরুতে এখানে শিশুদের জন্য টিনের চালা ও কাঠের বেড়ার ঘর নির্মাণ করা হয়েছিল। পরে সেই অস্থায়ী স্থাপনা ভেঙে ২০১৮ সালে দুইতলা ভবন তৈরি করা হয়। একই সময়ে সড়কের পাশে সারিবদ্ধভাবে ১৮টি দোকান নির্মাণ করা হয় এবং সেগুলো থেকে ভাড়া নেওয়া শুরু হয়। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তিপত্র করা হয়। ভাড়াটিয়ারাও জানিয়েছেন, তারা জানতেন না দোকানগুলো সরকারি জমিতে নির্মিত কিনা।

গোলাম রসুল নামে একজন ভাড়াটিয়া জানান, “দুই বছর আগে ৬ লাখ টাকা অগ্রিম দিয়ে দুটি দোকান ভাড়া নিয়েছি। প্রতি মাসে ৬ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়। ভাড়ার টাকা দিতে হয় নুরুল আমীনের স্ত্রী ফাতেমা সুলতানাকে।” অন্যান্য ভাড়াটিয়াও একই তথ্য দিয়েছেন। প্রতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে সবাই ভাড়া প্রদানের জন্য ফাতেমা সুলতানার কাছে টাকা জমা দেন।

নুরুল আমীন খোকা এবং তাঁর স্ত্রী ফাতেমা সুলতানা—যিনি বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক—দোকান ভাড়া নেওয়ার দায়িত্ব সামলেছেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠান পরিচালনার খরচ ও মেরামতের কথা বলে এই ভাড়া নেওয়া হলেও প্রকৃতপক্ষে এর কোনো সঠিক হিসাব বা স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

গত পাঁচ বছরে প্রগতি শিশুশিক্ষা নিকেতনের উন্নয়নের জন্য সরকারি তহবিল এবং অন্যান্য প্রকল্প থেকে প্রায় ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, দোকানভাড়ার আয়ের ব্যবহার এবং প্রকল্পের বরাদ্দের মধ্যে স্বচ্ছতা নেই। এতে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে কত টাকা ব্যবহার হয়েছে এবং কত টাকা ব্যক্তিগতভাবে নিয়েছে নুরুল আমীন।

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, অর্পিত সম্পত্তির শ্রেণি পরিবর্তন করে পাকা ভবন নির্মাণ করা যায় না। শুধুমাত্র সরকার দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত দিলে এবং সেই বন্দোবস্তে অনুমতি থাকলে পাকা ভবন বৈধভাবে নির্মাণ করা যায়। কিন্তু নুরুল আমীন খোকা সরকারি অনুমতি ছাড়াই জমিতে ভবন নির্মাণ করেছেন এবং সেই ভবন থেকে দোকান ভাড়া আদায় করেছেন। উপজেলা ভূমি অফিসের সহকারী সায়রাত বিশ্বাস বলেন, “অর্পিত সম্পত্তি নিয়ে কেউ তা অন্য কারও কাছে ভাড়া দিতে পারেন না। পাকা ভবনও নির্মাণ করা যাবে না। নিয়ম লঙ্ঘন হলে ইজারা বাতিলসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

অভিযোগের বিষয়ে ফাতেমা সুলতানা কোনো মন্তব্য করতে চাননি। নুরুল আমীন খোকা জানিয়েছেন, “একটি প্রতিষ্ঠান চালাতে অনেক খরচ হয়। সেই খরচ মেটাতেই দোকান ভাড়া ব্যবহার করা হয়।” কিন্তু তিনি পাকা ভবন নির্মাণের অনুমতি না নেওয়া, সরকারি জমি বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার এবং দোকানভাড়ার প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল বাকী জানান, “এ ধরনের অভিযোগ আগে জানা ছিল না। তবে সত্যতা প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

স্থানীয়দের মধ্যে নুরুল আমীন খোকাকে নিয়ে সমালোচনা বিরাট। একজন সরকারি শিক্ষক হয়েও তিনি সরকারি জমি ব্যবহার করে নিজস্ব আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেছেন। একাধিক ব্যবসায়ী ও ভাড়াটিয়ার অভিযোগের ভিত্তিতে বলা যায়, নুরুল আমীন খোকা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থে সরকারি সম্পত্তি ব্যবহার করছেন।

দোকানগুলো থেকে আদায়কৃত ভাড়া এবং অগ্রিম টাকা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে ন্যায্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। আইন অনুযায়ী, সরকারি অর্পিত সম্পত্তি ব্যবহার করে পাকা ভবন নির্মাণ এবং বাণিজ্যিক ভাড়া নেওয়া সম্পূর্ণ অবৈধ। ভূমি অফিস ও উপজেলা প্রশাসনের দৃষ্টিতে এটি গুরুতর লঙ্ঘন।

প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে থাকা একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এমন কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকা স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এলাকার লোকজন বলছেন, একজন শিক্ষকের পেশাগত নৈতিকতা এবং সরকারি সম্পত্তি ব্যবহারের নিয়মকানুন তিনি লঙ্ঘন করেছেন।

অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নুরুল আমীন খোকা পাকা ভবন নির্মাণ, দোকান বরাদ্দ, অগ্রিম নেওয়া এবং নিয়মিত ভাড়া আদায়—সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেছেন। এই কর্মকাণ্ডের কারণে প্রতিষ্ঠানটির স্বচ্ছতা, সরকারি তহবিলের ব্যবহার এবং স্থানীয়দের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় ভাড়া থেকে নেওয়া অর্থের ব্যবহার এবং ভবন নির্মাণে অনুমতি না নেওয়ার বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসলে, ইজারা বাতিলসহ গুরুতর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নুরুল আমীন খোকা নিজেকে শিক্ষক এবং সভাপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়ে সরকারি সম্পত্তিকে ব্যক্তিগত আর্থিক সুবিধার জন্য ব্যবহার করেছেন।

এই ঘটনার ফলে সরকারি সম্পত্তি ব্যবহারের স্বচ্ছতা এবং স্থানীয় প্রশাসনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নও উঠেছে। যদি প্রশাসন যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে, এটি অন্যদের জন্যও অনৈতিক precedent তৈরি করতে পারে।

নুরুল আমীন খোকার কর্মকাণ্ডের প্রভাব স্কুলের বর্তমান শিক্ষার মান, প্রতিষ্ঠানের সুনাম এবং স্থানীয় জনমতেও পড়েছে। শিক্ষকতার স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও, সরকারি সম্পত্তি ব্যবহারে তার এমন দৃষ্টান্ত স্থানীয়দের মধ্যে সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রূপ নিয়েছে।

ভবিষ্যতে প্রশাসন ও ভূমি অফিস এই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করতে আরও কঠোর নজরদারি আর নিয়মিত অডিট করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, নুরুল আমীন খোকার কর্মকাণ্ডের সঠিক তদন্ত এবং আইনগত ব্যবস্থা না নিলে, সরকারি সম্পত্তি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ঝুঁকির মুখে পড়বে।

অর্পিত সম্পত্তিতে অবৈধভাবে পাকা ভবন নির্মাণ এবং বাণিজ্যিক দোকান থেকে বিপুল অর্থ আদায়—এটি শুধু আইন লঙ্ঘন নয়, এটি শিক্ষাক্ষেত্রে দৃষ্টান্তহীন অনৈতিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্থানীয়রা প্রশাসনের হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে এমন অবৈধ কর্মকাণ্ড পুনরায় না ঘটে।

প্রতিষ্ঠানের বর্তমান প্রধান শিক্ষক ফাতেমা সুলতানা অভিযোগের বিষয়ে চুপ থাকলেও, প্রশাসনের তদন্তে প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ পেলে নুরুল আমীন খোকার দায় ও অনিয়ম স্পষ্ট হবে। স্থানীয়দের মতে, একজন শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে তার দায় দায়িত্বপূর্ণ হওয়া উচিত, কিন্তু তিনি সরকারি সম্পত্তি ব্যবহার করে নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করেছেন।

এ ঘটনা শুধু স্থানীয় নয়, সমগ্র খুলনার শিক্ষাক্ষেত্র এবং সরকারি সম্পত্তির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সতর্কবার্তা বহন করছে। প্রশাসনের নজরদারি, ভূমি অফিসের কার্যক্রম এবং স্থানীয় জনমতের চাপ যদি যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হয়, তবে ভবিষ্যতে এমন অনিয়ম প্রতিরোধ সম্ভব।

অতএব, নুরুল আমীন খোকার কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে কয়রার প্রগতি শিশুশিক্ষা নিকেতন এবং সরকারি জমির ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলা বিতর্ক, প্রশাসন ও স্থানীয়দের নজরে এসেছে। এই ঘটনা সরকারের নিয়ম-কানুন, শিক্ষাক্ষেত্রে নৈতিকতা এবং স্থানীয় প্রশাসনের কার্যক্রমের উপর প্রশ্ন তোলে, যা সমাধান না হলে সরকারি সম্পত্তি ও শিক্ষার মান উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।