ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লা আমদানির জন্য এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খোলার মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে যশোরের ৯ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ১০ কোটি টাকারও বেশি হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ফারজানা ইয়াসমিন নিলা নামের এক নারীর বিরুদ্ধে। প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের ঘনিষ্ঠ পরিচয় দিয়ে করা এই বিশাল প্রতারণার শিকার হয়ে এখন দেউলিয়া হওয়ার পথে নয়জন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। ভুক্তভোগীদের করা মামলায় বর্তমানে তিনি যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক রয়েছেন। অভিযুক্ত নিলা সাবেক এক ব্যাংক কর্মকর্তার স্ত্রী।
মামলার বিবরণ ও ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যবসায়িক অস্থিরতার সুযোগ নেন নিলা। নিজেকে অত্যন্ত ক্ষমতাধর দাবি করে তিনি মেসার্স এ টু জেড ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী আনিসুর রহমান খানকে ‘ব্রড কান্ট্রি এলসি’ খোলার প্রস্তাব দেন। তার আশ্বাসে আশ্বস্ত হয়ে যশোরের ৯ জন ব্যবসায়ী যৌথভাবে এলসি খোলার সিদ্ধান্ত নেন এবং ৩০ শতাংশ মার্জিনের শর্তে নিলার ব্যাংক হিসাবে মোট ১০ কোটি ৯ লাখ ১২ হাজার ৫০০ টাকা জমা দেন। কিন্তু টাকা পাওয়ার পর থেকেই শুরু হয় নিলার টালবাহানা। ব্যবসায়ীরা এলসির নথিপত্র দেখতে চাইলে তিনি ইন্দোনেশিয়ায় কয়লাবাহী জাহাজ প্রস্তুত রয়েছে জানিয়ে জাল কাগজপত্র সরবরাহ করেন। পরবর্তীতে পাওনা টাকা ফেরত পেতে চাপ দেওয়া হলে তিনি ৫০ লাখ টাকার জাল বিএফটিএন (BFTN) কপি ও একটি ভুয়া এফডিআরের (FDR) কাগজ দিয়ে ব্যবসায়ীদের সাথে প্রতারণা অব্যাহত রাখেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফারজানা ইয়াসমিন নিলা নিজেকে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তি তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, বাহাউদ্দিন নাছিম এবং সালমান এফ রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তার করতেন। এমনকি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার নাম ভাঙিয়েও তিনি সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু তাই নয়, তার বিরুদ্ধে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা, মানব পাচার এবং নথি জালিয়াতির একাধিক সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগও দীর্ঘদিনের। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী আনিসুর রহমান জানান, এর আগেও নিলার নামে বেশ কয়েকটি প্রতারণার মামলা ছিল এবং তিনি সাজাপ্রাপ্ত হওয়া সত্ত্বেও অদৃশ্য শক্তির ইশারায় এতদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন।
আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গত বছরের ২০ মার্চ গুলশান থানায় মামলা হলে নিলা গ্রেপ্তার হন, তবে পরবর্তীতে আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে আসেন। জামিনের শর্ত ভঙ্গ করে টাকা ফেরত না দিয়ে তিনি হাইকোর্ট থেকে ‘স্টে অর্ডার’ নিয়ে আসেন। সর্বশেষ গত ২৬ ফেব্রুয়ারি যশোরের কোতোয়ালি থানায় নতুন মামলা দায়ের হলে পুলিশ পুনরায় তাকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। বর্তমানে ব্যবসায়ীরা তাদের জমাকৃত অর্থ ফেরত পাওয়া এবং এই চতুর প্রতারকের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন। ব্যাংক ঋণ নিয়ে এলসির টাকা পরিশোধ করা নুর আলম বাবু, মাহমুদ হাসান লিপু ও মোহাম্মদ কামরুজ্জামানসহ অন্য ব্যবসায়ীরা জানান, এই প্রতারক চক্রের কারণে তাদের পরিবার এখন পথে বসার উপক্রম হয়েছে।
এ বিষয়ে যশোরের কোতোয়ালি থানায় করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান জানান, কয়লা আমদানির নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে ফারজানা ইয়াসমিন নিলা বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। প্রাথমিক তদন্তে জাল নথিপত্র তৈরি করে প্রতারণার সত্যতা পাওয়া গেছে এবং পূর্ণাঙ্গ তদন্ত কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে। তবে অভিযুক্তের মেয়ে নন্দিতা মেহজাবিন এসব অভিযোগকে ‘অপপ্রচার’ বলে দাবি করেছেন এবং বিষয়টি আদালত দেখবে বলে মন্তব্য করেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















