বরিশালের উজিরপুর উপজেলায় জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলমান বিরোধ ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। দুই পরিবারের মধ্যে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ও ক্রয়কৃত জমির মালিকানা নিয়ে একের পর এক মামলা, জালিয়াতি, হামলা ও হুমকির ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। সর্বশেষ গত ২৩ সেপ্টেম্বর বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাকক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী পরিবার তাদের অভিযোগ তুলে ধরে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে দেলোয়ার হোসেন মল্লিক (দুলাল) জানান, তাদের পৈত্রিক ও ক্রয়কৃত জমি ৮৯ নং ইচলাদি মৌজার এসএ ১৫৯ নং খতিয়ানে অবস্থিত। দীর্ঘ প্রায় সাত দশক ধরে এ জমির মালিকানা নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা চললেও আদালতের একাধিক রায়ে জমির মালিকানা তাদের পরিবারের পক্ষে নিশ্চিত হয়।
জমির মূল মালিক বছির উদ্দিন মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকারী নবাবজান বিবি ও সোনাবান বিবির মাধ্যমে বিভিন্ন অংশ ক্রয় করেন দেলোয়ার মল্লিকের পিতা ইসমাইল মল্লিক। ১৯৪৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর একটি হেবানামা দলিলের মাধ্যমে ইসমাইল মল্লিক ১ একর ৫৪ শতাংশ জমির মালিক হন। তবে রেকর্ডে ভুলের কারণে জমির মালিকানা অন্যদের নামে চলে যায়। এই নিয়ে ১৯৫৭ সালে দেওয়ানি মামলা হলে ১৯৫৯ সালে আদালতের রায়ে ৯৫ শতাংশ জমি ইসমাইল মল্লিকের নামে বহাল হয়।
দেলোয়ার মল্লিকের দাবি, পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া ওই জমি ও পরবর্তীতে দলিলমূলে ক্রয়কৃত মোট ৪ একর ৩৫ শতাংশ জমির বৈধ মালিক তারা। নিয়মিত খাজনা পরিশোধ ও মাঠ জরিপে রেকর্ড সংশোধন করেও তারা ভোগদখলে আছেন।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, প্রতিবেশী মাদারশি গ্রামের মৃত হালিম মল্লিকের ছেলে মামুন মল্লিক ও তার ভাইবোনরা ওই জমির উপর মালিকানা দাবি করে আসছে। ১৯৮৬ সালে সোনাবান তার ছেলে হালিম মল্লিকের নামে দলিল করেন। পরে হালিম মল্লিক দেলোয়ার মল্লিকসহ কয়েকজনের কাছে জমি বিক্রি করলেও প্রকৃত প্রাপ্যের চেয়ে বেশি জমি দলিলে দেখানো হয়। এ থেকেই বিরোধের সূত্রপাত।
দেলোয়ার মল্লিক অভিযোগ করেন, প্রতিপক্ষ মামুন মল্লিক ও তার সহযোগীরা জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে নামজারি করে জমি দখলের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সহকারী কমিশনার (ভূমি) আদালতে একাধিকবার নামজারি আবেদন করলে প্রতিপক্ষ প্রভাব খাটিয়ে ভুয়া নথিপত্র দাখিল করে। তবে এসব মামলার অধিকাংশ রায়ই তাদের (দেলোয়ার মল্লিক) পক্ষে আসে।
বিগত কয়েক বছরে জমি নিয়ে অসংখ্য মামলা হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রতিপক্ষ মামুন মল্লিক ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে নামজারি করতে সক্ষম হলেও তদন্তে তা ধরা পড়ে এবং ২০২৪ সালের ৩০ জুলাই নামজারি বাতিল হয়। এরপর প্রতিপক্ষ পুনরায় মিস কেস দায়ের করে হলেও আদালতের রায়ে দেলোয়ার মল্লিকের মালিকানা বহাল থাকে।
দেলোয়ারের ভাষ্য, আদালতের রায় তাদের পক্ষে থাকলেও প্রতিপক্ষ তা মানতে নারাজ। প্রতিবারই নতুন মামলা করে হয়রানি সৃষ্টি করছে। এমনকি ১৯৮৭ সালের দেওয়ানি মোকদ্দমায় বাতিল হওয়া একটি দলিলকে ঘিরেও নতুন করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে দেলোয়ার মল্লিক বলেন, প্রতিপক্ষ মামুন মল্লিক গ্যাং শুধু আইনি লড়াই নয়, শারীরিকভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শনও করছে। ২০২৪ সালের ৪ ডিসেম্বর উজিরপুর উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিসে বিচার কার্যক্রম চলাকালীন সময়ে তার ও পরিবারের সদস্যদের ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। এ ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়, যার নন-জি.আর নং ০৩/২০২৫ এখনো বিচারাধীন।
এছাড়া স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদেরও প্রতিপক্ষরা ভয়ভীতি দেখিয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে উজিরপুর উপজেলা সার্ভেয়ারকে হুমকি দেওয়া হয়, কারণ তিনি দেলোয়ার মল্লিকের নামজারীর প্রতিবেদন জমা দিয়েছিলেন।
প্রতিপক্ষ মামুন মল্লিক গং সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে নিজেদের দাবি উপস্থাপন করেছে। তারা দাবি করছে, জমির প্রকৃত মালিক তারা এবং আদালতের আদেশ যথাযথভাবে মানা হয়নি। স্থানীয় কয়েকটি পত্রিকায় তাদের সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, যা নিয়ে আবারও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।
এতো মামলা-মোকদ্দমা, রায় ও পাল্টা রায়ের পরও বিরোধ নিরসন হয়নি। দেলোয়ার মল্লিকের দাবি, সহকারী কমিশনার (ভূমি) একাধিকবার সঠিক প্রতিবেদন দিলেও প্রতিপক্ষের প্রভাবের কারণে অনেক ক্ষেত্রে গড়িমসি হয়। এতে তারা ন্যায়বিচার পেতে দেরি করছেন এবং চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
স্থানীয়রা বলছেন, দুই পক্ষের বিরোধের কারণে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আগেও শোনা গেছে। তবে মামুন মল্লিক গং নিজেদের নির্দোষ দাবি করে আসছে। প্রশাসন নিরপেক্ষ তদন্ত করলে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে বলে মনে করছেন অনেকেই।
সংবাদ সম্মেলনে দেলোয়ার মল্লিক বলেন— “আমরা প্রতিনিয়ত প্রাণনাশের হুমকির মুখে আছি। প্রশাসন দ্রুত হস্তক্ষেপ না করলে বড় ধরণের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। প্রতিপক্ষ মামুন মল্লিক গ্যাং ভূমি দস্যুতা করে চলেছে এবং মিথ্যা সংবাদ ছড়িয়ে আমাদের সুনাম নষ্ট করছে। আমরা এর সুষ্ঠু বিচার চাই।”
বাংলাদেশে ভূমি বিরোধ নতুন কিছু নয়। প্রতিটি মৌজা, খতিয়ান বা জরিপকে কেন্দ্র করে হাজারো মামলা ঝুলে আছে। দলিল জালিয়াতি, ভুল রেকর্ড, ওয়ারিশ সনদের জালিয়াতি, নামজারী প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন। উজিরপুরের ইচলাদি মৌজার এ ঘটনাই তার এক স্পষ্ট উদাহরণ।
এ ঘটনায় যেমন আদালতের রায় একাধিকবার এসেছে, তেমনি প্রতিপক্ষদের পাল্টা মামলা ও প্রভাব খাটানোয় সমাধান অধরাই থেকে যাচ্ছে। জমির মূল মালিকানা নির্ধারণ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিশ্চিত না করলে দুই পক্ষের সংঘর্ষ আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
দেলোয়ার মল্লিক পরিবার ও মামুন মল্লিক গ্যাং—এই দুই পক্ষের বিরোধ এখন স্থানীয় প্রশাসনের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জমির ইতিহাস ও আদালতের রায় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বৈধ মালিকানা দেলোয়ার মল্লিকের পরিবার ভোগ করছে। তবুও প্রতিপক্ষের একের পর এক মামলা, হুমকি ও মিথ্যা প্রচারণা বিরোধকে জটিল করে তুলেছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























