ঢাকা ০২:২৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
উত্তর হাওলা ইউনিয়নকে মডেল ইউনিয়নে রূপান্তর করতে চান হাফেজ মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ লীরা গ্রুপের এমডি আলমগীর ইকবালের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ অফিসে বসে বস্তা ভরে টাকা নেন প্রকৌশলী হাসান শওকত বিপিসির কর্মকর্তা এটিএম সেলিমের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ বিএমইটি ঘিরে একচেটিয়া প্রভাবের অভিযোগ ভুয়া বিল-ভাউচার দিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ডলার কারসাজিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুমন ডিএই’তে প্রধান সহকারী নাসির উদ্দীনের বদলি ঘিরে উত্তেজনা, নানা অনিয়মের অভিযোগ দুর্নীতির অভিযোগে বরখাস্ত আরিফুরের পুনর্বহালের তদবির সব আন্দোলনের অনুপ্রেরণা ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম : রিজভী নীলকুঞ্জ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগ ও একজন সংবাদকর্মীর জাতীয় সম্মান প্রাপ্তি
মেসে থাকা হামিদুল্লাহর এখন বিপুল সম্পদ

বিএমইটি ঘিরে একচেটিয়া প্রভাবের অভিযোগ

একসময় রাজধানীর ৮৪ নয়াপল্টনের একটি মেসে থাকতেন হামিদুল্লাহ। সময়ের ব্যবধানে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে পল্টনে চারটি, মুগদায় একটি এবং রামপুরার বনশ্রীতে দুটি বাড়ি রয়েছে তাঁর। নয়াপল্টনের চায়না টাওয়ারে তাঁর মালিকানাধীন ১৫টি দোকান ও সাতটি অফিস রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাঁচ কাঠা জমির ওপর ৩৫ পুরানা পল্টন লেনে এবং আট কাঠা জমির ওপর ৪৩/৩ শান্তিনগরে তিনি বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করেছেন। এসব সম্পদের উৎস নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, জনশক্তি রপ্তানি খাতে ‘ইস্তেমা’, ‘মাসুদ জামিল’, ‘বাংলাদেশ রিক্রুটিং’, ‘রাজমুকুট’ ও ‘সুফি আব্দুল্লাহ’ নামে বিএমইটির (জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো) লাইসেন্স নিয়েছেন হামিদুল্লাহ। পাশাপাশি স্ত্রী, নিজ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বিভিন্ন ব্যক্তির নামে আরও ৩২টি লাইসেন্স নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব লাইসেন্সের মাধ্যমে জনশক্তি রপ্তানি খাতে তিনি একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করেছেন।

সরকার পরিবর্তন হলেও সিন্ডিকেট বহাল থাকার অভিযোগ

বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক পাঠানোর সরকারি দায়িত্ব পালন করে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)। অভিযোগ রয়েছে, সরকার পরিবর্তন হলেও এই দপ্তরের কার্যক্রমে আগের প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেটের প্রভাব পুরোপুরি দূর হয়নি।

অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গড়ে ওঠা হামিদুল্লাহসহ চারটি রিক্রুটিং এজেন্সির প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে প্রবাসী ভবন ও ব্যুরো অফিস পরিচালিত হতো। চিহ্নিত বিতর্কিত এই চারটি এজেন্সির বিরুদ্ধেই মানব পাচার, মানি লন্ডারিংসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। এসব বিষয় সিআইডিসহ বিভিন্ন সংস্থা তদন্ত করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ
হামিদুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাবেক সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাটের ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। যুবলীগের সাবেক নেতা নুরুন্নবী শাওন ও মহিউদ্দিন মহির সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠতা এবং ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, সম্রাট, শাওন, মহিসহ ফেনী-২ আসনের সাবেক এমপি আব্দুল্লাহ নাসিমসহ কয়েকজন পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাকে নিয়মিত অর্থ সহায়তা দিয়ে আসছেন হামিদুল্লাহ। জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার ওপর হামলায় যুবলীগ নেতাদের আর্থিক সহযোগিতার পাশাপাশি মতিঝিলের হিরাঝিল হোটেল থেকে খাবার সংগ্রহ করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

জুলাই আন্দোলনের সময় যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশ প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে হামিদুল্লাহর ঘনিষ্ঠতার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা গেছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

বিএমইটিতে প্রভাব বহাল থাকার অভিযোগ
বর্তমান পরিস্থিতিতেও বিএমইটিতে হামিদুল্লাহর একচ্ছত্র প্রভাব বহাল রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, সম্প্রতি তিনি দিনের বেলায় বিএমইটি কার্যালয়ে না গিয়ে তাঁর কর্মচারী সোলেমানের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন রাত ৯টার পর তিনি বিএমইটি ভবনে আসেন বলেও ওই সূত্রের দাবি।

এদিকে, তাঁর নিকটজনদের বরাত দিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে, বর্তমানে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির এক শীর্ষ নেতা তাঁকে রাজনৈতিকভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন। পল্টন থানা যুবদলের এক নেতা এবং ঢাকা মহানগর পূর্ব ছাত্রদলের এক নেতার বিরুদ্ধেও তাঁকে সহযোগিতা করার অভিযোগ রয়েছে।

সূত্রের দাবি, ৫ আগস্টের পর প্রায় তিন মাস আত্মগোপনে থাকার পর হামিদুল্লাহ ওই মহানগর বিএনপি নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেন। চলতি মাসের ৩ তারিখেও তাঁর সঙ্গে বড় অঙ্কের অর্থের লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব দাবির স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

দুদকে ১১০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
হামিদুল্লাহর বিরুদ্ধে প্রায় ১১০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তদন্ত চলছে বলে দুদক সূত্রের বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে। তবে তদন্তের বর্তমান অবস্থা এবং অভিযোগের বিস্তারিত বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন।

মালয়েশিয়া সিন্ডিকেটেও সম্পৃক্ততার অভিযোগ
মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি নিয়েও হামিদুল্লাহর বিরুদ্ধে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। আসন্ন জনশক্তি রপ্তানি কার্যক্রমে তাঁর প্রতিষ্ঠান মাসুদ জামিল এন্টারপ্রাইজের লাইসেন্স অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ
পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এসি রোহনীর আস্থাভাজন ছিলেন বলেও হামিদুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া এডিসি মেহেদী হাসান, ডিবির মতিঝিল বিভাগের তৎকালীন ডিসি আসাদুজ্জামান এবং সর্বশেষ ডিবি ডিসি রাজিব আল মাসুদের ছত্রচ্ছায়ায় থেকে তিনি নিজের, স্ত্রীর ও অন্যদের নামে নেওয়া লাইসেন্সের মাধ্যমে একচেটিয়া ব্যবসা করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

বর্তমানে হামিদুল্লাহ কোথায় রাতযাপন করেন, তা তাঁর ঘনিষ্ঠ অনেকের কাছেও অজানা বলে দাবি করা হয়েছে। তবে একটি সূত্র জানিয়েছে, তিনি মহাখালী ডিওএইচএসের একটি বাসভবনে অবস্থান করছেন।
বিএমইটির ঠিকাদারের অভিযোগ
বিএমইটির এক ঠিকাদার জানান, এই সিন্ডিকেট এতটাই শক্তিশালী ছিল যে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অন্য আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও সেখানে প্রবেশ করতে পারতেন না। তাঁর দাবি, হামিদুল্লাহ ছাড়াও ইফতি ওভারসিজের রুবেল, প্রবীর বণিক, হামিদসহ আরও কয়েকজন এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। তাঁদের কাছে পুরো বিএমইটি এখনো জিম্মি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

বিএমইটির এক কর্মকর্তা জানান, এই সিন্ডিকেট সার্ভার জালিয়াতি এবং ভুয়া চালান, পে-অর্ডারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছে, যা বিভিন্ন গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর দাবি, জনশক্তি রপ্তানিতে তারা একটি নির্দিষ্ট রেট বেঁধে দিয়ে অন্য কাউকে টেন্ডার ড্রপ করতে দিত না।

ওই কর্মকর্তা জানান, হুমায়ুন কবির জনশক্তি রপ্তানি মহাপরিচালক (ডিজি) থাকা অবস্থায় সিন্ডিকেট করে দুই মাস কাতারে জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ করে রেখেছিল। একজন শ্রমিককে বিদেশে পাঠাতে বিএমইটির খরচ যেখানে ছিল ৫ হাজার টাকা, সেখানে ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু রেখেই প্রতি কর্মীর কাছ থেকে অতিরিক্ত ২০ হাজার টাকা করে আদায় করা হতো বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়া, কঙ্গো, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, ইরাক, কুয়েত, জাপান ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে শ্রমিক পাঠানো হতো এবং জনপ্রতি প্রায় ২০ হাজার টাকা নেওয়া হতো। শুধু তাই নয়, কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পরে রেট বাড়িয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, কর্মসংস্থান ও বহির্গমন সেক্টরে সিন্ডিকেটের প্রত্যেক সদস্যের ৮ থেকে ১০ জন করে কর্মচারী বিএমইটিতে অবস্থান করতেন, যদিও সেখানে তাঁদের নিজস্ব কোনো অফিস ছিল না।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চতুর হামিদুল্লাহ বলেন, “আমি সেই হামিদুল্লাহ নই। রং নাম্বারে কল দিয়েছেন।”

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

উত্তর হাওলা ইউনিয়নকে মডেল ইউনিয়নে রূপান্তর করতে চান হাফেজ মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ

মেসে থাকা হামিদুল্লাহর এখন বিপুল সম্পদ

বিএমইটি ঘিরে একচেটিয়া প্রভাবের অভিযোগ

আপডেট সময় ০১:৩৪:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬

একসময় রাজধানীর ৮৪ নয়াপল্টনের একটি মেসে থাকতেন হামিদুল্লাহ। সময়ের ব্যবধানে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে পল্টনে চারটি, মুগদায় একটি এবং রামপুরার বনশ্রীতে দুটি বাড়ি রয়েছে তাঁর। নয়াপল্টনের চায়না টাওয়ারে তাঁর মালিকানাধীন ১৫টি দোকান ও সাতটি অফিস রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাঁচ কাঠা জমির ওপর ৩৫ পুরানা পল্টন লেনে এবং আট কাঠা জমির ওপর ৪৩/৩ শান্তিনগরে তিনি বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করেছেন। এসব সম্পদের উৎস নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, জনশক্তি রপ্তানি খাতে ‘ইস্তেমা’, ‘মাসুদ জামিল’, ‘বাংলাদেশ রিক্রুটিং’, ‘রাজমুকুট’ ও ‘সুফি আব্দুল্লাহ’ নামে বিএমইটির (জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো) লাইসেন্স নিয়েছেন হামিদুল্লাহ। পাশাপাশি স্ত্রী, নিজ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বিভিন্ন ব্যক্তির নামে আরও ৩২টি লাইসেন্স নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব লাইসেন্সের মাধ্যমে জনশক্তি রপ্তানি খাতে তিনি একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করেছেন।

সরকার পরিবর্তন হলেও সিন্ডিকেট বহাল থাকার অভিযোগ

বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক পাঠানোর সরকারি দায়িত্ব পালন করে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)। অভিযোগ রয়েছে, সরকার পরিবর্তন হলেও এই দপ্তরের কার্যক্রমে আগের প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেটের প্রভাব পুরোপুরি দূর হয়নি।

অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গড়ে ওঠা হামিদুল্লাহসহ চারটি রিক্রুটিং এজেন্সির প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে প্রবাসী ভবন ও ব্যুরো অফিস পরিচালিত হতো। চিহ্নিত বিতর্কিত এই চারটি এজেন্সির বিরুদ্ধেই মানব পাচার, মানি লন্ডারিংসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। এসব বিষয় সিআইডিসহ বিভিন্ন সংস্থা তদন্ত করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ
হামিদুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাবেক সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাটের ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। যুবলীগের সাবেক নেতা নুরুন্নবী শাওন ও মহিউদ্দিন মহির সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠতা এবং ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, সম্রাট, শাওন, মহিসহ ফেনী-২ আসনের সাবেক এমপি আব্দুল্লাহ নাসিমসহ কয়েকজন পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাকে নিয়মিত অর্থ সহায়তা দিয়ে আসছেন হামিদুল্লাহ। জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার ওপর হামলায় যুবলীগ নেতাদের আর্থিক সহযোগিতার পাশাপাশি মতিঝিলের হিরাঝিল হোটেল থেকে খাবার সংগ্রহ করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

জুলাই আন্দোলনের সময় যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশ প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে হামিদুল্লাহর ঘনিষ্ঠতার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা গেছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

বিএমইটিতে প্রভাব বহাল থাকার অভিযোগ
বর্তমান পরিস্থিতিতেও বিএমইটিতে হামিদুল্লাহর একচ্ছত্র প্রভাব বহাল রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, সম্প্রতি তিনি দিনের বেলায় বিএমইটি কার্যালয়ে না গিয়ে তাঁর কর্মচারী সোলেমানের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন রাত ৯টার পর তিনি বিএমইটি ভবনে আসেন বলেও ওই সূত্রের দাবি।

এদিকে, তাঁর নিকটজনদের বরাত দিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে, বর্তমানে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির এক শীর্ষ নেতা তাঁকে রাজনৈতিকভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন। পল্টন থানা যুবদলের এক নেতা এবং ঢাকা মহানগর পূর্ব ছাত্রদলের এক নেতার বিরুদ্ধেও তাঁকে সহযোগিতা করার অভিযোগ রয়েছে।

সূত্রের দাবি, ৫ আগস্টের পর প্রায় তিন মাস আত্মগোপনে থাকার পর হামিদুল্লাহ ওই মহানগর বিএনপি নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেন। চলতি মাসের ৩ তারিখেও তাঁর সঙ্গে বড় অঙ্কের অর্থের লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব দাবির স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

দুদকে ১১০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
হামিদুল্লাহর বিরুদ্ধে প্রায় ১১০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তদন্ত চলছে বলে দুদক সূত্রের বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে। তবে তদন্তের বর্তমান অবস্থা এবং অভিযোগের বিস্তারিত বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন।

মালয়েশিয়া সিন্ডিকেটেও সম্পৃক্ততার অভিযোগ
মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি নিয়েও হামিদুল্লাহর বিরুদ্ধে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। আসন্ন জনশক্তি রপ্তানি কার্যক্রমে তাঁর প্রতিষ্ঠান মাসুদ জামিল এন্টারপ্রাইজের লাইসেন্স অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ
পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এসি রোহনীর আস্থাভাজন ছিলেন বলেও হামিদুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া এডিসি মেহেদী হাসান, ডিবির মতিঝিল বিভাগের তৎকালীন ডিসি আসাদুজ্জামান এবং সর্বশেষ ডিবি ডিসি রাজিব আল মাসুদের ছত্রচ্ছায়ায় থেকে তিনি নিজের, স্ত্রীর ও অন্যদের নামে নেওয়া লাইসেন্সের মাধ্যমে একচেটিয়া ব্যবসা করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

বর্তমানে হামিদুল্লাহ কোথায় রাতযাপন করেন, তা তাঁর ঘনিষ্ঠ অনেকের কাছেও অজানা বলে দাবি করা হয়েছে। তবে একটি সূত্র জানিয়েছে, তিনি মহাখালী ডিওএইচএসের একটি বাসভবনে অবস্থান করছেন।
বিএমইটির ঠিকাদারের অভিযোগ
বিএমইটির এক ঠিকাদার জানান, এই সিন্ডিকেট এতটাই শক্তিশালী ছিল যে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অন্য আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও সেখানে প্রবেশ করতে পারতেন না। তাঁর দাবি, হামিদুল্লাহ ছাড়াও ইফতি ওভারসিজের রুবেল, প্রবীর বণিক, হামিদসহ আরও কয়েকজন এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। তাঁদের কাছে পুরো বিএমইটি এখনো জিম্মি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

বিএমইটির এক কর্মকর্তা জানান, এই সিন্ডিকেট সার্ভার জালিয়াতি এবং ভুয়া চালান, পে-অর্ডারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছে, যা বিভিন্ন গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর দাবি, জনশক্তি রপ্তানিতে তারা একটি নির্দিষ্ট রেট বেঁধে দিয়ে অন্য কাউকে টেন্ডার ড্রপ করতে দিত না।

ওই কর্মকর্তা জানান, হুমায়ুন কবির জনশক্তি রপ্তানি মহাপরিচালক (ডিজি) থাকা অবস্থায় সিন্ডিকেট করে দুই মাস কাতারে জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ করে রেখেছিল। একজন শ্রমিককে বিদেশে পাঠাতে বিএমইটির খরচ যেখানে ছিল ৫ হাজার টাকা, সেখানে ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু রেখেই প্রতি কর্মীর কাছ থেকে অতিরিক্ত ২০ হাজার টাকা করে আদায় করা হতো বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়া, কঙ্গো, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, ইরাক, কুয়েত, জাপান ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে শ্রমিক পাঠানো হতো এবং জনপ্রতি প্রায় ২০ হাজার টাকা নেওয়া হতো। শুধু তাই নয়, কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পরে রেট বাড়িয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, কর্মসংস্থান ও বহির্গমন সেক্টরে সিন্ডিকেটের প্রত্যেক সদস্যের ৮ থেকে ১০ জন করে কর্মচারী বিএমইটিতে অবস্থান করতেন, যদিও সেখানে তাঁদের নিজস্ব কোনো অফিস ছিল না।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চতুর হামিদুল্লাহ বলেন, “আমি সেই হামিদুল্লাহ নই। রং নাম্বারে কল দিয়েছেন।”