ঢাকা ১২:০৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পরিবর্তনে সংবিধানে ফিরছে গণভোটের বিধান’ শিক্ষার উন্নয়ন ছাড়া দেশের অগ্রগতি সম্ভব নয় : ড. মঈন খান বাউফলে মৎস্যজীবী দলের সভাপতির বিরুদ্ধে প্রধান শিক্ষককে লাঞ্ছিতের অভিযোগ, মোবাইল ভাঙচুর সুন্দরবনে বাঘের পায়ের ছাপের স্মৃতি এখনও মনে পড়ে প্রধানমন্ত্রীর ব্রাহ্মণপাড়ায় পুলিশের বিশেষ অভিযান, গাঁজা-স্কাফসহ গ্রেপ্তার ৪ মঠবাড়িয়ায় বিয়ের আশ্বাসে শারীরিক সম্পর্কের অভিযোগ ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে নওগাঁর রাণীনগরে ব্যাংক কর্মকর্তাদের মারধর করে ৩৪ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগ কালিহাতীতে ৪ হাজার ৮১৫ পিস ইয়াবাসহ যুবক আটক লালমনিরহাটে পাঁচ মাসের শিশুকে রেখে মাকে হত্যা, স্বামীর মৃত্যুদণ্ড আত্রাইয়ে আনসার-ভিডিপির বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি

বন্ডে প্রভাব বিস্তার থেকে শতকোটি টাকার সম্পদ: কাস্টমস কর্মকর্তা রাসেলকে ঘিরে অভিযোগ

  • বিশেষ সংবাদদাতা
  • আপডেট সময় ০৬:৪১:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬
  • ৫৩৫ বার পড়া হয়েছে

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নিয়ন্ত্রণাধীন কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের সম্প্রতি পদোন্নতি পাওয়া সহকারী কমিশনার রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে চরম অনিয়ম, জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে। কাস্টমস ক্যাডারের ১১ ব্যাচের এই কর্মকর্তার (জন্ম: ১ নভেম্বর ১৯৮৬) বিরুদ্ধে সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

অনুসন্ধান ও অভিযোগের সূত্রে জানা যায়, চাকরিজীবনের শুরু থেকেই একের পর এক সংবেদনশীল পদে দায়িত্ব পালনকালে অনিয়মের সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন রাসেল। একজন সাধারণ সরকারি চাকরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও ঘুষ গ্রহণ ও রাজস্ব ফাঁকিতে সহায়তা করে রাতারাতি বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিক বনে যাওয়ায় হতবাক খোদ রাজস্ব প্রশাসনের সৎ কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।

বন্ড কমিশনারেটে একচ্ছত্র লুটপাট ও মাসোহারা সিন্ডিকেট

অভিযোগে জানা যায়, অবিভক্ত কাস্টম বন্ড কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে সবচেয়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন রাসেল আল মামুন। ২০১৮ থেকে ২০২১—এই তিন বছরে কেবল এই এলাকা থেকেই তিনি প্রায় ৭০ থেকে ৮০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন।

বন্ড ব্যবস্থার ফাঁকফোকর ব্যবহার করে রাজস্ব ফাঁকি আটকানোর নামে প্রিভেন্টিভ টিম নিয়ে নাইট টহলের ‘নাটক’ সাজিয়ে ব্যবসায়ীদের জিম্মি করতেন তিনি। পরবর্তীতে অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে ছাড়পত্র দিতেন। এছাড়া বন্ড ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এককালীন বড় অঙ্কের টাকার পাশাপাশি মোটা অঙ্কের নিয়মিত মাসিক মাসোহারা নির্ধারণ করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

সাবেক কমিশনার ও সিন্ডিকেটের ‘ক্যাশিয়ার’

রাসেল আল মামুনের এই দুর্নীতির সাম্রাজ্য গড়ে তোলার পেছনে প্রধান ভিত্তি ছিলেন এনবিআরের এক সাবেক সদস্য তথা তখনকার অবিভক্ত বন্ড কমিশনার। মোংলা কাস্টম হাউসে কর্মরত থাকাকালে রাসেলের সঙ্গে ওই কমিশনারের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় এবং তিনি কমিশনারের মূল ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে পরিচিতি পান।

মোংলা কাস্টমসের মাধ্যমে খালাস হওয়া গাড়ির যন্ত্রাংশসহ ভারী আমদানিপণ্যে অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে শত শত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকিতে সাহায্য করার বিনিময়ে কোটি কোটি টাকা আয় করেন রাসেল। পরবর্তীতে ওই কমিশনার ঢাকা বন্ড কমিশনারেটে বদলি হয়ে এলে ২০১৮ সালে রাসেলকেও সেখানে নিয়ে আসেন এবং হেডকোয়ার্টার্স ও প্রিভেন্টিভের মতো স্পর্শকাতর শাখার দায়িত্ব ন্যস্ত করেন।

পরে খুলনা আপিল বিভাগ থেকে পুনরায় ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটে পোস্টিং বাগিয়ে নেন তিনি। উত্তর বন্ডে কর্মরত থাকাকালে পোশাকশিল্পের বড় হাব গুলশান ও টঙ্গীর বন্ডেড ওয়্যারহাউসগুলো থেকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ চাঁদা আদায়ের অভিযোগ ওঠে। গুলশানের ওয়্যারহাউসগুলো থেকে প্রতি মাসে প্রায় ১ কোটি টাকা এবং টঙ্গী সার্কেল থেকে আরও ৫০-৬০ লাখ টাকা মাসিক মাসোহারা উঠত বলে জানা গেছে।

৩৫ লাখ টাকার অডিট চুক্তি ও ১ কোটি টাকার রাজস্ব ধামাচাপা

রাসেল আল মামুনের সাম্প্রতিক এক অনিয়মের ঘটনা পুরো বন্ড কমিশনারেটে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। আনোয়ার গ্রুপের মালিকানাধীন ‘হোসেন ডাইং’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের অডিট সম্পাদন করার জন্য তিনি ৩৫ লাখ টাকার গোপন চুক্তি করেন। অডিটের নিয়ম অনুযায়ী রাজস্ব ফাঁকি উদঘাটন করার কথা থাকলেও, বিপুল পরিমাণ ঘুষের বিনিময়ে কোনো প্রকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অডিট ছাড়াই ফাইল অনুমোদন দিয়ে ছেড়ে দেন।

পরবর্তীতে এনবিআরে লিখিত অভিযোগ জমা পড়লে বাধ্য হয়ে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ওই নতুন তদন্তে বেরিয়ে আসে যে, উক্ত প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছিল—যা রাসেলের হস্তক্ষেপে ধামাচাপা পড়েছিল। এত বড় জালিয়াতি প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও অদৃশ্য প্রভাবের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

কমলাপুর আইসিডিতে সমান্তরাল রাজত্ব

বন্ড কমিশনারেটের বাইরে কমলাপুর আইসিডি (ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো) কাস্টম হাউসেও রাসেলের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেখানে থাকাকালে আমদানিকৃত পণ্য খালাসের বিনিময়ে আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ (C&F) এজেন্টদের জিম্মি করে প্রতি মাসে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা আদায় করা হতো। ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে ভুয়া মামলা কিংবা চালান আটকে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হতো। আমদানিকারকরা তৎকালীন কমিশনার ও এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

টিনের ঘর থেকে রাজপ্রাসাদ: নামে-বেনামে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত কালো টাকা রাসেল আল মামুন রিয়েল এস্টেটসহ নানা অবৈধ খাতে বিনিয়োগ করেছেন। সরকারের আয়কর বিবরণীতে সামান্য সম্পদ দেখালেও বাস্তবে তাঁর সম্পদের পরিমাণ বহু গুণ বেশি।

গ্রামের বাড়ি (গফরগাঁও, ময়মনসিংহ): একসময় সাধারণ টিনের ঘরে বসবাস করলেও বর্তমানে নিজ গ্রামে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করেছেন বিলাসবহুল প্রাসাদসম বাড়ি। কিনেছেন শত শত শতাংশ জমি।

রাজধানীতে সম্পত্তি: ঢাকার অভিজাত এলাকায় একাধিক প্লট, ফ্ল্যাট ও গাড়ি কিনেছেন। কালো টাকা লুকাতে পিতা-মাতা, ভাই-বোন ও নিকটাত্মীয়দের নামে বিপুল সম্পত্তি কেনাবেচা করেছেন।

ব্যক্তিগত বিতর্ক ও পারিবারিক মামলা

কেবল দুর্নীতির ক্ষেত্রেই নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও বিতর্কে জড়িয়েছেন এই কর্মকর্তা। অতিরিক্ত অর্থ ও ক্ষমতার প্রভাবে উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনের কারণে স্ত্রীর সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে তাঁর স্ত্রী আদালতে রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন ও যৌতুক দাবির অভিযোগে ফৌজদারি মামলা দায়ের করেন। মামলা চলমান থাকলেও ক্ষমতার প্রভাবে তা ঝুলিয়ে রেখে তিনি বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

অভিযোগের সার্বিক বিষয়ে জানতে রাজস্ব বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তা ও অভিযুক্ত রাসেল আল মামুনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে দুদকের সূত্র জানায়, লিখিত অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে প্রাথমিক অনুসন্ধানের কাজ শুরু করার প্রক্রিয়া চলছে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পরিবর্তনে সংবিধানে ফিরছে গণভোটের বিধান’

বন্ডে প্রভাব বিস্তার থেকে শতকোটি টাকার সম্পদ: কাস্টমস কর্মকর্তা রাসেলকে ঘিরে অভিযোগ

আপডেট সময় ০৬:৪১:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নিয়ন্ত্রণাধীন কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের সম্প্রতি পদোন্নতি পাওয়া সহকারী কমিশনার রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে চরম অনিয়ম, জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে। কাস্টমস ক্যাডারের ১১ ব্যাচের এই কর্মকর্তার (জন্ম: ১ নভেম্বর ১৯৮৬) বিরুদ্ধে সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

অনুসন্ধান ও অভিযোগের সূত্রে জানা যায়, চাকরিজীবনের শুরু থেকেই একের পর এক সংবেদনশীল পদে দায়িত্ব পালনকালে অনিয়মের সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন রাসেল। একজন সাধারণ সরকারি চাকরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও ঘুষ গ্রহণ ও রাজস্ব ফাঁকিতে সহায়তা করে রাতারাতি বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিক বনে যাওয়ায় হতবাক খোদ রাজস্ব প্রশাসনের সৎ কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।

বন্ড কমিশনারেটে একচ্ছত্র লুটপাট ও মাসোহারা সিন্ডিকেট

অভিযোগে জানা যায়, অবিভক্ত কাস্টম বন্ড কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে সবচেয়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন রাসেল আল মামুন। ২০১৮ থেকে ২০২১—এই তিন বছরে কেবল এই এলাকা থেকেই তিনি প্রায় ৭০ থেকে ৮০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন।

বন্ড ব্যবস্থার ফাঁকফোকর ব্যবহার করে রাজস্ব ফাঁকি আটকানোর নামে প্রিভেন্টিভ টিম নিয়ে নাইট টহলের ‘নাটক’ সাজিয়ে ব্যবসায়ীদের জিম্মি করতেন তিনি। পরবর্তীতে অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে ছাড়পত্র দিতেন। এছাড়া বন্ড ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এককালীন বড় অঙ্কের টাকার পাশাপাশি মোটা অঙ্কের নিয়মিত মাসিক মাসোহারা নির্ধারণ করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

সাবেক কমিশনার ও সিন্ডিকেটের ‘ক্যাশিয়ার’

রাসেল আল মামুনের এই দুর্নীতির সাম্রাজ্য গড়ে তোলার পেছনে প্রধান ভিত্তি ছিলেন এনবিআরের এক সাবেক সদস্য তথা তখনকার অবিভক্ত বন্ড কমিশনার। মোংলা কাস্টম হাউসে কর্মরত থাকাকালে রাসেলের সঙ্গে ওই কমিশনারের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় এবং তিনি কমিশনারের মূল ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে পরিচিতি পান।

মোংলা কাস্টমসের মাধ্যমে খালাস হওয়া গাড়ির যন্ত্রাংশসহ ভারী আমদানিপণ্যে অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে শত শত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকিতে সাহায্য করার বিনিময়ে কোটি কোটি টাকা আয় করেন রাসেল। পরবর্তীতে ওই কমিশনার ঢাকা বন্ড কমিশনারেটে বদলি হয়ে এলে ২০১৮ সালে রাসেলকেও সেখানে নিয়ে আসেন এবং হেডকোয়ার্টার্স ও প্রিভেন্টিভের মতো স্পর্শকাতর শাখার দায়িত্ব ন্যস্ত করেন।

পরে খুলনা আপিল বিভাগ থেকে পুনরায় ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটে পোস্টিং বাগিয়ে নেন তিনি। উত্তর বন্ডে কর্মরত থাকাকালে পোশাকশিল্পের বড় হাব গুলশান ও টঙ্গীর বন্ডেড ওয়্যারহাউসগুলো থেকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ চাঁদা আদায়ের অভিযোগ ওঠে। গুলশানের ওয়্যারহাউসগুলো থেকে প্রতি মাসে প্রায় ১ কোটি টাকা এবং টঙ্গী সার্কেল থেকে আরও ৫০-৬০ লাখ টাকা মাসিক মাসোহারা উঠত বলে জানা গেছে।

৩৫ লাখ টাকার অডিট চুক্তি ও ১ কোটি টাকার রাজস্ব ধামাচাপা

রাসেল আল মামুনের সাম্প্রতিক এক অনিয়মের ঘটনা পুরো বন্ড কমিশনারেটে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। আনোয়ার গ্রুপের মালিকানাধীন ‘হোসেন ডাইং’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের অডিট সম্পাদন করার জন্য তিনি ৩৫ লাখ টাকার গোপন চুক্তি করেন। অডিটের নিয়ম অনুযায়ী রাজস্ব ফাঁকি উদঘাটন করার কথা থাকলেও, বিপুল পরিমাণ ঘুষের বিনিময়ে কোনো প্রকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অডিট ছাড়াই ফাইল অনুমোদন দিয়ে ছেড়ে দেন।

পরবর্তীতে এনবিআরে লিখিত অভিযোগ জমা পড়লে বাধ্য হয়ে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ওই নতুন তদন্তে বেরিয়ে আসে যে, উক্ত প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছিল—যা রাসেলের হস্তক্ষেপে ধামাচাপা পড়েছিল। এত বড় জালিয়াতি প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও অদৃশ্য প্রভাবের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

কমলাপুর আইসিডিতে সমান্তরাল রাজত্ব

বন্ড কমিশনারেটের বাইরে কমলাপুর আইসিডি (ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো) কাস্টম হাউসেও রাসেলের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেখানে থাকাকালে আমদানিকৃত পণ্য খালাসের বিনিময়ে আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ (C&F) এজেন্টদের জিম্মি করে প্রতি মাসে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা আদায় করা হতো। ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে ভুয়া মামলা কিংবা চালান আটকে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হতো। আমদানিকারকরা তৎকালীন কমিশনার ও এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

টিনের ঘর থেকে রাজপ্রাসাদ: নামে-বেনামে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত কালো টাকা রাসেল আল মামুন রিয়েল এস্টেটসহ নানা অবৈধ খাতে বিনিয়োগ করেছেন। সরকারের আয়কর বিবরণীতে সামান্য সম্পদ দেখালেও বাস্তবে তাঁর সম্পদের পরিমাণ বহু গুণ বেশি।

গ্রামের বাড়ি (গফরগাঁও, ময়মনসিংহ): একসময় সাধারণ টিনের ঘরে বসবাস করলেও বর্তমানে নিজ গ্রামে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করেছেন বিলাসবহুল প্রাসাদসম বাড়ি। কিনেছেন শত শত শতাংশ জমি।

রাজধানীতে সম্পত্তি: ঢাকার অভিজাত এলাকায় একাধিক প্লট, ফ্ল্যাট ও গাড়ি কিনেছেন। কালো টাকা লুকাতে পিতা-মাতা, ভাই-বোন ও নিকটাত্মীয়দের নামে বিপুল সম্পত্তি কেনাবেচা করেছেন।

ব্যক্তিগত বিতর্ক ও পারিবারিক মামলা

কেবল দুর্নীতির ক্ষেত্রেই নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও বিতর্কে জড়িয়েছেন এই কর্মকর্তা। অতিরিক্ত অর্থ ও ক্ষমতার প্রভাবে উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনের কারণে স্ত্রীর সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে তাঁর স্ত্রী আদালতে রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন ও যৌতুক দাবির অভিযোগে ফৌজদারি মামলা দায়ের করেন। মামলা চলমান থাকলেও ক্ষমতার প্রভাবে তা ঝুলিয়ে রেখে তিনি বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

অভিযোগের সার্বিক বিষয়ে জানতে রাজস্ব বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তা ও অভিযুক্ত রাসেল আল মামুনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে দুদকের সূত্র জানায়, লিখিত অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে প্রাথমিক অনুসন্ধানের কাজ শুরু করার প্রক্রিয়া চলছে।