৩৫ হাজার টাকার বেতনে মিলনের বিলাসী সাম্রাজ্য, ৪ লাখ টাকার ঘুষে বদলি, ব্যাংকে অস্বাভাবিক লেনদেন জড়িয়ে কর্মকর্তারাও
ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)— রাজধানীর বিদ্যুৎ বিতরণে অন্যতম বড় প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এ প্রতিষ্ঠানের মাঠপর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরেই চলছে দুর্নীতির রাজত্ব, ঘুষের সংস্কৃতি ও অবৈধ সংযোগ বাণিজ্য। সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য—মাত্র ৩৫ হাজার টাকার বেতনের এক লাইনম্যান কীভাবে শত কোটি টাকার মালিক হয়ে উঠেছেন।
এই প্রতিবেদনের কেন্দ্রে আছেন লাইনম্যান মেট মো. মিলন মিয়া (আইডি: ২১২৬৩), বর্তমানে কর্মরত মাতুয়াইল ডিভিশনে। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো শুধু একটি ব্যক্তিকে ঘিরে নয়—বরং ডিপিডিসির অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির অন্ধকার দুনিয়া উন্মোচন করছে।
৩৫ হাজার টাকার বেতন, কিন্তু বিলাসী জীবন : মিলন মিয়ার মাসিক বেতন আনুমানিক ৩৫ হাজার টাকা। তবে তাঁর জীবনযাত্রা, সম্পদ ও সামাজিক অবস্থান দেখে কেউ তা বিশ্বাস করতে রাজি নন। রাজধানীর মুগদা, মাতুয়াইল ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় তাঁর রয়েছে একাধিক বাড়ি, গাড়ি, ফ্ল্যাট ও গ্যারেজ ব্যবসা। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তিনি প্রতিদিন অফিস শেষে নিজস্ব প্রাইভেট কারে বাসায় ফেরেন, সঙ্গে থাকে নিরাপত্তাকর্মীও। এক সহকর্মী বলেন, “লাইনম্যান হয়েও মিলন ভাইয়ের জীবনযাপন এমন যে, মনে হয় কোনো বড় ঠিকাদার বা রাজনীতিক। অফিসে সবার সামনে তিনি বলেন—‘আমার সঙ্গে লাগলে চাকরি যাবে।’ এই ভয়েই কেউ মুখ খোলে না।”
ব্যাংকে অস্বাভাবিক লেনদেনের ছায়া : অর্থনৈতিক গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, গত তিন বছরে মিলন মিয়া ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে প্রায় ৮ কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশই হয়েছে মুগদা ও মাতুয়াইল শাখার স্থানীয় ব্যাংকগুলোতে। লেনদেনের ধরন দেখে মনে হচ্ছে, এগুলো মাসোহারা ও অবৈধ সংযোগ বাণিজ্যের আয়। একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “মিলন মিয়া লাইন সংযোগ, বিল সমন্বয়, মিটার সেটিং, এমনকি অভিযোগ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও টাকা ছাড়া কোনো কাজ করেন না। এই টাকাগুলোই বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁর ব্যাংকে জমা হয়।” এমনকি তাঁর নামে কয়েকটি অটো রিকশা ও হালকা যানবাহনের মালিকানাও পাওয়া গেছে। স্থানীয়রা বলছেন, এগুলো আসলে “বিনিয়োগকৃত ঘুষের টাকা ঘুরানোর পথ”।
ঘুষে বদলির গল্প: মাতুয়াইল ডিভিশনে ৪ লাখ টাকার সিঁড়ি : ডিপিডিসির অভ্যন্তরীণ নীতিমালা অনুযায়ী, একজন মাঠকর্মীকে একটি কর্মস্থলে অন্তত তিন বছর থাকতে হয়। তার আগে বদলির কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু এই নিয়মের তোয়াক্কা না করেই মিলন মিয়া ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর রমনা ডিভিশন থেকে বদলি হয়ে যোগ দেন মাতুয়াইল ডিভিশনে—যেটি অভ্যন্তরীণভাবে পরিচিত “অবৈধ সংযোগের স্বর্গরাজ্য” হিসেবে। সূত্রের দাবি, এই বদলির পেছনে ৪ লাখ টাকার ঘুষ লেনদেন হয়েছে। টাকাটি গিয়েছিল মুগদা ডিভিশনের হিসাব কর্মকর্তা মো. এনায়েত হোসেনুএর মাধ্যমে ডিপিডিসির এইচআর দপ্তরের ডিজিএম (মানবসম্পদ) মনিরুজ্জামানুএর হাতে। এক কর্মকর্তা বলেন, “ডিজিএম মনিরুজ্জামানকেই বলা হয় বদলির গেটকিপার। তাঁর অনুমতি ছাড়া কেউ কোথাও যেতে পারে না। মিলনের বদলি সেই ‘অনুমতি বাণিজ্যের’ ফসল।”
বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, অন্যায্য বদলি বা ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগে প্রমাণ পাওয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে তদন্ত ও বরখাস্তের বিধান রয়েছে। কিন্তু ডিপিডিসিতে এই আইন কার্যত অকার্যকর। মিলনের মতো কর্মচারীরা প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ঘুষ ও প্রভাব দেখিয়ে ‘অস্পর্শযোগ্য’ অবস্থায় থাকেন। মুগদা ডিভিশনে তাঁর আগের সময়ে গ্রাহকদের হয়রানি, সংযোগ বন্ধ করে পুনঃসংযোগের নামে টাকা আদায়, বিল সমন্বয়ের নামে মাসোহারা নেওয়া—এসবের অসংখ্য অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু প্রশাসন নড়েনি।
“শেখ হাসিনার আস্থাভাজন কর্মী” পরিচয়ে ক্ষমতার দম্ভ : মিলন মিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ শুধু ঘুষ নয়—রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করাও তাঁর দক্ষতা। তিনি প্রায়ই নিজেকে পরিচয় দেন “শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের আস্থাভাজন কর্মী” হিসেবে। স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, “মিলন আসলে রাজনীতির লোক না, কিন্তু সে রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে অফিসের কর্মকর্তাদের ভয় দেখায়। অনেক সময় বলেও ফেলে, ‘আমার ওপর হাত দিলে মন্ত্রীকে বলব’। ফলে কর্মকর্তারাও ঝামেলায় যেতে চায় না।” তাঁর ফেসবুক প্রোফাইলে মন্ত্রী, এমপি ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তোলা বিভিন্ন ছবিও রয়েছে, যা তিনি প্রভাব বিস্তারে ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ।
প্রতিটি মিটারের পেছনে কমিশন : মাতুয়াইল ডিভিশন দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ সংযোগের জন্য কুখ্যাত। এই এলাকায় প্রতিদিন শতাধিক ‘আনঅফিশিয়াল’ লাইন স্থাপন হয়—যার প্রত্যেকটির পেছনে যায় ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ। মিলন মিয়া এই লেনদেনের অন্যতম নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় কিছু গ্রাহক জানান, “যারা নতুন ঘরে সংযোগ নিতে চায়, তাদের অফিসে ঘুরতে হয় না। মিলন ভাইয়ের লোকজন ৫ হাজার টাকা নিয়ে সব ঠিক করে দেয়। কেউ যদি টাকা না দেয়, তাদের আবেদন মাসের পর মাস পড়ে থাকে।” এই টাকার একটি অংশ যায় মাঠকর্মীদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে, বাকিটা “উপরে”— অর্থাৎ কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছায়।
মুগদা ও মাতুয়াইল ডিভিশনের বহু গ্রাহক অভিযোগ করেছেন, বিদ্যুৎ বিল সামান্য বাকি থাকলেই সংযোগ কেটে দেওয়া হয়, অথচ একই এলাকায় অনেক অবৈধ সংযোগ নিরবচ্ছিন্ন থাকে। একজন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী বলেন, “আমার দোকানের লাইন তারা কেটে দিয়েছে মাত্র ১ হাজার টাকা বিল বাকি থাকায়। কিন্তু পাশের দোকানে অবৈধ সংযোগ মাসের পর মাস চলছে। পরে জানতে পারলাম, তারা নিয়মিত টাকা দেয় মিলন মিয়াকে।” এমন হয়রানিতে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। কিন্তু ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চান না।
সিন্ডিকেটের গোপন নেটওয়ার্ক : ডিপিডিসির অভ্যন্তরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে বলে একাধিক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন। এই সিন্ডিকেটে রয়েছেন মাঠ পর্যায়ের লাইনম্যান থেকে শুরু করে অফিসের হিসাব কর্মকর্তা, এমনকি কিছু বিভাগীয় ব্যবস্থাপকও। এই চক্রটি ঘুষ বাণিজ্য, বদলি, সংযোগ অনুমোদন, বিল সংশোধন সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করে। সিন্ডিকেটের মূল সুবিধাভোগীদের মধ্যে ডিজিএম মনিরুজ্জামানুএর নাম নিয়মিতভাবে আসে। একজন কর্মকর্তা বলেন, “মনিরুজ্জামান সাহেব আসলে পদের দিক থেকে সব বদলির নিয়ন্ত্রক। কে কোথায় যাবে, কে কোথায় থাকবে—সবকিছু তাঁর অনুমতিতে হয়। এর বিনিময়ে মোটা অঙ্কের টাকা ওঠে নিচে।”
তদন্ত ‘চাপা’ দেওয়ার অভিযোগ : ডিপিডিসির অভ্যন্তরীণ অডিট বিভাগ একাধিকবার মিলন মিয়ার সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন তুললেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদনগুলো সচেতনভাবে “চাপা দিয়ে রাখা” হয়। এর কারণ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও নাকি এই সিন্ডিকেটের অংশ। একজন সাবেক ব্যবস্থাপক বলেন, “যখনই মিলনের নামে অভিযোগ আসে, তখন এক-দুই মাস পরে দেখা যায়, ফাইলটা কোথাও উধাও হয়ে গেছে। যিনি তদন্ত করতেন, তাঁকেও অন্য জায়গায় বদলি দেওয়া হয়।”
ডিপিডিসি একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এর ওপর তদারকি করে বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, “মাঠ পর্যায়ে দুর্নীতির অনেক তথ্য আসে, কিন্তু প্রমাণ পাওয়া কঠিন। অনেক সময় রাজনৈতিক চাপে তদন্ত এগোয় না।”
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০২৪ সালে সরকারি প্রতিষ্ঠানের ঘুষবাণিজ্য রোধে বিশেষ অভিযান শুরু করেছিল। কিন্তু ডিপিডিসির মতো সংস্থাগুলোর ক্ষেত্রে কোনো দৃশ্যমান অভিযান দেখা যায়নি। দুদকের এক সাবেক কর্মকর্তা বলেন, “আমরা তথ্য পাই, কিন্তু অভ্যন্তরীণ চক্র এত শক্তিশালী যে, সাক্ষী পাওয়া যায় না। যিনি মুখ খোলেন, পরদিন তাঁকে বদলি দেওয়া হয়।”
ডিপিডিসির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার এক লাইনম্যান যদি কোটি টাকার মালিক হতে পারেন, তবে সেটি শুধু একজনের দুর্নীতি নয়—বরং পুরো ব্যবস্থার ব্যর্থতা ও প্রশাসনিক অন্ধকারের প্রতিফলন। মিলন মিয়া, ডিজিএম মনিরুজ্জামান ও হিসাব কর্মকর্তা এনায়েত হোসেন—এই তিনজনের নাম এখন আলোচনায়। তাঁদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্তের দাবি উঠেছে। বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়, দুদক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি এখনো নীরব থাকে, তবে ডিপিডিসির মাঠ পর্যায়ে দুর্নীতির এই “রাজত্ব” আরো গভীর শিকড় গেড়ে বসবে।
চলবে পর্ব ২: “অবৈধ সংযোগ বাণিজ্যের পেছনের মাসিক কমিশন চক্র”
সংবাদ শিরোনাম ::
বিদ্যুৎ কর্মীর দুর্নীতির পাহাড়
ডিপিডিসিতে কোটি টাকার রাজত্ব লাইনম্যান মিলনের
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় ০১:২৫:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ নভেম্বর ২০২৫
- ৫৪৭ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ




















