বাংলা টিভি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ সামাদুল হককে ঘিরে শেয়ার হস্তান্তর, আর্থিক লেনদেন, সম্পদ বিবরণী, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, মানিলন্ডারিং, ভাড়া সংক্রান্ত বিরোধ এবং বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। বিভিন্ন অভিযোগ, আদালতের নথি, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিষয়গুলো নিয়ে একাধিক তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের অনেকগুলোরই চূড়ান্ত বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।
বাংলা টিভির মালিকানা ও শেয়ার হস্তান্তরকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বেশি বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগকারী কয়েকজন বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীর দাবি, প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতির বিপরীতে বিপুল অঙ্কের অর্থ গ্রহণ করা হলেও দীর্ঘ সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও তাদের নামে শেয়ার হস্তান্তর সম্পন্ন করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট পক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, সৈয়দ সামাদুল হক তাঁর মালিকানাধীন ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ শেয়ার হস্তান্তরের বিষয়ে কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছান। এ প্রক্রিয়ায় কে এম আকতারুজ্জামান, মো. মনিরুল ইসলাম এবং কে এম রিফাতউজ্জামানের নাম উঠে আসে। অভিযোগে বলা হয়, শেয়ার পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে মালিকানার একটি কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং এ লক্ষ্যে মোট প্রায় ২৮ কোটি টাকা গ্রহণ করা হয়। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, অর্থ গ্রহণের পরও শেয়ার হস্তান্তর সম্পন্ন হয়নি এবং অর্থও ফেরত দেওয়া হয়নি।
এ ধরনের অভিযোগ নতুন নয়। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া বিভিন্ন আবেদনপত্রেও বাংলা টিভির শেয়ার হস্তান্তর নিয়ে জটিলতার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। আবেদনকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে শেয়ার হস্তান্তরের অনুমোদন ও বাস্তবায়ন ঝুলে থাকায় বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। তাদের দাবি, বিভিন্ন সময়ে শেয়ার হস্তান্তরের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে কার্যকর কোনো অগ্রগতি হয়নি।
শুধু সাম্প্রতিক বিনিয়োগকারীরাই নন, বাংলা টিভির শেয়ার নিয়ে অতীতেও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে একাধিক ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠী প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেন। তাদের মধ্যে দিনাজপুর-৩ আসনের বিএনপি নেতা, শিল্পপতি ও সমাজসেবক আলহাজ হাফিজুর রহমান সরকারের নামও আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় ১৮ বছর আগে তিনি বাংলা টিভির শেয়ার ক্রয়ের উদ্দেশ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও তাঁর নামে শেয়ার হস্তান্তর সম্পন্ন হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারী পক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, বিনিয়োগের অর্থও ফেরত দেওয়া হয়নি।
বাংলা টিভিকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগ একপর্যায়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের নজরে আসে। দুদকের নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৮ মে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার কেনাবেচার নামে অর্থ আত্মসাৎ ও অর্থ পাচারের অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য গ্রহণের জন্য সৈয়দ সামাদুল হককে তলব করা হয়। দুদকের স্মারকে উল্লেখ করা হয় যে অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে তাঁর বক্তব্য প্রয়োজন। এ প্রেক্ষিতে তাঁকে কমিশনের কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য দিতে বলা হয়েছিল।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালে দুদকের বিশেষ তদন্ত শাখা তাঁর দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণী যাচাইয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করে। নথি অনুযায়ী, সম্পদের উৎস, আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং সম্পদ অর্জনের বৈধতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে একটি অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়। দুদকের কর্মকর্তারা তাঁর বিভিন্ন স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য সংগ্রহ এবং আর্থিক লেনদেনের নথি পর্যালোচনা শুরু করেন।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দুদক সৈয়দ সামাদুল হকের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে মামলা দায়েরের তথ্য প্রকাশ করে। দুদকের দাবি অনুযায়ী, অনুসন্ধানে তাঁর নামে ৪ কোটি টাকারও বেশি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। একই সঙ্গে কয়েক কোটি টাকার অর্থ বিভিন্ন উপায়ে রূপান্তর বা বৈধ হিসেবে প্রদর্শনের চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়। এ অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা দায়ের করা হয়।
দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়, তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ এবং বৈধ আয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান পাওয়া গেছে। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, ঘোষিত আয় দিয়ে সম্পদের পুরো অংশের বৈধ উৎস ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়নি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো প্রকাশিত হয়নি।
২০২৬ সালে আদালতের মাধ্যমে তাঁর আয়কর নথি জব্দের অনুমতিও নেওয়া হয়। দুদকের আবেদনে বলা হয়েছিল, সম্পদ ও আয়ের প্রকৃত উৎস যাচাইয়ের জন্য একাধিক বছরের আয়কর রিটার্ন ও সংশ্লিষ্ট নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করলে তদন্ত আরও এগিয়ে যায়।
অন্যদিকে, বাংলা টিভির কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরীর একটি ভবন নিয়েও বিরোধের তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ভবনের মালিকের সঙ্গে ভাড়াটিয়া হিসেবে করা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ভবন ছাড়াকে কেন্দ্র করে বিরোধ সৃষ্টি হয়। অভিযোগে আরও বলা হয়, ভাড়া বাবদ বিপুল অঙ্কের অর্থ বকেয়া রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং উভয় পক্ষের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য সর্বসমক্ষে পাওয়া যায়নি।
বাংলা টিভির কিছু বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময়ে অসন্তোষের কথা উঠে এসেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বকেয়া থাকা, আর্থিক সংকটের অজুহাতে নিয়মিত পরিশোধ না করা এবং প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলার তথ্য পাওয়া যায়। তবে এসব অভিযোগের অনেকগুলোর স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি।
প্রতিনিধি নিয়োগ নিয়েও বিভিন্ন সময়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিনিধি নিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থ গ্রহণ করা হলেও পরবর্তীতে প্রতিশ্রুত সুবিধা বা সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হয়নি। যদিও এ অভিযোগের বিষয়ে সব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লিখিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে উত্তরা পশ্চিম থানায় তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া দুটি মামলার তথ্যও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মামলাগুলোয় বিভিন্ন দণ্ডবিধির ধারা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মামলার অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে কি না বা বিচারিক প্রক্রিয়ার বর্তমান অবস্থা কী—সেসব বিষয়ে প্রকাশ্য তথ্য সীমিত।
অন্যদিকে, সৈয়দ সামাদুল হক এসব অভিযোগের বিষয়ে বরাবরই ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছেন। তিনি অতীতে দুদকের কাছে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে দাবি করেন, তিনি একজন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি উদ্যোক্তা এবং দীর্ঘদিন ধরে গণমাধ্যম খাতের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলা টিভির প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের একটি অংশ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি দাবি করেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল বিভিন্ন তথ্য দিয়ে তাঁকে এবং তাঁর প্রতিষ্ঠানকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে।
তাঁর মতে, শেয়ার হস্তান্তর, বিনিয়োগ এবং মালিকানা সংক্রান্ত বিরোধের পেছনে ব্যবসায়িক মতবিরোধ ও ব্যক্তিগত স্বার্থ কাজ করছে। তিনি অতীতে বিভিন্ন অভিযোগ থেকে অব্যাহতি চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদনও করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলা টিভিকে ঘিরে যে বিরোধগুলো সামনে এসেছে, তার মধ্যে শেয়ার মালিকানা, আর্থিক লেনদেন, সম্পদ বিবরণী, বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, ভাড়া সংক্রান্ত বিরোধ এবং বিভিন্ন পক্ষের পাল্টাপাল্টি দাবি অন্যতম। এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ সত্য উদঘাটনের জন্য কোম্পানির শেয়ার রেজিস্টার, ব্যাংক লেনদেনের নথি, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনপত্র, কর নথি এবং আদালতের রায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, চলমান তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে। বর্তমানে অধিকাংশ বিষয়ই অভিযোগ, অনুসন্ধান বা বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে। ফলে আদালতের চূড়ান্ত রায় এবং তদন্তকারী সংস্থার চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের আগে কোনো পক্ষকে দায়ী বা নির্দোষ ঘোষণা করার সুযোগ নেই।
বাংলা টিভিকে কেন্দ্র করে চলমান এই বিরোধ বাংলাদেশের গণমাধ্যম খাতে করপোরেট সুশাসন, মালিকানা কাঠামোর স্বচ্ছতা, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা এবং আর্থিক জবাবদিহিতার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের বক্তব্য, প্রামাণ্য নথি এবং বিচারিক সিদ্ধান্ত প্রকাশ পেলে বিষয়টি সম্পর্কে আরও সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















