সংবাদ শিরোনাম ::
৫ আগস্টের পর ভাগ্য বদলে গেছে জামায়াত নেতার ছেলের রোহিঙ্গা প্রকল্পের অর্থে প্রতিমন্ত্রীর পিএস-এপিএসের ইউরোপ সফর, উঠছে নানা প্রশ্ন ঢাকার গুলিস্তানে সিলগালা ভেঙে পার্কিংয়ে সহস্রাধিক অবৈধ দোকান কাজ না করেই সরকারি প্রকল্পের ১২ কোটি টাকা নিয়ে গেল ঠিকাদার বিপিসির আহম্মদুল্লাহর ঢাকায় বহুতল ভবন, গ্রামে বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি রাষ্ট্রের টাকায় ব্যক্তিগত ‘ভবিষ্যৎ’ গড়লেন সামি! নেইমারকে না নামানোর কারণ জানালেন আনচেলত্তি রাজবাড়ীর কালুখালীতে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা সংসদে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পাস তরুণদের প্রলোভনে ফাঁদ, ‘অতিথি ডটকম’-এর বিরুদ্ধে শত কোটি টাকার প্রতারণার অভিযোগ

বিপিসির আহম্মদুল্লাহর ঢাকায় বহুতল ভবন, গ্রামে বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি

ঢাকায় বহুতল ভবন, একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট এবং গ্রামে ডুপ্লেক্স বাড়িসহ শতকোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন তিনি। নিজের বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকায় আইনি জটিলতা এড়াতে স্ত্রী, মা-বাবা ও শ্বশুরের নামে করেছেন এসব সম্পদ। মো. আহম্মদুল্লাহ নামের এই কর্মকর্তা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) উপব্যবস্থাপক। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানের একান্ত সচিবও (পিএস) ছিলেন তিনি।

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর মিরপুরে এক হাজার ১৬০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে আহম্মদুল্লাহর। ফ্ল্যাটটির অবস্থান পল্লবী সেকশন ৬-এর ৮ নম্বর রোডের সি-ব্লকের ৫ নম্বর বাড়ির দ্বিতীয় তলায়। এ ছাড়া আদাবরে একটি প্লট এবং মোহাম্মদপুরে আরও একটি ফ্ল্যাট রয়েছে তার।

বিপিসি চেয়ারম্যানের পিএস থাকাকালে তিনি স্ত্রী নুসরাত জেবিন সিনথীর নামে কেরানীগঞ্জ (দক্ষিণ) থানার কোন্ডা ইউনিয়নের আইন্তা মৌজায় সাড়ে তিন কাঠা জমি কেনেন। এটি ছিল বসুন্ধরা রিভারভিউ প্রকল্পের ২৮৭ নম্বর প্লট। দলিল নম্বর ১০১৯৭, খতিয়ান নম্বর ২২৪৩। ওই প্লটে ৮ তলা ভবনের ছাদ ঢালাই সম্পন্ন হয়েছে।

 


কেরানীগঞ্জ (দক্ষিণ) থানার কোন্ডা ইউনিয়নের আইন্তা মৌজায় সাড়ে তিন কাঠা জমির মালিক আহম্মদুল্লাহর স্ত্রী নুসরাত জেবিন সিনথী।

প্লটটির বাজারমূল্য শতকোটি টাকার কাছাকাছি হলেও দলিলে মাত্র ৩০ লাখ ৯৬ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। ২০২১ সালের ১১ নভেম্বর জমিটি জ্বালানি তেল পরিবহন ব্যবসায়ী আবুল বশর আবুর কাছ থেকে সিনথীর নামে দলিল করা হয়।

নিজের নামে বসুন্ধরা রিভারভিউ প্রকল্পের সাড়ে তিন কাঠা জমি থাকার কথা স্বীকার করেছেন নুসরাত জেবিন সিনথী। তবে তার দাবি, সেখানে ৮ তলা ভবন নির্মাণে তাকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হয়েছে।


বসুন্ধরা রিভারভিউ প্রকল্পে নির্মাণাধীন নুসরাত জেবিন সিনথীর আট তলা ভবন।

আদাবরের প্লটটি প্রথমে আহম্মদুল্লাহ তার শ্বশুর অলিউল হকের নামে কেনেন। পরে শ্বশুর সেটি মেয়ে নুসরাত জেবিন সিনথীর নামে দলিল করে দেন।

বরিশালের ঝালকাঠী সদর উপজেলার দিবাকরকাঠী গ্রামে আহম্মদুল্লাহ একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণ করেছেন। ওই এলাকায় তার ১০ একরের বেশি জমি রয়েছে। এ ছাড়া বরিশাল শহরে একটি ফ্ল্যাট এবং উজিরপুর কলেজের পাশেও জমি কিনেছেন তিনি।

ব্যক্তিগত গাড়িতে সরকারি লোগো ব্যবহার করেন আহম্মদুল্লাহর স্ত্রী।

 

ঢাকা মেট্রো-গ ৪৩-৪৭৬৯ নম্বরের একটি গাড়ি ব্যবহার করেন আহম্মদুল্লাহর স্ত্রী। ব্যক্তিগত গাড়ি হলেও সেটির সামনে সরকারি লোগো লাগানো হয়েছে। আর আহম্মদুল্লাহ ব্যবহার করতেন বিপিসির চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের বরাদ্দ গাড়ি (জিপ ও কার)।

সূত্র জানায়, প্রতি মাসে আহম্মদুল্লাহর পল্লবীর বাসায় বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ গাড়িতে করে উপহারসামগ্রী পৌঁছে দেন। এত মানুষের আনাগোনা প্রতিবেশীদেরও বিস্মিত করে। তার ছেলে ঢাকার একটি নামকরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষার্থী।

ফাইল আটকে কমিশন

বিপিসির অধীনে আটটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলো হচ্ছে ইস্টার্ন রিফাইনারি, পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, যমুনা অয়েল, ইস্টার্ন লুব্রিকেন্টস ব্লেন্ডার্স, এলপি গ্যাস লিমিটেড, পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানি ও স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল লিমিটেড।

এসব প্রতিষ্ঠানের যে কোনো কেনাকাটায় চেয়ারম্যানের অনুমোদন লাগে। সেই অনুমোদনের ফাইল প্রথমে যায় চেয়ারম্যানের পিএস আহম্মদুল্লাহর কাছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি ফাইল আটকে রেখে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিতেন। মাসোহারা পেতেন চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি জাহাজে জ্বালানি সরবরাহকারী (বাংকার) ১০ ডিলারের কাছ থেকে।

বেসরকারি রিফাইনারি পারটেক্স পেট্রো লিমিটেড, পেট্রোম্যাক্স রিফাইনারি লিমিটেড, সুপার পেট্রোকেমিক্যাল লিমিটেড, অ্যাকোয়া রিফাইনারি লিমিটেড ও বসুন্ধরা অয়েল অ্যান্ড গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড বিপিসির কাছ থেকে শত শত কোটি টাকার বিল নেয়।

সুপার পেট্রোকেমিক্যাল লিমিটেড একাই মাসে ৩০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার বিল তোলে। বিল দ্রুত পাস করাতে আহম্মদুল্লাহ নিয়মিত মাসোহারা পেতেন এসব কোম্পানির কাছ থেকেও।

এ ছাড়া বিটুমিন বিতরণ ও বিদেশি জাহাজের এলসি পেমেন্টের ফাইলেও টাকা ছাড়া চেয়ারম্যানের টেবিলে ফাইল না রাখার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।

মাদারীপুরের শিবচরে এ. এইচ. কে. ফিলিং স্টেশন অনুমোদনের ফাইল আটকে রেখে প্রায় ছয় লাখ টাকা নেওয়া হয়। লেনদেন হয় সোনারগাঁও হোটেলে।

নিয়োগে অনিয়ম

আহম্মদুল্লাহ ২০১৯ সালে বিপিসিতে সরাসরি ষষ্ঠ গ্রেডে নিয়োগ পান। চাকরির আবেদনে স্থায়ী ঠিকানা বরিশালের ঝালকাঠী গোপন করে ঢাকার ঠিকানা ব্যবহার করেছেন তিনি।

২০১৮ সালে মো. সামছুর রহমান বিপিসির চেয়ারম্যান হওয়ার পর আহম্মদুল্লাহকে পিএস হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

বিপিসির বিধিমালা অনুযায়ী চেয়ারম্যানের একান্ত সহকারীর পদটি সহকারী ব্যবস্থাপক (নবম গ্রেড) সমমানের। অথচ ষষ্ঠ গ্রেডের উপব্যবস্থাপক হয়েও আহম্মদুল্লাহ টানা সাড়ে ছয় বছর পদটি ধরে রাখেন।

২০১৯ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে আহম্মদুল্লাহ বিপিসিতে বরিশালের লোকজনকে নিয়োগ ও পদোন্নতি দিয়ে নিজের প্রভাববলয় তৈরি করেন। সরেজমিন দেখা গেছে, বিপিসির ঢাকার কেন্দ্রীয় অফিসে পিয়ন থেকে পিএ, নিরাপত্তা প্রহরী, রিসিপশনিস্ট ও গাড়িচালক; প্রতিটি পদেই বরিশাল অঞ্চলের লোকজনের আধিক্য।

প্রতিষ্ঠানের ঢাকা অফিস ও রেস্ট হাউসের কেনাকাটার দায়িত্বে থাকা উপব্যবস্থাপক মো. আশিক শাহরিয়ারের বাড়ি বরিশালে।

চেয়ারম্যানের প্রটোকল অফিসার ও রেস্ট হাউসের ইনচার্জ মো. মনিরুজ্জামান, চেয়ারম্যানের পিএ নুসরাত ইসলাম, পরিচালক (অপারেশন্স) বদরুননেসা, নিরাপত্তা প্রহরী রাকিব মিয়া, রিসিপশনিস্ট ইব্রাহিম, চেয়ারম্যানের গাড়িচালক মো. রাসেল, পিএসের গাড়িচালক মো. মনির এবং রেস্ট হাউসের মাহমুদ, শাহজাহান, আনোয়ার, শাহাদাত; সবার বাড়ি বরিশালে।

এক দিনেই বাতিল বদলির আদেশ
২০২১ সালে বিপিসির চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দেন এ বি এম আজাদ। আহম্মদুল্লাহর সিন্ডিকেট ও অপকর্মের বিষয়ে জানতে পেরে তিনি তাকে প্রধান কার্যালয় থেকে চট্টগ্রামে বদলি করেন। কিন্তু সিন্ডিকেটের চাপে এক দিনের মাথায় সেই আদেশ বাতিল করতে বাধ্য হন চেয়ারম্যান। আহম্মদুল্লাহ আবার পিএস পদে ফিরে আসেন।

আহম্মদুল্লাহর অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় বিপিসির ঢাকা রেস্ট হাউসের ইনচার্জ মো. শফিউল ইসলাম চাকরি হারান। পরে ওই পদে বরিশালের মো. মনিরুজ্জামানকে বসানো হয়।

ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে এফডিআর
আহম্মদুল্লাহর বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে গত ১ মার্চ জ্বালানিমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেন বিপিসি চেয়ারম্যানের সাবেক পিএস কে এম রিয়াজ রহমান। এতে বলা হয়, আহম্মদুল্লাহ প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন ব্যাংকে স্বজনদের চাকরির ব্যবস্থা করতেন। এই ব্যক্তিগত সুবিধার বিনিময়ে তিনি বিপিসির এফডিআর ও এসএনডি হিসাবের জন্য এসব ব্যাংককে বিশেষ সুবিধা দিতেন।

তার সাড়ে ছয় বছরের দায়িত্বকালে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে এসএনডি ও এফডিআর করা হয়েছে। এতে তিনি ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিপিসি। এ ছাড়া জ্বালানি কোম্পানিগুলোর বার্ষিক পাঁচ শতাংশ মুনাফা অনুমোদন, ডিপো ইনচার্জদের বদলির হুমকি দিয়ে মাসোহারা আদায়, তদন্ত রিপোর্টে জালিয়াতি এবং ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নিয়োগ-বাণিজ্যে মূলহোতা হিসেবে তার নাম উঠে এসেছে।

বিপিসির উপব্যবস্থাপক (হিসাব) মো. ইসতিয়াক হোসেন স্বাক্ষরিত প্রত্যয়নপত্রে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আপ্যায়ন, টিএ/ডিএ ও জ্বালানি বিল বাবদ আহম্মদুল্লাহকে পাঁচ লাখ ৫৯ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।

মেঘনা পেট্রোলিয়ামে বদলি

আহম্মদুল্লাহর সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির বিষয়ে জানতে পেরে গত ১৩ মে তাকে সহায়ক সংস্থা মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডে (এমপিএল) সংযুক্ত করেন বিপিসির বর্তমান চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান। তবে পুরোনো সিন্ডিকেটের মাধ্যমে আবারও পিএস পদে ফিরতে মরিয়া আহম্মদুল্লাহ।

আহম্মদুল্লাহকে মেঘনা পেট্রোলিয়ামে সংযুক্ত করার অফিস আদেশ

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, আহম্মদুল্লাহকে সরানোর পর থেকে বিপিসির ঢাকা কেন্দ্রীয় অফিসে তার সিন্ডিকেটের লোকজন কাজে অসহযোগিতা শুরু করে।

বিপিসির বক্তব্য

আহম্মদুল্লাহর বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা বলেন, আমি এখানে জয়েন করার পর থেকে এখন পর্যন্ত কেউ তার বিষয়ে অভিযোগ করেনি। দুদকেরও কোনো চিঠি আমরা পাইনি।

বিপিসির বিভিন্ন কাজে আহম্মদুল্লাহর সিন্ডিকেটের অসহযোগিতার বিষয়ে তিনি বলেন, আমি চেয়ারম্যান স্যারের সঙ্গে কাজ করি। পুরো ডিপার্টমেন্টে কোথায় কী হচ্ছে তা জানা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

আহম্মদুল্লাহর সাড়ে ছয় বছরে বিপিসির পক্ষে কোন কোন ব্যাংকে এফডিআর ও এসএনডি করা হয়েছে? এতে প্রতিষ্ঠানের কেমন ক্ষতি হয়েছে? এমন প্রশ্নে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে তথ্য অধিকার আইনে আবেদনের পরামর্শ দেন শাহিনা সুলতানা।

বিপিসি চেয়ারম্যান রেজানুর রহমানকে একাধিকবার ফোন করেও পাওয়া যায়নি। আর অভিযুক্ত আহাম্মদুল্লাহর ফোন বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

৫ আগস্টের পর ভাগ্য বদলে গেছে জামায়াত নেতার ছেলের

বিপিসির আহম্মদুল্লাহর ঢাকায় বহুতল ভবন, গ্রামে বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি

আপডেট সময় ০৮:২০:১৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

ঢাকায় বহুতল ভবন, একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট এবং গ্রামে ডুপ্লেক্স বাড়িসহ শতকোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন তিনি। নিজের বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকায় আইনি জটিলতা এড়াতে স্ত্রী, মা-বাবা ও শ্বশুরের নামে করেছেন এসব সম্পদ। মো. আহম্মদুল্লাহ নামের এই কর্মকর্তা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) উপব্যবস্থাপক। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানের একান্ত সচিবও (পিএস) ছিলেন তিনি।

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর মিরপুরে এক হাজার ১৬০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে আহম্মদুল্লাহর। ফ্ল্যাটটির অবস্থান পল্লবী সেকশন ৬-এর ৮ নম্বর রোডের সি-ব্লকের ৫ নম্বর বাড়ির দ্বিতীয় তলায়। এ ছাড়া আদাবরে একটি প্লট এবং মোহাম্মদপুরে আরও একটি ফ্ল্যাট রয়েছে তার।

বিপিসি চেয়ারম্যানের পিএস থাকাকালে তিনি স্ত্রী নুসরাত জেবিন সিনথীর নামে কেরানীগঞ্জ (দক্ষিণ) থানার কোন্ডা ইউনিয়নের আইন্তা মৌজায় সাড়ে তিন কাঠা জমি কেনেন। এটি ছিল বসুন্ধরা রিভারভিউ প্রকল্পের ২৮৭ নম্বর প্লট। দলিল নম্বর ১০১৯৭, খতিয়ান নম্বর ২২৪৩। ওই প্লটে ৮ তলা ভবনের ছাদ ঢালাই সম্পন্ন হয়েছে।

 


কেরানীগঞ্জ (দক্ষিণ) থানার কোন্ডা ইউনিয়নের আইন্তা মৌজায় সাড়ে তিন কাঠা জমির মালিক আহম্মদুল্লাহর স্ত্রী নুসরাত জেবিন সিনথী।

প্লটটির বাজারমূল্য শতকোটি টাকার কাছাকাছি হলেও দলিলে মাত্র ৩০ লাখ ৯৬ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। ২০২১ সালের ১১ নভেম্বর জমিটি জ্বালানি তেল পরিবহন ব্যবসায়ী আবুল বশর আবুর কাছ থেকে সিনথীর নামে দলিল করা হয়।

নিজের নামে বসুন্ধরা রিভারভিউ প্রকল্পের সাড়ে তিন কাঠা জমি থাকার কথা স্বীকার করেছেন নুসরাত জেবিন সিনথী। তবে তার দাবি, সেখানে ৮ তলা ভবন নির্মাণে তাকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হয়েছে।


বসুন্ধরা রিভারভিউ প্রকল্পে নির্মাণাধীন নুসরাত জেবিন সিনথীর আট তলা ভবন।

আদাবরের প্লটটি প্রথমে আহম্মদুল্লাহ তার শ্বশুর অলিউল হকের নামে কেনেন। পরে শ্বশুর সেটি মেয়ে নুসরাত জেবিন সিনথীর নামে দলিল করে দেন।

বরিশালের ঝালকাঠী সদর উপজেলার দিবাকরকাঠী গ্রামে আহম্মদুল্লাহ একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণ করেছেন। ওই এলাকায় তার ১০ একরের বেশি জমি রয়েছে। এ ছাড়া বরিশাল শহরে একটি ফ্ল্যাট এবং উজিরপুর কলেজের পাশেও জমি কিনেছেন তিনি।

ব্যক্তিগত গাড়িতে সরকারি লোগো ব্যবহার করেন আহম্মদুল্লাহর স্ত্রী।

 

ঢাকা মেট্রো-গ ৪৩-৪৭৬৯ নম্বরের একটি গাড়ি ব্যবহার করেন আহম্মদুল্লাহর স্ত্রী। ব্যক্তিগত গাড়ি হলেও সেটির সামনে সরকারি লোগো লাগানো হয়েছে। আর আহম্মদুল্লাহ ব্যবহার করতেন বিপিসির চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের বরাদ্দ গাড়ি (জিপ ও কার)।

সূত্র জানায়, প্রতি মাসে আহম্মদুল্লাহর পল্লবীর বাসায় বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ গাড়িতে করে উপহারসামগ্রী পৌঁছে দেন। এত মানুষের আনাগোনা প্রতিবেশীদেরও বিস্মিত করে। তার ছেলে ঢাকার একটি নামকরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষার্থী।

ফাইল আটকে কমিশন

বিপিসির অধীনে আটটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলো হচ্ছে ইস্টার্ন রিফাইনারি, পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, যমুনা অয়েল, ইস্টার্ন লুব্রিকেন্টস ব্লেন্ডার্স, এলপি গ্যাস লিমিটেড, পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানি ও স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল লিমিটেড।

এসব প্রতিষ্ঠানের যে কোনো কেনাকাটায় চেয়ারম্যানের অনুমোদন লাগে। সেই অনুমোদনের ফাইল প্রথমে যায় চেয়ারম্যানের পিএস আহম্মদুল্লাহর কাছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি ফাইল আটকে রেখে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিতেন। মাসোহারা পেতেন চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি জাহাজে জ্বালানি সরবরাহকারী (বাংকার) ১০ ডিলারের কাছ থেকে।

বেসরকারি রিফাইনারি পারটেক্স পেট্রো লিমিটেড, পেট্রোম্যাক্স রিফাইনারি লিমিটেড, সুপার পেট্রোকেমিক্যাল লিমিটেড, অ্যাকোয়া রিফাইনারি লিমিটেড ও বসুন্ধরা অয়েল অ্যান্ড গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড বিপিসির কাছ থেকে শত শত কোটি টাকার বিল নেয়।

সুপার পেট্রোকেমিক্যাল লিমিটেড একাই মাসে ৩০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার বিল তোলে। বিল দ্রুত পাস করাতে আহম্মদুল্লাহ নিয়মিত মাসোহারা পেতেন এসব কোম্পানির কাছ থেকেও।

এ ছাড়া বিটুমিন বিতরণ ও বিদেশি জাহাজের এলসি পেমেন্টের ফাইলেও টাকা ছাড়া চেয়ারম্যানের টেবিলে ফাইল না রাখার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।

মাদারীপুরের শিবচরে এ. এইচ. কে. ফিলিং স্টেশন অনুমোদনের ফাইল আটকে রেখে প্রায় ছয় লাখ টাকা নেওয়া হয়। লেনদেন হয় সোনারগাঁও হোটেলে।

নিয়োগে অনিয়ম

আহম্মদুল্লাহ ২০১৯ সালে বিপিসিতে সরাসরি ষষ্ঠ গ্রেডে নিয়োগ পান। চাকরির আবেদনে স্থায়ী ঠিকানা বরিশালের ঝালকাঠী গোপন করে ঢাকার ঠিকানা ব্যবহার করেছেন তিনি।

২০১৮ সালে মো. সামছুর রহমান বিপিসির চেয়ারম্যান হওয়ার পর আহম্মদুল্লাহকে পিএস হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

বিপিসির বিধিমালা অনুযায়ী চেয়ারম্যানের একান্ত সহকারীর পদটি সহকারী ব্যবস্থাপক (নবম গ্রেড) সমমানের। অথচ ষষ্ঠ গ্রেডের উপব্যবস্থাপক হয়েও আহম্মদুল্লাহ টানা সাড়ে ছয় বছর পদটি ধরে রাখেন।

২০১৯ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে আহম্মদুল্লাহ বিপিসিতে বরিশালের লোকজনকে নিয়োগ ও পদোন্নতি দিয়ে নিজের প্রভাববলয় তৈরি করেন। সরেজমিন দেখা গেছে, বিপিসির ঢাকার কেন্দ্রীয় অফিসে পিয়ন থেকে পিএ, নিরাপত্তা প্রহরী, রিসিপশনিস্ট ও গাড়িচালক; প্রতিটি পদেই বরিশাল অঞ্চলের লোকজনের আধিক্য।

প্রতিষ্ঠানের ঢাকা অফিস ও রেস্ট হাউসের কেনাকাটার দায়িত্বে থাকা উপব্যবস্থাপক মো. আশিক শাহরিয়ারের বাড়ি বরিশালে।

চেয়ারম্যানের প্রটোকল অফিসার ও রেস্ট হাউসের ইনচার্জ মো. মনিরুজ্জামান, চেয়ারম্যানের পিএ নুসরাত ইসলাম, পরিচালক (অপারেশন্স) বদরুননেসা, নিরাপত্তা প্রহরী রাকিব মিয়া, রিসিপশনিস্ট ইব্রাহিম, চেয়ারম্যানের গাড়িচালক মো. রাসেল, পিএসের গাড়িচালক মো. মনির এবং রেস্ট হাউসের মাহমুদ, শাহজাহান, আনোয়ার, শাহাদাত; সবার বাড়ি বরিশালে।

এক দিনেই বাতিল বদলির আদেশ
২০২১ সালে বিপিসির চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দেন এ বি এম আজাদ। আহম্মদুল্লাহর সিন্ডিকেট ও অপকর্মের বিষয়ে জানতে পেরে তিনি তাকে প্রধান কার্যালয় থেকে চট্টগ্রামে বদলি করেন। কিন্তু সিন্ডিকেটের চাপে এক দিনের মাথায় সেই আদেশ বাতিল করতে বাধ্য হন চেয়ারম্যান। আহম্মদুল্লাহ আবার পিএস পদে ফিরে আসেন।

আহম্মদুল্লাহর অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় বিপিসির ঢাকা রেস্ট হাউসের ইনচার্জ মো. শফিউল ইসলাম চাকরি হারান। পরে ওই পদে বরিশালের মো. মনিরুজ্জামানকে বসানো হয়।

ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে এফডিআর
আহম্মদুল্লাহর বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে গত ১ মার্চ জ্বালানিমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেন বিপিসি চেয়ারম্যানের সাবেক পিএস কে এম রিয়াজ রহমান। এতে বলা হয়, আহম্মদুল্লাহ প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন ব্যাংকে স্বজনদের চাকরির ব্যবস্থা করতেন। এই ব্যক্তিগত সুবিধার বিনিময়ে তিনি বিপিসির এফডিআর ও এসএনডি হিসাবের জন্য এসব ব্যাংককে বিশেষ সুবিধা দিতেন।

তার সাড়ে ছয় বছরের দায়িত্বকালে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে এসএনডি ও এফডিআর করা হয়েছে। এতে তিনি ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিপিসি। এ ছাড়া জ্বালানি কোম্পানিগুলোর বার্ষিক পাঁচ শতাংশ মুনাফা অনুমোদন, ডিপো ইনচার্জদের বদলির হুমকি দিয়ে মাসোহারা আদায়, তদন্ত রিপোর্টে জালিয়াতি এবং ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নিয়োগ-বাণিজ্যে মূলহোতা হিসেবে তার নাম উঠে এসেছে।

বিপিসির উপব্যবস্থাপক (হিসাব) মো. ইসতিয়াক হোসেন স্বাক্ষরিত প্রত্যয়নপত্রে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আপ্যায়ন, টিএ/ডিএ ও জ্বালানি বিল বাবদ আহম্মদুল্লাহকে পাঁচ লাখ ৫৯ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।

মেঘনা পেট্রোলিয়ামে বদলি

আহম্মদুল্লাহর সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির বিষয়ে জানতে পেরে গত ১৩ মে তাকে সহায়ক সংস্থা মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডে (এমপিএল) সংযুক্ত করেন বিপিসির বর্তমান চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান। তবে পুরোনো সিন্ডিকেটের মাধ্যমে আবারও পিএস পদে ফিরতে মরিয়া আহম্মদুল্লাহ।

আহম্মদুল্লাহকে মেঘনা পেট্রোলিয়ামে সংযুক্ত করার অফিস আদেশ

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, আহম্মদুল্লাহকে সরানোর পর থেকে বিপিসির ঢাকা কেন্দ্রীয় অফিসে তার সিন্ডিকেটের লোকজন কাজে অসহযোগিতা শুরু করে।

বিপিসির বক্তব্য

আহম্মদুল্লাহর বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা বলেন, আমি এখানে জয়েন করার পর থেকে এখন পর্যন্ত কেউ তার বিষয়ে অভিযোগ করেনি। দুদকেরও কোনো চিঠি আমরা পাইনি।

বিপিসির বিভিন্ন কাজে আহম্মদুল্লাহর সিন্ডিকেটের অসহযোগিতার বিষয়ে তিনি বলেন, আমি চেয়ারম্যান স্যারের সঙ্গে কাজ করি। পুরো ডিপার্টমেন্টে কোথায় কী হচ্ছে তা জানা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

আহম্মদুল্লাহর সাড়ে ছয় বছরে বিপিসির পক্ষে কোন কোন ব্যাংকে এফডিআর ও এসএনডি করা হয়েছে? এতে প্রতিষ্ঠানের কেমন ক্ষতি হয়েছে? এমন প্রশ্নে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে তথ্য অধিকার আইনে আবেদনের পরামর্শ দেন শাহিনা সুলতানা।

বিপিসি চেয়ারম্যান রেজানুর রহমানকে একাধিকবার ফোন করেও পাওয়া যায়নি। আর অভিযুক্ত আহাম্মদুল্লাহর ফোন বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।