মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী বাজারে একটি কনফেকশনারি দোকানে পাঁচ হাজার টাকা চাঁদা দাবিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও অধিবাসীদের সঙ্গে ধীপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতির ভাইয়ের সংঘর্ষ ও মারধরের ঘটনা ঘটেছে। আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার স্বীকৃত ইনভার্টেড পিরামিড পদ্ধতি অনুসরণ করে জানা যায়, গত ১৭ ও ১৮ অক্টোবর টঙ্গীবাড়ী বাজারের মাঝিবাড়ি বটতলা মসজিদসংলগ্ন এলাকায় এই চাঁদা দাবি ও পরবর্তীতে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত ব্যক্তি স্থানীয় প্রভাবশালী বিএনপি নেতা দেলোয়ার হাওলাদারের ভাই নুরু হাওলাদার। ঘটনার জের ধরে নুরু হাওলাদার গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ঘটনার ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীর অভিযোগ না নেওয়া এবং পাল্টা মামলা দায়েরের মাধ্যমে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা বিধান নিয়ে মারাত্মক প্রশ্ন উঠেছে।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ ও সময়রেখা বিশ্লেষণে জানা যায়, গত ১৭ অক্টোবর অভিযুক্ত নুরু হাওলাদার টঙ্গীবাড়ী বাজারের মাঝিবাড়ি বটতলা মসজিদসংলগ্ন মো. রহিমের কনফেকশনারি দোকানে গিয়ে সরাসরি পাঁচ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেন। ওই সময় মূল দোকানমালিক রহিম উপস্থিত না থাকায় তার ছোট ভাই রমজান দোকানে দায়িত্ব পালন করছিলেন। রমজান উক্ত চাঁদার টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে নুরু হাওলাদার তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ, শারীরিক প্রহার এবং প্রাণনাশের হুমকি প্রদান করেন। একই সঙ্গে দোকানের বিক্রয়যোগ্য মালামাল ভাঙচুর করে মাটিতে ফেলে রেখে চলে যান।
পরদিন ১৮ অক্টোবর নুরু হাওলাদার পুনরায় উক্ত দোকানে গিয়ে আবার চাঁদার টাকা দাবি করেন। এ সময় দোকানমালিক রহিম ও উপস্থিত স্থানীয়দের সঙ্গে তার তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে সংক্ষুব্ধ স্থানীয় জনতা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে অভিযুক্তের তুমুল মারামারি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে নুরু হাওলাদার গুরুতর আহত হন। পরবর্তীতে উপস্থিত স্থানীয়রা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠায়। এ-সংক্রান্ত দৃশ্য ধারণকৃত ভিডিও ফেসবুকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় সচেতন মহল ও ব্যবসায়ী সমাজের মধ্যে ক্ষোভ ছড়ায়।
ঘটনায় যুক্ত সংশ্লিষ্ট পক্ষ, ভুক্তভোগী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্যে চরম বৈপরীত্য ও বিরোধ লক্ষ্য করা গেছে। দোকানমালিক মো. রহিম অভিযোগ করে বলেন, “নুরু হাওলাদার দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ভয়ভীতি দেখিয়ে আসছিলেন। ঘটনার দিন আমার ছোট ভাইকে মারধর ও দোকানে তাণ্ডব চালানো হয়। আমি এ বিষয়ে আইনি সুরক্ষার জন্য টঙ্গীবাড়ী থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে গেলেও পুলিশ আমার অভিযোগ গ্রহণ করেনি। উল্টো পরবর্তীতে জানতে পারি, আহত নুরু হাওলাদার বাদী হয়ে আমার ও স্থানীয়দের বিরুদ্ধে সাতজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ৯ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন।”
অন্যদিকে, চাঁদা দাবির অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে অভিযুক্তের ভাই ধীপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি দেলোয়ার হাওলাদার বলেন, “আমার ভাইকে পরিকল্পিতভাবে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে মোহন মাঝি ও তার সহযোগীরা বর্বরোচিতভাবে মারধর করেছে। সে বর্তমানে আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। আমার ভাই কখনো চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত ছিল না। তবে অপরাধী যে-ই হোক, সে আমার ভাই হলেও তার পার পাওয়ার সুযোগ নেই।”
এদিকে ভুক্তভোগীর অভিযোগ না নেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে টঙ্গীবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শামীম আহম্মেদ ব্যবসায়ীর দাবি অস্বীকার করে জানান, “উক্ত ঘটনায় ভুক্তভোগী বা অন্য কোনো পক্ষ থেকে থানায় চাঁদাবাজির কোনো অভিযোগ জমা দেওয়া হয়নি। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আমরা তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
স্থানভিত্তিক অপরাধের পরিসংখ্যান ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী কিংবা তাদের স্বজনদের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর চাঁদাবাজির অভিযোগ নতুন নয়। ‘জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর’ এবং স্থানীয় শিল্প ও বণিক সমিতির উপাত্ত অনুযায়ী, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা প্রায়শই এ ধরনের অনিয়মতান্ত্রিক চাঁদাবাজির শিকার হন, কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব ও আইনি জটিলতার ভয়ে অধিকাংশ সময়ই সরাসরি মামলা দায়ের করা থেকে বিরত থাকেন। দ্য পিনাল কোড, ১৮৬০-এর ৩৮৩ ও ৩৮৪ ধারা অনুযায়ী জোরপূর্বক অর্থ আদায় বা চাঁদা দাবি একটি গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ। তবে ঘটনার পর ভুক্তভোগী পক্ষ থানায় অভিযোগ করতে গিয়ে আইনি সহায়তা না পাওয়ার যে দাবি উঠে এসেছে, তা ফৌজদারি কার্যবিধির (CrPC) আওতায় সাধারণ নাগরিকদের আইনি প্রতিকার পাওয়ার মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করে।
এই ঘটনার সার্বিক বিশ্লেষণ ও সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজনৈতিক পরিচয়কে ব্যবহার করে হাট-বাজারে চাঁদাবাজি বা স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারের মানসিকতা গ্রামীণ অর্থনীতি ও স্থানীয় শান্তিশৃঙ্খলা ধ্বংসের অন্যতম কারণ। ঘটনার ভিডিওচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত হওয়ায় এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন থাকায় এলাকায় পাল্টা প্রতিশোধমূলক সহিংসতার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত কোনো পক্ষের দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করা, নিরপেক্ষ সিসিটিভি ও ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করা এবং মূল অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনি আওতায় আনা। ব্যবসায়ীদের পূর্ণ নিরাপত্তা বিধান এবং সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই বর্তমানে টঙ্গীবাড়ীর স্থানীয় স্থিতিশীলতা বজায় রাখার একমাত্র উপায়।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















