কক্সবাজারের রামু উপজেলার খুনিয়াপালং ইউনিয়নের থোয়াইংগাকাটা বাজারে গভীর রাতে সরকারি গাড়িতে করে এসে অস্ত্রের মুখে দুই যুবককে তুলে নিয়ে রাতভর আটকে রেখে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।
পরদিন জনপ্রতি ৮ হাজার টাকা নেওয়ার পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকাণ্ড নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৫ মার্চ রাত আনুমানিক ২টার দিকে থোয়াইংগাকাটা বাজারের একটি চায়ের দোকানে বসে ছিলেন প্রতিবন্ধী বাবুল (২৮) ও কৃষক সেলিমের ছেলে মোহাম্মদ রমজান (১৭)। এসময় কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের রাজারকুল রেঞ্জের (ঢাকা মেট্রো-ঠ-১১-৬৩৬৩ সিরিয়ালের একটি কালো রঙের সরকারি গাড়িতে করে কয়েকজন কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, রেঞ্জ কর্মকর্তা অভিউজ্জমান এবং বিট কর্মকর্তা আল ফুয়াদসহ কয়েকজন কোনো ধরনের লিখিত নোটিশ বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়াই অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ওই দুইজনকে জোরপূর্বক গাড়িতে তুলে নিয়ে যান।
ভুক্তভোগী মোহাম্মদ রমজান বলেন,
আমরা চায়ের দোকানে বসে ছিলাম। হঠাৎ করে তারা এসে আমাদের ধরে নিয়ে যায়। আপত্তি করলে অস্ত্র দেখিয়ে ভয় দেখানো হয়। পরে একটি কক্ষে সারারাত আটকে রেখে সকালে জনপ্রতি ৮ হাজার টাকা নেওয়ার পর ছেড়ে দেয়।
অন্য ভুক্তভোগী, যিনি শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী, ঘটনার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন তার পরিবারের সদস্যরা। পরিবারের দাবি,ধারদেনা করেও টাকা জোগাড় করে
তাদের মুক্ত করতে হয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, একটি জনবহুল বাজার থেকে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই গভীর রাতে এভাবে লোকজন তুলে নেওয়ায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পরে এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে যে অর্থের বিনিময়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযুক্ত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। পাহাড় কাটা, বালু উত্তোলন ও বনভূমিতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণে অর্থের বিনিময়ে ছাড় দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
টাকা দিলে সুবিধা, না দিলে হয়রানি এমন একটি অঘোষিত নিয়ম চালু রয়েছে বলেও দাবি করেন তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেঞ্জ কর্মকর্তা অভিউজ্জমান বলেন, ঘটনার সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন না এবং বিট কর্মকর্তা আল ফুয়াদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। তবে সরেজমিনে অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যে তার উপস্থিতির বিষয়টি উঠে এসেছে, যা ঘটনার ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যক্তিকে আটক করতে হলে নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক।
গ্রেপ্তারের কারণ উল্লেখ, তা নথিভুক্ত করা এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আদালতে হাজির করা না হলে তা সম্পূর্ণ বেআইনি হিসেবে গণ্য হয়।
অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করা হলে তা দণ্ডবিধি অনুযায়ী গুরুতর অপরাধ, যা চাঁদাবাজি ও অবৈধ আটক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা যদি নিজেরাই আইন লঙ্ঘন করেন, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে? তারা দ্রুত একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন, জড়িতদের সাময়িক বরখাস্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে মানবাধিকারকর্মীরা সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের ঘটনা অব্যাহত থাকলে আইন ও রাষ্ট্রের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
কক্সবাজার প্রতিনিধি 






















