পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন দেশের মেগা প্রকল্প ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র’-এ কোটি কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে বিশাল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের এক চাঞ্চল্যকর প্রতারণা চক্রের পর্দা উন্মোচিত হয়েছে। ভুক্তভোগী এক স্থানীয় ঠিকাদারের দায়ের করা সুনির্দিষ্ট প্রতারণা মামলার ভিত্তিতে অনুসন্ধানে নেমে ঈশ্বরদীর স্থানীয় একটি সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের দুই মূল হোতা ও সহোদর ভাইকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অভিযুক্ত আসামিরা হলেন—ঈশ্বরদীর পাকশী ইউনিয়নের নতুন রূপপুর এলাকার ইসলাম মণ্ডলের দুই ছেলে সুপ্ত ইসলাম জীবন (২৭) এবং তাঁর ছোট ভাই দীপ্ত ইসলাম (২৫)। দীর্ঘ প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে গত ১৪ অক্টোবর, বুধবার ঈশ্বরদী থানা পুলিশ আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই প্রতারণা, অস্ত্র ও মাদক সিন্ডিকেটের গ্রেপ্তারের বিস্তারিত তথ্য গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছে।
মামলার এজাহার ও ঈশ্বরদী থানা পুলিশ সূত্রে পাওয়া অনুসন্ধানী তথ্য অনুযায়ী, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের রাশিয়ান মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘এটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট’ (ASE) এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘ইএসকেএম’ (ESKM)-এর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিত এই সংঘবদ্ধ চক্রটি। স্থানীয় ও বহিরাগত ঠিকাদারদের বিদ্যুৎকেন্দ্রের অভ্যন্তরে কোটি কোটি টাকার আধুনিক নির্মাণকাজ ও মালামাল সরবরাহের প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলত আসামিরা।
এরপর জাল ও ভুয়া কার্যাদেশ (Work Order) তৈরি, প্রকল্প এলাকার ভেতরে প্রবেশের বিশেষ প্রশাসনিক কার্ড সংগ্রহ, কাঁচামাল কেনা, দ্রুত বিল পাস করানো এবং ভ্যাট-ট্যাক্স পরিশোধের নানা মনগড়া অজুহাতে নগদ ও ব্যাংকের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিত তারা। এই কৌশলে ঈশ্বরদীর পাকশী ইউনিয়নের বাঘইল পূর্বপাড়ার বাসিন্দা স্থানীয় ঠিকাদার মোহাম্মদ বিন ছালামের কাছ থেকে চক্রটি দফায় দফায় নগদ ২ কোটি ৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। এ ছাড়া মালামাল বাবদ আরও ৪৪ লাখ টাকা সমন্বয় না করে আত্মসাৎ করা হয়, যার সর্বমোট পরিমাণ প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ টাকারও বেশি।
প্রতারণার শিকার ঠিকাদার মোহাম্মদ বিন ছালাম গত ৩ সেপ্টেম্বর ঈশ্বরদী থানায় আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির প্রাসঙ্গিক ধারায় একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর নিবিড় তদন্তে নেমে ঘটনার মাত্র তিন দিনের মাথায়, অর্থাৎ গত ৬ সেপ্টেম্বর, অন্যতম প্রধান আসামি দীপ্ত ইসলামকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। অন্যদিকে, মামলার তদন্তে উঠে আসে, চক্রের অপর প্রধান আসামি সুপ্ত ইসলাম জীবন গত ৬ জুলাই অবৈধ অস্ত্রসহ চার সহযোগীসহ র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) হাতে গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে জেলা কারাগারে বন্দি রয়েছেন।
মামলার দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্তকারী কর্মকর্তা ও ঈশ্বরদী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সঞ্চয় চক্রবর্তী বিষয়গুলোর সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, আসামি দীপ্ত ইসলামকে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হলে তিনি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজ মুখে প্রতারণা ও অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অপরাধ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছেন। এ ছাড়া বিকাশ, নগদ এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে কোটি কোটি টাকা লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত এজেন্ট ও ব্যবসায়ীরাও ইতোমধ্যে আদালতে সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্য প্রদান করেছেন।
ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশাদুর রহমান আসাদ সার্বিক আইনি পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বলেন, “রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে কেন্দ্র করে একশ্রেণির কিশোর গ্যাং ও প্রতারক চক্র ঠিকাদারদের বিভ্রান্ত করে অর্থ আত্মসাৎ করছে বলে দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক খবর পাওয়া যাচ্ছিল। ছালামের সুনির্দিষ্ট এজাহারের ভিত্তিতে তদন্ত চালিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের শীর্ষ দুই ভাই সুপ্ত ও দীপ্তকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, এরা শুধু প্রতারণাই নয়, অবৈধ অস্ত্রের প্রদর্শন এবং সীমান্তঘেঁষা মাদক কারবারের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। চক্রের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য সহযোগীদেরও পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের গ্রেপ্তারে ধারাবাহিক পুলিশি চিরুনি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”
দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪২০ (প্রতারণা), ৪০৬ (বিশ্বাসভঙ্গ) ও ৪৬৮ (জালিয়াতি) ধারার অধীনে এ ধরনের ভুয়া ওয়ার্ক অর্ডার তৈরি ও কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া চরম শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। দেশের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের ভাবমূর্তি ব্যবহার করে সাধারণ ব্যবসায়ীদের প্রতারিত করা এবং কিশোর গ্যাং গড়ে তোলার পেছনে কারা ইন্ধন জোগাচ্ছে, তাও খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
জাতীয় মেগা প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও সুরক্ষিত আন্তর্জাতিক স্থানের নাম ব্যবহার করে স্থানীয় কিশোর গ্যাংয়ের কোটি টাকার প্রতারণা স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার জন্য এক তীব্র অশনিসংকেত। নামসর্বস্ব পরিচয় ব্যবহার করে বিকাশ ও ব্যাংকিং মাধ্যমে এমন বিপুল অঙ্কের অবৈধ লেনদেন কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে নজরদারির বাইরে থাকল—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল।
বিশেষজ্ঞ ও সুশীল সমাজের মতে, রূপপুর প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও সাধারণ ঠিকাদারদের আইনি সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে পুলিশ ও রাশিয়ান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের যৌথ তদারকি প্রয়োজন। গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান নিশ্চিত করা না গেলে এ ধরনের সংঘবদ্ধ অপরাধী ও কিশোর গ্যাং রাষ্ট্রীয় মেগা প্রকল্পকে পুঁজি করে অপরাধমূলক সাম্রাজ্য বিস্তার চালিয়ে যাবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















