চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)-এর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গত এক বছরে এক টাকারও কাজ হয়নি। ৮০০ কোটি টাকার বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও নগরী আজ থমকে রয়েছে। এ অবস্থা চট্টগ্রামের নাগরিকদের জন্য উদ্বেগজনক, আর দায় দায়ী ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা গেলে তা স্পষ্ট-চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলাম। দু’জনের মধ্যে বিদ্যমান বিরোধ—নির্বাচিত মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলামের—নাগরিকদের জন্য শুধু উন্নয়ন কার্যক্রমের ব্যর্থতা নয়, বরং প্রশাসনিক জটিলতার এক ভয়াবহ দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে।
মেয়র ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দ্বন্দ্ব :
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব নেওয়ার পর মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন প্রথম থেকেই প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কঠিন দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। মেয়র দাবি করেছেন, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা “দুর্নীতিবাজ সাবেক মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর সঙ্গে কাজ করেছেন এবং সেই যোগসাজশ এখনও বজায় রাখছেন।”
মেয়রের ভাষ্য :
“আমি তাঁকে দুর্নীতির জবাব দিতে শোকজ করেছি। এখনো তিনি কোনো জবাব দেননি। তৌহিদ সাহেব ঢাকাতেই বেশি থাকেন। তাঁকে দিয়ে চসিকের কাজ হচ্ছে না।” এখানেই মূল সমস্যা—চসিকের উন্নয়ন কার্যক্রম প্রধান নির্বাহীর অনুপস্থিতি ও প্রশাসনিক দমনমূলক মনোভাবের কারণে আটকে গেছে। শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলাম একজন যুগ্ম সচিব, যিনি প্রেষণে এসে চসিকে দায়িত্ব পালন করছেন। যদিও তার দায়িত্ব সরকারি নিয়ম মেনে বলে দাবি করা হয়, বাস্তবতা হচ্ছে—তার আমলাতান্ত্রিক দমনমূলক আচরণ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নীতির কারণে চসিকের কোটি কোটি টাকার প্রকল্প কাজ শুরু করতে পারেনি।
৮০০ কোটি টাকার প্রকল্প :
২০২৪ সালের নভেম্বরে ডা. শাহাদাত হোসেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেন। তখন সরকারের বরাদ্দ থাকা ৮০০ কোটি টাকার প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দীর্ঘ বিচার-বিবেচনা ও দরপত্র যাচাই-বাছাইয়ের জটিলতা পুরো উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে থামিয়ে দিয়েছে। প্রথম দফায় মেয়র প্রায় ৮০ কোটি টাকার ১০টি প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করেন। কিন্তু প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার জটিল প্রশাসনিক নীতি এবং দীর্ঘ যাচাই-বাছাইয়ের কারণে তিন মাস কাজ বন্ধ থাকে। দরপত্র বাতিল হয়ে পুনরায় আহ্বান করতে হয়। এরপর মেয়র আরও ১০০ কোটি টাকার ১৩টি প্রকল্পের দরপত্র দেন, যা মূল্যায়নের ধাপে আটকে রয়েছে। সর্বশেষ নতুন করে ১০০ কোটি টাকার ১৪টি প্রকল্পের দরপত্র দেওয়া হলেও সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) ২০২৫ চালুর পর এগুলো আর কার্যকর হয়নি। চসিকের প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান জানিয়েছেন, নতুন বিধি অনুযায়ী আবার দরপত্র দিতে হবে। ফলে বোঝা যাচ্ছে, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধে চসিকের উন্নয়ন কার্যক্রম এক বছরে স্থবির।
এক বছরের বিলম্ব ও ব্যর্থতা :
চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কেবল প্রকল্প কার্যক্রমে বাধা দিচ্ছেন না, নগরের অবকাঠামোও অবহেলার শিকার। মেয়রের বাড়ির সামনে বাদশা মিয়া সড়কের কার্পেটিং কাজ আগের মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর আমলের। কোভিড প্রকল্পের আওতায় কিছু কাজ হয়েছে, কিন্তু তা মাত্র ১০০ কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। সাধারণ নাগরিকরা জানাচ্ছেন, নগরীর রাস্তাঘাট, ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—সব ক্ষেত্রেই প্রশাসনিক কার্যক্রমের স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন “আমাদের নগরের জন্য বরাদ্দ থাকা ৮০০ কোটি টাকার প্রকল্প এখন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার আমলাতান্ত্রিক মনোভাবের কারণে কাজ শুরু করতে পারছে না। নগরবাসী এই ব্যর্থতা সরাসরি অনুভব করছে।” এখানেই দেখা যাচ্ছে, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দমনমূলক প্রশাসনিক মনোভাব নগরীর উন্নয়নকে মূলত স্থবির করেছে।
দরপত্র ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা :
চসিক সূত্র জানায়, মেয়র দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ধাপের ১০টি প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করা হলেও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দীর্ঘ যাচাই-বাছাই প্রকল্পগুলো কার্যকর হতে দেয়নি। এর ফলে মেয়র নতুনভাবে দরপত্র আহ্বান করতে বাধ্য হন। এরপর ১৩টি প্রকল্পের দরপত্র দেওয়া হয়, যা এখনও মূল্যায়নের ধাপে। শেষ পর্যায়ে ১৪টি প্রকল্পের দরপত্র দেওয়া হলেও নতুন পিপিআর ২০২৫ চালুর পর এগুলো আর কার্যকর হয়নি। প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান বলেন, “আমাদের এই ১০০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজের জন্য নতুন দরপত্র দিতে হবে।” প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার এই দমনমূলক মনোভাব এবং নতুন নিয়মের প্রয়োগে বিলম্ব নগরের কোটি কোটি টাকার প্রকল্প স্থবির করেছে। মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের রাজনৈতিক পরিচয় বিএনপি, অন্যদিকে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলাম আওয়ামী লীগ সরকারের যুগ্ম সচিব। ফলে প্রশাসনিক দ্বন্দ্বের সাথে রাজনৈতিক প্রভাবও জড়িত। চসিক ভবনে সম্প্রতি দুই দফা সমাবেশ হয়েছে, যেখানে বিএনপিপন্থি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার অপসারণ দাবি করেছেন। তাঁরা স্লোগান দেন—“জিয়ার সৈনিক এক হও”। এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক কাজ পরিচালনায় তীব্র প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দমনমূলক আচরণ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপ নগরের উন্নয়নকে মূলত বাধাগ্রস্ত করেছে।
গৃহকর অ্যাসেসমেন্টে অনিয়মের অভিযোগ :
মেয়র কানাডা সফরের আগে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রত্যাহারের জন্য চিঠি দেন। কিন্তু মন্ত্রণালয় তা আমলে নেয়নি। দেশে ফিরে মেয়র ৪২ কোটি টাকার গৃহকর অ্যাসেসমেন্টে দুর্নীতির অভিযোগ পান। এ নিয়ে তিনি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে শোকজও করেন। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দাবি করেন, বিষয়টি ঘটনার সময় তিনি দায়িত্বে ছিলেন না। তবে নগরের উন্নয়ন ও আয় সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডে তার নির্লজ্জ অবহেলা ও দমনমূলক প্রশাসন নগরকে স্থবির করেছে। চট্টগ্রামবাসী প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার এই আচরণে ক্ষুব্ধ। তারা বলছেন, “আমরা কাজ চাই, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব নয়। এক বছরে এক টাকার কাজও হয়নি—এটা নগরবাসীর জন্য লজ্জার।” চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের এক কর্মকর্তা বলেন, “চসিক এখন রাজনীতির মঞ্চে পরিণত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের নামে আমলাতান্ত্রিক কৌশল চলছে। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কারণে নগরবাসী দীর্ঘ সময়ের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”
পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দমনমূলক প্রশাসনিক মনোভাব এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কর্মকাণ্ড নগরের উন্নয়ন কার্যক্রমকে শূন্যে নামিয়ে এনেছে।
চসিকের ব্যর্থতার পরিসংখ্যান চলমান এডিপি প্রকল্প ১,৭০০ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ ছিলো রেজাউলের সময় আর শাহাদাতের সময় তা এসে পড়ে ৮০০ কোটি টাকায়
রেজাউলের সময় ৭০% কাজ সম্পন্ন হলেও শাহাদাতের তা ০%
নতুন দরপত্র আহ্বান রেজাউলের সময় ৩৭টি শাহাদাতের সময়ও ৩৭টি প্রকল্প কিন্তু রেজাউলের সময় বাস্তবায়ন হয় ৩০ টি এবং শাহাদাতের সময় একটিও নয়
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. জাহিদুল ইসলাম বলেন, “প্রধান নির্বাহী ও মেয়রের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে উন্নয়ন কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চসিকের এই স্থবিরতার মূল কারণ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দমনমূলক মনোভাব এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপ।” তিনি আরও বলেন, নগরের প্রশাসনিক কার্যক্রম যাতে নির্বিঘ্নে চলে, তার জন্য মন্ত্রণালয়ের দৃঢ় পদক্ষেপ অপরিহার্য।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন আজ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দমনমূলক এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আচরণের কারণে স্থবির। ৮০০ কোটি টাকার বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও এক বছরের মধ্যে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি। নগরবাসীর অবস্থা উদ্বেগজনক, কারণ প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তি চসিককে কার্যত কাজহীন করে রেখেছেন। যতক্ষণ না মন্ত্রণালয় প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দমনমূলক ও অযৌক্তিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়, চট্টগ্রামের উন্নয়ন কার্যক্রম থমকে থাকবে, এবং নগরবাসী পাবেন না তাদের দাবিকৃত নগর উন্নয়ন। নাগরিকরা আশা করছেন, সরকার ও মন্ত্রণালয় এই স্থবিরতার অবসান ঘটাবে, যাতে চসিক আবার প্রকৃত অর্থে নগরের উন্নয়নে কাজ করতে পারে।
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি 



















