জ্বালানি খাতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড-এ বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা একক আধিপত্য, নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, তেল চুরি, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের কেন্দ্রে উঠে এসেছে একটি নাম—জিএম (এইচআর) ও কোম্পানি সচিব মো. মাসুদুল ইসলাম। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এক বড় অংশের অভিযোগ, যমুনা অয়েলের প্রশাসনিক কাঠামোতে এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেই যেখানে তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব নেই। নিয়োগ থেকে বদলি, পদোন্নতি থেকে ডিপো নিয়ন্ত্রণ, এমনকি সিবিএ রাজনীতির অভ্যন্তরীণ সমীকরণ পর্যন্ত তার নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে একের পর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে, তবুও রহস্যজনকভাবে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর তদন্ত কিংবা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সম্প্রতি যমুনা অয়েলে একযোগে ৪৫ কর্মকর্তা-কর্মচারীর গণবদলির পর নতুন করে আলোচনায় আসে মাসুদুল ইসলামের নাম। কারণ, বদলির এই বড় পদক্ষেপেও বহাল তবিয়তেই রয়ে গেছেন তিনি। শুধু তাই নয়, তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীও গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক পোস্টিং পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে প্রশ্ন উঠেছে—এই গণবদলি কি আদৌ দুর্নীতি রোধের উদ্যোগ, নাকি সিন্ডিকেট পুনর্বিন্যাসের একটি কৌশল?
যমুনা অয়েলের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত এক দশকে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করেন মাসুদুল ইসলাম। শুরুতে প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব পালন করলেও পরবর্তীতে তিনি একই সঙ্গে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন। জিএম (এইচআর), কোম্পানি সচিব, বিটুমিন সংক্রান্ত কার্যক্রমের প্রভাবক, বিভিন্ন কমিটির সমন্বয়ক—এভাবে বহু দায়িত্বের সমন্বয়ে তিনি কার্যত প্রতিষ্ঠানের “সুপার পাওয়ার” হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির এমডি পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রে তার ইচ্ছার বাইরে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশের বিভিন্ন ডিপোতে তেল চুরি ও অনিয়মে জড়িত একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন মাসুদুল ইসলাম। বিশেষ করে বাঘাবাড়ি ডিপোকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা “সাদেকীন সিন্ডিকেট”-এর নেপথ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবেও তার নাম এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা বছরের পর বছর ধরে তেল মাপজোক, পরিবহন, স্টোরেজ এবং সরবরাহ প্রক্রিয়ায় নানা কারসাজির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার জ্বালানি আত্মসাৎ করেছে। কিন্তু প্রশাসনিক ছত্রচ্ছায়ার কারণে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাঘাবাড়ি ডিপোর আলোচিত সিন্ডিকেটপ্রধান আবুল ফজল মো. সাদেকীনসহ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ থাকলেও তারা বরাবরই নিরাপদ থেকেছেন। বরং সাম্প্রতিক গণবদলিতে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ডিপোতে পদায়ন করা হয়েছে। দৌলতপুর, শ্রীমঙ্গল, ফতুল্লা ও পার্বতীপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ ডিপোতে এসব কর্মকর্তাকে পোস্টিং দেওয়ার পেছনে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যমুনা অয়েলের একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেন, এসব বদলির নেপথ্য সমন্বয়ক ছিলেন মাসুদুল ইসলাম নিজেই।
প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরে নিয়োগ ও পদোন্নতি নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ রয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি, যোগ্যতা বা জ্যেষ্ঠতার চেয়ে “ম্যানেজমেন্ট” এবং আর্থিক সমঝোতাই এখানে বেশি কার্যকর। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ ডিপো, বিপণন বিভাগ কিংবা আর্থিক প্রশাসনের মতো স্পর্শকাতর স্থানে পোস্টিং পেতে হলে মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেন করতে হয়। আর এই পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন মাসুদুল ইসলাম। অনেক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, তিনি নিজস্ব বলয় তৈরি করে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে নিজের অনুগতদের বসিয়েছেন।
যমুনা অয়েলের অভ্যন্তরে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো সিবিএ রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগপন্থি শ্রমিক রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে তিনি নিজের ক্ষমতার বলয় অটুট রেখেছেন। যমুনা অয়েল লেবার ইউনিয়নের কয়েকজন আলোচিত নেতার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া সিবিএ নেতা মুহাম্মদ এয়াকুব ও আবুল হোসেনকে ঘিরে সম্প্রতি নতুন বিতর্কের জন্ম হয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে এই দুই সিবিএ নেতাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ও অনুপস্থিতির অভিযোগ আনা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে অভিযোগ ওঠে, গ্রেপ্তারের দিন থেকেই তাদের নামে বিশেষ ছুটি অনুমোদন করা হয়েছিল। প্রশ্ন উঠেছে—যারা তখন পুলিশ হেফাজতে ছিলেন, তারা কীভাবে ছুটির আবেদন করলেন? প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে অভিযোগ, মাসুদুল ইসলাম নিজেই তাদের পক্ষে ছুটির আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন এবং পরবর্তীতে সেটি অনুমোদন করান।
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, বরখাস্ত প্রত্যাহারের জন্য বড় অঙ্কের আর্থিক সমঝোতা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে, মুহাম্মদ এয়াকুবের সাময়িক বরখাস্ত প্রত্যাহারে প্রায় এক কোটি বিশ লাখ টাকার সমঝোতা হয়েছিল। সদ্য বিদায়ী এমডি প্রকৌশলী আমির মাসুদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু হঠাৎ এমডি বদলি হয়ে যাওয়ায় সেই পরিকল্পনা থমকে যায়।
তবে অভিযোগ রয়েছে, এমডি পরিবর্তনের পরও থেমে নেই মাসুদুল ইসলামের তৎপরতা। সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এবং মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজম নাসির উদ্দীনের বড় ভাই সাইফুদ্দিনকে নিয়ে নবাগত এমডির চেম্বারে যান তিনি। সেখানে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া সিবিএ নেতা মুহাম্মদ এয়াকুবের চাকরি পুনর্বহালের সুপারিশ করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। যমুনা অয়েলের একাধিক কর্মকর্তা মনে করেন, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে এখনো প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চাইছেন মাসুদুল ইসলাম।
যদিও গত এপ্রিলে তাকে জিএম (মার্কেটিং) পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, তবুও বাস্তবে সেই বিভাগের ওপর তার প্রভাব কমেনি। অভিযোগ রয়েছে, তিনি এখনো মার্কেটিং বিভাগের চেম্বার ব্যবহার করছেন এবং বিটুমিন সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমেও হস্তক্ষেপ করছেন। এমনকি বিটুমিন সরবরাহ ও সংশ্লিষ্ট কমিটির সিদ্ধান্তেও তার প্রভাব বিদ্যমান রয়েছে বলে দাবি করেছেন কর্মকর্তারা।
প্রতিষ্ঠানের ভেতরে তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজন কর্মকর্তার নামও বারবার আলোচনায় আসছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন ম্যানেজার (ফাইন্যান্স) ধীমান কান্তি দাস এবং ডেপুটি ম্যানেজার (অ্যাডমিন) হোসেন মোহাম্মদ ইয়াহিয়া। অভিযোগ রয়েছে, বছরের পর বছর একই জায়গায় দায়িত্ব পালন করলেও তাদের বদলি হয়নি। যদিও বিপিসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিন বছরের বেশি সময় একই স্থানে দায়িত্ব পালনকারীদের বদলির নির্দেশনা রয়েছে। কর্মকর্তাদের অভিযোগ, মাসুদুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তারা প্রশাসনিক সুবিধা ভোগ করছেন।
বিশেষ করে হোসেন মোহাম্মদ ইয়াহিয়াকে ঘিরে অভিযোগ আরও গুরুতর। এমডির দপ্তরে কর্মরত থাকলেও কার্যত তিনি মাসুদুল ইসলামের হয়ে তথ্য নিয়ন্ত্রণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমডির কাছে যাওয়া বিভিন্ন অভিযোগ ও নথি তার হাত দিয়েই যায়। ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ এমডির দৃষ্টিগোচরই হয় না বলে দাবি করেছেন কর্মকর্তারা।
যমুনা অয়েলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কেন এখনো মাসুদুল ইসলামের বিরুদ্ধে তদন্ত হচ্ছে না? যেখানে তার বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠছে, সেখানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিপিসি কিংবা দুর্নীতি দমন কমিশনের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না থাকায় হতাশা বাড়ছে। কর্মকর্তাদের অনেকে মনে করছেন, প্রশাসনের ভেতরে শক্তিশালী লবিং এবং রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণেই তিনি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
এদিকে সাম্প্রতিক গণবদলিকে ঘিরেও নতুন করে সমালোচনা শুরু হয়েছে। কর্মকর্তাদের অভিযোগ, প্রকৃত দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে শুধু “রদবদল” দেখিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। বরং যাদের বিরুদ্ধে তেল চুরি, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, তাদের অনেককেই আরও গুরুত্বপূর্ণ ডিপোতে পদায়ন করা হয়েছে। এতে করে দুর্নীতির নেটওয়ার্ক ভাঙার বদলে আরও শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিষ্ঠানের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যমুনা অয়েলে এখন একটি অস্বাভাবিক ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। কেউ অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বললে তাকে বদলি, পদাবনতি কিংবা প্রশাসনিক হয়রানির মুখে পড়তে হয়। ফলে অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রকাশ্যে কিছু বলতে চান না। তবে অভ্যন্তরীণভাবে তারা একটি নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রশাসনিক সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছেন।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যমুনা অয়েলের মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অভিযোগ শুধু প্রশাসনিক সংকট নয়, জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগজনক। কারণ, তেল সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থাকেও অস্থিতিশীল করতে পারে।
অন্যদিকে, মাসুদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে যমুনা অয়েলের কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, তিনি বরাবরই নিজেকে “টার্গেটেড” দাবি করে আসছেন এবং সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। যদিও প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে ও বাইরে ক্রমবর্ধমান অভিযোগ এবং একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর এখন তার ভূমিকা নিয়ে বিস্তৃত তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এক কর্মকর্তাকে ঘিরে যেসব অভিযোগ সামনে আসছে, তা শুধু ব্যক্তি পর্যায়ের অনিয়ম নয়; বরং পুরো প্রশাসনিক কাঠামোর দুর্বলতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং জবাবদিহির সংকটকেই সামনে নিয়ে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, সাম্প্রতিক গণবদলির পর সত্যিই কোনো পরিবর্তন আসে, নাকি আগের মতোই অদৃশ্য সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণেই চলতে থাকে যমুনা অয়েলের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















