ঢাকা ১২:২৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
দুর্নীতির অভিযোগে বরখাস্ত আরিফুরের পুনর্বহালের তদবির সব আন্দোলনের অনুপ্রেরণা ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম : রিজভী নীলকুঞ্জ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগ ও একজন সংবাদকর্মীর জাতীয় সম্মান প্রাপ্তি পিপিআর বিধিমালা ভেঙে সমাজসেবা অধিদপ্তরের কামরুল- ফিরাদুলের পৌনে ৭ কোটি টাকা দুর্নীতি দুখু মিয়ার ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে বাংলাদেশ ভূমিহীন আন্দোলনের শ্রদ্ধাঞ্জলি সৌদি থেকে আত্রাইয়ের সাতজনের মরদেহ দেশে আসছে আজ কুমিল্লায় দুই সাংবাদিকের ওপর হামলা, প্রধান আসামি গ্রেপ্তার নওগাঁর ধামইরহাটে ১ হাজার ৫৮০পিস ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট উদ্ধার বরগুনায় প্লাস্টিকের ব্যাগে ফেলে রাখা শিশুকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় প্রেরণ  প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ ও প্রতিবাদলিপি

বালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনিয়মের মহোৎসব

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার পাইকুরাটি ইউনিয়নের বালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলছে অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও জবাবদিহিতাহীনতার চর্চা। শিক্ষক অনুপস্থিতি, সময়মতো স্কুল না খোলা, জাল হাজিরা এবং রাজনৈতিক প্রভাবে দায়িত্বহীনতার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় অভিভাবক ও এলাকাবাসী। স্কুল সূত্র ও স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক থেকে শুরু করে সহকারী শিক্ষক পর্যন্ত জড়িয়ে পড়েছেন এই অনিয়মে। অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের কিছু কর্মকর্তা প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্যভাবে এসব অনিয়মকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন। গত বৃহস্পতিবার উপজেলা প্রশাসনের অফিসার (টিও) মানবেন্দ্র ও এটিও সাজ্জাদের বরাত দিয়ে জানানো হয়, প্রধান শিক্ষিকা শেলী ১৯ এবং ২০ নভেম্বর সরকারি ছুটিতে ছিলেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ১৯ তারিখের হাজিরা খাতায় শেলীর উপস্থিতি দেখানো হয়েছে। সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। স্থানীয়দের ধারণা, প্রধান শিক্ষিকাকে রক্ষার জন্যই হঠাৎ করে ‘বেআইনি ছুটির কাগজ’ তৈরির চেষ্টা হয়।
২১ শিক্ষার্থীর জন্য ৫ শিক্ষক, তবু ক্লাস নেই : বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা মাত্র ২১ জন। মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকা একজন ছাড়া কাগজপত্রে উপস্থিত দেখানো হয়েছে আরও চারজন শিক্ষককে। কিন্তু বাস্তবে প্রতিদিন দুই থেকে তিন শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকলেও রোলকল নেওয়া হয় না। অভিভাবকদের অভিযোগ, বছরের পর বছর শিক্ষক অনুপস্থিতি ও হাজিরা জালিয়াতির মাধ্যমে চলেছে বিদ্যালয়টি। সহকারী শিক্ষক মেহেদী হাসান ডালির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র সহকারী শিক্ষক মেহেদী হাসান ডালি। অভিযোগ রয়েছে, তিনি আগাম সাত দিনের হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর দিয়ে যান। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিদ্যালয়ে না এসেও ‘উপস্থিত’ দেখিয়ে সুবিধা নেন। ১২ নভেম্বর বিএনপি মনোনীত এমপি প্রার্থী আনিসুল হকের পথসভায় তার অংশগ্রহণের কথাও স্থানীয়রা উল্লেখ করেন, অথচ ওইদিনও হাজিরা খাতায় তার উপস্থিতি দেখানো হয়েছে। ডালি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “এগুলো মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য সাজানো। আমি স্কুলে যাই, তবে দুইটা আড়াইটার সময় চলে আসি।” ধর্মপাশা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মানবেন্দ্র বলেন, বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে পূর্বেও অভিযোগ উঠেছিল, তখন সতর্ক করা হয়েছিল। নতুন অভিযোগের তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও দাবি করেন, বিদ্যালয়টি বাতিল করার জন্য আবেদন করা হয়েছে।
শিক্ষাব্যবস্থায় প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ছায়া : স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক বা প্রশাসনিকভাবে প্রভাবশালী কোনো শিক্ষক হলে দায়িত্ব পালনে আরও গাফিলতি বাড়ে। আর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কঠোর ব্যবস্থা নেয় না। এতে শিক্ষার মান ভেঙে পড়ছে, অভিভাবকদের আস্থা নষ্ট হচ্ছে, আর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। অভিভাবকরা বলেন, শিক্ষক অনুপস্থিতি, জালিয়াতি, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও প্রশাসনিক উদাসীনতার ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা। দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের শাস্তির আওতায় না আনলে অনিয়ম বন্ধ হবে না।
স্থানীয়রা মনে করেন, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় যদি জাতীয় নীতিমালার বাইরে থেকে প্রভাব, ক্ষমতা ও রাজনীতির ছায়ায় চলে, তার মূল্য দিতে হয় পুরো জাতিকে। তাই বালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই ঘটনা কেবল একটি এলাকার সমস্যা নয়, বরং বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার সামগ্রিক দুরবস্থার প্রতিচ্ছবি।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

দুর্নীতির অভিযোগে বরখাস্ত আরিফুরের পুনর্বহালের তদবির

বালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনিয়মের মহোৎসব

আপডেট সময় ০৭:০৩:২৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ নভেম্বর ২০২৫

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার পাইকুরাটি ইউনিয়নের বালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলছে অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও জবাবদিহিতাহীনতার চর্চা। শিক্ষক অনুপস্থিতি, সময়মতো স্কুল না খোলা, জাল হাজিরা এবং রাজনৈতিক প্রভাবে দায়িত্বহীনতার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় অভিভাবক ও এলাকাবাসী। স্কুল সূত্র ও স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক থেকে শুরু করে সহকারী শিক্ষক পর্যন্ত জড়িয়ে পড়েছেন এই অনিয়মে। অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের কিছু কর্মকর্তা প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্যভাবে এসব অনিয়মকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন। গত বৃহস্পতিবার উপজেলা প্রশাসনের অফিসার (টিও) মানবেন্দ্র ও এটিও সাজ্জাদের বরাত দিয়ে জানানো হয়, প্রধান শিক্ষিকা শেলী ১৯ এবং ২০ নভেম্বর সরকারি ছুটিতে ছিলেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ১৯ তারিখের হাজিরা খাতায় শেলীর উপস্থিতি দেখানো হয়েছে। সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। স্থানীয়দের ধারণা, প্রধান শিক্ষিকাকে রক্ষার জন্যই হঠাৎ করে ‘বেআইনি ছুটির কাগজ’ তৈরির চেষ্টা হয়।
২১ শিক্ষার্থীর জন্য ৫ শিক্ষক, তবু ক্লাস নেই : বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা মাত্র ২১ জন। মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকা একজন ছাড়া কাগজপত্রে উপস্থিত দেখানো হয়েছে আরও চারজন শিক্ষককে। কিন্তু বাস্তবে প্রতিদিন দুই থেকে তিন শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকলেও রোলকল নেওয়া হয় না। অভিভাবকদের অভিযোগ, বছরের পর বছর শিক্ষক অনুপস্থিতি ও হাজিরা জালিয়াতির মাধ্যমে চলেছে বিদ্যালয়টি। সহকারী শিক্ষক মেহেদী হাসান ডালির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র সহকারী শিক্ষক মেহেদী হাসান ডালি। অভিযোগ রয়েছে, তিনি আগাম সাত দিনের হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর দিয়ে যান। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিদ্যালয়ে না এসেও ‘উপস্থিত’ দেখিয়ে সুবিধা নেন। ১২ নভেম্বর বিএনপি মনোনীত এমপি প্রার্থী আনিসুল হকের পথসভায় তার অংশগ্রহণের কথাও স্থানীয়রা উল্লেখ করেন, অথচ ওইদিনও হাজিরা খাতায় তার উপস্থিতি দেখানো হয়েছে। ডালি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “এগুলো মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য সাজানো। আমি স্কুলে যাই, তবে দুইটা আড়াইটার সময় চলে আসি।” ধর্মপাশা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মানবেন্দ্র বলেন, বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে পূর্বেও অভিযোগ উঠেছিল, তখন সতর্ক করা হয়েছিল। নতুন অভিযোগের তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও দাবি করেন, বিদ্যালয়টি বাতিল করার জন্য আবেদন করা হয়েছে।
শিক্ষাব্যবস্থায় প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ছায়া : স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক বা প্রশাসনিকভাবে প্রভাবশালী কোনো শিক্ষক হলে দায়িত্ব পালনে আরও গাফিলতি বাড়ে। আর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কঠোর ব্যবস্থা নেয় না। এতে শিক্ষার মান ভেঙে পড়ছে, অভিভাবকদের আস্থা নষ্ট হচ্ছে, আর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। অভিভাবকরা বলেন, শিক্ষক অনুপস্থিতি, জালিয়াতি, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও প্রশাসনিক উদাসীনতার ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা। দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের শাস্তির আওতায় না আনলে অনিয়ম বন্ধ হবে না।
স্থানীয়রা মনে করেন, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় যদি জাতীয় নীতিমালার বাইরে থেকে প্রভাব, ক্ষমতা ও রাজনীতির ছায়ায় চলে, তার মূল্য দিতে হয় পুরো জাতিকে। তাই বালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই ঘটনা কেবল একটি এলাকার সমস্যা নয়, বরং বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার সামগ্রিক দুরবস্থার প্রতিচ্ছবি।