ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের গত ১৬ বছরের কঠোর দমন-পীড়ন, নির্যাতন-নিপীড়ন, গুম-খুন, হামলা, মামলা ও গণগ্রেফতারে বিপর্যস্ত ছিল বিএনপি। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে সাজা দিয়ে বন্দি করে রেখেছিল কারাগারে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রচারে ছিল নিষেধাজ্ঞা। এমনকি বিএনপি নেতাদের বক্তব্য ও আন্দোলন-কর্মসূচির সংবাদ প্রচারেও ছিল বিধিনিষেধ।
ফলে বিএনপি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে ডিজিটাল জগতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হয়ে ওঠে বিকল্প মঞ্চ। কিন্তু এই ভার্চুয়াল রাজনীতি আর কতদিন, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানান প্রশ্ন।
ভাঙা মাঠের রাজনীতির বিকল্প
২০০৭ সালের এক/এগারোর পর বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেকটা স্থবির হয়ে পড়ে। সাংগঠনিক দুর্বলতা, নেতৃত্বের অনিশ্চয়তা ও প্রশাসনিক দমন-পীড়নের কারণে মাঠে দাঁড়িয়ে থাকাটা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল দলটির। বিশেষ করে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন-পরবর্তীসময়ে বিএনপির রাজপথ কার্যত শূন্য হয়ে পড়ে। এই শূন্যতা পূরণ করতে দলের নেতাকর্মীরা প্রথমে ব্যক্তিগত উদ্যোগে, পরে কিছুটা সংগঠিতভাবে বেছে নেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। যেমন, ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটিক, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার (বর্তমানে এক্স), হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রামসহ আরও কয়েকটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। ফেসবুক ও ইউটিউবে লাইভ, টুইটার ক্যাম্পেইন, টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ব্যবহার এখন বিএনপির দৈনন্দিন যোগাযোগের অপরিহার্য অঙ্গ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মাঠের অনুপস্থিতি ঘোঁচানোর জন্য বিএনপি কার্যত ভার্চুয়াল মাঠ তৈরি করেছে, যেখানে প্রতিদিন কথার মিছিল হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিএনপিকে কিছু তাৎক্ষণিক সুবিধা দিলেও এর ব্যবস্থাপনার অভাব আজ দলের জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। প্রথমত, সংগঠিত বার্তা দেওয়ার পরিবর্তে ব্যক্তিপর্যায়ের মতামত নির্ভর প্রচারণা দলে বিভ্রান্তি বাড়াচ্ছে। দ্বিতীয়ত, গুজব ও যাচাইবিহীন তথ্য ছড়ানোয় দলীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। তৃতীয়ত, অনেক ক্ষেত্রে নেতা-নেত্রীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব সরাসরি ফেসবুক পোস্ট বা ইউটিউব ভিডিওর মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে, যা দলীয় শৃঙ্খলাবোধের অবক্ষয়ের ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যেখানে দলের নিজস্ব বার্তা সংগঠিত করে জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা, সেখানে বিএনপির অনেক নেতাকর্মী নিজেরাই আলাদা মঞ্চ তৈরি করেছেন। ফলে জনগণের কাছে দলের অবস্থান অস্পষ্ট বা বিতর্কিত হয়ে উঠছে।
নেতিবাচক দিক থাকা সত্ত্বেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিএনপি কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও সফলতা দেখিয়েছে। যেমন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরতে বা দেশে নির্যাতনের অভিযোগ প্রচারে ডিজিটাল প্রচার কার্যকর হয়েছে। বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে বিএনপির সমর্থন ধরে রাখার ক্ষেত্রে ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক পেজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে জনপ্রিয়তা আদৌ মাঠের ভোটবাক্সে রূপান্তরিত হচ্ছে কি না? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, ভার্চুয়াল জনপ্রিয়তা আর নির্বাচনী শক্তি এক নয়। মাঠে জনসমর্থন ছাড়া শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে রাজনৈতিক দল টিকিয়ে রাখা কঠিন।
বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সংগঠিত বার্তা পৌঁছানোর মাধ্যম হিসেবে সাজিয়ে নিতে পারে, তাহলে এটি মাঠের রাজনীতির ঘাটতি অনেকাংশে পুষিয়ে দিতে পারবে। তবে যদি চলমান বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি অব্যাহত থাকে, তাহলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আত্মঘাতী হাতিয়ারে পরিণত হবে।
বিএনপির জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো একক, সুসমন্বিত বার্তা নির্ধারণ, প্রাতিষ্ঠানিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নীতিমালা প্রণয়ন, তরুণ কর্মীদের তথ্য যাচাই ও কৌশলী প্রচারণায় প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং বিভ্রান্তিমূলক ও বিশৃঙ্খল প্রচার বন্ধ করতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। রাজনীতির মাঠ যতই সংকুচিত হোক, জনগণের আস্থা এবং সাংগঠনিক সংহতি ছাড়া কোনো ডিজিটাল যুদ্ধই দীর্ঘমেয়াদে বিজয় এনে দিতে পারে না। বিএনপির সামনে এখন সেই কঠিন বাস্তবতা।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ফেসবুক পেজে বর্তমানে অনুসারীর সংখ্যা ৩৪ লাখের বেশি। এক্স অ্যাকাউন্টে অনুসারী আছে প্রায় ৮১ হাজার ৬০০। ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে অনুসারী প্রায় ৭৬ হাজার ৮০০। টিকটকে অনুসারীর সংখ্যা চার লাখ ৮৮ হাজারের বেশি। লাইকের সংখ্যা ৭৭ লাখের বেশি।
বিএনপির ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা ২৭ লাখের বেশি। টেলিগ্রাম চ্যানেলে সাবস্ক্রাইবার প্রায় ৫২ হাজার ৬০০। হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলে অনুসারীর সংখ্যা প্রায় চার হাজার।
এসব পেজ ও অ্যাকাউন্টে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, বড় ছেলে তারেক রহমান, বিএনপির কেন্দ্রীয় বিভিন্ন নেতার বক্তব্য, বৈঠক ও কর্মসূচির খবর নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। বিএনপির নেতাকর্মী, সমর্থক ও সাংবাদিকরা এসব পেজ, অ্যাকাউন্ট ও চ্যানেল থেকে নিয়মিত তাৎক্ষণিক খবরাখবর পাচ্ছেন।
আমাদের মার্তৃভূমি ডেস্ক : 

























