ঢাকা ওয়াসার (DWASA) জোন-৩ এর বিতর্কিত রাজস্ব পরিদর্শক (প্রাক্তন মিটার রিডার) হারুন অর রশিদ (রানা)-এর বিরুদ্ধে আন্ডার বিলিং, মিটার টেম্পারিং এবং অবৈধ পানির সংযোগের মাধ্যমে সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আত্মসাতের এক নজিরবিহীন অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে মাত্র ৩৫ হাজার টাকা স্কেলের একজন তৃতীয় শ্রেণির সাধারণ কর্মচারী হয়েও তিনি গড়ে তুলেছেন শতকোটি টাকার এক বিশাল ও অভেদ্য সম্পদের পাহাড়। তার এই রূপকথার মতো উত্থান এবং জ্ঞাত আয় বহির্ভূত বিপুল সম্পদের বিবরণ দেখে বিস্মিত সহকর্মী থেকে শুরু করে তার নিজ গ্রামের সাধারণ মানুষ।
তার বিরুদ্ধে ওঠা সুনির্দিষ্ট অভিযোগসমূহ, সম্পদের বিবরণ এবং সামগ্রিক অনিয়মের চিত্র নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হল
লুণ্ঠনের মেকানিজম: যেভাবে চলত সরকারি রাজস্ব ফাঁকি
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও অভিযোগ অনুযায়ী, ওয়াসার এই রাজস্ব পরিদর্শকের আয়ের মূল উৎস ছিল গ্রাহকদের সাথে অবৈধ আঁতাত। তিনি মূলত তিনটি অভিনব উপায়ে এই অনৈতিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন:
ক) আন্ডার বিলিং ও মিটার টেম্পারিং: গ্রাহকদের পানির প্রকৃত ব্যবহার গোপন করে বিল কম দেখাতেন এবং মিটারে বিশেষ কারসাজির (টেম্পারিং) মাধ্যমে রিডিং কমিয়ে রাখতেন। এর বিনিময়ে নিয়মিত মোটা অঙ্কের মাসোহারা বা অর্থ আদায় করতেন, যা সরাসরি সরকারের রাজস্বে বিশাল ধস নামিয়েছে।
খ) অবৈধ সংযোগ বাণিজ্য: ঢাকা ওয়াসার কোনো প্রকার অনুমোদন ছাড়াই শত শত বাণিজ্যিক ভবন ও বহুতল আবাসিক ভবনে অবৈধ পানির মেইন লাইনের সংযোগ দিয়ে এককালীন বিপুল অঙ্কের ঘুষ গ্রহণ করেছেন।
গ) ডুপলি নিয়োগ (বহিরাগত দিয়ে কাজ করানো): নিজে দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন না করে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে নিজস্ব খরচে ব্যক্তিগত বেতনভুক্ত কয়েকজন বহিরাগত লোক দিয়ে মাঠপর্যায়ের মিটার রিডিং ও বিলিংয়ের কাজ করাতেন। এর ফলে তার নিজস্ব দুর্নীতির সিন্ডিকেটটি পর্দার আড়ালে থেকে নির্বিঘ্নে সচল থাকত।
রাজধানী ঢাকায় ৪টি বিলাসবহুল বাড়ি
অনুসন্ধানে রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুর ও সংলগ্ন অভিজাত এলাকায় হারুন অর রশিদ ও তার পরিবারের নামে-বেনামে থাকা ৪টি বহুতল ও দামি বাড়ির সন্ধান মিলেছে:
ক্রমিক বাড়ির অবস্থান ও হোল্ডিং নং ভবনের বিবরণ
০১ টিক্কাপাড়া (৭/এ/১৫), মোহাম্মদপুর একটি বহুতল আধুনিক আবাসিক ভবন।
০২ ঢাকা উদ্যান, ৩ নং রোড ৪ তলা বিশিষ্ট একটি বিলাসবহুল ভবন।
০৩ নূরজাহান রোড, মোহাম্মদপুর ২ তলা বিশিষ্ট একটি বাণিজ্যিক/আবাসিক বাড়ি।
০৪ চান মিয়া হাউজিং, মোহাম্মদপুর একটি বড় আবাসিক বাড়ি ও জায়গা।
ঢাকার বাইরে ও নিজ গ্রামে সম্পত্তির সাম্রাজ্য
কেবল ঢাকা শহরেই নয়, ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলা ও তার পৈতৃক এলাকাতেও তিনি গড়ে তুলেছেন বিপুল স্থাবর সম্পত্তি:
গাজীপুর ও ময়মনসিংহ: এই জেলাগুলোতে রয়েছে তার একাধিক টিনশেড ও পাকা বাড়ি। এছাড়া বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে গড়ে তুলেছেন কয়েক একর জায়গাজুড়ে বিশাল মুরগির খামার (পোল্ট্রি ফার্ম) এবং বিভিন্ন বাজার এলাকায় ক্ষমতার দাপটে অবৈধ দখলের মাধ্যমে বেশ কিছু দোকানপাট তৈরিরও অভিযোগ রয়েছে।
গ্রামের বাড়িতে রাজপ্রাসাদ: ময়মনসিংহ জেলার পাগলা থানার মাখল গ্রামে তার রয়েছে একটি প্রাসাদসম বিলাসবহুল বাড়ি, যা দূর-দূরান্তের মানুষের কাছেও কৌতূহলের বিষয়। এছাড়া গ্রামের চারপাশজুড়ে বিঘার পর বিঘা দামি কৃষিজমি ক্রয় করে এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন।
আইনি জটিলতা ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চোখ এড়াতে হারুন অর রশিদ অত্যন্ত চতুরতার সাথে তার অধিকাংশ সম্পদ নিজের নামে না রেখে স্ত্রী, সন্তান এবং অতি ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনদের নামে ক্রয় করেছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি কেবল দুর্নীতির টাকাই কামাননি, বরং নিজের এলাকায় এক প্রকার ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। গ্রামের অসহায় ও দরিদ্র মানুষদের ভয়ভীতি দেখিয়ে এবং প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে তিনি বহু জমি জবরদখল করেছেন। তার এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কোনো ভুক্তভোগী মুখ খুললেই তাকে বিভিন্ন মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে পুলিশি হয়রানি ও সামাজিকভাবে হেনস্তা করার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, হারুন ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে দেশের বিভিন্ন তফসিলি ব্যাংক ও পোস্ট অফিসে কোটি কোটি টাকার স্থায়ী আমানত (FDR) ও সঞ্চয়পত্র রয়েছে। এছাড়া একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হওয়া সত্ত্বেও তার পরিবার ব্যবহার করছে একাধিক দামি গাড়ি এবং তাদের হেফাজতে রয়েছে প্রায় ১০০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার, যা তার বৈধ বেতন কাঠামোর সাথে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিকবার সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছিল। তবে রহস্যজনকভাবে দেশের শীর্ষ দুর্নীতি বিরোধী সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দুই দফায়—২০১৬ এবং ২০২০ সালে তাকে ‘ক্লিন চিট’ বা দায়মুক্তি দেয়।
একজন সাধারণ কর্মচারীর এমন দৃশ্যমান অবৈধ সম্পদের পাহাড় থাকার পরও কীভাবে দুদক তাকে দায়মুক্তি দিল, তা নিয়ে ওয়াসার সাধারণ কর্মচারী এবং তার নিজ এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
সম্প্রতি হারুন অর রশিদের এই বিশাল দুর্নীতির বিরুদ্ধে আবারও সরকারের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ে এবং তদন্ত সংস্থায় নতুন করে অভিযোগ জমা পড়েছে। গ্রামবাসী ও ওয়াসার সচেতন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি:
১. হারুন অর রশিদের আয়ের প্রকৃত উৎস খতিয়ে দেখতে অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় বা বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক।
২. তার এবং তার পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে থাকা জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সমস্ত সম্পদের হিসাব প্রকাশ ও তা দ্রুত সরকারি কোষাগারে বাজেয়াপ্ত করা হোক।
৩. অতীতে তাকে দুই দফায় রহস্যজনকভাবে দায়মুক্তি দেওয়ার পেছনে কোনো লবিং, ঘুষ বা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির প্রভাব ছিল কিনা, তাও খতিয়ে দেখা হোক।
ঢাকা ওয়াসার একজন সাধারণ মিটার রিডার থেকে রাজস্ব পরিদর্শক হয়ে শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে যাওয়ার এই উত্থানকে অনেকেই “আলাদীনের চেরাগ”-এর সঙ্গে তুলনা করছেন। এই অভিযোগগুলো সত্য হলে এটি শুধু একজন ব্যক্তির অপরাধ নয়, বরং একটি বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা না নিলে সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনোবল ভেঙে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























