ঢাকা ০৯:৩৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ৩০ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
সংরক্ষিত নারী আসন সিলেট থেকে বিএনপির এমপি হতে চান যেসব নারী নেত্রী চারুকলায় চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি, দর্শনার্থীদের ব্যাপক ভিড় নববর্ষে ঐক্যের আহ্বান, দেশ পুনর্গঠনে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে বন্ধ মিল দ্রুত চালু করতে উদ্যোগ নিচ্ছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় ১২ হাজারে শূন্য কয়টি জানেন না ছাত্রলীগ নেতা, আসামিপক্ষে চিফ প্রসিকিউটর! পীরগঞ্জে গৃহবধূকে ধর্ষণের চেষ্টা, চাচাতো দেবরের বিরুদ্ধে থানায় মামলা বোরহানউদ্দিনে দুধ দিয়ে গোসল করে অনলাইন জুয়া খেলা ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন এক যুবক জুয়া খেলার টাকা না পেয়ে ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে যুবকের আত্মহত্যা ডাকাতের গুলিতে প্রাণ গেল ফুটবলারের চুরির অভিযোগে কিশোরকে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন, ভিডিও ভাইরাল

ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে আওয়ামীলীগ দোসর ২য় পর্ব

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ঢামেক) দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই হাসপাতালটি প্রতিদিন হাজারো রোগীর চিকিৎসা সেবার প্রধান ভরসাস্থল। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, গত দেড় দশকে এই হাসপাতালটি একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে থেকে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। একাধিক সূত্র, কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ অনুযায়ী, হাসপাতালের প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে থাকা কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী, ঠিকাদার ও মধ্যস্বত্বভোগীর সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী চক্র গড়ে ওঠে, যারা হাসপাতালের কেনাকাটা, সরবরাহ, টেন্ডার ও স্টোর ব্যবস্থাপনাকে নিয়ন্ত্রণ করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।
অভিযোগে বলা হয়, দীর্ঘ ১৫ বছরে হাসপাতালের বিভিন্ন স্তরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সহকারী পরিচালক, স্টোর ইনচার্জ, হিসাবরক্ষণ বিভাগ, নার্সিং প্রশাসন এবং কিছু চিকিৎসক পর্যন্ত এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। সরকারি বাজেটে রোগীদের জন্য বরাদ্দ থাকা ওষুধ, সার্জিক্যাল সামগ্রী, গ্লাভস, সুতা, চিকিৎসা যন্ত্রপাতি এবং খাবার সরবরাহ ব্যবস্থার বড় অংশই কাগজে-কলমে ব্যবহার দেখিয়ে বাস্তবে বাইরে পাচার করা হতো বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
এই পুরো ব্যবস্থার কেন্দ্রে ছিল কয়েকটি প্রভাবশালী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও তাদের সঙ্গে যুক্ত হাসপাতালের কিছু কর্মচারী। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভুয়া নথি, জাল পে-অর্ডার এবং অসত্য কাগজপত্র ব্যবহার করে হাসপাতালের আইসিটি স্টোর ও সরবরাহ শাখা থেকে কোটি কোটি টাকার মালামাল উত্তোলন করত। অভিযোগকারীদের দাবি, হাসপাতালের অভ্যন্তরে একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছিল, যারা টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, বিল পাস এবং সরবরাহ অনুমোদনের প্রতিটি ধাপ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল।
একটি বড় অভিযোগে বলা হয়, একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভুয়া পে-অর্ডার জমা দিয়ে পারফরমেন্স সিকিউরিটি দেখানো হতো, কিন্তু বাস্তবে সেই অর্থ ব্যাংকে জমা থাকত না বা ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া হতো। অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং হিসাব শাখার কর্মচারী এই প্রক্রিয়ায় সরাসরি জড়িত ছিলেন। তারা টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, হাসপাতালের কিছু ওয়ার্ড ও স্টোর থেকে রোগীদের জন্য বরাদ্দ থাকা ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী সরাসরি বাইরে পাচার করা হতো। বিশেষ করে ইনডেন্ট (চাহিদা তালিকা) তৈরি করে কাগজে রোগীর সংখ্যা দেখিয়ে অতিরিক্ত সরবরাহ দেখানো হতো। বাস্তবে রোগীরা সেই পরিমাণ ওষুধ বা সামগ্রী পেত না বলে একাধিক কর্মচারী ও রোগীর স্বজনদের অভিযোগে উঠে এসেছে।
সূত্রগুলো আরও দাবি করে, কিছু প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং স্টোর ইনচার্জ দীর্ঘ সময় একই পদে থাকার সুযোগ নিয়ে একটি শক্তিশালী ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক তৈরি করেন। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তারা সরবরাহ ব্যবস্থা, ওষুধ ক্রয়, যন্ত্রপাতি আমদানি এবং বিতরণ প্রক্রিয়া নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতেন। ফলে হাসপাতালের অভ্যন্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব তৈরি হয়।
একাধিক অভিযোগে বলা হয়, কিছু কর্মচারী ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগও করা হয়েছিল। এসব অভিযোগে বলা হয়, তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। কেউ কেউ ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি, জমি এবং ব্যবসায়িক বিনিয়োগ করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের অনেকগুলোই তদন্তাধীন অবস্থায় দীর্ঘদিন ঝুলে থাকে বা কার্যকর ফলাফল পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
অন্যদিকে হাসপাতালের ভেতরের কিছু অনিয়ম ও দুর্নীতি ধরা পড়লেও সেগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। মাঝে মাঝে কিছু নিম্নপদস্থ কর্মচারী বা ছোট ঠিকাদারকে শাস্তি দেওয়া হলেও মূল চক্রের প্রভাবশালী সদস্যরা থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে পুরো ব্যবস্থার ভেতরে এক ধরনের দণ্ডহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়।
অভিযোগ রয়েছে, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া অন্যান্য প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নানাভাবে হয়রানি করা হতো। নথি গায়েব করা, দরপত্র বাতিল করা বা শর্ত পরিবর্তন করার মতো অভিযোগও রয়েছে। এতে করে নির্দিষ্ট একটি চক্রের প্রতিষ্ঠানই বারবার কাজ পেত এবং সরকারি অর্থের বড় অংশ সেই চক্রের মাধ্যমে অপব্যবহার হতো।
হাসপাতালের কিছু কর্মচারী ও অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, করোনা মহামারির সময় এই অনিয়ম আরও বেড়ে যায়। সংকটকালীন পরিস্থিতিতে চিকিৎসা সামগ্রীর চাহিদা অত্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু চক্র বেশি দামে সরবরাহ দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আত্মসাৎ করেছে বলে অভিযোগ করা হয়। তবে এসব অভিযোগের অনেকটাই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত হয়নি।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, হাসপাতালের গুদাম ও সরবরাহ ব্যবস্থায় দায়িত্বে থাকা কিছু কর্মচারী নিয়মিতভাবে সরবরাহের হিসাব গরমিল করতেন। কাগজে দেখানো স্টক এবং বাস্তব স্টকের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য থাকত। এই পার্থক্য ব্যবহার করে অতিরিক্ত মালামাল বাইরে বিক্রি করা হতো বলে দাবি করা হয়।
একই সঙ্গে কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, তারা একাধিক নামে ব্যবসা পরিচালনা করে একই হাসপাতালে বিভিন্ন কাজ ভাগিয়ে নিত। এতে প্রতিযোগিতা কমে যেত এবং দরপত্র প্রক্রিয়া প্রভাবিত হতো। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে একই ব্যক্তি একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দরপত্রে অংশ নিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
হাসপাতালের কিছু কর্মচারীর ভাষ্যমতে, এই অনিয়মগুলো এতটাই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছিল যে, নতুন কেউ যোগ দিলেও তাকে ওই ব্যবস্থার সাথে মানিয়ে নিতে বাধ্য করা হতো। কেউ বিরোধিতা করলে তাকে বদলি বা চাপের মুখে পড়তে হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়, অনেক অভিযোগই ভিত্তিহীন বা অতিরঞ্জিত। তাদের দাবি, কিছু বিচ্ছিন্ন অনিয়ম ঘটলেও পুরো হাসপাতালকে জিম্মি করে কোনো সিন্ডিকেট কাজ করেছে—এমন দাবি সঠিক নয়। তবে অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষক ও সাবেক কর্মচারীদের অনেকে মনে করেন, দীর্ঘ সময় ধরে প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং নজরদারির অভাবে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছিল।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হওয়ায় এখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অভিযোগগুলোর ব্যাপকতা বিবেচনায় স্বাস্থ্য খাতের প্রশাসনিক কাঠামো নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসপাতালের কেনাকাটা, টেন্ডার এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় ডিজিটাল মনিটরিং এবং স্বচ্ছ অডিট ব্যবস্থা না থাকলে এ ধরনের অনিয়ম ভবিষ্যতেও চলতে পারে।
অন্যদিকে সাধারণ মানুষ ও রোগীদের অভিযোগ, তারা অনেক সময় সরকারি বরাদ্দের ওষুধ বা সামগ্রী ঠিকভাবে পান না। অনেক ক্ষেত্রে বাইরে থেকে কিনতে বাধ্য হতে হয়। এতে চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যায় এবং সরকারি হাসপাতালের ওপর আস্থা কমে যায়।
সব মিলিয়ে অভিযোগগুলো যদি সত্য হয়, তাহলে এটি শুধু একটি হাসপাতালের নয় বরং পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রশাসনিক দুর্বলতার প্রতিফলন। তবে এসব অভিযোগের অনেকাংশই এখনো তদন্তাধীন বা প্রমাণসাপেক্ষ। তাই চূড়ান্ত সত্য উদঘাটনের জন্য স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী তদন্ত প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সংরক্ষিত নারী আসন সিলেট থেকে বিএনপির এমপি হতে চান যেসব নারী নেত্রী

ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে আওয়ামীলীগ দোসর ২য় পর্ব

আপডেট সময় ০৫:৫৯:২৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ঢামেক) দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই হাসপাতালটি প্রতিদিন হাজারো রোগীর চিকিৎসা সেবার প্রধান ভরসাস্থল। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, গত দেড় দশকে এই হাসপাতালটি একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে থেকে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। একাধিক সূত্র, কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ অনুযায়ী, হাসপাতালের প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে থাকা কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী, ঠিকাদার ও মধ্যস্বত্বভোগীর সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী চক্র গড়ে ওঠে, যারা হাসপাতালের কেনাকাটা, সরবরাহ, টেন্ডার ও স্টোর ব্যবস্থাপনাকে নিয়ন্ত্রণ করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।
অভিযোগে বলা হয়, দীর্ঘ ১৫ বছরে হাসপাতালের বিভিন্ন স্তরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সহকারী পরিচালক, স্টোর ইনচার্জ, হিসাবরক্ষণ বিভাগ, নার্সিং প্রশাসন এবং কিছু চিকিৎসক পর্যন্ত এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। সরকারি বাজেটে রোগীদের জন্য বরাদ্দ থাকা ওষুধ, সার্জিক্যাল সামগ্রী, গ্লাভস, সুতা, চিকিৎসা যন্ত্রপাতি এবং খাবার সরবরাহ ব্যবস্থার বড় অংশই কাগজে-কলমে ব্যবহার দেখিয়ে বাস্তবে বাইরে পাচার করা হতো বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
এই পুরো ব্যবস্থার কেন্দ্রে ছিল কয়েকটি প্রভাবশালী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও তাদের সঙ্গে যুক্ত হাসপাতালের কিছু কর্মচারী। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভুয়া নথি, জাল পে-অর্ডার এবং অসত্য কাগজপত্র ব্যবহার করে হাসপাতালের আইসিটি স্টোর ও সরবরাহ শাখা থেকে কোটি কোটি টাকার মালামাল উত্তোলন করত। অভিযোগকারীদের দাবি, হাসপাতালের অভ্যন্তরে একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছিল, যারা টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, বিল পাস এবং সরবরাহ অনুমোদনের প্রতিটি ধাপ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল।
একটি বড় অভিযোগে বলা হয়, একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভুয়া পে-অর্ডার জমা দিয়ে পারফরমেন্স সিকিউরিটি দেখানো হতো, কিন্তু বাস্তবে সেই অর্থ ব্যাংকে জমা থাকত না বা ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া হতো। অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং হিসাব শাখার কর্মচারী এই প্রক্রিয়ায় সরাসরি জড়িত ছিলেন। তারা টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, হাসপাতালের কিছু ওয়ার্ড ও স্টোর থেকে রোগীদের জন্য বরাদ্দ থাকা ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী সরাসরি বাইরে পাচার করা হতো। বিশেষ করে ইনডেন্ট (চাহিদা তালিকা) তৈরি করে কাগজে রোগীর সংখ্যা দেখিয়ে অতিরিক্ত সরবরাহ দেখানো হতো। বাস্তবে রোগীরা সেই পরিমাণ ওষুধ বা সামগ্রী পেত না বলে একাধিক কর্মচারী ও রোগীর স্বজনদের অভিযোগে উঠে এসেছে।
সূত্রগুলো আরও দাবি করে, কিছু প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং স্টোর ইনচার্জ দীর্ঘ সময় একই পদে থাকার সুযোগ নিয়ে একটি শক্তিশালী ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক তৈরি করেন। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তারা সরবরাহ ব্যবস্থা, ওষুধ ক্রয়, যন্ত্রপাতি আমদানি এবং বিতরণ প্রক্রিয়া নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতেন। ফলে হাসপাতালের অভ্যন্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব তৈরি হয়।
একাধিক অভিযোগে বলা হয়, কিছু কর্মচারী ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগও করা হয়েছিল। এসব অভিযোগে বলা হয়, তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। কেউ কেউ ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি, জমি এবং ব্যবসায়িক বিনিয়োগ করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের অনেকগুলোই তদন্তাধীন অবস্থায় দীর্ঘদিন ঝুলে থাকে বা কার্যকর ফলাফল পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
অন্যদিকে হাসপাতালের ভেতরের কিছু অনিয়ম ও দুর্নীতি ধরা পড়লেও সেগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। মাঝে মাঝে কিছু নিম্নপদস্থ কর্মচারী বা ছোট ঠিকাদারকে শাস্তি দেওয়া হলেও মূল চক্রের প্রভাবশালী সদস্যরা থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে পুরো ব্যবস্থার ভেতরে এক ধরনের দণ্ডহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়।
অভিযোগ রয়েছে, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া অন্যান্য প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নানাভাবে হয়রানি করা হতো। নথি গায়েব করা, দরপত্র বাতিল করা বা শর্ত পরিবর্তন করার মতো অভিযোগও রয়েছে। এতে করে নির্দিষ্ট একটি চক্রের প্রতিষ্ঠানই বারবার কাজ পেত এবং সরকারি অর্থের বড় অংশ সেই চক্রের মাধ্যমে অপব্যবহার হতো।
হাসপাতালের কিছু কর্মচারী ও অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, করোনা মহামারির সময় এই অনিয়ম আরও বেড়ে যায়। সংকটকালীন পরিস্থিতিতে চিকিৎসা সামগ্রীর চাহিদা অত্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু চক্র বেশি দামে সরবরাহ দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আত্মসাৎ করেছে বলে অভিযোগ করা হয়। তবে এসব অভিযোগের অনেকটাই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত হয়নি।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, হাসপাতালের গুদাম ও সরবরাহ ব্যবস্থায় দায়িত্বে থাকা কিছু কর্মচারী নিয়মিতভাবে সরবরাহের হিসাব গরমিল করতেন। কাগজে দেখানো স্টক এবং বাস্তব স্টকের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য থাকত। এই পার্থক্য ব্যবহার করে অতিরিক্ত মালামাল বাইরে বিক্রি করা হতো বলে দাবি করা হয়।
একই সঙ্গে কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, তারা একাধিক নামে ব্যবসা পরিচালনা করে একই হাসপাতালে বিভিন্ন কাজ ভাগিয়ে নিত। এতে প্রতিযোগিতা কমে যেত এবং দরপত্র প্রক্রিয়া প্রভাবিত হতো। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে একই ব্যক্তি একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দরপত্রে অংশ নিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
হাসপাতালের কিছু কর্মচারীর ভাষ্যমতে, এই অনিয়মগুলো এতটাই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছিল যে, নতুন কেউ যোগ দিলেও তাকে ওই ব্যবস্থার সাথে মানিয়ে নিতে বাধ্য করা হতো। কেউ বিরোধিতা করলে তাকে বদলি বা চাপের মুখে পড়তে হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়, অনেক অভিযোগই ভিত্তিহীন বা অতিরঞ্জিত। তাদের দাবি, কিছু বিচ্ছিন্ন অনিয়ম ঘটলেও পুরো হাসপাতালকে জিম্মি করে কোনো সিন্ডিকেট কাজ করেছে—এমন দাবি সঠিক নয়। তবে অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষক ও সাবেক কর্মচারীদের অনেকে মনে করেন, দীর্ঘ সময় ধরে প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং নজরদারির অভাবে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছিল।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হওয়ায় এখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অভিযোগগুলোর ব্যাপকতা বিবেচনায় স্বাস্থ্য খাতের প্রশাসনিক কাঠামো নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসপাতালের কেনাকাটা, টেন্ডার এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় ডিজিটাল মনিটরিং এবং স্বচ্ছ অডিট ব্যবস্থা না থাকলে এ ধরনের অনিয়ম ভবিষ্যতেও চলতে পারে।
অন্যদিকে সাধারণ মানুষ ও রোগীদের অভিযোগ, তারা অনেক সময় সরকারি বরাদ্দের ওষুধ বা সামগ্রী ঠিকভাবে পান না। অনেক ক্ষেত্রে বাইরে থেকে কিনতে বাধ্য হতে হয়। এতে চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যায় এবং সরকারি হাসপাতালের ওপর আস্থা কমে যায়।
সব মিলিয়ে অভিযোগগুলো যদি সত্য হয়, তাহলে এটি শুধু একটি হাসপাতালের নয় বরং পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রশাসনিক দুর্বলতার প্রতিফলন। তবে এসব অভিযোগের অনেকাংশই এখনো তদন্তাধীন বা প্রমাণসাপেক্ষ। তাই চূড়ান্ত সত্য উদঘাটনের জন্য স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী তদন্ত প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করে।