কথিত প্রাচীন পিলার, দুর্লভ কয়েন, ঐতিহাসিক ধাতব বস্তু ও গোপন প্রত্নসম্পদের নামে প্রতারণা করে সাধারণ মানুষের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া দুলাল-ইব্রাহিম চক্রের বিরুদ্ধে নতুন নতুন তথ্য সামনে আসছে। আগের পর্বগুলোতে সরাসরি যোগাযোগ, ভুয়া নথি ও সাজানো বৈঠকের মাধ্যমে প্রতারণার চিত্র উঠে এলেও এবার অনুসন্ধানে মিলেছে তাদের অনলাইনভিত্তিক নতুন কৌশলের তথ্য।
অভিযোগ রয়েছে, আহাদুল ইসলাম দুলাল ওরফে এইচএম দুলাল খান (চান্দু) এবং আব্দুল মনসুর ওরফে ইব্রাহিম মুসার নেতৃত্বে চক্রটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন মেসেজিং অ্যাপ, ভুয়া বিদেশি ক্রেতা ও ডিজিটাল কাগজপত্র ব্যবহার করে প্রতারণার পরিধি আরও বড় করে তোলে। এতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ সহজেই তাদের ফাঁদে পড়েছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ‘ম্যাগনেটিক কয়েন’ ও ‘অ্যান্টিক মেটাল কয়েন’ প্রতারণার নামে একাধিক সংঘবদ্ধ চক্র ধরাও পড়েছে, যেখানে কোটি টাকার লেনদেন, ভুয়া পরীক্ষক এবং সাজানো বিদেশি ক্রেতার তথ্য উঠে আসে।
দুলাল-ইব্রাহিম চক্রের বিষয়ে অনুসন্ধান সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এরা পুরোনো প্রতারণাকে ডিজিটাল রূপ দিয়েছে। ফলে এখন সরাসরি দেখা না করেও বিশ্বাস অর্জন করে বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপে সাজানো বাজার : অনুসন্ধানে জানা গেছে, চক্রটি একাধিক ভুয়া ফেসবুক আইডি, পেজ এবং মেসেঞ্জার গ্রুপ ব্যবহার করত। কোথাও তারা নিজেদের অ্যান্টিক সংগ্রাহক, কোথাও বিনিয়োগ পরামর্শক, আবার কোথাও আন্তর্জাতিক নিলাম প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দিত।
এসব আইডিতে নিয়মিত রহস্যময় কয়েন, ধাতব বস্তু, পাথরের স্তম্ভ, আরবি বা ইংরেজি খোদাই করা জিনিসের ছবি পোস্ট করা হতো। ক্যাপশনে লেখা থাকত-“বিদেশে কোটি টাকায় বিক্রি হবে”, “গোপন ডিল চলছে”, “সুযোগ সীমিত”, “আজই যোগাযোগ করুন”।
ডিজিটাল নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের পোস্টের উদ্দেশ্য পণ্য বিক্রি নয়; বরং আগ্রহী মানুষকে ব্যক্তিগত বার্তায় টেনে আনা। একবার ইনবক্সে যোগাযোগ শুরু হলে ধাপে ধাপে তাকে ফাঁদে ফেলা হয়। অনলাইন প্রতারণায় এই কৌশল এখন ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ভুয়া বিদেশি ক্রেতার নাটক : ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, চক্রটির অন্যতম বড় কৌশল ছিল ভুয়া বিদেশি ক্রেতা দেখানো। প্রথমে একজন মধ্যস্থতাকারী যোগাযোগ করত। পরে আরেকজন নিজেকে দুবাই, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপান বা ইউরোপের সংগ্রাহক পরিচয় দিয়ে ভিডিও কলে যুক্ত হতো।
কখনো ইংরেজিতে কথা বলা, কখনো অনুবাদক ব্যবহার, আবার কখনো বিদেশি নম্বর দেখিয়ে ফোন করা হতো। এতে ভুক্তভোগীরা মনে করতেন এটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বড় ব্যবসা।
একজন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি জানান, তাকে বলা হয়েছিল তার কাছে থাকা কয়েনটি বিদেশে ৫০ কোটি টাকায় বিক্রি হবে। পরে কাস্টমস, ট্যাক্স, সার্টিফিকেট ও নিরাপত্তা খরচের নামে কয়েক ধাপে টাকা নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক ‘ম্যাগনেটিক কয়েন’ প্রতারণার ঘটনাতেও ভুয়া বিদেশি বাজার, অতিরঞ্জিত মূল্য এবং সাজানো পরীক্ষার রিপোর্ট ব্যবহারের তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
ছোট লাভ দেখিয়ে বড় বিনিয়োগ
চক্রটির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগে একটি বিষয় প্রায় সবার বক্তব্যে মিলেছে—প্রথমে অল্প লাভ দেখিয়ে পরে বড় অঙ্কের টাকা নেওয়া।
কেউ ১ লাখ টাকা দিলে কয়েকদিন পর ২০ হাজার টাকা লাভ ফেরত দেওয়া হতো। কেউ ৫ লাখ দিলে কিছু অংশ ফেরত দিয়ে বোঝানো হতো ব্যবসাটি বাস্তব। এতে অনেকেই আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকেও টাকা এনে বিনিয়োগ করতেন।
পরে বলা হতো, “এবার আসল ডিল”, “বড় ক্রেতা এসেছে”, “আজ টাকা না দিলে সুযোগ শেষ”, “সরকারি ছাড়পত্র হয়ে গেছে”। এই চাপের মুখে অনেকে কোটি টাকাও দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রতারণাতেও প্রথমে ছোট মুনাফা দেখিয়ে পরে বড় অর্থ আত্মসাৎ করার কৌশল শনাক্ত করেছে তদন্ত সংস্থাগুলো।
নকল কাগজপত্র ও ডিজিটাল প্রতারণা : অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, দুলাল-ইব্রাহিম চক্র কাগজপত্র তৈরিতে ছিল দক্ষ। তারা নানা প্রতিষ্ঠানের লোগো ব্যবহার করে অনুমতিপত্র, ক্রয়চুক্তি, পরীক্ষার রিপোর্ট, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, এমনকি রপ্তানি অনুমোদনের আদলে নথিও দেখাত।
কিছু নথিতে বানান ভুল, তারিখের অসামঞ্জস্য, অস্পষ্ট স্বাক্ষর বা জাল সিল থাকলেও সাধারণ মানুষ তা ধরতে পারতেন না। অনেক সময় পিডিএফ ফাইল, স্ক্যান কপি বা মোবাইলে পাঠানো ডকুমেন্ট দেখিয়ে জরুরি সিদ্ধান্ত নিতে চাপ দেওয়া হতো।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো নথি হাতে পেলেই তা সত্য ধরে নেওয়া যাবে না। সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর, ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানে যাচাই ছাড়া বড় অঙ্কের আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।
‘পুরোনো’ মানেই কোটি টাকার সম্পদ নয় : প্রত্নতত্ত্ব ও সংগ্রহশালা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরোনো বা মরিচাধরা কোনো বস্তু মানেই বিরল সম্পদ নয়। বাজারমূল্য নির্ভর করে সত্যতা, উৎস, বিরলতা, সংরক্ষণ অবস্থা এবং বৈধ মালিকানার ওপর।
আধুনিক প্রযুক্তিতে নতুন ধাতুকে পুরোনো দেখানো, রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় জং ধরানো, নকল খোদাই করা কিংবা পাথরে কৃত্রিম ক্ষয় তৈরি করা এখন সহজ। ফলে বাহ্যিক রূপ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া বড় ভুল হতে পারে।
বাংলাদেশে অতীতেও ‘কাঠের কয়েন’, ‘ম্যাগনেটিক কয়েন’ ও ভুয়া ধাতব মুদ্রার নামে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে।
কেন অভিযোগ করেন না ভুক্তভোগীরা : অনেক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি এখনো প্রকাশ্যে আসতে চান না। কেউ ব্যবসায়ী, কেউ সামাজিকভাবে পরিচিত, কেউ পরিবারের কাছেও ক্ষতির কথা গোপন রেখেছেন।
একজন ভুক্তভোগী বলেন, “আমি যদি অভিযোগ করি, সবাই জানবে আমি লোভে পড়ে টাকা দিয়েছি। তাই চুপ ছিলাম।”
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রতারণার শিকার ব্যক্তিরা প্রায়ই লজ্জা, আত্মগ্লানি ও সামাজিক চাপে অভিযোগ করতে দেরি করেন। এতে প্রতারকরা আরও সময় পেয়ে যায় এবং নতুন শিকার খুঁজে নেয়।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা : অর্থনৈতিক অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এখন প্রতারণা আর শুধু সামনাসামনি সীমাবদ্ধ নেই; এটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মনির্ভর হয়ে উঠছে। তাই তদন্তেও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণ, সাইবার মনিটরিং এবং দ্রুত তথ্য যাচাই জরুরি।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অনলাইন প্রতারণায় ভুয়া বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে।
সাধারণ মানুষের জন্য সতর্কবার্তা : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অস্বাভাবিক লাভের প্রতিশ্রুতি, গোপন ডিল, দ্রুত সিদ্ধান্তের চাপ, বিদেশি ক্রেতার নাটক বা যাচাইহীন নথি—এসব দেখলেই সতর্ক হতে হবে।
কোনো অচেনা ব্যক্তি বা অনলাইন সূত্রের কথায় অর্থ লেনদেন না করা, সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়া এবং সন্দেহজনক ঘটনার ক্ষেত্রে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ।
দুলাল-ইব্রাহিম চক্রকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো প্রমাণ করে, প্রতারণার পদ্ধতি বদলালেও মূল অস্ত্র একই—লোভ, গোপনীয়তা ও বিশ্বাস। আর এই তিন জায়গাতেই সাধারণ মানুষকে সবচেয়ে বেশি সচেতন হতে হবে।
সংবাদ শিরোনাম ::
প্রাচীন পিলার ও কয়েন চক্রের ১০ পর্বের ৪র্থ পর্ব
দুলাল-ইব্রাহিম চক্রের প্রতারণার জাল কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার কৌশল
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় ১১:১৩:০৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
- ৫০৭ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ




















