বিপন্ন প্রাণী “তক্ষক” বিক্রির নামে কোটি টাকার লোভ দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলার একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে রাজধানীর খিলক্ষেতের লেক সিটি কনকর্ড এলাকায়। গোপন সূত্রে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত সোমবার (২০ অক্টোবর) দুপুরে দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি-এর অনুসন্ধানী টিম উপস্থিত হয় লেক সিটি কনকর্ডের ‘ভৈরবী’ নামের ভবনের ১১ তলার ঝই-৩ নম্বর ফ্ল্যাটে-যে বাসাটির মালিক বর্তমানে বিদেশে অবস্থানরত সাত্তার সাহেব। ফ্ল্যাটটির ভেতরে তখনই চলছিল এক অদ্ভুত বেচাকেনার প্রস্তুতি। দরজা বন্ধ, ভিতরে একাধিক ব্যক্তি ফিসফিস করে কিছু হিসাব মিলাচ্ছে। গোপনে ঢুকে পড়ার কয়েক মিনিট পরই সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে কয়েকজন দৌড়ে পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থলে থাকা স্থানীয় এক গৃহপরিচারিকা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বেশ কয়েকদিন ধরেই এখানে অপরিচিত লোকজন আসা-যাওয়া করছে। কখনও গভীর রাতে গাড়ি আসে, আবার ভোরে চলে যায়। আমরা ভেবেছিলাম বাড়িতে হয়তো নতুন ভাড়াটে উঠেছে, কিন্তু পরে শুনি তক্ষক বেচাকেনা হচ্ছে!
এ ঘটনায় ঘটনাস্থলেই পাওয়া যায় জাহানার বেগম হেলানা, নজরুল, উৎপল, জাহিদুল, সাফায়াত ও বিল্লালকে।
গুজবের গায়ে কোটি টাকার ছায়া : তক্ষক (ঞড়শধু এবপশড়) একটি বিপন্ন প্রজাতির গিরগিটি জাতীয় প্রাণী, যা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জঙ্গলে পাওয়া যায়। বাংলাদেশে প্রায় দুই দশক আগে থেকে ছড়াতে থাকে এক গুজব-তক্ষকের দেহে আছে বিশেষ “ঔষধি উপাদান”, যা নাকি ক্যানসার সারাতে পারে এবং বিদেশে এর দাম কোটি টাকা। এই গুজবের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে এক ভয়ংকর প্রতারণা নেটওয়ার্ক। লোকজনকে বলা হয়, “তক্ষক বিক্রি করলে জীবন বদলে যাবে।” কেউ কেউ পরিবারের জমি বিক্রি করে “তক্ষক ব্যবসায়” নামে অচেনা লোকদের হাতে অর্থ তুলে দিয়েছে, পরে নিঃস্ব হয়ে ফিরেছে। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রাশেদা খানম বলেন, “তক্ষক নিয়ে যে গুজব ছড়ানো হয়েছে, তা পুরোপুরি ভিত্তিহীন। এর কোনো ঔষধি বা বাণিজ্যিক মূল্য নেই। বরং এটি একটি সংরক্ষিত প্রজাতি, যাকে ধরা বা বেচাকেনা করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।” সেই সোমবার দুপুরে এসবি-৩ ফ্ল্যাটে উপস্থিত ছিলেন কয়েকজন-পিয়াস, সৌরভ, জাহানার বেগম, নজরুল, খুলনার ব্যবসায়ী উৎপল, জাহিদুল ইসলাম, সাফায়াত ও বিল্লাল। সাংবাদিক দল ঘটনাস্থলে পৌঁছালে সৌরভ ও পিয়াস দ্রুত সরে পড়েন। ফ্ল্যাটের একটি কোণে তখন রাখা ছিল একটি বড় প্লাস্টিক ব্যাগ; তার ভেতরেই ছিল একটি জীবিত তক্ষক, যেটি “নমুনা” হিসেবে দেখানো হচ্ছিল সম্ভাব্য ক্রেতাকে।
অনুসন্ধানী দলের একজন সদস্য বলেন, “আমরা যখন ঢুকি, তখন ওরা তক্ষকটি দেখিয়ে দরদাম করছিল। কথায় কথায় শুনলাম—এটার দাম ৫০ কোটি টাকা। এমন নাটকীয় প্রতারণা আগে কখনো চোখে দেখিনি।” চক্রটির কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তারা সাধারণত দুই দলে ভাগ হয়ে কাজ করে-এক দল “বিক্রেতা”, অন্য দল “ক্রেতা”র ভূমিকায় থাকে। তারা গোপন স্থানে “ডিলিং সেশন” আয়োজন করে, যেখানে অভিনয়ের মাধ্যমে বোঝানো হয় তক্ষকের দাম নাকি কোটি টাকায় উঠেছে। এরপর “মধ্যস্থ কমিশন”, “লাইসেন্স ফি” বা “বায়ার টোকেন” নামে আগাম টাকা দাবি করা হয়।
সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ও অপরাধ বিশ্লেষক এমদাদুল হক বলেন, “এই প্রতারণার ধরনটা খুব পরিকল্পিত। তারা মনস্তাত্ত্বিকভাবে শিকারকে ‘সহযোগী’ বানিয়ে ফাঁদে ফেলে। মানুষ মনে করে, ওরা সত্যিই আন্তর্জাতিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।” ফ্ল্যাটটির মালিক সাত্তার সাহেব দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে কর্মরত। স্থানীয় সূত্র জানায়, তার অনুপস্থিতিতে তার আত্মীয় জাহানার বেগম বাসাটির দেখভাল করতেন। সেই সুযোগে প্রতারক চক্রটি এখানে আশ্রয় নেয়। জাহানার বেগমের মাধ্যমে তাদের যোগাযোগ হয় পিয়াস ও সৌরভ নামের দুই ব্যক্তির সঙ্গে, যারা “বিনিয়োগকারী” হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেয়। একজন প্রতিবেশী বলেন “আমরা ভেবেছিলাম তারা কোনো অনলাইন বিজনেস করে। কিন্তু একদিন দেখি সাংবাদিক আসছে, ক্যামেরা চলছে, সবাই পালাচ্ছে-তখন বুঝি ভেতরে অন্য কিছু হচ্ছিল।” পুলিশের বিমানবন্দর জোনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “তক্ষক প্রতারণা অনেক পুরোনো ফাঁদ। কিন্তু ভুক্তভোগীরা খুব কমই অভিযোগ করেন, কারণ তারা নিজেরাই প্রথমে লাভের আশায় জড়িয়ে পড়েন। ফলে আইনি ব্যবস্থা নিতে দেরি হয়।” তিনি আরও বলেন, “আমরা নিয়মিত নজরদারি চালাচ্ছি। এখন ডিজিটাল মাধ্যমে তক্ষক ব্যবসার বিজ্ঞাপনও চলছে—এসবের পেছনে থাকা সিন্ডিকেট শনাক্তে কাজ করছে সাইবার ইউনিট।” এই প্রতিবেদনের প্রস্তুতিকালে অনুসন্ধানী দল কথা বলেছে দুইজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে।
তাদের মধ্যে একজন, উত্তরার ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম, জানান, “২০২২ সালে এক ব্যক্তি আমাকে বলে তক্ষক বিক্রি করলে ৩০ কোটি টাকা পাব। আমি ৭ লাখ টাকা দিয়ে রাখি, পরে দেখি সব ভুয়া। থানায় অভিযোগ দিতে গিয়েও লজ্জায় ফিরে আসি।” আরেকজন ভুক্তভোগী কামরুল হাসান বলেন, “ওরা এমনভাবে অভিনয় করে, মনে হয় সব সত্যি। আমাকে বলে লাইসেন্স ফি দিতে হবে। আমি ২ লাখ টাকা হারিয়েছি।”
তক্ষক প্রতারণার শিকাররা শুধু অর্থ হারায় না, সামাজিকভাবে লজ্জিত হয়। এই গুজবের ফলে অনেক মানুষ আইনগত জটিলতায় পড়েছে। প্রাণী সংরক্ষণ অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, “তক্ষক নিয়ে যারা ‘বাণিজ্য’ করছে, তারা আসলে দুটো অপরাধ করছে—একদিকে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন ভঙ্গ করছে, অন্যদিকে প্রতারণার মাধ্যমে আর্থিক অপরাধ করছে।” দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি-এর অনুসন্ধানী দল ঘটনাটির নেপথ্য অনুসন্ধানে জানতে পারে, এই চক্রের একটি মূল কেন্দ্র উত্তরার, আরেকটি খিলক্ষেতের আশপাশে। তারা অনলাইনে গোপন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে সদস্য সংগ্রহ করে, যেখানে দাবি করা হয়—“আমাদের কাছে তক্ষক আছে, ক্রেতা দরকার।” এইভাবে বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষকে এনে “ডিলিং স্পটে” প্রতারণা করা হয়। একজন সাইবার বিশ্লেষক জানান, “এদের কিছু সদস্য বিদেশে বসে সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘তক্ষক বিক্রির’ বিজ্ঞাপন দেয়। পরে বাংলাদেশের সহযোগীরা ভিকটিমকে টেনে আনে। এটি একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক।” ঘটনার পরদিন থেকেই ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ইউনিট মাঠে নামে। তারা ছদ্মবেশে ক্রেতা সেজে চক্রের মূল হোতাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছে। এক কর্মকর্তা বলেন, “আমরা প্রাথমিকভাবে সাতজনের নাম পেয়েছি। তাদের মধ্যে তিনজনের মোবাইল ফোন ট্র্যাকিংয়ে রাখা হয়েছে। ফ্ল্যাটটির নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ চলছে।” তিনি যোগ করেন, “এই চক্র শুধু তক্ষক বিক্রিই নয়, অনেক সময় অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের মতো অপরাধেও জড়িত থাকে।” অনুসন্ধান সূত্রে জানা গেছে, এই সিন্ডিকেটের পেছনে রয়েছে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি, যারা স্থানীয়ভাবে তাদের রক্ষা করে। তাদের আশ্রয়ে চক্রটি লেক সিটি কনকর্ডসহ আশেপাশের এলাকায় “ডিলিং হাউজ” হিসেবে কয়েকটি ফ্ল্যাট ব্যবহার করে। দৈনিক আমাদের মাতৃভূমিুএর অনুসন্ধান দল জানিয়েছে, দ্বিতীয় পর্বের প্রতিবেদনে এসব আশ্রয়দাতাদের বিস্তারিত প্রকাশ করা হবে। এক অনুসন্ধান সদস্য বলেন, “আমরা প্রমাণসহ কিছু তথ্য পেয়েছি, যা প্রকাশ করলে বড় বড় নাম উঠে আসবে। তবে যাচাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমরা তা প্রকাশ করছি না।”
বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী তক্ষক ধরা, রাখা বা বিক্রির শাস্তি সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড ও জরিমানা। অন্যদিকে প্রতারণার জন্য দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। ফলে এই চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে একাধিক আইনে মামলা হতে পারে। আইনজীবী ব্যারিস্টার সামিয়া হক বলেন, “এই মামলাগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ হলো ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য ও ডিজিটাল প্রমাণ। যদি পুলিশ পেশাদারভাবে তদন্ত করে, তাহলে চক্রটি ভেঙে ফেলা সম্ভব।” এই প্রতারণা রোধে প্রয়োজন জনসচেতনতা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “মানুষের মধ্যে যখন সহজে ধনী হওয়ার লোভ জন্মায়, তখনই এমন প্রতারণা সফল হয়।” খিলক্ষেত লেক সিটি কনকর্ডের এক বাসিন্দা বলেন, “আমরা চাই প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিক। আমাদের বাচ্চারা ভয় পাচ্ছে—বাড়ির পাশেই এমন প্রতারক চক্র চললে কে নিরাপদ?” সবশেষে প্রশ্ন থেকেই যায়- এই চক্রের নেপথ্যে কারা? কারা দিচ্ছে তাদের আশ্রয়? বিদেশে থাকা ফ্ল্যাটমালিক কি জানতেন তার বাসায় এমন প্রতারণার আসর বসে? না কি, তার নাম ব্যবহার করেই চলছে বৃহৎ প্রতারণা সিন্ডিকেট? যতই রহস্য বাড়ছে, ততই বাড়ছে নাগরিক উৎকণ্ঠা। ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ইউনিট ও দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি-এর অনুসন্ধানী দল এর পরবর্তী প্রতিবেদনে এই প্রতারণা নেটওয়ার্কের মূল হোতাদের মুখোশ উন্মোচন করবে। তক্ষক কেবল একটি বিপন্ন প্রাণী নয়, এখন এটি প্রতারণার প্রতীক। এই প্রতারণার ছায়া যদি দ্রুত প্রতিহত না করা যায়, তাহলে আরও নিরীহ মানুষ পড়বে ফাঁদে, হারাবে অর্থ, মান-সম্মান ও বিশ্বাস। আমাদের মাতৃভূমি’র পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা- তক্ষকের নামে কোনো ব্যবসা নেই, আছে শুধু প্রতারণা।
সংবাদ শিরোনাম ::
খিলক্ষেত লেক সিটি কনকর্ডে তক্ষক বিক্রির আসর
বিপন্ন প্রাণী বেচাকেনার নামে কোটি টাকার লোভে সিন্ডিকেটের সন্ধান
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় ০৯:২৩:৪৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর ২০২৫
- ১২৭৬ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ




















