ঢাকা ০৯:৩৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
আইইউবিতে মঞ্চস্থ হলো ইবসেনের কালজয়ী নাটকের আধুনিক রূপ নির্বাচনের পর পদত্যাগ করতে চান রাষ্ট্রপতি : রয়টার্স স্থানীয় সরকারে আদিলুর, তথ্যে রিজওয়ানা, ক্রীড়া মন্ত্রণালয় পেলেন আসিফ নজরুল ঢাকা-২০ আসনে এনসিপির প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার নাবিলা তাসনিদ নিয়ম ভাঙলেই এক্রিডিটেশন বাতিল, হুঁশিয়ারি বিসিবির ৩২ ঘণ্টায়ও সন্ধান মেলেনি শিশু সাজিদের, হাল ছাড়ছে না ফায়ার সার্ভিস দাফনের সময় কবরে পড়ে যায় মোবাইল, এক রাত পর মাটি সরিয়ে উদ্ধার তারাগঞ্জে গোপন নিয়োগ ও সাংবাদিক হেনস্তার অভিযোগে মানববন্ধন মেসির সঙ্গে নিজ থেকেই দেখা করবেন শাহরুখ সংবর্ধনা পাচ্ছেন হকি বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা আমিরুল

“দুর্নীতির পাহাড় গড়া হারুন এখন পদোন্নতির তালিকায়”

নিয়োগের শুরুটাই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। সেই অনিয়মের বীজ থেকেই অঙ্কুরিত হয়েছে এক প্রশাসনিক কেলেঙ্কারির গাছ, যার শাখা-প্রশাখা আজ ছড়িয়ে পড়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পর্যন্ত। যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের (জয়েন্ট স্টক) সহকারী রেজিস্ট্রার মো. হারুন-অর-রশিদ—একজন সরকারি কর্মকর্তা, যিনি অভিযোগ অনুযায়ী দুর্নীতি, ঘুষ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং তদন্ত ধামাচাপা দেওয়ার মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন কোটি কোটি টাকার সাম্রাজ্য। আর অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, সবকিছুর পরও পদোন্নতি পাচ্ছেন তিনি—‘বঞ্চিত কোটায়’!
বিতর্কিত নিয়োগ থেকে প্রভাবশালী পদে : দুদক ও মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, মো. হারুন-অর-রশিদ ১৯৯২ সালে অফিস সহকারী (এলডি ক্লার্ক) পদে জয়েন্ট স্টকে চাকরিতে যোগ দেন। নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে তখন থেকেই ছিল বিতর্ক। অভিযোগ—নিয়োগটি হয়েছিল রাজনৈতিক সুপারিশ আর টাকার বিনিময়ে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। চাকরির কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি নানা কৌশলে “উচ্চমান সহকারী ও এক্সামিনার (অ্যাকাউন্টস)” পদে পদোন্নতি পান। যদিও পদোন্নতি কমিটি তাঁকে সুপারিশ করেছিল ইন্সপেক্টর পদে, রহস্যজনকভাবে আদেশ জারি হয় অন্য পদের জন্য। ওই সময় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তিনি এ পদোন্নতি আদায় করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই পদোন্নতির পর থেকেই শুরু হয় হারুনের দুর্নীতির স্বর্ণযুগ। একদিকে সরকারি পদ, অন্যদিকে প্রভাবশালী রাজনৈতিক লবি—এই দুই মিলে তিনি হয়ে ওঠেন জয়েন্ট স্টকের “অঘোষিত ক্ষমতাধর কর্মকর্তা”।
নিম্নবেতন থেকে কোটিপতি : অফিস সহকারী হিসেবে তাঁর প্রাথমিক বেতন ছিল মাত্র তিন হাজার টাকা। কিন্তু দুই দশকের মাথায় তিনি হয়ে ওঠেন একাধিক বাড়ি, ফ্ল্যাট ও ব্যবসার মালিক। সূত্র অনুযায়ী, হারুনের নামে ও আত্মীয়স্বজনদের নামে অর্জিত সম্পদের পরিমাণ কোটি টাকারও বেশি।
তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সম্পদসমূহ হলো- খুলনার টুটপাড়া ও বসুপাড়ায় দুটি দোতলা বাড়ি, ঢাকার মিরপুর থানার বড়বাগে শেল কোম্পানির ১ নম্বর ভবনের চতুর্থ তলায় একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, মিরপুর ডিওএইচএসে মেয়ের নামে আরেকটি ফ্ল্যাট, নিজ জেলা যশোরে একাধিক প্লট ও জমি, এবং রাজধানীর কারওয়ান বাজারের শাহ আলী টাওয়ারে একটি কনসালটেন্সি ফার্ম, যা তাঁর স্ত্রী অ্যাডভোকেট মিথিলার নামে নিবন্ধিত, কিন্তু পরিচালনা করেন হারুন নিজেই।
অফিসে প্রভাব, বাইরে ‘কনসালটেন্ট’ : রাজশাহীতে বদলি হওয়ার আগ পর্যন্ত হারুন প্রায় প্রতিদিনই বসতেন ওই ফার্মে। সেখানে বসে তিনি জয়েন্ট স্টকের সরকারি নথিপত্র নিজের দখলে নিয়ে কাজ করতেন। কোনো কোম্পানি নতুনভাবে নিবন্ধন নিতে বা নবায়ন করতে এলে তিনি সেই কাগজ নিজের অফিসের পরিবর্তে ফার্মে এনে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতেন। একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কাগজপত্রে ঘাটতি থাকলে তিনি “ম্যানেজ করে” অনুমোদন দিতেন—বিনিময়ে অর্থ আদায় করতেন সরাসরি বা পরোক্ষভাবে। একজন সাবেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “হারুন ছিল অফিসে সবার ভয়। কেউ কিছু বললে সঙ্গে সঙ্গে বলত—‘আমি শিখরের আত্মীয়।’ এই পরিচয়ের কারণেই কেউ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সাহস করত না।” উল্লেখ্য, তিনি বারবার নিজের পরিচয় দিতেন প্রধানমন্ত্রীর এপিএস সাইফুজ্জামান শিখরের আত্মীয় হিসেবে। এছাড়া প্রতিরক্ষা বাহিনী ও পুলিশ প্রশাসনে তাঁর আত্মীয়-স্বজন আছে বলে ভয় দেখাতেন কর্মকর্তাদের।
রাজশাহীতে বদলির আগে হারুন ছিলেন জয়েন্ট স্টকের চট্টগ্রাম অফিসে। সেখানে তার বিরুদ্ধে ওঠে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও ঘুষ গ্রহণের একাধিক অভিযোগ। অভিযোগের ভিত্তিতে ২০১৩ সালে দুদকের চট্টগ্রাম কার্যালয় তদন্ত শুরু করে। তদন্ত নথি ছিল ঢাকার ফাইল নং-০৪.০১.০০০০.৬২১.২৬.০০৫.১৮(অংশ-৫).৬২৬২৩। কিন্তু তদন্তের অগ্রগতি থমকে যায়। ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর তদন্তটি কমিশন সভায় ওঠে। সিদ্ধান্ত হয় পুনরায় অনুসন্ধান শুরু করার। ২০২০ সালের ১৯ অক্টোবর তদন্তের ফাইল পাঠানো হয় দুদকের চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এ। সেখানে দায়িত্ব পান সহকারী পরিচালক মো. শহীদুল ইসলাম মোড়ল। মোড়ল ওই বছর ২৭ অক্টোবর জয়েন্ট স্টক কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেন—হারুনের চাকরিকালীন মোট বেতন-ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক তথ্য দিতে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, অচিরেই তদন্তটি ‘নিষ্ক্রিয়’ হয়ে যায়। অভিযোগ, হারুন প্রভাব খাটিয়ে দুদকের অভ্যন্তরে ফাইলটি ধামাচাপা দেন।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে হারুনের বিরুদ্ধে তদন্ত করছেন সংস্থার সহকারী পরিচালক রনজিৎ কুমার। তাঁর দায়িত্ব হলো হারুনের অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধান। তদন্ত এখন সম্পদ বিবরণী চাওয়ার পর্যায়ে। কিন্তু ঠিক এই সময়েই ঘটে যায় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। আগস্ট মাসে নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নেন হারুন। নিজেকে হঠাৎ ‘বঞ্চিত কর্মকর্তা’ হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করেন।
নতুন কৌশলে হারুন এবার পদোন্নতির তদবির শুরু করেন। জয়েন্ট স্টকের বর্তমান মহাপরিচালক মো. মিজানুর রহমান এনডিসি—যিনি হাসিনার আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত—তাঁর সহায়তায় হারুনের পদোন্নতির প্রস্তাব পাঠানো হয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয় নিয়ম অনুযায়ী দুদকের এসএসবি ক্লিয়ারেন্স চেয়ে পত্র পাঠায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই ক্লিয়ারেন্স পাওয়া যায় “সুপারসনিক গতিতে”। দুদকের সচিব খুরশীদা ইয়াসমিন স্বাক্ষর করেন স্মারক নং ০০.০১.০০০০.১০৩.০৬.০০৪.২৪.১৩২৪/১(২)—যার মাধ্যমে হারুনের পদোন্নতির সবুজ সংকেত মেলে। অর্থাৎ, যে দুদক তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত করছে, সেই সংস্থাই আবার তাঁকে “দূষণমুক্ত” সার্টিফিকেট দিয়ে দেয়!
অন্যদিকে, ভুক্তভোগী কর্মকর্তা মো. আনিসুজ্জামান খান কর্তৃক করা অভিযোগের ভিত্তিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও হারুনের বিরুদ্ধে আরেকটি তদন্ত শুরু করে। ফাইল নম্বর ২৬.০০.০০০০.০৮৮.২৭.০২৮.১৭.২১৮- তবে সেটিও পরিণত হয় “ম্যানেজড রিপোর্টে”। সূত্র বলছে, প্রশাসন অনুবিভাগের কিছু কর্মকর্তাকে আর্থিকভাবে প্রভাবিত করে হারুন ওই তদন্ত থেকেও দায়মুক্তি নেন।
হারুনের দুর্নীতির ধরন ছিল বহুমাত্রিক যেমন- সরকারি কাগজ বেসরকারি ফার্মে নিয়ে যাওয়া, নবায়ন ফি বা নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় ঘুষ আদায়, অন্য কর্মকর্তাদের ভয়ের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার, দুদকের তদন্ত ধামাচাপা দিতে অভ্যন্তরীণ লবিং, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিচয়ের অপব্যবহার। একাধিক কর্মকর্তা জানান, হারুনের মতো কর্মকর্তার কারণে জয়েন্ট স্টকের কাজকর্মে স্বচ্ছতা হারিয়েছে। “অফিসে তার লোকজন ছাড়া কিছুই চলে না”এমন মন্তব্য করেছেন দফতরের একজন প্রবীণ কর্মচারী।
দুদকের নথিপত্রে হারুনের বিরুদ্ধে তিন দফায় তদন্তের সিদ্ধান্ত থাকলেও, কোনো অনুসন্ধানই শেষ হয়নি। অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, দুদকের কিছু কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে “অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট” গড়ে তুলেছেন, যারা প্রভাবশালীদের ফাইলকে আলতোভাবে “ঘুম পাড়িয়ে” দেন। এখন প্রশ্ন উঠেছে দুদকের অনুসন্ধান বিভাগ কি আসলেই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে?
যদি একাধিক তদন্ত স্থবির থাকে, আর অভিযুক্ত কর্মকর্তা পদোন্নতি পেয়ে যান, তবে প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি কোথায় দাঁড়াবে?
এখন প্রশ্ন উঠছে একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা কীভাবে এতগুলো অভিযোগ, তদন্ত ও দুর্নীতির পরও পদোন্নতি পেতে পারেন? দায় কি দুদকের, না বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের, না কি গোটা প্রশাসনিক ব্যবস্থার? দুর্নীতিবিরোধী সংগঠন “সুশাসনের জন্য নাগরিক” (সুজন)-এর এক প্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এই ধরনের ঘটনা দুদকের অস্তিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। যেখানে অভিযুক্ত ব্যক্তিই দুদকের ফাইল নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সেখানে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচারের আশা করব কীভাবে?”
এখনো পর্যন্ত হারুনের পদোন্নতির আদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে জারি না হলেও প্রক্রিয়াটি দ্রুত এগোচ্ছে। সবশেষ খবর অনুযায়ী, তিনি “আওয়ামী আমলে বঞ্চিত কর্মকর্তা” হিসেবে বিশেষ কোটায় প্রমোশন পাচ্ছেন। অর্থাৎ যিনি ওই আমলেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন, তিনিই এখন “বঞ্চিত”! এ যেন বঞ্চিতদের নয়, দুর্নীতিবাজদের উৎসব।
হারুন-অর-রশিদের এই কাহিনি কেবল একজন কর্মকর্তার নয়—এটি বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতির এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি। যেখানে দুর্নীতি ধামাচাপা দেওয়া হয়, তদন্ত নিস্তেজ হয়, আর অপরাধীরাই পুরস্কৃত হয়। আজও দুদকের ফাইলে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো “চলমান” লেখা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সব ফাইলই যেন ঘুমিয়ে আছে। অন্যদিকে হারুন নিজের প্রভাব ও টাকায় পদোন্নতির দ্বারপ্রান্তে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

আইইউবিতে মঞ্চস্থ হলো ইবসেনের কালজয়ী নাটকের আধুনিক রূপ

“দুর্নীতির পাহাড় গড়া হারুন এখন পদোন্নতির তালিকায়”

আপডেট সময় ০১:৪৪:২৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ নভেম্বর ২০২৫

নিয়োগের শুরুটাই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। সেই অনিয়মের বীজ থেকেই অঙ্কুরিত হয়েছে এক প্রশাসনিক কেলেঙ্কারির গাছ, যার শাখা-প্রশাখা আজ ছড়িয়ে পড়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পর্যন্ত। যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের (জয়েন্ট স্টক) সহকারী রেজিস্ট্রার মো. হারুন-অর-রশিদ—একজন সরকারি কর্মকর্তা, যিনি অভিযোগ অনুযায়ী দুর্নীতি, ঘুষ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং তদন্ত ধামাচাপা দেওয়ার মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন কোটি কোটি টাকার সাম্রাজ্য। আর অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, সবকিছুর পরও পদোন্নতি পাচ্ছেন তিনি—‘বঞ্চিত কোটায়’!
বিতর্কিত নিয়োগ থেকে প্রভাবশালী পদে : দুদক ও মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, মো. হারুন-অর-রশিদ ১৯৯২ সালে অফিস সহকারী (এলডি ক্লার্ক) পদে জয়েন্ট স্টকে চাকরিতে যোগ দেন। নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে তখন থেকেই ছিল বিতর্ক। অভিযোগ—নিয়োগটি হয়েছিল রাজনৈতিক সুপারিশ আর টাকার বিনিময়ে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। চাকরির কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি নানা কৌশলে “উচ্চমান সহকারী ও এক্সামিনার (অ্যাকাউন্টস)” পদে পদোন্নতি পান। যদিও পদোন্নতি কমিটি তাঁকে সুপারিশ করেছিল ইন্সপেক্টর পদে, রহস্যজনকভাবে আদেশ জারি হয় অন্য পদের জন্য। ওই সময় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তিনি এ পদোন্নতি আদায় করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই পদোন্নতির পর থেকেই শুরু হয় হারুনের দুর্নীতির স্বর্ণযুগ। একদিকে সরকারি পদ, অন্যদিকে প্রভাবশালী রাজনৈতিক লবি—এই দুই মিলে তিনি হয়ে ওঠেন জয়েন্ট স্টকের “অঘোষিত ক্ষমতাধর কর্মকর্তা”।
নিম্নবেতন থেকে কোটিপতি : অফিস সহকারী হিসেবে তাঁর প্রাথমিক বেতন ছিল মাত্র তিন হাজার টাকা। কিন্তু দুই দশকের মাথায় তিনি হয়ে ওঠেন একাধিক বাড়ি, ফ্ল্যাট ও ব্যবসার মালিক। সূত্র অনুযায়ী, হারুনের নামে ও আত্মীয়স্বজনদের নামে অর্জিত সম্পদের পরিমাণ কোটি টাকারও বেশি।
তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সম্পদসমূহ হলো- খুলনার টুটপাড়া ও বসুপাড়ায় দুটি দোতলা বাড়ি, ঢাকার মিরপুর থানার বড়বাগে শেল কোম্পানির ১ নম্বর ভবনের চতুর্থ তলায় একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, মিরপুর ডিওএইচএসে মেয়ের নামে আরেকটি ফ্ল্যাট, নিজ জেলা যশোরে একাধিক প্লট ও জমি, এবং রাজধানীর কারওয়ান বাজারের শাহ আলী টাওয়ারে একটি কনসালটেন্সি ফার্ম, যা তাঁর স্ত্রী অ্যাডভোকেট মিথিলার নামে নিবন্ধিত, কিন্তু পরিচালনা করেন হারুন নিজেই।
অফিসে প্রভাব, বাইরে ‘কনসালটেন্ট’ : রাজশাহীতে বদলি হওয়ার আগ পর্যন্ত হারুন প্রায় প্রতিদিনই বসতেন ওই ফার্মে। সেখানে বসে তিনি জয়েন্ট স্টকের সরকারি নথিপত্র নিজের দখলে নিয়ে কাজ করতেন। কোনো কোম্পানি নতুনভাবে নিবন্ধন নিতে বা নবায়ন করতে এলে তিনি সেই কাগজ নিজের অফিসের পরিবর্তে ফার্মে এনে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতেন। একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কাগজপত্রে ঘাটতি থাকলে তিনি “ম্যানেজ করে” অনুমোদন দিতেন—বিনিময়ে অর্থ আদায় করতেন সরাসরি বা পরোক্ষভাবে। একজন সাবেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “হারুন ছিল অফিসে সবার ভয়। কেউ কিছু বললে সঙ্গে সঙ্গে বলত—‘আমি শিখরের আত্মীয়।’ এই পরিচয়ের কারণেই কেউ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সাহস করত না।” উল্লেখ্য, তিনি বারবার নিজের পরিচয় দিতেন প্রধানমন্ত্রীর এপিএস সাইফুজ্জামান শিখরের আত্মীয় হিসেবে। এছাড়া প্রতিরক্ষা বাহিনী ও পুলিশ প্রশাসনে তাঁর আত্মীয়-স্বজন আছে বলে ভয় দেখাতেন কর্মকর্তাদের।
রাজশাহীতে বদলির আগে হারুন ছিলেন জয়েন্ট স্টকের চট্টগ্রাম অফিসে। সেখানে তার বিরুদ্ধে ওঠে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও ঘুষ গ্রহণের একাধিক অভিযোগ। অভিযোগের ভিত্তিতে ২০১৩ সালে দুদকের চট্টগ্রাম কার্যালয় তদন্ত শুরু করে। তদন্ত নথি ছিল ঢাকার ফাইল নং-০৪.০১.০০০০.৬২১.২৬.০০৫.১৮(অংশ-৫).৬২৬২৩। কিন্তু তদন্তের অগ্রগতি থমকে যায়। ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর তদন্তটি কমিশন সভায় ওঠে। সিদ্ধান্ত হয় পুনরায় অনুসন্ধান শুরু করার। ২০২০ সালের ১৯ অক্টোবর তদন্তের ফাইল পাঠানো হয় দুদকের চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এ। সেখানে দায়িত্ব পান সহকারী পরিচালক মো. শহীদুল ইসলাম মোড়ল। মোড়ল ওই বছর ২৭ অক্টোবর জয়েন্ট স্টক কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেন—হারুনের চাকরিকালীন মোট বেতন-ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক তথ্য দিতে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, অচিরেই তদন্তটি ‘নিষ্ক্রিয়’ হয়ে যায়। অভিযোগ, হারুন প্রভাব খাটিয়ে দুদকের অভ্যন্তরে ফাইলটি ধামাচাপা দেন।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে হারুনের বিরুদ্ধে তদন্ত করছেন সংস্থার সহকারী পরিচালক রনজিৎ কুমার। তাঁর দায়িত্ব হলো হারুনের অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধান। তদন্ত এখন সম্পদ বিবরণী চাওয়ার পর্যায়ে। কিন্তু ঠিক এই সময়েই ঘটে যায় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। আগস্ট মাসে নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নেন হারুন। নিজেকে হঠাৎ ‘বঞ্চিত কর্মকর্তা’ হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করেন।
নতুন কৌশলে হারুন এবার পদোন্নতির তদবির শুরু করেন। জয়েন্ট স্টকের বর্তমান মহাপরিচালক মো. মিজানুর রহমান এনডিসি—যিনি হাসিনার আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত—তাঁর সহায়তায় হারুনের পদোন্নতির প্রস্তাব পাঠানো হয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয় নিয়ম অনুযায়ী দুদকের এসএসবি ক্লিয়ারেন্স চেয়ে পত্র পাঠায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই ক্লিয়ারেন্স পাওয়া যায় “সুপারসনিক গতিতে”। দুদকের সচিব খুরশীদা ইয়াসমিন স্বাক্ষর করেন স্মারক নং ০০.০১.০০০০.১০৩.০৬.০০৪.২৪.১৩২৪/১(২)—যার মাধ্যমে হারুনের পদোন্নতির সবুজ সংকেত মেলে। অর্থাৎ, যে দুদক তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত করছে, সেই সংস্থাই আবার তাঁকে “দূষণমুক্ত” সার্টিফিকেট দিয়ে দেয়!
অন্যদিকে, ভুক্তভোগী কর্মকর্তা মো. আনিসুজ্জামান খান কর্তৃক করা অভিযোগের ভিত্তিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও হারুনের বিরুদ্ধে আরেকটি তদন্ত শুরু করে। ফাইল নম্বর ২৬.০০.০০০০.০৮৮.২৭.০২৮.১৭.২১৮- তবে সেটিও পরিণত হয় “ম্যানেজড রিপোর্টে”। সূত্র বলছে, প্রশাসন অনুবিভাগের কিছু কর্মকর্তাকে আর্থিকভাবে প্রভাবিত করে হারুন ওই তদন্ত থেকেও দায়মুক্তি নেন।
হারুনের দুর্নীতির ধরন ছিল বহুমাত্রিক যেমন- সরকারি কাগজ বেসরকারি ফার্মে নিয়ে যাওয়া, নবায়ন ফি বা নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় ঘুষ আদায়, অন্য কর্মকর্তাদের ভয়ের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার, দুদকের তদন্ত ধামাচাপা দিতে অভ্যন্তরীণ লবিং, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিচয়ের অপব্যবহার। একাধিক কর্মকর্তা জানান, হারুনের মতো কর্মকর্তার কারণে জয়েন্ট স্টকের কাজকর্মে স্বচ্ছতা হারিয়েছে। “অফিসে তার লোকজন ছাড়া কিছুই চলে না”এমন মন্তব্য করেছেন দফতরের একজন প্রবীণ কর্মচারী।
দুদকের নথিপত্রে হারুনের বিরুদ্ধে তিন দফায় তদন্তের সিদ্ধান্ত থাকলেও, কোনো অনুসন্ধানই শেষ হয়নি। অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, দুদকের কিছু কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে “অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট” গড়ে তুলেছেন, যারা প্রভাবশালীদের ফাইলকে আলতোভাবে “ঘুম পাড়িয়ে” দেন। এখন প্রশ্ন উঠেছে দুদকের অনুসন্ধান বিভাগ কি আসলেই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে?
যদি একাধিক তদন্ত স্থবির থাকে, আর অভিযুক্ত কর্মকর্তা পদোন্নতি পেয়ে যান, তবে প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি কোথায় দাঁড়াবে?
এখন প্রশ্ন উঠছে একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা কীভাবে এতগুলো অভিযোগ, তদন্ত ও দুর্নীতির পরও পদোন্নতি পেতে পারেন? দায় কি দুদকের, না বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের, না কি গোটা প্রশাসনিক ব্যবস্থার? দুর্নীতিবিরোধী সংগঠন “সুশাসনের জন্য নাগরিক” (সুজন)-এর এক প্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এই ধরনের ঘটনা দুদকের অস্তিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। যেখানে অভিযুক্ত ব্যক্তিই দুদকের ফাইল নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সেখানে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচারের আশা করব কীভাবে?”
এখনো পর্যন্ত হারুনের পদোন্নতির আদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে জারি না হলেও প্রক্রিয়াটি দ্রুত এগোচ্ছে। সবশেষ খবর অনুযায়ী, তিনি “আওয়ামী আমলে বঞ্চিত কর্মকর্তা” হিসেবে বিশেষ কোটায় প্রমোশন পাচ্ছেন। অর্থাৎ যিনি ওই আমলেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন, তিনিই এখন “বঞ্চিত”! এ যেন বঞ্চিতদের নয়, দুর্নীতিবাজদের উৎসব।
হারুন-অর-রশিদের এই কাহিনি কেবল একজন কর্মকর্তার নয়—এটি বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতির এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি। যেখানে দুর্নীতি ধামাচাপা দেওয়া হয়, তদন্ত নিস্তেজ হয়, আর অপরাধীরাই পুরস্কৃত হয়। আজও দুদকের ফাইলে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো “চলমান” লেখা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সব ফাইলই যেন ঘুমিয়ে আছে। অন্যদিকে হারুন নিজের প্রভাব ও টাকায় পদোন্নতির দ্বারপ্রান্তে।