গত ১২ এপ্রিল ফরিদপুরে প্রবাসী কল্যাণ সেন্টারে যাইয়া আবেদন করেছি। আমি শুধু আমার বোনটারে ফেরত চাই। অনেকে জিগায় সরকার কত টাকা দেবে, কি দেবে- আমি কিচ্ছু চাই না। আমি শুধু আমার মায়ের মতো বোনটারে চাই। মানুষ বাড়িতে আইসা শুধু ছবি তুইলা নিয়া গেল, বোনডারে কেউ আইনা দিচ্ছে না।’
কথাগুলো বলেছেন লেবাননে ইসরাইলি হামলায় নিহত নারী শ্রমিক দিপালী আক্তারের (৩৪) ছোট বোন লাইজু আক্তার (২৪)। আজ বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) দুপুর ১টার দিকে আমাদের মাতৃভূমি প্রতিবেদকের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হলে তিনি এসব কথা বলেন।
ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার পূর্ব শালেপুর মুন্সিরচর গ্রামের মেয়ে নিহত দিপালী বেগম। বাবা শেখ মোকা একজন দিনমজুর। তার কোনো কৃষিজমি নেই। মা রাজিয়া বেগম মারা গেছেন অন্তত আট বছর আগে। বাড়ির ভিটার জন্যও এক বিন্দু জমি নেই এই অসহায় দরিদ্র পরিবারের। সরকারি খাসজমিতে কোনোভাবে মাথা গোঁজার জায়গা করে পড়ে রয়েছে পরিবারটি।
তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় শেফালী আক্তার (৪০), এরপর দুই ভাই শেখ ওবায়দুর (৩৮) ও শেখ সেকেন্দার (৩৬), এরপর দিপালী আক্তার সবার শেষে লাইজু আক্তার।
আজ থেকে ১৫ বছর আগে ২০১১ সালে সংসারের অভাব দূর করতে জীবিকার তাগিদে প্রথম লেবানন যান দিপালী, ওই সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৯ বছর। এতদিন বিদেশ থেকে টাকা পাঠিয়েছেন দেশে। সেই টাকা দিয়ে দুটি ভাঙা ঝুপড়ি ঘরের জায়গায় তোলা হয়েছে দুটি চারচালা টিনের ঘর। তিনি বাদে একে একে সব ভাইবোনের বিয়ে হয়েছে। বিয়েতে আর্থিকভাবে সাহায্য করেছেন দিপালী।
প্রতি মাসে বাড়িতে খরচের জন্য লেবানন থেকে টাকা পাঠিয়েছেন তিনি। এভাবে আস্তে আস্তে বদলে যায় সংসারের চেহারা।
লাইজু বলেন, আমার অনেক আক্ষেপ ভাই। একটা যুদ্ধে আমার আপন বোন মারা গেছে। তার কত কষ্ট হয়েছে কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। আমাদের বাড়িতে কত মানুষ আইসা ছবি তুইলা নিয়া গেল, বোনটারে এখনও কেউ আইনা দিলো না। গত ১৩ এপ্রিল লেবাননের দূতাবাস থেকে আমারে ফোন করে জানানো হয় বর্তমানে এই দেশের প্লেন বন্ধ। তাই আপনার বোনের লাশ পাঠাতে কিছুটা দেরি হবে। কত দেরি হইবে?
ফরিদপুর প্রবাসী কল্যাণ সেন্টারের সহকারী পরিচালক মো. আশিক সিদ্দিকী বলেন, আমরা মরদেহ দেশে আনার জন্য ইতোমধ্যেই কাজ শুরু করেছি। তবে যুদ্ধাবস্থা ও প্লেন না চলার কারণে এটা এখনই সম্ভব হচ্ছে না। কিছুটা সময় লাগবে।
তিনি বলেন, ওই পরিবারের সঙ্গে আমাদের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রয়েছে। লাশ দেশে আসার পর বাংলাদেশ সরকার বিনামূল্যের অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের মাধ্যমে লাশ বাড়িতে পাঠানো এবং দাফনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা দেবে। পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ বাবদ দেওয়া হবে তিন লাখ টাকা।
প্রসঙ্গত, গত ৮ এপ্রিল বৈরুতের যে ভবনে দিপালী কর্মরত ছিলেন, সেখানেই আঘাত হানে ঘাতক বোমা। গুরুতর আহত অবস্থায় বৈরুতের রফিক হারিরি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
জেলা প্রতিনিধি 



















