নরসিংদীর পলাশ উপজেলার ঘোড়াশাল এলাকায় চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, প্রভাব বিস্তার এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি ব্যবহার করে অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে আলোচনায় এসেছেন মহিউদ্দিন চিশতি নামের এক ব্যক্তি। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তিনি এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে নানা অনিয়মের মাধ্যমে একটি প্রভাবশালী চক্র গড়ে তুলেছেন। বিশেষ করে ঘোড়াশাল উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এখন জনমনে ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মহিউদ্দিন চিশতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের জায়গা দখল করে সেখানে ব্যক্তিগত অফিস স্থাপন করা। অভিযোগ রয়েছে, ঘোড়াশাল উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ভেতরে তিনি বিশাল আকারের একটি অফিস নির্মাণ করে নিজের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে এবং রোগীদের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিদিন ওই অফিসে বিপুল সংখ্যক মানুষের যাতায়াত থাকায় চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রের মতো সংবেদনশীল জায়গা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করার মাধ্যমে শুধু আইন লঙ্ঘনই করা হয়নি, জনগণের স্বাস্থ্য অধিকারও ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোগীর চেয়ে বহিরাগতদের উপস্থিতি অনেক সময় বেশি দেখা যায় বলেও দাবি করেন তারা। এতে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও রোগী—সবাই বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন।
শুধু স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভেতরেই নয়, এর বাইরেও মহিউদ্দিন চিশতির বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, ঘোড়াশাল উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সামনের নদীপাড় এলাকায় প্রায় ১০টি দোকান স্থাপন করে তিনি নিয়মিত ভাড়া আদায় করছেন। এসব দোকান সরকারি জায়গায় স্থাপিত হলেও তা ব্যক্তিগত আয়-উৎসে পরিণত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এলাকাবাসীর প্রশ্ন, কার অনুমতিতে সরকারি জায়গায় দোকান বসিয়ে এভাবে অর্থ আদায় করা হচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের অভিযোগ, মহিউদ্দিন চিশতি শুধু জমি বা স্থাপনা দখলেই সীমাবদ্ধ নন, তিনি এলাকায় একধরনের অঘোষিত আধিপত্য কায়েম করেছেন। খেয়া পারাপার, বাসস্ট্যান্ড নিয়ন্ত্রণ, হাট-বাজারের প্রভাব, ঠিকাদারি বাণিজ্যসহ নানা খাতে তার প্রভাব রয়েছে বলে দাবি করা হয়। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি বিপুল আর্থিক সুবিধা নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মহিউদ্দিন ও তার অনুসারীদের ভয়ে অনেকে মুখ খুলতে সাহস পান না। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে ভয়ভীতি দেখানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে এলাকায় এক ধরনের নীরব আতঙ্ক বিরাজ করছে। সাধারণ মানুষ মনে করেন, প্রভাবশালী অবস্থানের কারণে তার বিরুদ্ধে কেউ প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে পারছেন না।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, মহিউদ্দিন চিশতির ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সহযোগীও এলাকায় নানা অনিয়মে জড়িত। স্থানীয়দের দাবি, তার ভাগিনা ও কর্মীদের মাধ্যমে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। কেউ কেউ মাদক ব্যবসার অভিযোগও তুলেছেন। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবুও স্থানীয় পর্যায়ে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে।
ঘোড়াশাল এলাকার প্রবীণ বাসিন্দারা বলেন, একসময় এই জনপদ ছিল শান্তিপূর্ণ। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব নিয়মে চলত, মানুষও স্বাভাবিকভাবে সেবা পেতেন। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। বিভিন্ন স্থানে প্রভাব বিস্তার, দখলদারিত্ব ও ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। বিশেষ করে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে কেন্দ্র করে এমন অভিযোগ উঠায় তারা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা কয়েকজন নারী রোগী বলেন, চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এসে তারা প্রায়ই অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখে পড়েন। অপ্রয়োজনীয় ভিড়, বহিরাগতদের আনাগোনা এবং বিশৃঙ্খল পরিবেশের কারণে অনেক সময় স্বাভাবিকভাবে চিকিৎসা নেওয়া যায় না। শিশু ও বয়স্ক রোগীদের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলে জানান তারা।
সুশাসন নিয়ে কাজ করা স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, একটি সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের জমি বা ভবন কোনো ব্যক্তি দখল করে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করলে তা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। একই সঙ্গে সেখানে যদি চাঁদাবাজি, ভাড়া আদায় বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে, তবে তা দ্রুত তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কারণ এসব ঘটনায় জনগণের মধ্যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা কমে যেতে পারে।
এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগপত্রে মহিউদ্দিন চিশতির অবৈধ দখল উচ্ছেদ, সরকারি জায়গা উদ্ধার, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং তার বিরুদ্ধে ওঠা অন্যান্য অভিযোগ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। স্থানীয়দের আশা, প্রশাসন দ্রুত বিষয়টি আমলে নেবে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় পর্যায়ে এ ধরনের প্রভাবশালী চক্র তৈরি হলে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। তারা ন্যায়বিচার পান না, সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত হন এবং ভয়ভীতির মধ্যে জীবনযাপন করতে বাধ্য হন। তাই কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি।
এদিকে মহিউদ্দিন চিশতির বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ভবিষ্যতে তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।
সব মিলিয়ে, ঘোড়াশালে মহিউদ্দিন চিশতিকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ এখন স্থানীয় জনজীবনের বড় আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সরকারি সম্পত্তি দখল, চাঁদাবাজি, প্রভাব বিস্তার ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ার মতো অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা। তাদের মতে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের সেবা নিশ্চিত করতে হলে এ বিষয়ে দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ প্রয়োজন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















