এক হাতে দাঁড়াশ সাপের লেজ, অন্য হাতে মাথা— কাঁধে গামছা। দৃশ্যটি দেখে যে কেউ তাকে পেশাদার সাপুড়ে ভেবে ভুল করতে পারেন। হেঁটে গিয়ে একপর্যায়ে পাশে থাকা এক ব্যক্তির কাঁধে সাপটি তুলে দেন তিনি। আচমকা সাপ দেখে ভয়ে ওই ব্যক্তি দৌড় দিলে চারপাশে হাসির রোল পড়ে।
সাধারণত সাপুড়েরা এভাবে সাপের খেলা দেখিয়ে থাকলেও দেশে এ ধরনের প্রদর্শনী আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, এই ঘটনার মূল ব্যক্তি কোনো সাপুড়ে নন— তিনি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান ফারুক।
শুধু বোয়ালখালী নয়, মাগুরা জেলা প্রশাসনের আয়োজনে নোমানী ময়দান এবং জামালপুরেও সাপ প্রদর্শনীর খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া, সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) বৈশাখী শোভাযাত্রায় হাতি প্রদর্শন, সাপের খেলা এবং বানর নাচের ঘটনাও সামনে এসেছে। গত মঙ্গলবার বর্ষবরণ উপলক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব আইন লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে।
আইন যা বলে
‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ অনুযায়ী, লাইসেন্স বা পারমিট ছাড়া কোনো ব্যক্তি বন্যপ্রাণী লালন-পালন, আবদ্ধ রাখা, দখলে রাখা, ক্রয়-বিক্রয় বা পরিবহন করতে পারেন না। একই সঙ্গে বন্যপ্রাণী দিয়ে খেলা দেখানো বা জনসমক্ষে প্রদর্শন করাও দণ্ডনীয় অপরাধ। এই আইন লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অথবা সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড, কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
আইন অমান্য করে সাপ নিয়ে জনসমক্ষে প্রদর্শনী করার অভিযোগ উঠলেও বোয়ালখালী ইউএনও মেহেদী হাসান ফারুক তা অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো সাপুড়ে আনা হয়নি। আমাদের মূল কর্মসূচিতে ছিল র্যালি, রশি টানাটানি এবং নারীদের হাঁড়ি ভাঙা খেলা। আমি যখন সংসদ সদস্য মহোদয়কে স্বাগত জানাতে যাচ্ছিলাম, তখন এক সাপুড়ে বকশিশের আশায় আচমকা আমার হাতে সাপ পেঁচিয়ে দেয় এবং পরে বকশিশ নিয়ে চলে যায়।’
অন্যদিকে, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশাখী শোভাযাত্রায় হাতি, সাপ ও বানর প্রদর্শনের ঘটনায় সমালোচনা শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় বৈশাখ উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম জানান, বন্যপ্রাণী প্রদর্শন নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি তাদের জানা ছিল না। তিনি বলেন, ‘আয়োজনে বন্যপ্রাণী রাখার কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছিল না; এটি অনেকটা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত ছিল। ভবিষ্যতে এ ব্যাপারে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক থাকব।’
মাগুরার নোমানী ময়দানের প্রদর্শনীতে বার্মিজ পাইথন (অজগর) ও ফুল গোখরাসহ বেশকিছু সংরক্ষিত প্রজাতির সাপ দেখানো হয়। এমনকি সাপের কামড়ে এক সাপুড়ে আহত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে মাগুরার জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, ‘স্থানীয় মানুষের প্রবল আগ্রহের কারণেই জনপ্রতিনিধিরা সাপুড়ে এনেছিলেন। এর পেছনে অন্য কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল না এবং সাপুড়েদের সঙ্গে আমার পূর্বপরিচয়ও নেই।’
বিশেষজ্ঞ ও বন বিভাগের অভিমত
‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) অধ্যাদেশ, ২০২৬’- এর তফসিল অনুযায়ী হাতি, বানর, দাঁড়াশ সাপ, ফুল গোখরা ও বার্মিজ অজগর সংরক্ষিত প্রাণী হিসেবে তালিকাভুক্ত। ফলে এসব প্রাণীর প্রদর্শনী সম্পূর্ণ বেআইনি।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) বন্যপ্রাণী প্রদর্শনের বিষয়ে সিলেটের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা মির্জা মেহেদী সরোয়ার বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে বা কোনো আয়োজনে বন্যপ্রাণী প্রদর্শনের সুযোগ নেই। কেউ এমনটি করে থাকলে তা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বিষয়টি আগে আমাদের নজরে আসেনি।’
ওয়াইল্ড লাইফ ক্রাইম কন্ট্রোল ইউনিটের ইন্সপেক্টর আব্দুল্লাহ এস সাদিক এই ঘটনার আইনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ‘সাপ, হাতি বা বানর প্রদর্শনের মাধ্যমে সাধারণত এই অধ্যাদেশের ৩৬, ৪২ ও ১০ নম্বর ধারা লঙ্ঘিত হয়। এছাড়া আয়োজক কমিটি এই অপরাধে সহায়তা করায় ৪৫ নম্বর ধারার আওতায় অভিযুক্ত হতে পারে।’
তিনি বন্যপ্রাণী রক্ষায় বন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আগাম সতর্কতা জারি, নিয়মিত অভিযান ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানে এমন আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় পরিবেশকর্মীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তারা মনে করেন, আইন প্রয়োগের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের এমন উদাসীনতা জনমনে নেতিবাচক বার্তা দেয় এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের দীর্ঘমেয়াদী প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















