আর মাত্র কয়েকদিন পর পবিত্র ঈদ। পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিতে শুরু করেছেন শিল্পনগরী গাজীপুর ও ঢাকার কর্মজীবী মানুষ। ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়কে যানবাহন ও ঘরমুখী মানুষের চাপ বেড়েছে কয়েক গুণ। বাসের চেয়ে মানুষের ভিড়ই যেন বেশি। এ সুযোগে গণপরিবহনের অসাধু কিছু চালক ও সহযোগী অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন বলে অভিযোগ তুলেছে যাত্রীরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা বাসস্ট্যান্ডে যাত্রীবাহী বাসগুলোয় চলছে দরদাম। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে তুলনায় বাসগুলোতে দ্বিগুণ ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। এতে হতাশা প্রকাশ করছেন যাত্রীরা। তবে পরিবহন চালকদের দাবি, সড়কের বিভিন্ন স্থানে খরচ বেড়েছে। এ জন্য ঈদে বেশি ভাড়া নেওয়া হয়।
হাবিব এক যাত্রী দৈনিক আমাদের মাতৃভূমিকে বলেন, স্বাভাবিক সময়ে সিরাজগঞ্জে যেতে ভাড়া লাগে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। কিন্তু আজ ৮০০-১,০০০ টাকা করে চাচ্ছে। ৬০০ টাকা বলেছি, তা-ও নিচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত ৭৫০ টাকা করে দিয়ে আমরা তিনজন বাসে উঠছি।
শ্যামলী পরিবহনের চন্দ্রা এলাকার কাউন্টারের ব্যবস্থাপক বলেন, ভাড়া নৈরাজ্য সৃষ্টি করছেন নন-ব্র্যান্ডের কিছু বাস ও লোকাল বাসের মালিকেরা। যাঁদের কোনো কাউন্টার নেই। ঈদ কেন্দ্র করে তাঁরা দূরপাল্লার যাত্রী বহন করেন। এদিকে, গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বাড়তি ভাড়ার চাপ ও যানবাহন স্বল্পতায় ঘরমুখী অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পিকাপ ভ্যান, খোলা ছাদের ট্রাক ও বাসের ছাদে ভ্রমণ করছেন।
অনেক যাত্রীরা বলছেন, প্রতি বছর ঈদের আনন্দ উদযাপনে মানুষ বাড়ি ফেরেন। স্বাভাবিকভাবে এ সময় সড়ক, রেল ও নদীপথে যাত্রীদের চাপ বেড়ে যায়। তবে সেই সঙ্গে টিকিট ক্রয় থেকে বাড়ি পৌঁছানো পর্যন্ত যাত্রীদের ভোগান্তিও বেড়ে যায়। এ ভোগান্তির শুরু হয় টিকিট না পাওয়া থেকে। আবার পাওয়া গেলেও তার জন্য বাড়তি ভাড়া গুনতে হয়। আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বিভিন্ন রুটে এসি বা নন-এসি বাসের সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ দামে বাসের টিকিট বিক্রি হচ্ছে। টিকিট বিক্রির অনলাইন সাইটগুলোয় দেখানো হচ্ছে কোনো বাসেরই আসন খালি নেই। কিন্তু অনলাইনে না থাকলেও কাউন্টারে বেশি দামে টিকিট পাওয়া যাচ্ছে। এর পেছনে দায় রয়েছে পরিবহন মালিকদের। দুঃখজনকভাবে পরিবহন মালিকরা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলেও তা প্রতিরোধে সরকারের তরফ থেকে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না।
যদিও এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ভাষ্য, বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অতিরিক্ত ভাড়া আদায় প্রতিরোধে তৎপর রয়েছে। সংস্থাটি সারা দেশেই নিয়মিত তদারকি করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সংস্থাটির তদারকির কোনো প্রতিফলন টিকিটের দামে দেখা যাচ্ছে না। অথচ উৎসবের যাত্রা এ ধরনের ভোগান্তি থেকে মুক্ত হওয়া জরুরি ছিল।
পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঢাকা ও আশপাশের জেলা থেকে প্রায় দেড় কোটি মানুষ নিজ নিজ গন্তব্যে যাত্রা করবে। এছাড়া দেশের এক জেলা থেকে অন্য জেলায় আরো তিন থেকে সাড়ে তিন কোটি মানুষের যাতায়াত হতে পারে। তাদের ৭৫ শতাংশ সড়কপথে, ১৭ শতাংশ নৌপথে এবং ৮ শতাংশ রেলপথে যাতায়াত করবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ঈদযাত্রীর সংখ্যার দিকে লক্ষ করলে দেখা যায় এক কোটির বেশি মানুষ ঈদে ঘরে ফেরেন। কিন্তু তার পরও এ যাত্রীদের যাত্রা সেভাবে ভোগান্তিহীন ও নিরাপদ করতে পারেনি কোনো সরকার। ঈদে চাহিদার সমপরিমাণ পরিবহনের ব্যবস্থা করতে পারেনি। আবার যেসব গাড়ি সড়কে নামানো হয় সেগুলোর বেশির ভাগই থাকে ফিটনেসবিহীন। যদিও ঈদের আগে সড়ক পরিবহনসংশ্লিষ্টদের বলতে শোনা যায়, ফিটনেসবিহীন গাড়ি বা রুট পারমিটবিহীন গাড়ি মহাসড়কে নামতে দেয়া হবে না। কিন্তু বাস্তবায়ন চোখে পড়ে না। অতিরিক্ত ও বেপরোয়া গাড়ির চাপে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা বাড়তে থাকে।
সচেতন নাগরিকরা বলছেন, ঈদযাত্রা নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর সক্রিয় হওয়া জরুরি। টিকিট পাওয়ার সুব্যবস্থা করা জরুরি। বাড়তি দাম নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বাসের ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ট্রেনের ওপরও চাপ কমতে পারে। এজন্য নজরদারি এবং আইনের প্রয়োগ জোরদার করা আবশ্যক। এছাড়া কীভাবে সড়ক ও মহাসড়কে যানজট নিরসন করা যায় সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।
গাজীপুর জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা সবসময় নজরদারি করছেন। অতিরিক্ত ভাড়া দাবির বিষয়ে কেউ অভিযোগ করলে সাথে সাথে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এম এ হোসেন, গাজীপুর 






















