ঢাকা ০৪:২৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬, ১৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
খাল খননের উদ্বৃত্ত ১ কোটি ৫ লাখ টাকা ফেরত দিয়ে নজির, প্রশংসিত এমপি রাজৈরে লিবিয়ায় নির্যাতনের পর নিহত সোহাগ মুন্সি পরিবারের থানায় অভিযোগ মোবাইল কোর্টের অভিযানে হেলমেট না পরায় ৫ মামলায় ৪ হাজার টাকা জরিমানা লটারির মাধ্যমে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ৭৬৭ জন উপ-সহকারী প্রকৌশলীর বদলি শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনকে নিয়ে মিলল আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য গোসিংগা ইউনিয়ন বিএনপি’র বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত স্বচ্ছতা ও দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে: পবিপ্রবি উপাচার্য বর্তমানে পত্রিকার পাতায় গুম, খুন, ব্যাংক লুটের খবর নেই : পার্থ গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর মিলন রানীর পাশে উপজেলা প্রশাসন জুলাইযোদ্ধাদের সঙ্গে বেইমানি করলে আল্লাহ আমাদের ছেড়ে দেবেন না : ডা. শফিকুর রহমান

জিইএমকোতে ১৫ কোটি টাকার স্ক্র্যাপ ৩ কোটিতে বিক্রি, এমডির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান General Electric Manufacturing Company Limited-এ (জিইএমকো) কোটি কোটি টাকার স্ক্র্যাপ বিক্রি ঘিরে অনিয়ম, নীতিমালা লঙ্ঘন এবং আর্থিক ক্ষতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানের ভেতরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, শ্রমিকনেতা এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি—প্রায় ১৫ কোটি টাকার স্ক্র্যাপ মাত্র তিন কোটি টাকায় বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়ন হলে রাষ্ট্রের বিপুল আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম। যদিও তার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জিইএমকোর কারখানায় দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা বিভিন্ন অকেজো মেশিনারিজ, লৌহজাতীয় স্ক্র্যাপ, ব্যবহারের অনুপযোগী যন্ত্রাংশ এবং পুরোনো মালামাল বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয় কয়েক মাস আগে। প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ তালিকা অনুযায়ী এসব স্ক্র্যাপের মধ্যে রয়েছে প্রায় ৪৬৫টি মেশিন ও বিভিন্ন ধরনের ভারী ধাতব উপকরণ। বাজারমূল্য যাচাইয়ে অভিজ্ঞ কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেন, এসব মালামালের প্রকৃত মূল্য ১৫ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে। অথচ এগুলো মাত্র তিন কোটি টাকার কাছাকাছি মূল্যে বিক্রির চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, পুরো প্রক্রিয়াটি করা হচ্ছে অস্বচ্ছ উপায়ে এবং প্রচলিত সরকারি নীতিমালা অনুসরণ না করে। বিশেষ করে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান না করে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি বা ডিপিএমের মাধ্যমে স্ক্র্যাপ বিক্রির উদ্যোগ নেওয়াকে ঘিরে ব্যাপক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সাধারণত স্ক্র্যাপ বিক্রির ক্ষেত্রে উন্মুক্ত টেন্ডার, দরপত্র মূল্যায়ন এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নির্ধারণ বাধ্যতামূলক হলেও জিইএমকোর ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

জিইএমকোর কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে স্ক্র্যাপ বিক্রি নিয়ে শুরু থেকেই অসন্তোষ ছিল। তারা বলেন, “যেভাবে মালামালগুলোর মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। স্ক্র্যাপের বাজারদর, লোহা ও যন্ত্রাংশের বর্তমান মূল্য বিবেচনা করলে এর দাম আরও অনেক বেশি হওয়ার কথা।” তাদের অভিযোগ, কিছু নির্দিষ্ট পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে পুরো প্রক্রিয়াটি দ্রুত সম্পন্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছিল।

প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নও বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছে। ইউনিয়নের নেতারা অভিযোগ করে বলেন, Bangladesh Steel and Engineering Corporation (বিএসইসি)-এর নীতিমালা উপেক্ষা করে স্ক্র্যাপ বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তারা এ বিষয়ে বিএসইসি চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগও জমা দিয়েছেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়, নিয়মবহির্ভূতভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ কম মূল্যে বিক্রি করা হলে প্রতিষ্ঠানটি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাবে।

শ্রমিকনেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্ক্র্যাপ বিক্রির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য যে ধরনের মূল্য যাচাই, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা এবং নিলাম পদ্ধতি অনুসরণ করা প্রয়োজন ছিল, তার কোনোটিই যথাযথভাবে মানা হয়নি। তারা দাবি করেন, বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুললেও অনেক কর্মকর্তা ভীতির কারণে প্রকাশ্যে কথা বলতে চাননি।

নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, স্ক্র্যাপ বিক্রির জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটির সভাপতি ছিলেন জিইএমকোর এমডি প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম। এছাড়া কমিটিতে বাণিজ্যিক, হিসাবরক্ষণ, উৎপাদন এবং প্রশাসনিক বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা সদস্য হিসেবে যুক্ত ছিলেন। তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে এমডির প্রভাবই ছিল সবচেয়ে বেশি।

কোম্পানির অভ্যন্তরীণ কয়েকটি সূত্র জানায়, স্ক্র্যাপগুলোর প্রকৃত মূল্য নির্ধারণের জন্য স্বাধীন মূল্যায়ন প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হয়নি। বরং অভ্যন্তরীণভাবে এমনভাবে মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে দরপত্র ছাড়া কম দামে বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়। একজন কর্মকর্তা বলেন, “স্ক্র্যাপের বর্তমান বাজারমূল্য বিবেচনা করলে এই দর অস্বাভাবিকভাবে কম। এখানে স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা থাকলে সরকার আরও অনেক বেশি অর্থ পেত।”

এদিকে পুরো প্রক্রিয়ায় ডিপিএম বা সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি ব্যবহার নিয়ে আইনি প্রশ্নও উঠেছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্ক্র্যাপ বিক্রির ক্ষেত্রে ডিপিএম পদ্ধতি সাধারণত প্রযোজ্য নয়। কারণ এতে প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে যায় এবং বাজারদরের চেয়ে কম মূল্যে সম্পদ বিক্রির ঝুঁকি তৈরি হয়। সরকারি সম্পদ বিক্রিতে উন্মুক্ত দরপত্রের মূল উদ্দেশ্যই হলো সর্বোচ্চ দর নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করা।

শিল্পখাত সংশ্লিষ্ট একাধিক বিশ্লেষক মনে করছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই স্ক্র্যাপ বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো যন্ত্রপাতি বা অচল মালামালের প্রকৃত মূল্য গোপন রেখে কম দামে বিক্রি করা হয়। পরে সেই মালামাল পুনরায় বাজারে উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়। ফলে রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হলেও একটি প্রভাবশালী চক্র লাভবান হয়।

জিইএমকোর ক্ষেত্রেও তেমন কোনো চক্র সক্রিয় কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়নি, তবে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এবং বিএসইসির সংশ্লিষ্ট মহলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। শ্রমিক ইউনিয়নের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, স্ক্র্যাপ বিক্রির পুরো প্রক্রিয়াটি গোপনীয়ভাবে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

জিইএমকোর সাধারণ সম্পাদক (সিবিএ) মেহেদী হাসান বলেন, “আমরা শুরু থেকেই বলেছি, নীতিমালা না মেনে স্ক্র্যাপ বিক্রি করা হলে প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। উন্মুক্ত টেন্ডার হলে সরকার আরও বেশি রাজস্ব পেত। আমরা লিখিতভাবে বিএসইসিকে জানিয়েছি, যাতে তারা বিষয়টি তদন্ত করে।”

তিনি আরও বলেন, “সরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রিতে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি। কিন্তু এখানে যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে, তা নিয়ে শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।”

অভিযোগ উঠলেও জিইএমকোর এমডি প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলামের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে একাধিকবার তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। লিখিত বক্তব্য চাওয়া হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

তবে প্রতিষ্ঠানের একটি সূত্র দাবি করেছে, স্ক্র্যাপ বিক্রির উদ্যোগটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদনের বিভিন্ন ধাপ বাকি রয়েছে। তাদের ভাষ্য, “প্রক্রিয়াটি নিয়ম মেনেই করা হচ্ছে।” যদিও কীভাবে ডিপিএম পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে এবং কেন উন্মুক্ত টেন্ডার ডাকা হয়নি—এ বিষয়ে তারা স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেনি।

অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এ ধরনের অভিযোগ আরও বাড়বে। বিশেষ করে স্ক্র্যাপ বিক্রি, যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং অব্যবহৃত সম্পদ ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতির ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। এজন্য স্বাধীন নিরীক্ষা এবং ডিজিটাল টেন্ডারিং ব্যবস্থা আরও কঠোরভাবে বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। যদি প্রমাণ পাওয়া যায় যে বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিক্রির চেষ্টা হয়েছে, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে স্ক্র্যাপ বিক্রির পুরো প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে স্থগিত রাখারও দাবি উঠেছে।

স্থানীয় শিল্পখাতের ব্যবসায়ীদের একটি অংশ বলছেন, উন্মুক্ত দরপত্র হলে অনেক প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতায় অংশ নিত এবং প্রকৃত বাজারমূল্য পাওয়া সম্ভব হতো। কিন্তু সীমিত পরিসরে দর নির্ধারণের কারণে শুরু থেকেই সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, “এ ধরনের প্রক্রিয়ায় সাধারণ ব্যবসায়ীরা অংশ নেওয়ার সুযোগই পায় না।”

জিইএমকো দীর্ঘদিন ধরে নানা আর্থিক ও উৎপাদন সংকটে রয়েছে। একসময় দেশের গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত থাকলেও বর্তমানে উৎপাদন কার্যক্রম আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক কার্যক্রম নিয়ে আগেও প্রশ্ন উঠেছে। এবার স্ক্র্যাপ বিক্রি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিএসইসির একজন সাবেক কর্মকর্তা বলেন, “রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রি সবসময় সংবেদনশীল বিষয়। এখানে সামান্য অনিয়মও বড় দুর্নীতিতে পরিণত হতে পারে। তাই সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।”

তিনি আরও বলেন, “যদি সত্যিই ১৫ কোটি টাকার স্ক্র্যাপ তিন কোটিতে বিক্রির চেষ্টা হয়ে থাকে, তাহলে এটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, রাষ্ট্রীয় স্বার্থেরও বড় ক্ষতি।”

এদিকে শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তাদের আশঙ্কা, কম মূল্যে স্ক্র্যাপ বিক্রি হলে প্রতিষ্ঠান আরও আর্থিক সংকটে পড়বে। অনেকেই মনে করছেন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

পুরো ঘটনায় এখন নজর বিএসইসি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দিকে। অভিযোগের বিষয়ে তারা কী পদক্ষেপ নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তদন্ত হলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে আপাতত জিইএমকোর স্ক্র্যাপ বিক্রি ঘিরে ওঠা অভিযোগ শিল্পখাতে নতুন করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

খাল খননের উদ্বৃত্ত ১ কোটি ৫ লাখ টাকা ফেরত দিয়ে নজির, প্রশংসিত এমপি

জিইএমকোতে ১৫ কোটি টাকার স্ক্র্যাপ ৩ কোটিতে বিক্রি, এমডির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

আপডেট সময় ১২:০১:৩৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬

রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান General Electric Manufacturing Company Limited-এ (জিইএমকো) কোটি কোটি টাকার স্ক্র্যাপ বিক্রি ঘিরে অনিয়ম, নীতিমালা লঙ্ঘন এবং আর্থিক ক্ষতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানের ভেতরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, শ্রমিকনেতা এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি—প্রায় ১৫ কোটি টাকার স্ক্র্যাপ মাত্র তিন কোটি টাকায় বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়ন হলে রাষ্ট্রের বিপুল আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম। যদিও তার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জিইএমকোর কারখানায় দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা বিভিন্ন অকেজো মেশিনারিজ, লৌহজাতীয় স্ক্র্যাপ, ব্যবহারের অনুপযোগী যন্ত্রাংশ এবং পুরোনো মালামাল বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয় কয়েক মাস আগে। প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ তালিকা অনুযায়ী এসব স্ক্র্যাপের মধ্যে রয়েছে প্রায় ৪৬৫টি মেশিন ও বিভিন্ন ধরনের ভারী ধাতব উপকরণ। বাজারমূল্য যাচাইয়ে অভিজ্ঞ কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেন, এসব মালামালের প্রকৃত মূল্য ১৫ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে। অথচ এগুলো মাত্র তিন কোটি টাকার কাছাকাছি মূল্যে বিক্রির চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, পুরো প্রক্রিয়াটি করা হচ্ছে অস্বচ্ছ উপায়ে এবং প্রচলিত সরকারি নীতিমালা অনুসরণ না করে। বিশেষ করে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান না করে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি বা ডিপিএমের মাধ্যমে স্ক্র্যাপ বিক্রির উদ্যোগ নেওয়াকে ঘিরে ব্যাপক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সাধারণত স্ক্র্যাপ বিক্রির ক্ষেত্রে উন্মুক্ত টেন্ডার, দরপত্র মূল্যায়ন এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নির্ধারণ বাধ্যতামূলক হলেও জিইএমকোর ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

জিইএমকোর কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে স্ক্র্যাপ বিক্রি নিয়ে শুরু থেকেই অসন্তোষ ছিল। তারা বলেন, “যেভাবে মালামালগুলোর মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। স্ক্র্যাপের বাজারদর, লোহা ও যন্ত্রাংশের বর্তমান মূল্য বিবেচনা করলে এর দাম আরও অনেক বেশি হওয়ার কথা।” তাদের অভিযোগ, কিছু নির্দিষ্ট পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে পুরো প্রক্রিয়াটি দ্রুত সম্পন্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছিল।

প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নও বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছে। ইউনিয়নের নেতারা অভিযোগ করে বলেন, Bangladesh Steel and Engineering Corporation (বিএসইসি)-এর নীতিমালা উপেক্ষা করে স্ক্র্যাপ বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তারা এ বিষয়ে বিএসইসি চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগও জমা দিয়েছেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়, নিয়মবহির্ভূতভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ কম মূল্যে বিক্রি করা হলে প্রতিষ্ঠানটি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাবে।

শ্রমিকনেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্ক্র্যাপ বিক্রির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য যে ধরনের মূল্য যাচাই, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা এবং নিলাম পদ্ধতি অনুসরণ করা প্রয়োজন ছিল, তার কোনোটিই যথাযথভাবে মানা হয়নি। তারা দাবি করেন, বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুললেও অনেক কর্মকর্তা ভীতির কারণে প্রকাশ্যে কথা বলতে চাননি।

নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, স্ক্র্যাপ বিক্রির জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটির সভাপতি ছিলেন জিইএমকোর এমডি প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম। এছাড়া কমিটিতে বাণিজ্যিক, হিসাবরক্ষণ, উৎপাদন এবং প্রশাসনিক বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা সদস্য হিসেবে যুক্ত ছিলেন। তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে এমডির প্রভাবই ছিল সবচেয়ে বেশি।

কোম্পানির অভ্যন্তরীণ কয়েকটি সূত্র জানায়, স্ক্র্যাপগুলোর প্রকৃত মূল্য নির্ধারণের জন্য স্বাধীন মূল্যায়ন প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হয়নি। বরং অভ্যন্তরীণভাবে এমনভাবে মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে দরপত্র ছাড়া কম দামে বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়। একজন কর্মকর্তা বলেন, “স্ক্র্যাপের বর্তমান বাজারমূল্য বিবেচনা করলে এই দর অস্বাভাবিকভাবে কম। এখানে স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা থাকলে সরকার আরও অনেক বেশি অর্থ পেত।”

এদিকে পুরো প্রক্রিয়ায় ডিপিএম বা সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি ব্যবহার নিয়ে আইনি প্রশ্নও উঠেছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্ক্র্যাপ বিক্রির ক্ষেত্রে ডিপিএম পদ্ধতি সাধারণত প্রযোজ্য নয়। কারণ এতে প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে যায় এবং বাজারদরের চেয়ে কম মূল্যে সম্পদ বিক্রির ঝুঁকি তৈরি হয়। সরকারি সম্পদ বিক্রিতে উন্মুক্ত দরপত্রের মূল উদ্দেশ্যই হলো সর্বোচ্চ দর নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করা।

শিল্পখাত সংশ্লিষ্ট একাধিক বিশ্লেষক মনে করছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই স্ক্র্যাপ বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো যন্ত্রপাতি বা অচল মালামালের প্রকৃত মূল্য গোপন রেখে কম দামে বিক্রি করা হয়। পরে সেই মালামাল পুনরায় বাজারে উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়। ফলে রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হলেও একটি প্রভাবশালী চক্র লাভবান হয়।

জিইএমকোর ক্ষেত্রেও তেমন কোনো চক্র সক্রিয় কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়নি, তবে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এবং বিএসইসির সংশ্লিষ্ট মহলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। শ্রমিক ইউনিয়নের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, স্ক্র্যাপ বিক্রির পুরো প্রক্রিয়াটি গোপনীয়ভাবে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

জিইএমকোর সাধারণ সম্পাদক (সিবিএ) মেহেদী হাসান বলেন, “আমরা শুরু থেকেই বলেছি, নীতিমালা না মেনে স্ক্র্যাপ বিক্রি করা হলে প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। উন্মুক্ত টেন্ডার হলে সরকার আরও বেশি রাজস্ব পেত। আমরা লিখিতভাবে বিএসইসিকে জানিয়েছি, যাতে তারা বিষয়টি তদন্ত করে।”

তিনি আরও বলেন, “সরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রিতে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি। কিন্তু এখানে যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে, তা নিয়ে শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।”

অভিযোগ উঠলেও জিইএমকোর এমডি প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলামের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে একাধিকবার তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। লিখিত বক্তব্য চাওয়া হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

তবে প্রতিষ্ঠানের একটি সূত্র দাবি করেছে, স্ক্র্যাপ বিক্রির উদ্যোগটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদনের বিভিন্ন ধাপ বাকি রয়েছে। তাদের ভাষ্য, “প্রক্রিয়াটি নিয়ম মেনেই করা হচ্ছে।” যদিও কীভাবে ডিপিএম পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে এবং কেন উন্মুক্ত টেন্ডার ডাকা হয়নি—এ বিষয়ে তারা স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেনি।

অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এ ধরনের অভিযোগ আরও বাড়বে। বিশেষ করে স্ক্র্যাপ বিক্রি, যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং অব্যবহৃত সম্পদ ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতির ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। এজন্য স্বাধীন নিরীক্ষা এবং ডিজিটাল টেন্ডারিং ব্যবস্থা আরও কঠোরভাবে বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। যদি প্রমাণ পাওয়া যায় যে বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিক্রির চেষ্টা হয়েছে, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে স্ক্র্যাপ বিক্রির পুরো প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে স্থগিত রাখারও দাবি উঠেছে।

স্থানীয় শিল্পখাতের ব্যবসায়ীদের একটি অংশ বলছেন, উন্মুক্ত দরপত্র হলে অনেক প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতায় অংশ নিত এবং প্রকৃত বাজারমূল্য পাওয়া সম্ভব হতো। কিন্তু সীমিত পরিসরে দর নির্ধারণের কারণে শুরু থেকেই সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, “এ ধরনের প্রক্রিয়ায় সাধারণ ব্যবসায়ীরা অংশ নেওয়ার সুযোগই পায় না।”

জিইএমকো দীর্ঘদিন ধরে নানা আর্থিক ও উৎপাদন সংকটে রয়েছে। একসময় দেশের গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত থাকলেও বর্তমানে উৎপাদন কার্যক্রম আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক কার্যক্রম নিয়ে আগেও প্রশ্ন উঠেছে। এবার স্ক্র্যাপ বিক্রি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিএসইসির একজন সাবেক কর্মকর্তা বলেন, “রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রি সবসময় সংবেদনশীল বিষয়। এখানে সামান্য অনিয়মও বড় দুর্নীতিতে পরিণত হতে পারে। তাই সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।”

তিনি আরও বলেন, “যদি সত্যিই ১৫ কোটি টাকার স্ক্র্যাপ তিন কোটিতে বিক্রির চেষ্টা হয়ে থাকে, তাহলে এটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, রাষ্ট্রীয় স্বার্থেরও বড় ক্ষতি।”

এদিকে শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তাদের আশঙ্কা, কম মূল্যে স্ক্র্যাপ বিক্রি হলে প্রতিষ্ঠান আরও আর্থিক সংকটে পড়বে। অনেকেই মনে করছেন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

পুরো ঘটনায় এখন নজর বিএসইসি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দিকে। অভিযোগের বিষয়ে তারা কী পদক্ষেপ নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তদন্ত হলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে আপাতত জিইএমকোর স্ক্র্যাপ বিক্রি ঘিরে ওঠা অভিযোগ শিল্পখাতে নতুন করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে।