কাজ শেষ হওয়ার আগেই একটি প্রতিষ্ঠানকে ১০ কোটি টাকার বেশি বিল পরিশোধ করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। সড়কবাতির দুটি কাজের বিপরীতে ‘প্রোটেস্টার লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে এই বিল দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির মালিক ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালকের দায়িত্ব পালন করা জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক আকরাম খান। দরপত্র প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়ম, অভিজ্ঞতা জালিয়াতি এবং মালামাল বুঝে পাওয়ার আগেই বিল ছাড়ের এই ঘটনায় করপোরেশনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।
ডিএনসিসির নথি অনুযায়ী, গত ৩০ জুন কাজ শেষ হওয়ার আগেই দুই প্রকল্পে মোট ১০ কোটি ৬৯ লাখ ৪৩ হাজার ২১৮ টাকার বিলের ফাইলে স্বাক্ষর করেন সংশ্লিষ্টরা। আয়কর ও ভ্যাট কেটে রাখার পর এর নিট অঙ্ক দাঁড়ায় ৯ কোটি ১৮ লাখ ৭৩ হাজার ৯৪৭ টাকা। এর মধ্যে অঞ্চল-৫-এর প্রকল্পে কাজের ভৌত অগ্রগতি দেখানো হয়েছে মাত্র ২৯ শতাংশ। অথচ প্রোটেস্টার লিমিটেড ডিএনসিসির বিদ্যুৎ বিভাগে সড়কবাতির যে দুটি কাজ পেয়েছে, তার মোট প্রাক্কলিত দর প্রায় সাড়ে ৩৫ কোটি টাকা।
নিয়ম অনুযায়ী দরদাতাকে আগে সফলভাবে কাজ শেষ করার অভিজ্ঞতা দেখাতে হলেও প্রোটেস্টারের ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। অঞ্চল-৩-এর মহাখালী ফ্লাইওভার থেকে জাহাঙ্গীর গেট এবং বিভিন্ন সড়কে বাতির খুঁটি ও স্মার্ট এলইডি লাইট সরবরাহের ১৪ কোটি ২০ লাখ টাকার দরপত্রে প্রোটেস্টার রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) একটি অসম্পন্ন কাজের সনদ জমা দেয়। কাজটির মেয়াদ ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত হওয়ায় দরপত্র জমা দেওয়ার সময় তা চলমান ছিল। সরকারি ক্রয় বিধিমালা-২০০৮ (পিপিআর)-এর বিধি ১১১৮ এবং বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (পিপিএ) নির্দেশনা লঙ্ঘন করে পরবর্তীতে সাধারণ কাজের সনদ ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়।
একইভাবে অঞ্চল-৫-এর ২১ কোটি ১৯ লাখ টাকার ডেকোরেটিভ লাইট পোল ও প্রযুক্তি সরঞ্জাম সরবরাহের দরপত্রেও একমাত্র অংশগ্রহণকারী হিসেবে প্রোটেস্টার লিমিটেড একই অসম্পন্ন রাসিকের সনদ জমা দেয়। পরবর্তীতে পূর্বের মতো সাধারণ কাজের সনদ দেখিয়ে গত বছরের ১৯ নভেম্বর প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যাদেশ দেওয়া হয় এবং ৪ ডিসেম্বর চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। অস্বচ্ছ এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাজ বাগিয়ে নেওয়ার পর থেকেই শুরু হয় নানামুখী অনিয়ম।
প্রকল্পের সরেজমিন অগ্রগতি ও মালামাল শতভাগ বুঝে পাওয়ার আগেই ঠিকাদারের অর্থ ছাড়ের তোড়জোড় শুরু হয়। অঞ্চল-৫-এর ২১ কোটি ১৯ লাখ টাকার প্রকল্পের বিপরীতে প্রথম ও চলতি বিল বাবদ ৬ কোটি ৫ লাখ ৪৭ হাজার ৯৫৮ টাকার প্রস্তাব তৈরি করা হয়। এর মধ্যে ভ্যাট ও আয়কর বাবদ ৮৫ লাখ ৩১ হাজার ৭৫৮ টাকা কেটে নেওয়ার পর নিট ৫ কোটি ২০ লাখ ১৬ হাজার ২০০ টাকা যমুনা ব্যাংক পিএলসির উত্তরা শাখায় প্রোটেস্টারের অ্যাকাউন্টে পরিশোধ করা হয়। নথিতে কাজের ভৌত অগ্রগতি মাত্র ২৯ শতাংশ দেখানো হলেও মালামাল ও কাজ সম্পূর্ণ বুঝে না নিয়েই বিলের ফাইলে স্বাক্ষর করেন নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহিম মিয়া, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম, প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ রাকিবুল হাসান, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান এবং ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন।
অনুরূপভাবে অঞ্চল-৩-এর ১৪ কোটি ২০ লাখ টাকার কাজের বিপরীতেও প্রথম ও চলতি বিল বাবদ ৪ কোটি ৬৩ লাখ ৯৫ হাজার ২৬০ টাকার বিল অনুমোদন করা হয়। ভ্যাট ও আয়কর বাবদ ৬৫ লাখ ৩৭ হাজার ৫১৪ টাকা কাটার পর নিট ৩ কোটি ৯৮ লাখ ৫৭ হাজার ৭৪৭ টাকা একইভাবে পরিশোধ করা হয়। এই ফাইলেও একই শীর্ষ কর্মকর্তারা স্বাক্ষর করেছেন। মালামাল ও কাজ সম্পূর্ণ বুঝে না নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে অঞ্চল-৩-এর নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম জানান, তাদের মালামাল রাখার জায়গা না থাকায় সেগুলো ঠিকাদারের হেফাজতে রাখা হয়েছে এবং বৈদ্যুতিক পোলের ঢালাইয়ের কাজ চলছে। তবে মালামাল ঠিকাদারের হেফাজতে রাখার কোনো দাপ্তরিক অনুমতিপত্র আছে কি না, এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।
এই পুরো অনিয়মকে দীর্ঘায়িত করতে করপোরেশনের সাংগঠনিক কাঠামো বা অর্গানোগ্রাম লঙ্ঘন করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী বিদ্যুৎ বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলীর পদ একটি হলেও দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে একজন অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দিয়ে এই পদটি চালানো হচ্ছে। তৎকালীন মেয়র আতিকুল ইসলামের নির্দেশে ২০২১ সালে অঞ্চল-২-এর সহকারী প্রকৌশলী আব্দুর রহিম মিয়াকে নির্বাহী প্রকৌশলীর অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের জুনে ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং সার্কেলের সহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামকেও বিদ্যুৎ সার্কেলের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রশাসকের নির্দেশের আড়ালে এক পদের বিপরীতে দুজনকে এমন দ্বৈত দায়িত্ব দেওয়ার পেছনে দরপত্র ও কাজের তদারকিতে অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্য রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
দরপত্র প্রক্রিয়ার অনিয়ম ও কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিল ছাড়ের এই ঘটনা আড়াল করতে অভিনব এক উপায়ে বিদেশ সফরের আয়োজন করা হয়। সরকারি প্রকল্পের অর্থে বিদেশ সফর বন্ধের কড়া নির্দেশনা থাকলেও স্থানীয় সরকার বিভাগের এক আদেশে ডিএনসিসি ও স্থানীয় সরকার বিভাগের ১০ কর্মকর্তার চীন সফর মঞ্জুর করা হয়। ‘স্মার্ট এলইডি স্ট্রিট লাইট অ্যান্ড ডেকোরেটিভ পোল’-এর ফ্যাক্টরি অ্যাকসেপ্টেন্স টেস্ট ও প্রযুক্তি হস্তান্তর প্রশিক্ষণের কথা বলে এই সফরের অনুমোদন নেওয়া হয়। যাতায়াত ও অবস্থানকালীন যাবতীয় খরচ বহন করার কথা ছিল সরবরাহকারী ও প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান জিয়াংসু সিশিন ইলেকট্রিক গ্রুপ এবং জেজিয়াং হংইউয়ান লাইটিং গ্রুপ কোম্পানির।
তবে ১০ কর্মকর্তার সফরের সরকারি অনুমোদন থাকলেও বাস্তবে দুই দফায় পরিবারসহ মোট ২২ জন চীন সফর করেন। প্রথম দফায় ছয়জন এবং দ্বিতীয় দফায় সপরিবারে গেছেন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম, প্রশাসকের একান্ত সচিব মুহাম্মদ আবদুল্লাহ এবং জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব জিসান বিন মাজেদসহ ১৬ জন। প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের এই সপরিবার বিদেশ সফর নিয়ে প্রশাসনিক মহলে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
সমগ্র এই অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রোটেস্টার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আকরাম খান দাবি করেন, এ কাজে কোনো ধরনের অনিয়ম হয়নি। সিটি করপোরেশন মালামাল রাখার জায়গা না দেওয়ায় তারা জিনিসপত্র নিজেদের তত্ত্বাবধানে রেখেছেন এবং নিয়ম অনুসারেই প্রথম বিল পরিশোধ করা হয়েছে। অন্যদিকে দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়ে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম জানান, দরপত্র থেকে মালামাল গ্রহণ পর্যন্ত সব প্রক্রিয়া আইনি নিয়ম মেনেই হওয়ার কথা, তবে প্রশ্ন ওঠলে করপোরেশন তা আবার যাচাই করে দেখবে। তবে এ বিষয়ে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















